ই. ই. কামিংস প্রমাণ করেছিলেন যে, নিয়মভাঙা মানেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা নয়, বরং নিয়ম ভেঙে নতুন এক সুশৃঙ্খল সৌন্দর্য তৈরি করা সম্ভব। আজকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে মানুষ সংক্ষিপ্ত ভাষা বা টেক্সট ফরম্যাটে যোগাযোগ করে, সেখানে কামিংসের শতবর্ষ আগের টাইপোগ্রাফিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তিনি প্রথার শৃঙ্খল ভেঙে শব্দকে মুক্ত করেছিলেন।
ই. ই. কামিংস-এর কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় শেষ কৈশোরে, বাবার বইয়ের তাকে। ‘73 poems e.e cummnings’। পুরোটাই ছোট হাতে লেখা। ধূসর অক্ষরে লেখা ‘ফেবার অ্যান্ড ফেবার’-এর বিখ্যাত ff লোগো সারা মলাট জুড়ে। মাঝখানে পেন্সিল স্কেচে কবির বিখ্যাত সিগারেট হাতে ধরা প্রতিকৃতি। আমার বাংলা মিডিয়ামের ইংরেজি সে-কবিতার বইয়ের একবর্ণও বুঝতে পারেনি! সেই প্রথম পরিচয়ের ৩০ বছর পরে আজও খানিক দূরত্ব রয়ে গিয়েছে!

মার্কিন আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের ইতিহাসে ই. ই. কামিংস (E. E. Cummings) এক অনন্য ও বৈপ্লবিক নাম। প্রথাগত ব্যাকরণ, বিরামচিহ্ন এবং শব্দবিন্যাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি কবিতায় যে নতুন ভাষার জন্ম দিয়েছিলেন, তা আজও পাঠকের সম্ভ্রম আদায় করে, বিস্মিত করে।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মার্কিন সাহিত্যে যে আধুনিকতাবাদী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, ই. ই. কামিংস ছিলেন তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এডওয়ার্ড এস্টলিন কামিংস (১৮৯৪-১৯৬২) একাধারে কবি, চিত্রশিল্পী, প্রাবন্ধিক এবং নাট্যকার। তবে বিশ্বসাহিত্যে তিনি মূলত তাঁর টাইপোগ্রাফিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে কবিতা লেখার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। যেখানে অন্য কবিরা শব্দের অর্থ নিয়ে খেলতেন, কামিংস সেখানে খেলতেন শব্দের অবয়ব, দৃশ্যরূপ এবং ব্যাকরণ নিয়ে।
১৮৯৪ সালের ১৪ অক্টোবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের কেমব্রিজে কামিংস জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা এডওয়ার্ড কামিংস ছিলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং পরবর্তীতে একজন নামী যাজক। মা রেবেকা হাসওয়েল ক্লার্ক কামিংস শৈশব থেকেই ছেলেকে সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। কামিংসের শৈশব অত্যন্ত আনন্দময়। সৃজনশীল। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৫ সালে বি.এ. এবং ১৯১৬ সালে ইংরেজি ও ধ্রুপদী সাহিত্যে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন।
হার্ভার্ডে পড়ার সময়ই তিনি আধুনিক শিল্প ও সাহিত্যের সংস্পর্শে আসেন এবং প্রথাগত রীতির বাইরে লেখার প্রেরণা পান। ১৯১৭ সালে কামিংস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সে ‘নর্টন-হারজেস অ্যাম্বুলেন্স কর্পস’-এ স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দেন। সেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা দেখার পাশাপাশি একটি ভুল বোঝাবুঝির কারণে তিনি ফরাসি সরকারের হাতে প্রায় সাড়ে তিনমাস বন্দি থাকেন। তাঁর চিঠিপত্রে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব প্রকাশের সন্দেহে তাঁকে একটি সামরিক বন্দিশিবিরে রাখা হয়েছিল। এই বন্দিজীবনের তিক্ত ও মানবিক অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯২২ সালে তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত আত্মজৈবনিক উপন্যাস– ‘দ্য এনার্মাস রুম’ (The Enormous Room)। এই গ্রন্থটি তাঁকে সাহিত্যিকমহলে প্রথম বড় সাফল্য এনে দেয়।

কামিংসের কবিতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, এর দৃশ্যমান রূপ বা ‘ভিজুয়াল ফর্ম’। তিনি বিশ্বাস করতেন– কবিতা শুধু কানে শোনার বিষয় নয়, চোখে দেখারও বিষয়।
প্রথমত, ছোট হাতের অক্ষরের ব্যবহার: কামিংস তাঁর কবিতায় বড় হাতের অক্ষরের (Capital Letters) ব্যবহার প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। এমনকী নিজের নামও তিনি অনেক সময় ছোট হাতের অক্ষরে ‘e e cummings’ লিখতেন। এর মাধ্যমে তিনি অহংকার বর্জন এবং সমতাবাদের প্রতীকী প্রকাশ ঘটাতেন।
দ্বিতীয়ত, বিরামচিহ্নের ভাঙন: কমা, ফুলস্টপ, কোলন বা ব্র্যাকেটকে তিনি লাইনের মাঝে অদ্ভুত সব জায়গায় বসাতেন। কখনও কখনও একটি শব্দের ভেতরে ব্র্যাকেট ঢুকিয়ে দিয়ে দু’টি ভিন্ন ভাবকে একসঙ্গে প্রকাশ করতেন (যেমন তাঁর বিখ্যাত– ‘l(a’ কবিতাটি, যেখানে ‘loneliness’ শব্দের ভেতরে ‘a leaf falls’ কথাটি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে)।

তৃতীয়ত, শব্দ ও ব্যাকরণের পুনর্বিন্যাস: তিনি বিশেষ্যকে ক্রিয়াপদ বা বিশেষণকে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহার করতে ভালোবাসতেন। লাইনের ফাঁকা জায়গা (Spacing) ব্যবহার করে তিনি কবিতার গতি এবং পড়ার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতেন।
বাইরের রূপটি অত্যন্ত আধুনিক এবং জটিল মনে হলেও, কামিংসের কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল অত্যন্ত সহজ, চিরন্তন এবং প্রেমিক। কামিংস ছিলেন মূলত প্রেমের কবি। তাঁর অসংখ্য কবিতায় প্রেমের গভীরতা, শারীরিক ও মানসিক টান অত্যন্ত সহজ ও অকপটভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ‘somewhere i have never travelled,gladly beyond’ তাঁর অন্যতম সেরা প্রেমের কবিতা।

বসন্ত ঋতু এবং প্রকৃতির প্রতি তাঁর এক অদ্ভুত টান ছিল। শিশুদের সরলতা এবং প্রকৃতির অবিকৃত রূপকে তিনি যান্ত্রিক সভ্যতার চেয়ে উঁচুতে স্থান দিতেন। কামিংস তীব্রভাবে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি আধুনিক গণসমাজ, যুদ্ধবাজ রাজনীতি এবং মানুষের অন্ধ অনুকরণপ্রিয়তার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে বিজ্ঞান ও যুক্তি মানুষকে রোবট বানিয়ে ফেলে, যা মানুষের আত্মাকে ধ্বংস করে।
১৯৬২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর নিউ হ্যাম্পশায়ারে মৃত্যুর সময়ে তিনি ছিলেন আমেরিকার দ্বিতীয় সর্বাধিক পঠিত কবি (রবার্ট ফ্রস্টের পরেই)।

ই. ই. কামিংস প্রমাণ করেছিলেন যে, নিয়মভাঙা মানেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা নয়, বরং নিয়ম ভেঙে নতুন এক সুশৃঙ্খল সৌন্দর্য তৈরি করা সম্ভব। আজকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে মানুষ সংক্ষিপ্ত ভাষা বা টেক্সট ফরম্যাটে যোগাযোগ করে, সেখানে কামিংসের শতবর্ষ আগের টাইপোগ্রাফিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তিনি প্রথার শৃঙ্খল ভেঙে শব্দকে মুক্ত করেছিলেন।
ই. ই. কামিংসের ব্যক্তিগত জীবন ছিল তাঁর কবিতার মতোই বৈচিত্র্যময়, আবেগপ্রবণ এবং প্রথাগত সমাজরীতির বাইরে। তাঁর জীবনের জটিল প্রেম, বিয়ে, পিতৃ পরিচয়ের লড়াই এবং বন্ধুদের বৃত্ত তাঁর সাহিত্যিক ভাবনার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

কামিংসের ব্যক্তিগত জীবন কোনও সহজ, সরল রেখায় চলেনি। তাঁর জীবনে প্রধানত তিনজন নারী এসেছিলেন, যাঁরা তাঁর কবিতা ও জীবনবোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন।
কামিংসের প্রথম বড় প্রেম ছিল তাঁর বন্ধু স্কোফিল্ড থায়েরের স্ত্রী এলিয়েন অর-এর সঙ্গে। এই সম্পর্কটি ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত। থায়েরের সঙ্গে বিবাহিত থাকা অবস্থাতেই এলিয়েন এবং কামিংসের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯১৯ সালে তাঁদের একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়, যার নাম রাখা হয়েছিল ন্যান্সি।
পরবর্তীতে এলিয়েনের সঙ্গে থায়েরের বিবাহবিচ্ছেদ হলে, ১৯২৪ সালে কামিংস এলিয়েনকে বিয়ে করেন। তবে এই বিয়ে স্থায়ী হয়েছিল মাত্র দু’মাস! বিবাহবিচ্ছেদের পর এলিয়েন ন্যান্সিকে নিয়ে আয়ারল্যান্ডে চলে যান এবং কামিংসকে তাঁর মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাধা দেন।

নিজের কন্যাসন্তান ন্যান্সিকে ফিরে পাওয়ার জন্য কামিংস আইনি লড়াই করেছিলেন, কিন্তু তৎকালীন সামাজিক ও আইনি জটিলতার কারণে তিনি ব্যর্থ হন। ন্যান্সিকে বড় করা হয়েছিল এই তথ্যটি লুকিয়ে যে, কামিংস তাঁর আসল বাবা। বহু বছর পর, ন্যান্সি যখন প্রাপ্তবয়স্ক এবং নিজের বিয়ের পর কামিংসের আঁকা একটি প্রতিকৃতি (Portrait) দেখতে পান, তখন তিনি সত্যটি জানতে পারেন। ১৯৪৮ সালে, দীর্ঘ দুই দশক পর বাবা ও মেয়ের এই পুনর্মিলন কামিংসের জীবনের অন্যতম আবেগঘন ঘটনা ছিল।

১৯২৯ সালে কামিংস অ্যান বার্টন নাম এক ফ্যাশন মডেল ও লেখককে বিয়ে করেন। এই বিয়েটি কয়েক বছর স্থায়ী হয়েছিল। তবে আদর্শগত অমিল এবং কামিংসের বোহেমিয়ান (উদাসী) জীবনযাপনের কারণে ১৯৩২ সালে তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটে।
১৯৩২ সালে কামিংসের জীবনে আসেন ম্যারিয়ন মোরহাউস (Marion Morehouse)। ম্যারিয়ন ছিলেন একজন নামী ফ্যাশন মডেল এবং অসাধারণ চিত্রগ্রাহক (Photographer)। যদিও তাঁরা কোনওদিন প্রথাগতভাবে আইনি বিয়ে করেছিলেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে ম্যারিয়নই ছিলেন কামিংসের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী, প্রেরণা এবং অভিভাবক।

ম্যারিয়ন কামিংসের বোহেমিয়ান স্বভাবকে সামলে রাখতেন এবং তাঁর সাহিত্যিক ও চিত্রকর্মের কাজগুলোকে গুছিয়ে রাখতেন। কামিংসের জীবনের শেষ তিন দশক ম্যারিয়নের সঙ্গেই অত্যন্ত শান্তিতে কেটেছিল।
কামিংস নিউ ইয়র্কের ‘গ্রিনউইচ ভিলেজ’ (Greenwich Village)-এর ৪, প্যাচিন প্লেসে (Patchin Place) জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। এই জায়গাটি ছিল তৎকালীন আমেরিকার মুক্তচিন্তা, লেখক এবং শিল্পীদের প্রধান আড্ডাখানা। কামিংস এখানে অত্যন্ত সাধারণ, প্রায় দারিদ্রের কাছাকাছি জীবনযাপন করতেন। তিনি প্রথাগত চাকরি করা পছন্দ করতেন না এবং কেবল তাঁর লেখা ও পেইন্টিং বিক্রি করে যা আয় হত, তা দিয়েই চলতেন। আমেরিকার ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী সমাজের ওপর তাঁর যে ক্ষোভ ছিল, তা তাঁর এই সাধারণ জীবনযাপনের মাধ্যমেই প্রতিফলিত।
কামিংসের জীবনে তাঁর বাবা এডওয়ার্ড কামিংসের প্রভাব ছিল অপরিসীম। ১৯২৬ সালে একটি মর্মান্তিক গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর বাবা মারা যান। এই ঘটনাটি কামিংসকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর তিনি তাঁর অন্যতম বিখ্যাত শোকগাথা কবিতা ‘my father moved through dooms of love’ রচনা করেন, যেখানে তিনি তাঁর বাবার উদার ব্যক্তিত্ব এবং আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তাঁর মা রেবেকাও শেষদিন পর্যন্ত কামিংসের সৃজনশীলতার সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন। কামিংসের এই ব্যক্তিগত জীবনের উত্থান-পতন, বিশেষ করে এলিয়েনের সঙ্গে বিচ্ছেদ এবং কন্যাসন্তানকে হারানোর বেদনা তাঁর কবিতাকে আরও পরিপক্ব এবং সংবেদনশীল করে তুলেছিল।

অনেকেই জানেন না যে, কামিংস নিজেকে যতটা কবি মনে করতেন, ঠিক ততটাই চিত্রশিল্পী মনে করতেন। প্যারিসে থাকার সময় তিনি কিউবিজম এবং আধুনিক চিত্রকলার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তাঁর কবিতার শব্দবিন্যাসে ক্যানভাসের সেই জ্যামিতিক প্রভাব স্পষ্ট। তিনি সারাজীবনে হাজার হাজার স্কেচ ও অয়েল পেইন্টিং তৈরি করেছেন।

কামিংসের কবিতা পড়তে এবং দেখতে গিয়ে মনে হয়, বাংলায় এ-কবিতা অনুবাদ করা অসম্ভব, কারণ অক্ষরের চেহারা নিয়ে, ছোট ও বড় হাতের অক্ষর নিয়ে এই খেলা– বাংলা তথা এশিয়ার কোনও ভাষাতেই সম্ভব নয়। রোমান হরফে লেখা তুর্কিতে হয়তো হতে পারে। এবং বাংলা কবিতার পাঠক যেহেতু প্রায় কোনও পরীক্ষাকেই মেনে নেন না, সেখানে বাংলা কবিতার দৃশ্যরূপ নিয়ে করা পরীক্ষা আমাদের মানচিত্রের বাইরেই থেকে যাবে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved