Robbar

উদাসী স্মৃতির পথে পথে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 30, 2026 8:00 pm
  • Updated:April 30, 2026 8:21 pm  

একটি গল্প ভারি মায়াময়। তাঁর মুখেই শোনা। স্মৃতি হাতড়ে খুঁজে পেলাম। হয়তো সঠিক মনে নেই। তবু খানিক এরকম। কলকাতায় অনেক বাসা বদলের পর একটি স্থায়ী আস্তানা হয়েছে প্রতিমা ও শঙ্খ ঘোষের। নতুন বাড়ি দেখতে গিয়ে বেখেয়ালে কাঁচা সিমেন্টের মেঝেয় হেঁটে গেলেন প্রতিমা। তাই দেখে শঙ্খ ঘোষের সহাস্য উক্তি ‘যাঃ, গৃহপ্রবেশের আগেই লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ পাকাপোক্ত হয়ে গেল মেঝেতে!’ এমনই ছিল তাঁদের পারস্পরিক আদানপ্রদান। শ্রদ্ধায়, সহমর্মিতায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো।

দূর্বা বন্দ্যোপাধ্যায়

সেদিনটাও ছিল এক রবিবার। বাইরের ঘরে আড্ডা তখনও তেমন জমে ওঠেনি। সামান্য কয়েকজনের আনাগোনা। হয়তো আমরা গিয়ে পড়েছি খানিক আগে আগেই। বৈঠকখানায় বসে রয়েছেন গৃহকর্তা এবং আড্ডার মূল আকর্ষণ, সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত, সৌম্য, মৃদুভাষী মানুষটি। যথারীতি আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি ছিল না। তবু আমি বরাবর, অকারণ আড়ষ্ট বোধ করতাম। না, কোনও ভয়ে নয়, সম্ভ্রমে। অনতিদূরে, ভিতরের ঘরটি ছিল আমার আড়মোড়া ভেঙে হাত-পা ছড়ানোর স্থান। আমাদের ছোটবেলায় যেমন দেখেছি, যে-কোনও মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়িতে আত্মীয় বা অনাত্মীয়– ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মানুষ এলে তাঁদের যাতায়াত শুধুই বসার ঘরে সীমিত থাকত না। খাবার জায়গা থেকে শোওয়ার ঘর– তা ছিল অবাধ। এ-বাড়িতেও নিয়ম তেমনই। ফলে নিঃসংকোচে চলে যেতাম ওঁদের ভিতর ঘর বা শোওয়ার ঘরে।

শঙ্খ ঘোষ

সেখানে ঘর আলো করে বসে থাকতেন তিনি। সাদামাটা তাঁতের শাড়ি পরিপাটি করে পরা। ঠোঁটে লেগে থাকত একফালি চাঁদের মতো হাসি। সে-হাসিতে প্রশান্তি ও প্রশ্রয়ের সহাবস্থান। সে-হাসিতে কার্পণ্য দেখিনি একদিনও। ফরসা হাতে রিনরিনে দু’টি চুড়ি। সেই হাত বাড়িয়ে পরম আদরে জড়িয়ে ধরতেন আমার ক্লান্ত দু’টি হাত। মুহূর্তে হাজার আলোয় ঝলমল করে উঠত আমার মন। তিনি প্রতিমা ঘোষ। আমাদের প্রতিমাদি। শঙ্খ ঘোষ যদি ছিলেন পথহারা নাবিকের কম্পাস, দিকহারা কবিদের আশ্রয়, তবে নিশ্চিতভাবে প্রতিমা ছিলেন সেই কম্পাসের আশ্রয়, তাঁর নির্ভুল উত্তর-দিশা।

আজ লিখতে বসে কত যে টুকরো কথা মনে পড়ছে। সেসব ঘরোয়া গল্পে কোনও আগল থাকত না, থাকত না কোনও পক্ষেই কোনও কিছু যাচাই করার কৌতূহল। নিখাদ ভালোবাসায় পরিপূর্ণ সেসব আড্ডায় তিনি, প্রতিমা ঘোষ, উল্টোদিকে বসে থাকা কন্যাসমা মানুষটিকে যেন-বা সমবয়স্ক ও সমমনস্ক মানুষের সম্মান দিতেন। সেই সব গল্পের ছত্রে ছত্রে বোনা থাকত তাঁর অপূর্ব রসবোধ, সাহিত্যপ্রেম ও কবিতার প্রতি অনাবিল ভালোবাসা। থাকত না কোনও জ্ঞানগর্ভ উপদেশ। তাঁর সোনায় বাঁধানো নিরহংকার হৃদয়টি খুলে দিতেন তিনি। সেইসব মুহূর্তে তাঁর আঁচলের প্রান্তে বসে বরং আমি নতুন করে বুঝতে শিখেছিলাম কেমন করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে।’

শঙ্খ ঘোষ, সঙ্গে প্রতিমা ঘোষ

আর একদিন সকাল সকাল গিয়েছি। ক’দিন আগেই শ্রীজাত পেটের অসুখে কাহিল হয়ে পড়েছিল শুনে ওষুধের পাশাপাশি সাবধান থাকার জন্য অনেক ঘরোয়া উপচার শেখালেন। শঙ্খবাবু অসুস্থ হলে কেমন করে ভাত ছেঁকে খাওয়াতেন– সেসব বলে দিলেন যত্ন করে। যতদিন সচল ছিলেন, প্রতিবার দেখেছি বরের জন্মদিনে নিজে হাতে একটা কিছু খাবার বানাতেন। বাঙালির নিয়ম মেনে বেশিরভাগ সময় পায়েসের বাটি হাতে পেতাম। কিন্তু তা মোটেই সাদামাটা রোজকার পরমান্ন নয়। একবার স্বাদে আর জিভের আহ্লাদে চমৎকৃত জিজ্ঞেস করে ফেললাম, ‘এটা তো ঠিক চাল বা সিমাইয়ের পায়েস মনে হচ্ছে না।’ ফেলে আসা জীবনের অধ্যাপিকার ভূমিকায় দেখলাম যেন তাঁকে। মৃদু হেসে বললেন, ‘ভেবে বলতে হবে উত্তর কী হতে পারে।’ ভেবেচিন্তে হার মানলাম দেখে তিনিই সহাস্য জবাব দিলেন। এটা ডিমের পায়েস। অর্থাৎ, ডিমের অ্যাল্বুমিন বা সাদা অংশ দুধে মিশিয়ে অনেকটা রাবড়ির ছন্দে বানানো পায়েস।

মনে আছে, এর পরের বছর খেয়েছিলাম আর এক অন্য স্বাদের পায়েস। সেবার উত্তর ছিল বাঁধাকপির কচি পাতার পায়েস। এসবের রান্না-প্রণালী শেখানোর পাশাপাশি এটাও জানিয়েছিলেন যে, এ-সবই ওঁর শাশুড়ি-মা’র হাতে ধরে শেখানো উৎকৃষ্ট মানের ডেজার্ট। অত বছর আগে দাঁড়িয়েও শাশুড়ি-বউমার সাবলীল বন্ধুত্বের গল্প যেন লুকিয়ে ছিল সেইসব রান্নায়। রান্না খাওয়ার পাশাপাশি নিজের চাকরি জীবন, পড়ানো, লেখালেখি, এমনকী, বাগান করার গল্পও বলতেন অনেক সময়।

আমার শৈশব কেটেছে চুঁচুড়ায়। ওঁর দাদামশায়ের বাবা থাকতেন চুঁচুড়ায়। বহরমপুর আর চুঁচুড়ার গল্প কত যে হত, তার ইয়ত্তা নেই! আমি তখনও পিএইচডি-র ছাত্রী। এসবের শেষে জুড়ে দিতেন, যদি কখনও ক্লান্ত হও, তবু ভেঙে পড়বে না। আর নিজের গল্পটা কখনও ভুলে যেও না।

আর একটি আখ্যান না-লিখলে কিছুতেই ধরা পড়বে না ওঁর শান্ত, সুকোমল অথচ দৃঢ় ব্যক্তিত্বের ধার। খুব পরিচিত একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছি আমরা প্রত্যেকে। কে নেই সেখানে! চেনা বৃত্তের কবি-লেখকরা ছাড়াও গোটা কলকাতার পরিচিত মুখের ভিড়। শ্রীজাত আর আমি যাওয়ার আগেই বোধহয় পৌঁছে গিয়েছিলেন প্রতিমাদি আর শঙ্খবাবু। দলবেঁধে দাঁড়িয়ে টুকরো কথার আড্ডায় মশগুল আমরা। হঠাৎ সুপরিচিত আরেকজন মানুষ এসে আমায় বললেন, শ্রীজাতর এত রোগাপাতলা চেহারা, তা তুমি কেন এত হৃষ্টপুষ্ট? আমি জবাব দেওয়ার চেয়ে নীরবতা বজায় রাখাই শ্রেয় মনে করে চুপ ছিলাম। বাকি সবাই দ্বিধান্বিত। শ্রীজাত একবার তাকাল আমার দিকে, যার অর্থ, কিছু মনে করিস না। শঙ্খবাবুর মুখ ঈষৎ গম্ভীর। কিন্তু আমার সৌজন্য ও দ্বিধাবোধে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত না-হয়ে যিনি বলে উঠলেন, তিনি প্রতিমাদি। আজও মনে আছে, যেন থাকতে না-পেরেই শান্ত অথচ কঠিন স্বরে বললেন, ‘এ আবার কেমন কথা হল, ওর স্বামীর স্বাস্থ্য কেমন হবে তা ওর স্বাস্থ্য দিয়ে বিচার করা হবে কেন? এটা মোটেই ঠিক কথা নয়।’ কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকাতে পেরেছিলাম শুধু। অভিভাবকের আশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছিলেন নিজের সবল চাহনিতে।

ছবি: শ্রীজাত-র ফেসবুক ওয়াল থেকে

লেখিকা প্রতিমা ঘোষকে বোধহয় আমরা পাইনি সেভাবে, যাকে স্বয়ং কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যের ইতিহাসে মেয়েদের স্থান ও অবদান নিয়ে লিখতে বলেছিলেন। এ-বিষয়ে বলার আমি কেউ নই। হয়তো পরে কেউ মূল্যায়ন করবেন। কিন্তু তাঁর লেখা ‘নয় বোনের বাড়ি’ পড়তে পড়তে অচিরেই অম্বিকাচরণ রায়, তাঁর নয় কন্যা ও তৃতীয়া কন্যার ঘরের নাতনির পরম ভক্ত হয়ে উঠেছি আমি। শুধু তো পারিবারিক স্মৃতিকথা নয়, সেকালের মেয়েদের জীবনযাপন, পড়াশুনো ও চিন্তাভাবনা নিয়ে অপরিসীম যত্নে লেখা এক স্বচ্ছ সাবলীল গদ্য।

প্রতিমাদির গল্প বলার ভঙ্গিটি ছিল সকৌতুক। কত যে ছোট ছোট পারিবারিক গল্প শোনাতেন নিজের মনে করে। আদরের নাতনি সাম্পান কলেজে ভর্তি হবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সে অর্থনীতি নিয়ে পড়ার সুযোগও পেয়েছে। তবু হয়তো অপরিণত বয়সের দুশ্চিন্তা সাম্পানের পিছু ছাড়ে না। কোনও গোপন সমাধান চুপিচুপি ভাগ করে নিচ্ছেন, এমনভাবে সহাস্য মৃদুস্বরে বললেন আমায়, ‘শেষমেষ ভরসা পেয়েছে, টিয়া বুঝিয়েছে আর তকাই বলেছে সব পেপার দেখিয়ে দেবে।’ উল্টোডাঙার ভিতর ঘরের আড্ডায় যাঁরা নিয়মিত ছিলেন, এই গল্পের রসগ্রহণে তাঁরা বঞ্চিত হবেন না। নাতনিরা ছিল দাদু-দিদার প্রাণভ্রমরা।

পরিবারের সঙ্গে, মধ্যমণি প্রতিমা ঘোষ

আর একটি গল্প ভারি মায়াময়। তাঁর মুখেই শোনা। স্মৃতি হাতড়ে খুঁজে পেলাম। হয়তো সঠিক মনে নেই। তবু খানিক এরকম। কলকাতায় অনেক বাসা বদলের পর একটি স্থায়ী আস্তানা হয়েছে প্রতিমা ও শঙ্খ ঘোষের। নতুন বাড়ি দেখতে গিয়ে বেখেয়ালে কাঁচা সিমেন্টের মেঝেয় হেঁটে গেলেন প্রতিমা। তাই দেখে শঙ্খ ঘোষের সহাস্য উক্তি ‘যাঃ, গৃহপ্রবেশের আগেই লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ পাকাপোক্ত হয়ে গেল মেঝেতে!’ এমনই ছিল তাঁদের পারস্পরিক আদানপ্রদান। শ্রদ্ধায়, সহমর্মিতায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো।

প্রতিমা ঘোষের ঘর, তাঁর স্মৃতিচিহ্ন

আজ মনে হয়, বড় ভাগ্যবান ছিলাম আমরা, এঁদের কাছে পেয়েছি। কিন্তু সময়টা যেন ঝড়ের বেগে পেরিয়ে এসেছি। হুশ করে কোথায় চলে গেলেন সবাই! এই বিধ্বস্ত সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়– এইসব উদাসী স্মৃতিরাই একক অবলম্বন।