remembering works of khaled chowdhury as a stage artist | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শূন্য মঞ্চের ভিতরে এত ঢেউ

থিয়েটার ওয়ার্কশপের প্রযোজনা ‘বিসর্জন’। প্রথাগতভাবে এই নাটকে মঞ্চের মাঝখানে একটা পেল্লাই মন্দির আর বিশাল এক দেবী-বিগ্রহ থাকত, যা অনেক সময় অভিনেতাদের আড়াল করে দিত, এবং তাঁদের মানবিক দ্বন্দ্বগুলোকে ম্লান করে দিত। খালেদ চৌধুরী এলেন, দেখলেন এবং পুরো মন্দিরের সেটটাই বাতিল করে দিলেন! তার বদলে মঞ্চের পেছনের কালো পর্দার ওপর থেকে ফ্লোর অবধি টানটান করে ঝুলিয়ে দিলেন আড়াই ফুট চওড়া তিনটি স্ক্রোল— লাল, সবুজ আর নীল। একটিতে আঁকা হাঁড়িকাঠ, একটিতে খড়গ এবং অপরটিতে লম্বভাবে আঁকা দেবীর তৃতীয় নয়ন। এক লহমায় মঞ্চের ভার্টিকাল স্পেসটা ব্যবহার করে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে, মহাশক্তির সর্বগ্রাসী উপস্থিতির জন্য কোনও কংক্রিটের মন্দির লাগে না। ওই তিনটি প্রাথমিক বর্ণের প্রতীকী রেখাই দর্শকের মনে ভক্তিরসের সাথে সাথে অন্ধ ধর্মান্ধতার এক রুদ্ধশ্বাস ভয় ও রক্তপাতের আবহ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট।

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ১৭:১৮   
Facebook WhatsApp Messenger

আমরা বাংলার থিয়েটার নিয়ে কথা বলতে গেলেই আবেগী হয়ে পড়ি, কারণ অনেকেই বিবাগী হয়েছিলেন– এই মহান শিল্পচর্চা করতে করতে, মহৎ হতে চেয়ে। কিন্তু এই মহান শিল্পের যে ক’জনের নাম আপনি এক নিঃশ্বাসে বলে যেতে পারেন, অথবা পারেন না, তাঁরা প্রত্যেকেই ‘থিয়েটার’ করতে এসে ‘অভিনয়’ করেছেন মূলত। থিয়েটার আসলে অ্যালায়েড আর্ট। থিয়েটার করা মানে শুধু অভিনয় করা নয়। সংগীত নাটক আকাদেমি-সহ আরও নানা আকাদেমি যেসব থিয়েটারের মানুষগুলিকে সাধারণত স্বীকৃতি দেন, তাঁরা এই ‘স্টার অ্যাক্টর’ মূলত। কিন্তু যে-মানুষগুলো দীর্ঘদিন লাইট, সাউন্ড, মেক-আপ, মিউজিক, সেট-ডিজাইন, পোস্টার ডিজাইন করে করে মরে গেলেন এবং একটি পাড়াতুতো স্মরণ-সভার রজনীগন্ধার মালার তলায় বিস্মরণে গেলেন? তাঁদের কী হয়? যদিও আমি ফের আকাদেমির বোকামি করে ফেলেছি, উল্লেখ করিনি নাট্য-সমালোচক এবং গবেষকদের। ওঁদের তো লাগে শুধু উৎসব উদ্বোধনে, কারণ থিয়ে-পাড়ার দাদারা বলেছেন ‘নাটকটা করার জিনিস, ওসব পড়ে-ফড়ে কিস্যু হয় না!’ আজকাল তো আবার সিনোগ্রাফার নামে নতুন একটি পদের চালু হয়েছে বাংলা থিয়েটারে, ফলে অনেকেই ‘হবি’-র পাশে সেসব লিখছেন।

খালেদ চৌধুরীদের সময় কেউ ‘সিনোগ্রাফার’ হতেন না। সেসময় সবাই সবটা করে নাটকটা নামানোর চেষ্টা করতেন। শম্ভু মিত্রে তৃপ্ত বাঙালি, তৃপ্তি মিত্রে দৃপ্ত বাঙালি, উৎপল দত্তে ক্ষিপ্ত বাঙালি, অজিতেশে মত্ত বাঙালি, কেয়া-পাতার নৌকা থেকে মাঝেমাঝেই জলে পড়ে যান। জল থেকে উঠে হয়তো তাপস সেনের আলো চোখে পড়ে, কিন্তু খালেদ চৌধুরী-র মঞ্চ? 

zoom
খালেদ চৌধুরী

শুনেছি, তাপস সেন আলো করার সময় আসলে অন্ধকারটা নিয়েই ভাবতেন; আর খালেদ চৌধুরীর মঞ্চভাবনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল– শূন্যস্থানের প্রতি তাঁর জাদুকরি দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি প্রসেনিয়াম আর্চের হাঁ-করা জায়গাটাকে ভয় পেতেন না, বরং শূন্যতাকেই তিনি শিল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতেন। তাঁর এই অভাবনীয় যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সাল থেকে। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ-র প্রযোজনা ‘শহিদের ডাক’। এটি ছিল মূলত একটি ছায়ানাট্য বা শ্যাডো থিয়েটার। এই ছায়ানাট্যের সেটের ব্যবস্থাপনা করতে গিয়েই খালেদ চৌধুরী প্রথম বুঝতে শেখেন, আলো আর ছায়ার জ্যামিতি কীভাবে একটা সমতল, দ্বিমাত্রিক পর্দাকে মুহূর্তের মধ্যে বিশাল ত্রিমাত্রিক ক্যানভাসে পরিণত করতে পারে। এই আলো-আঁধারির খেলাই তাঁকে শিখিয়েছিল, দৃশ্যপটে সব কিছু বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, দর্শকের কল্পনাশক্তিকে উসকে দেওয়াই মঞ্চসজ্জার আসল কাজ।

এরপর তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে যায় শম্ভু মিত্রের ডাকে বহুরূপী নাট্যদলে যোগ দেওয়ার পর। বহুরূপীর প্রযোজনা ‘ধর্মঘট’ নাটকের সেট তৈরি করার মধ্য দিয়ে তিনি প্রথাগত মঞ্চসজ্জার দুনিয়ায় পা রাখেন। কিন্তু বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস চিরতরে বদলে গেল, যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রূপক-সাংকেতিক নাটক ‘রক্তকরবী’ মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত হল। প্রথমে দেবব্রত বিশ্বাসের নির্দেশনায় শিল্পী সূর্য রায়ের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি এই নাটকের মঞ্চসজ্জা করেন। কিন্তু পরে শম্ভু মিত্রের আইকনিক বহুরূপী প্রযোজনায় এবং তার হিন্দি রূপান্তরে তাঁর মঞ্চভাবনা এক নিস্তব্ধ বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। তিনি কোনও রাজপ্রাসাদ বা খনিগর্ভের আক্ষরিক, বস্তুতান্ত্রিক সেট বানালেন না, যা দর্শকরা সাধারণত দেখে অভ্যস্ত ছিলেন। তার বদলে তিনি তৈরি করলেন বহুতল বিশিষ্ট একটি লিনিয়ার কম্পোজিশন বা জ্যামিতিক রেখার এক অদ্ভুত কাঠামো। এই কাঠামোটি ছিল পুঁজিবাদের নির্মম শোষণের এক দৃশ্যগত রূপক। মঞ্চে দাঁড়িয়ে রইল মকররাজের সেই নিষ্ঠুর জাল, যার ওপরে শ্যেনচক্ষুর মতো জ্বলজ্বল করছে লাল রঙের নিষেধ। একদিকে লোহার পাত আর শিকলের কাঠিন্য, অন্যদিকে শ্বেতপাথরের মতো এক শীতল স্তব্ধতা। শোষিত শ্রমিকের হাড়ভাঙা খাটুনি, মানুষের ওপর যন্ত্রের আগ্রাসন আর যান্ত্রিক জীবনের নিষ্ঠুরতাকে তিনি কোনও আক্ষরিক ছবি দিয়ে নয়, বরং বিমূর্ত ফর্মের সাহায্যে এমনভাবে ফুটিয়ে তুললেন, যা দেখে স্বয়ং শিল্পগুরু নন্দলাল বসু পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। শিল্পের সঙ্গে শিল্পের এই অদ্ভুত বোঝাপড়া প্রমাণ করেছিল যে, খালেদ চৌধুরীর কাজ কতটা আন্তর্জাতিক মানের ছিল।

বহুরূপীর সঙ্গেই তাঁর মঞ্চস্থাপত্যের নিত্যনতুন নিরীক্ষা চলতে থাকে। ইবসেনের বিখ্যাত নাটক ‘পুতুলখেলা’ এবং পরবর্তীকালে তার হিন্দি রূপ ‘গুঁড়িয়া ঘর’-এর মঞ্চসজ্জায় তিনি এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক কাজ করলেন। নোরা-র মানসিক বন্দিদশা এবং দমবন্ধ করা দাম্পত্যকে বোঝাতে তিনি প্রসেনিয়ামের ভেতরেই এক রুদ্ধশ্বাস করা ফ্রেম বা খাঁচা তৈরি করলেন। দর্শক যেন বুঝতে পারলেন, ওই সুন্দর সাজানো, পরিপাটি ড্রয়িংরুমটা আসলে একটা অদৃশ্য কারাগার, যেখানে নোরার নিজস্ব কোনও আকাশ নেই। আবার বাদল সরকারের ‘পাগলা ঘোড়া’ নাটকের ক্ষেত্রে তিনি তাঁর নিজস্বতার এমন এক স্বাক্ষর রাখলেন, যা আজও অবাক করে। তিনি একই নাটকের বাংলা এবং হিন্দি– দু’টি ভিন্ন মঞ্চায়নের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপের এবং ভিন্ন মাত্রার কাজ করেছিলেন। একটি নির্দিষ্ট ছকে নিজেকে আটকে রাখা বা নিজেকে পুনরাবৃত্তি করা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ ছিল। বহুরূপীর আরেক অবিস্মরণীয় প্রযোজনা ‘ডাকঘর’ নাটকেও তাঁর মঞ্চসজ্জা অমল নামের সেই রুগ্ন, বন্দি ছেলেটির জানলার বাইরের পৃথিবীর প্রতি অদম্য আকর্ষণ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে যেন এক মূর্ত রূপ দিয়েছিল।

বহুরূপীর গণ্ডি পেরিয়ে তিনি যখন অন্যান্য দলের সঙ্গে কাজ শুরু করলেন, তখন তাঁর প্রতিভার আরও বিচিত্র সব দিক উন্মোচিত হল। নান্দীকারের প্রযোজনা ‘ফেরিওয়ালার মৃত্যু’ (আর্থার মিলারের ‘ডেথ অফ এ সেলসম্যান’-এর বঙ্গানুবাদ) নাটকের মঞ্চসজ্জার গল্পটা তো থিয়েটার মহলে রীতিমতো মিথ হয়ে আছে। এই নাটকের জন্য খালেদ চৌধুরী মঞ্চের পিছনে একটা বিশাল কংক্রিটের জঙ্গলের ক্যানভাস তৈরি করেছিলেন। উইলি লোম্যানের ছোট্ট, পুরনো, স্বপ্নমাখা বাড়িটাকে যেন চারপাশ থেকে গিলে খেতে উদ্যত হয়েছে এক অতিকায়, অনুভূতিহীন কংক্রিটের দানব। দেশলাই বাক্সের মতো খোপ খোপ জানলাওয়ালা আকাশছোঁয়া সেই বহুতলগুলো দেখতে অসাধারণ হয়েছিল, যা একজন সাধারণ মানুষের ব্যর্থতাকে আরও প্রকট করে তুলেছিল। কিন্তু আলোকশিল্পী তাপস সেন পড়লেন ঘোর বিপদে। পিছনের ক্যানভাসটা এতই নিখুঁত আর নিশ্ছিদ্র যে, ব্যাকলাইট বা পিছন থেকে আলো ফেলে মঞ্চে গভীরতা তৈরি করার কোনও জায়গাই নেই! তাপস সেন প্রস্তাব দিলেন ক্যানভাসের জানলাগুলো কেটে ফোঁকর তৈরি করার। কিন্তু খালেদ চৌধুরী তাঁর নিখুঁত সৃষ্টিতে কাঁচি চালাতে নারাজ। অবশেষে অনেক বাদানুবাদের পর, রাতের অন্ধকারে ক্যানভাসের জানলাগুলো কেটে দেওয়া হল। পরদিন তাপস সেন নিচ থেকে রঙিন আলো এমনভাবে ফেললেন যে, কাটা জানলাগুলো দিয়ে আলো ঠিকরে বেরিয়ে পুরো কংক্রিটের জঙ্গলটা যেন একদম জীবন্ত একটা মহানগরী হয়ে উঠল। নিজের সৃষ্টিকে অন্যের আলোর জাদুতে এক নতুন মাত্রা পেতে দেখে খালেদ চৌধুরী মুগ্ধ হয়ে কেবল অস্ফুটে বলেছিলেন, ‘বাহ্!’ এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তিনি শিল্পের স্বার্থে নিজের অহংকারকে দূরে সরিয়ে রাখতে জানতেন।

zoom
স্কেচ: খালেদ চৌধুরী

মঞ্চের এই শূন্যস্থানকে ভেঙেচুরে নতুন অর্থ দেওয়ার আরেকটা অসামান্য নিদর্শন হল থিয়েটার ওয়ার্কশপের প্রযোজনা ‘বিসর্জন’। প্রথাগতভাবে এই নাটকে মঞ্চের মাঝখানে একটা পেল্লাই মন্দির আর বিশাল এক দেবী-বিগ্রহ থাকত, যা অনেক সময় অভিনেতাদের আড়াল করে দিত, এবং তাঁদের মানবিক দ্বন্দ্বগুলোকে ম্লান করে দিত। খালেদ চৌধুরী এলেন, দেখলেন এবং পুরো মন্দিরের সেটটাই বাতিল করে দিলেন! তার বদলে মঞ্চের পিছনের কালো পর্দার ওপর থেকে ফ্লোর অবধি টানটান করে ঝুলিয়ে দিলেন আড়াই ফুট চওড়া তিনটি স্ক্রোল– লাল, সবুজ আর নীল। একটিতে আঁকা হাঁড়িকাঠ, একটিতে খড়গ এবং অপরটিতে লম্বভাবে আঁকা দেবীর তৃতীয় নয়ন। এক লহমায় মঞ্চের ভার্টিকাল স্পেসটা ব্যবহার করে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে, মহাশক্তির সর্বগ্রাসী উপস্থিতির জন্য কোনও কংক্রিটের মন্দির লাগে না। ওই তিনটি প্রাথমিক বর্ণের প্রতীকী রেখাই দর্শকের মনে ভক্তিরসের সঙ্গে সঙ্গে অন্ধ ধর্মান্ধতার এক রুদ্ধশ্বাস ভয় ও রক্তপাতের আবহ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট।

খালেদ চৌধুরীর এই দৃশ্যগত জাদুর স্পর্শ পেয়েছিল তৎকালীন প্রায় সব ক’টি অগ্রণী নাট্যদল। শ্যামানন্দ জালানের পরিচালনায় ‘অনামিকা’ ও ‘পদাতিক’ গোষ্ঠীর জন্য তিনি যখন কাজ করলেন, তখন হিন্দি থিয়েটারও এক নতুন আধুনিকতার মুখ দেখল। ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকের মঞ্চসজ্জার মাধ্যমে তিনি ভারতীয় নগরজীবনের একাকিত্ব, মধ্যবিত্তের শেকড়হীনতা ও অস্তিত্বের সংকটকে মঞ্চে ফুটিয়ে তুললেন। এরপর ‘আধে আধুরে’ এবং ইতিহাসাশ্রয়ী নাটক ‘তুঘলক’-এর সেটেও তিনি প্রমাণ করলেন যে, ঐতিহাসিক বিশালতা বা মধ্যবিত্তের ক্লান্তি– সবকিছুই তাঁর হাতের মুঠোয়। ক্যালকাটা থিয়েটারের প্রযোজনায় শেখর চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘কৃষ্ণচূড়া’ এবং শেক্সপিয়রের অমর সৃষ্টি ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটকেও তাঁর মঞ্চসজ্জা বাস্তববাদ ও রূপকবাদের এক অনন্য মিশ্রণ তৈরি করেছিল।

zoom
খালেদ চৌধুরীর করা ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকের সেট, ১৯৭২-’৭৩

মনোজ মিত্রের ‘সুন্দরম’ নাট্যদলের সঙ্গে তাঁর কাজগুলোও ভোলার নয়। ‘অলকানন্দার পুত্রকন্যা’, ‘শোভাযাত্রা’ এবং ‘গল্প হেকিম সাহেব’– প্রতিটি নাটকেই তিনি নাটকের অন্তর্নিহিত সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বগুলোকে দৃশ্যগতভাবে তুলে ধরেছিলেন। ‘সমীক্ষণ’ নাট্যদলের প্রযোজনায় প্রাচীন সংস্কৃত ধ্রুপদী নাটক ‘মৃচ্ছকটিক’-এর মঞ্চসজ্জাতেও তিনি প্রাচীন ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে আধুনিক মঞ্চভাবনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। ‘সওদাগরের নৌকা’ (যা নান্দীকার এবং পরবর্তীকালে থিয়েটার ওয়ার্কশপ উভয়েই প্রযোজনা করেছিল) নাটকেও তাঁর সেট ডিজাইনের মুনশিয়ানা ছিল চোখে পড়ার মতো।

এছাড়া ‘শুতুর মুর্গ’, ‘ছাপতে ছাপতে’ এবং ‘যযাতি’-র মতো নাটকে তাঁর মঞ্চস্থাপত্য নাটকের মূল বক্তব্যকে দর্শকদের মগজে সোজা গেঁথে দিতে সাহায্য করত। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ নাটকে তাঁর করা সেট এক রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার জ্বলন্ত দলিল হয়ে আছে। তাঁর প্রতিভার পরিধি কেবল মঞ্চসজ্জাতেই আটকে ছিল না; ‘দেবতার গ্রাস’ এবং ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’ নাটকের ক্ষেত্রে তিনি মঞ্চ পরিকল্পনার পাশাপাশি অসাধারণ সব পোশাক পরিকল্পনাও করেছিলেন, যা চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্বকে পোশাকের ভাঁজে ভাঁজে বুনে দিয়ে এই নাটকগুলোকে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিজুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ বা দৃশ্যগত ভাষা প্রদান করেছিল।

zoom
খালেদ চৌধুরীর করা সুন্দরম প্রযোজিত ‘হেকিম সাহেব’-এর মঞ্চসজ্জা

সবচেয়ে বড় কথা– কাঠ, বাঁশ, চট, দড়ি বা সস্তার মাটির মতো একেবারে সাধারণ, মাটির কাছাকাছি থাকা উপকরণগুলো দিয়ে তিনি যে ‘কান্ট্রি ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা দেশীয় ভাষার জন্ম দিয়েছিলেন, তা আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের এক অমূল্য সম্পদ। বিদেশি নাটকের অন্ধ অনুকরণ বা দামি ঝকমকে মেটেরিয়াল ব্যবহার করতে তিনি ঘোর অপছন্দ করতেন, কারণ তাতে বাংলার সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনের কোনও ছাপ থাকে না। তিনি জানতেন, একটা শহরের রূপ বোঝানোর জন্য গোটা শহরটাকে মঞ্চে তুলে আনার দরকার নেই, শুধু একটা ভাঙা ল্যাম্পপোস্ট আর একটা শূন্যে হারানো বাঁকানো সিঁড়িই যথেষ্ট। তাঁর তৈরি করা সেটগুলো যেন নিজেরাই এক একটা নীরব অভিনেতা, যারা সংলাপ না-বলেও দর্শকদের সঙ্গে অনবরত কথা বলে যেত।

খালেদ চৌধুরীর এই বিশাল, ব্যাপ্ত এবং বহুমুখী কর্মযজ্ঞ নিয়ে কথা বলতে বলতে মনের ভিতর একটা প্রশ্ন খুব স্বাভাবিকভাবেই উঁকি মারে। আমরা যখন কোনও নাটকের কথা স্মরণ করি, তখন যদি কেবল সেই নাটকের আলোর কারসাজি বা মঞ্চসজ্জার বিশালত্বটাই আমাদের মনে থেকে যায়, তবে সেই নাটকটি কি সামগ্রিকভাবে একটি সফল প্রযোজনা? থিয়েটার তো কোনও একক শিল্প নয়, থিয়েটার আলো, শব্দ, মঞ্চ, অভিনয় এবং নির্দেশনার এক সম্মিলিত সিম্ফনি। একটি সার্থক নাটকে এই প্রতিটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যাওয়া বাঞ্ছনীয়, যেন কাউকে আলাদা করে চোখে না পড়ে, অথচ সবাই মিলে একটা অখণ্ড মায়া তৈরি করে। যদি কোনও সেটের জাঁকজমক অভিনেতার মানবিক দ্বন্দ্বকে ছাপিয়ে যায়, অথবা যদি কেবল মঞ্চের প্রশংসাই মানুষের মুখে মুখে ঘোরে, তবে কি সেখানে শিল্পের কোথাও একটা ভারসাম্য নষ্ট হয় না?

zoom
স্কেচ: খালেদ চৌধুরী

খালেদ চৌধুরী হয়তো এই চরম সত্যটা খুব ভালো করেই জানতেন। আর তাই তিনি আজীবন চেষ্টা করে গিয়েছেন তাঁর মঞ্চসজ্জাকে নাটকের অভিনয়ের গতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত একটি ‘অর্গানিক পার্ট’ বা জৈব অঙ্গ হিসেবে গড়ে তুলতে। তিনি কখনও নিজের ক্যানভাসকে নাটকের মূল সুরের চেয়ে বড় হতে দেননি। একজন প্রকৃত শিল্পীর মতো তিনি জানতেন, কখন নেপথ্যে সরে যেতে হয়, যাতে অভিনেতার মুখাবয়ব ফুটে ওঠে। কিন্তু তাঁর প্রতিভা এতই প্রখর ছিল যে, শত চেষ্টা সত্ত্বেও সেই শূন্যস্থানের জ্যামিতি আমাদের চোখে বিস্ময়ের ঘোর লাগিয়ে দেয়। যে ‘ঘোর-লাগা চোখে’ সংগীত নাটক আকাদেমি বাধ্য হয় এই বাঙালি ‘ব্যাকস্টেজ’ শিল্পীকে স্বীকৃতি দিতে। আসলে অভিনেতার পুরস্কার পাওয়ার চেনা ইক্যুয়েশনের বাইরে গিয়ে পুরস্কার অর্জন করে পরবর্তী প্রজন্মের রাস্তাটাই সুগম করে দিয়েছিলেন তিনি। আসলে মঞ্চের শূন্যতা সম্পর্কে তো আমরা সবাই জানতাম, শূন্যের ভিতরে এত ঢেউ আছে সেকথা জানতেন শুধু খালেদ চৌধুরী।

………………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন নীলাঞ্জন হালদার-এর অন্যান্য লেখা

………………………….

Khaled chowdhury Raktakarabi Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Stage Artists Bengal theatre stage

Share this article on