


স্বাধীনতা এখন মেগা ইভেন্ট। জল-স্থল-অন্তরীক্ষে তেরঙ্গা পতাকা ওড়ানোর ২৪ ঘণ্টার আড়ম্বরের মধ্যে হয়তো বিলীন হয়ে যাচ্ছে সেই সব শহীদদের আদর্শ, দেশগঠনের দিব্য চিন্তাধারা– যেমনটি চেয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ আর ঋষি অরবিন্দ। ৪০ বছর ধরে অরবিন্দ যে দিব্যজীবন গড়ে তোলার সাধনায় ব্যাপৃত ছিলেন পণ্ডিচেরিতে সেখানে তিনি অন্বেষণ করেছেন সেই পূর্ণযোগ তত্ত্ব। রাজনৈতিক স্বাধীনতার চেয়েও তিনি চেয়েছিলেন মানবচেতনার স্বাধীনতা। চেয়েছিলেন সমষ্টির উত্তরণ।
কয়েদিদের জন্য নির্দিষ্ট জাল ঘেরা আসনে আরও ৩১ জন বিপ্লবীর সঙ্গে বসে আছেন ১৭ নম্বর কয়েদি। একেবারে শেষ বেঞ্চে। অসম্ভব চুপচাপ। শুধু দু’টি উজ্জ্বল চোখের স্ফটিকস্বচ্ছ মণি অপলক। কাচের মতো স্থির। মামলার ফলাফল সম্পর্কে সেই চোখে নেই কোনও চাঞ্চল্য।
‘কয়েদি নম্বর ১৭ হা-জি-র…!’
কয়েকবার কানফাটানো এই ডাকের পর শেষ বেঞ্চ থেকে খুব ধীরে জাল ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াল এক উদ্ভ্রান্ত মধ্য তিরিশের সুপুরুষ যুবা। লম্বা চুলদাড়ি। গত সাড়ে পাঁচ মাস ধরে তার বিচার চলছে। রুটিন হাজিরা। তাকে ঘিরে বাদী-বিবাদীর চাপান-উতরে আদালত কক্ষ সরগরম। তিনিই নায়ক এই মামলার, কিন্তু তিনি নির্লিপ্ত। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার কোনও চেষ্টাই নেই আসামির।

ব্যারিস্টার নটর্ন চিৎকার করে ওঠেন– ‘ডু ইউ হিয়ার মি মিস্টার আরোবিনডো ঘোষ?’
নিষ্ফল তাঁর চিৎকার। অরবিন্দ ঘোষ নিষ্পৃহ। তাঁর আইনজীবী তরুণ ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাসও প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছেন– বাঁচানো অসম্ভব! ফাঁসির আদেশ হল বলে!
বিচারকের আসনে বসে আছেন বিচক্র্যাফ্ট। তিনি তো অবাক। তিনি কার বিচার করতে এসেছেন সুদূর ইংল্যান্ড থেকে! এ তো তাঁর সহপাঠী। লন্ডনের কিংস কলেজের ফার্স্ট বয়। আর বিচারক নিজে তো লাস্ট-বেঞ্চার ছিলেন। কখনওই অরবিন্দকে হারাতে পারেননি তিনি। এমনকী লিটারেচারেও অরবিন্দ ফার্স্ট। অগাধ তাঁর পাণ্ডিত্য। ঋষি রাজনারায়ণ বসুর গ্র্যান্ডসন। ভাগ্যের পরিহাসে সেই লাস্ট-বেঞ্চার আজ ফার্স্ট বয়কে সাজা দেওয়ার জন্য আসনে বসেছে। কিন্তু না, মনটা ছটফট করছে, এমন বন্ধুত্বকে তিনি মলিন হতে দেবেন না।

ইংরেজ উকিল নর্টন আর চিত্তরঞ্জনের বাগযুদ্ধ চলছে। স্ত্রী মৃণালিনীকে লেখা চিঠিতে নর্টন প্রমাণ করতে চাইছেন যে, অরবিন্দ রাজদ্রোহী আর সেই চিঠি দিয়েই চিত্তরঞ্জন প্রমাণ করতে চাইছেন তিনি দেশমাতৃকার সেবায় নিযুক্ত মাত্র। মুরারিপুকুরের বাগানবাড়ি থেকে পাওয়া দক্ষিণেশ্বরের রামকৃষ্ণের পদস্পর্শ-করা মাটিকে নর্টন প্রমাণ করতে চাইছেন বোমা তৈরির বিস্ফোরক হিসাবে। আর ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাস দেখাচ্ছেন– সেই পবিত্র মাটিতে আছে সাধনার শক্তি, আরাধনার উপচার। আলিপুর বোমা মামলা সে সময় দেশের সর্বোচ্চ মনোযোগ আকর্ষণকারী মামলা। বারীন ঘোষ, উল্লাসকর দত্তের সওয়াল-জবাব লোকের মুখে মুখে ফিরত। একালের ভাষায় হাই টিআরপি।
জনগণের আকর্ষণ যত বাড়ে এই মামলার ব্যাপারে, বিপরীতে ততটাই বিকর্ষণ ঘটে শ্রীঅরবিন্দের। তিনি এক অতীন্দ্রিয় ক্ষমতায় নিজেকে উত্তরণ ঘটাতে লাগলেন সাধনার দ্বারা। কোর্টের বাদানুবাদ তাঁকে স্পর্শ করে না। রাত্রে ঘুমন না। নিজের খাবার আরশোলা-পিঁপড়েদের জন্য সাজিয়ে দেন। যোগ অভ্যাস করেন রুটিন মেনে। শীর্ষাসন বড় প্রিয় আসন। কোনও কোনও কয়েদি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করতেন বিনা তেলে আপনার চুল-ত্বক এত চকচকে থাকে কী করে? তাঁর সংক্ষিপ্ত উত্তর– ‘আমার ধ্যান সাধনার ফলে মনের সঙ্গে সঙ্গে শরীরেরও পরিবর্তন হচ্ছে, তাই হয়তো আপনি আমার ত্বক চুলের ঔজ্জ্বল্য দেখতে পাচ্ছেন।’

অন্তরের বিভায়, দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছেন– বারীন আর উল্লাসকরের ফাঁসি হবে না। বন্ধু-প্রতিম চিত্তরঞ্জন দাস বা বিচক্র্যাফ্ট উভয়কেই তার স্বয়ং সর্বশক্তিমান বাসুদেব মনে হচ্ছে। চিত্তরঞ্জনের যুক্তির জাল কেটে বিচারক বিচক্র্যাফ্ট বেরতে পারলেন না। জেল থেকে ছাড়া পেলেন অরবিন্দ ১৯০৯ সালের মে মাসে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন পেল এক দীপ্তিমান সংগ্রামীকে। উদ্বুদ্ধ করার জন্য তাঁকে আর সশরীরে আন্দোলনের পুরোভাগে থাকার দরকার পড়ল না। এই অসমসাহসে বোমা বাঁধার ঘটনা আর প্রায় এক বছরের কারাবাস এক লাফে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গেল বিপ্লবীদের। তাঁর নামটাই যথেষ্ট হয়ে রইল। এদিকে তিনি বুঝে যাচ্ছিলেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা আসবেই, আজ না হয় কাল, কিন্তু দরকার আত্মিক উন্নতি। জেলে বসেই অধ্যাত্ম-সাধনার ডাক শুনেছিলেন। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন পণ্ডিচেরি।
বরোদার রাজ-এস্টেটের ৭৫০ টাকার লোভনীয় বেতনের চাকরি ছেড়ে কলকাতার জাতীয় কলেজের মাত্র ৭৫ টাকায় চাকরি করা অরবিন্দ ঘোষের হৃদয়ে দেশপ্রেমের স্ফুলিঙ্গ সেদিন দাউদাউ জ্বলেছিল। ভাইকে করেছিলেন বন্দেমাতরমের উজ্জীবন-মন্ত্রে দীক্ষিত। শতেক বিপ্লবী ছিলেন তাঁর অনুগামী। ছিলেন চরমপন্থী। চেয়েছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা। তাই কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে মতবিরোধ। যে অরবিন্দর জীবন শুরুই হয়েছিল পাশ্চাত্যে, পাশ্চাত্য শিক্ষায়-দীক্ষায় ঘরানায় আচার-বিচারে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের আইকন। তিনি আইসিএস ত্যাগ করে হলেন বিপ্লবী। আলিপুর জেলে অন্য কয়েদিদের থেকে শিখতেন বাংলা ভাষা। এই তো দেশপ্রেমের সংজ্ঞা।

বিপ্লবী থেকে ঋষি। যেন গুটিপোকা থেকে বেরিয়ে আসা আগুনরাঙা প্রজাপতি। রূপান্তর হলেও লক্ষ্যে অবিচল, উদ্দেশ্যে স্থির। ভারতমাতার পার্থিব স্বাধীনতা আর ভারতবাসীর পরমার্থিক স্বাধীনতার এক অখণ্ড চেতনা-তরঙ্গ মিশেছিল তাঁর দিব্য জীবনের বিভায়।
আজ ৮০ বছরে পা দিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা। প্রাজ্ঞ ভারতবর্ষ। বিজ্ঞ স্বাধীনতা। অতীতের সেই দিন বদলেছে। বদলেছে বিশ্ব। স্বাধীনতার সেই আদর্শ আজ আর তেমনটি নেই। বদলেছে স্বাধীনতার ব্যঞ্জনা, কথাটির দ্যোতনা। আমরা কোন আঙ্গিকে কতটা স্বাধীন সত্তা নিয়ে নিজের দেশকে শাসন করছি বা শাসিত হচ্ছি– তার চুলচেরা বিচার হয়তো সম্ভব নয়। এই আট দশকে স্বাধীনতার মানে যেমন বদলেছে তেমনই পরাধীনতার সংজ্ঞাও বদলেছে। গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হওয়া বিশ্বে প্রযুক্তির চূড়ান্ত প্রয়োগের দিনে ভারতবাসী কতটা স্বাধীন– সে প্রশ্ন থেকেই যায়। জাগতিক স্বাধীনতা আর পারমার্থিক স্বাধীনতার মধ্যে এখনও দুস্তর ব্যবধান। এখনও নানা সোশাল ট্যাবু অকারণে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে ভারতবাসীকে।

স্বাধীনতা এখন মেগা ইভেন্ট। জল-স্থল-অন্তরীক্ষে তেরঙ্গা পতাকা ওড়ানোর ২৪ ঘণ্টার আড়ম্বরের মধ্যে হয়তো বিলীন হয়ে যাচ্ছে সেই সব শহীদদের আদর্শ, দেশগঠনের দিব্য চিন্তাধারা– যেমনটি চেয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ আর ঋষি অরবিন্দ। ৪০ বছর ধরে অরবিন্দ যে দিব্যজীবন গড়ে তোলার সাধনায় ব্যাপৃত ছিলেন পণ্ডিচেরিতে সেখানে তিনি অন্বেষণ করেছেন সেই পূর্ণযোগ তত্ত্ব। রাজনৈতিক স্বাধীনতার চেয়েও তিনি চেয়েছিলেন মানবচেতনার স্বাধীনতা। চেয়েছিলেন সমষ্টির উত্তরণ। কেবল ব্যাষ্টির মুক্তি শেষ কথা হতে পারে না– এই ছিল তাঁর প্রতীতী। মানুষের অতিমানস চেতনা বা Supramental consciousness-এর ওপর তাঁর বিশ্বাস ছিল। চেয়েছিলেন সাধারণ মানুষ যেন এই চেতনার দ্বারা উন্মেষশালিনী হয়ে উঠতে পারেন। ‘The Human Cycle’ গ্রন্থে চেতনার স্তরের উত্তরণের দিশা দেখিয়েছেন। ‘Savitri’, ‘The Foundations of Indian Culture’, ‘The life Divine’ গ্রন্থগুলি এই অস্থির সময়কে পথ দেখাতে পারে, শান্ত করতে পারে সবাইকে– জেন জি বা জেন আলফাই হোক আর জেন এক্স, জেন মিলেনিয়াই হোক না কেন। সব প্রজন্মের মানুষই নবজন্মের স্বাদ পাবেন তাঁর নির্দেশিত পথে। আলিপুর জেলের ১৭ নম্বর কয়েদি শ্রীঅরবিন্দের তপোমগ্ন দিব্য ভাবনার ক্ষয় নেই।
আজকে আমাদের এই হীন জীবনযাপনের সংশোধনী আগুনের পরশমণি হিসেবেই তাঁকে আমাদের গ্রহণ করা উচিত। যাতে তাঁকে অনুসরণ করে আমাদের দিব্যচক্ষু উন্মোচিত হয়।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved