


রবীন্দ্রনাথ নিজে সংগ্রহ করেছেন ছড়ার পাঠান্তর তাঁর ‘লোকসাহিত্য’ প্রবন্ধের পরিশিষ্টে, যে আলোচনায় তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন পুরনো ছড়ায় ‘সংলগ্নতা নেই কিন্তু ছবি আছে।’ ‘আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে’ ছড়াটির চারটি পাঠ পরের পর সাজিয়েছেন তিনি, এইটা দেখাতে যে কীভাবে মূল পাঠ সামান্য বদলেছে মুখে মুখে, হয়তো অপভ্রষ্ট, আর দ্বিতীয় লাইন ‘ঢাক মৃদং ঝাঁঝর বাজে’ হয়ে যাচ্ছে ‘টাঁই মিরগেল ঘাঘর বাজে’, ‘লাল মিরগেল ঘাঘর বাজে’ অথবা ‘ডান মেকড়া ঘাঘর বাজে’। ‘কোনো পরিষ্কার অর্থ আছে কিনা জানি না’ বলেও তিনি একটি ভাষ্য তৈরি করে নিচ্ছেন এর পরেই– ‘কিন্তু ইহা স্পষ্ট দেখা যাইতেছে, প্রথম কয়েক ছত্র বিবাহযাত্রার বর্ণনা, দ্বিতীয় ছত্রে যে বাজনা কয়েকটির উল্লেখ আছে, তাহা ভিন্ন ভিন্ন পাঠে কতই বিকৃত হইয়াছে।’
যেন একটা ধূসর অ্যালবামের পাতা উলটে দেখছি, সেই একটা সময়, যখন ঘর জুড়ে, উঠোন জুড়ে, বাইরে বাগান জুড়ে আর মাঠ জুড়ে, অথবা গাছতলায়– কখনও বসে, কখনও ছুটে, কখনও গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে চলছিল খেলা, তার সরঞ্জাম নামমাত্র! ‘চোর’, ‘আউট’, ‘আব্বুলিশ’, ‘ধাপ্পা’ অথবা ‘বুড়ি-ছোঁয়া’ শব্দগুলো ঘুরছে মুখে মুখে, উচ্ছ্বাসে, উল্লাসে আর চিহ্নিত হয়ে থাকছে একটা কাল-পর্ব। তখন কেবল ভূগোল বইয়ের পৃষ্ঠায় আমাদের পৃথিবী পরিচয়, তথ্যের বিস্ফোরণ অকল্পনীয়; মধ্য-সত্তরে কলকাতায় টিভি আসবে, তারও বছর কয়েক আগে, সেই প্রাক-ডিজিটাল সময়ের সঙ্গে জুড়ে-থাকা খেলা। সেই সব খেলা আমাদের নেই-উপকরণের ছেলেবেলা ভরে ছিল প্রতিদিন, এখন কেবল স্মৃতি-বিস্মৃতির টানের মাঝখানে, তবে সেসব শুধু খেলাই নয়, যেন সেই সময়ের বাল্য-যাপনের একটা ধরন।

খেলামুখর একটা মাঠ, ‘মেয়েলি’ তকমার এক্কা-দোক্কা অথবা ‘আনি মানি জানি না’-র পাশাপাশি চলছে পিট্টু, গোল্লাচোর, বাঘবন্দি, ধাপসা, রুমাল-চোর কি চোর-পুলিশ, আর সেসব খেলার দল কখনও লিঙ্গভিত্তিক ছিল মনে পড়ে না। শিশুকালের ‘ইকড়ি মিকড়ি চাম চিকড়ি’, ‘আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে’-এর পর্ব শেষ হয়ে, ততদিনে এসেছে কিত-কিত আর এক্কা-দোক্কার বিকেল, ঘরের খেলা মাঠে এসে পড়ল। হঠাৎ খেয়াল হলে, দু’জন দাঁড়িয়েও পড়ছে, হাত উপরে তুলে জুড়ে নিয়ে হল ‘ব্রিজ’, তার তলা দিয়ে বাকিরা চলছে সাবধানে পাছে ‘বন্দি’ হয়ে যায়, মুখে ছন্দ আর সুর মিলিয়ে একটা ছড়া, ‘ওপেনটি বায়োস্কোপ টানটুন টায়োস্কোপ…’। ‘লন্ডন ব্রিজ ইজ ফলিং ডাউন’ খেলার দেশজ রকমফের এই খেলাটির মতো বাকিগুলিরও খুব পুরনো ইতিহাস থাকা সম্ভব। মনে পড়ছে, একটা খেলায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে এক-এক জন পালা করে সুরে হাঁক দিচ্ছি ‘এল-ও-এন-ডি-ও-এন লন্ডন’ (সে দেশের ভৌগোলিক হিসেব তখনও আবছা যদিও), অথবা ‘একটা বাজল তবুও বুড়ি এল না!’ ওই প্রতীক্ষিত ‘বুড়ি’-র পরিচয় নিয়ে এতটুকু ভাবিনি! তবে তাৎক্ষণিক ভাবনার একটা বসে-খেলাও ছিল, ‘নাম-দেশ-ফুল-ফল’, কাগজের টুকরোয় চটপট লিখে ফেলতে হবে, সময়ের মধ্যেই; ফিরে দেখে মনে হয়, সে-ই ছিল কুইজ প্রতিযোগিতার অগ্রদূত। মফস্সলে বড় হওয়া আমাদের ছেলেবেলায় ঘরেও-হবে-মাঠেও-হবে এইরকম কিছু খেলা তখন ইনডোর আর আউটডোর গেম-এর মধ্যরেখা আবছা করে রেখেছিল; এর পরের পর্বেই এসে পড়বে স্কুল স্পোর্টসের উত্তেজনা।

স্লাইড শো-এর মতো সরে সরে যায় ছবি– সরঞ্জাম তেমন কিছু না, তবে কত-না স্ফূর্তি নিয়ে বিকেলের জটলা, আর সকলের প্রাণে খুশির তুফান, ঘরে বসে একলা মোবাইল কি কম্পিউটার গেম খেলবার দিন তখন দূরতম কল্পনাতেও নেই। একটুকরো পাথর কি ঢিল হাতে পেলেই শুরু হয়ে যাচ্ছে খেলা, অথবা খালি হাতেই, বলে উঠছি ‘এতোল বেতোল তামা তেতোল/ ধর তো বেতোল ধরে না/ ইশ বিশ ধানের শিস/ কধাপ খাবি বলে দিস’! খেলার এই-যে বিচিত্র ধ্বনিগত দিক– কখনও বলে নিচ্ছি পুরো একটা ছড়াই, কখনও শব্দবন্ধ, তার মানের কোনও স্পষ্ট হদিশ নেই, যদিও তার প্রবল অনুপ্রাস, শব্দদ্বিত্বের পাশাপাশি সুর, তাল আর ছন্দ কাজ করে যায়। ‘আব্বুলিশ’ বলে খেলা থামিয়ে দিচ্ছি মুহূর্তে, তবে তখন কেই-বা ভেবেছিল ‘I believe’ অথবা ‘abolish’ থেকে এসে থাকতে পারে ওই বিচিত্র শব্দ! মনে পড়ছে, আরও পুরনো কালের একটা শব্দ-খেলাও কানে আসত– কথার প্রতি ধ্বনি ভেঙে ভেঙে শুরু করতে হবে ‘ক-কড়ি-কদম-কড়ি’ বলে! অকারণ সময় নেয় শব্দের উচ্চারণ, তবে ‘সময়’-এর হিসেব সবসময়েই আপেক্ষিক, আর আমাদের যুক্তি-বুদ্ধিতে তেমন শান পড়েনি তখন– প্রশ্ন, সংশয় কম। এর মধ্যে উনিশ শতকীয় সমাজে নারীর অন্দরমহলের বিনোদন কড়ি-খেলার অনুষঙ্গ থেকে যাওয়া সম্ভব, আর তারও আগের প্রাচীন ছড়ায় কড়ির ছড়াছড়ি– “দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি, গুনতে গুনতে যাই”।

ঘুরে সেই ছড়ার কথাই এল, আর পারম্পর্যহীন ভাবে সাজানো শব্দ বা ছড়া খেলার সঙ্গে জড়িয়ে থেকে একটা ম্যাজিক সম্ভব করে দিত মনে হয়, কিছুক্ষণের জন্য অবিশ্বাস মুলতুবি! পুরনো বাংলা লোকজ ছড়ার এই এক অপূর্ব অসঙ্গতি, কল্পনার সত্যি আর বাস্তবের সত্যির মধ্যরেখা অস্পষ্ট করে দিয়ে, আর ওই যুক্তিহীনতাই তার লাবণ্য। ‘ষষ্ঠীঠাকরুন বানরের চোখে হাত বোলালেন, বানরের দিব্যচক্ষু হল।’ ‘ক্ষীরের পুতুল’-এ অবনীন্দ্রনাথ কি এর পরেই সেই ঘুমপাড়ানি ছড়ার মায়ায় গড়ে নিলেন না বানরের ‘দিব্য-দর্শন’? ‘বানর দেখলে– ষষ্ঠীতলা ছেলের রাজ্য, সেখানে কেবল ছেলে– ঘরে ছেলে, বাইরে ছেলে, জলে-স্থলে, পথে-ঘাটে, গাছের ডালে, সবুজ ঘাসে যেদিকে দেখে সেদিকেই ছেলের পাল, মেয়ের দল…একদল কাঠের ঘোড়া টকবক হাঁকাছে, একদল দিঘির জলে মাছ ধরছে, একদল বাঁধের জলে নাইতে নেমেছে, একদল গাছের তলায় ফুল কুড়াচ্ছে, চারিদিকে খেলাধুলো, মারামারি, হাসিকান্না… আর আছেন বনের ধারে বনগাঁবাসী মাসি-পিসি, যিনি খইয়ের মোয়া গড়েন, ঘরের ধারে ডালিম গাছটি তাতে প্রভু নাচেন!’ রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন, ‘জগৎ পারাবারের তীরে শিশুরা করে খেলা’, তখন সে খেলা তাঁর মিস্টিকাল দর্শনে যুক্ত হয়ে ‘লীলা’-র মাত্রা পায়। লোকায়ত পরিসরে, শুদ্ধচৈতন্য বাল্যের খেলা, ছড়া আর স্বপ্ন মিলিয়ে নিয়েছেন গগন ঠাকুরও তাঁর ‘ভোঁদড় বাহাদুর’-এ, সম্ভব-অসম্ভব একাকার!

আদতে পুরাণ, লোককাহিনি, প্রবাদ থেকে শুরু করে উপনিবেশ, বাবু কালচার– সব জুড়ে গিয়ে পুরনো ছড়ার নির্মাণ; বিচ্ছিন্ন বিচিত্র উপাদান মিলিয়ে নিয়ে এই-যে একটা গল্পের গড়ন, এর টানেই হয়তো চলত খেলা। ‘ওপেনটি বায়োস্কোপ’ (শুনতে পাই ‘ওপেন দ্য বায়োস্কোপ’-এর অপভ্রংশ!) কী অনায়াসে বুনে দিয়েছিল কলোনিয়াল আর আঞ্চলিক সমাজ-ছবি– ‘সুলতানা বিবিয়ানা সাহেব-বাবুর বৈঠকখানা/ কাল বলেছেন যেতে পান সুপারি খেতে…’ সেই আমলের ‘বাবু’-দের বিনোদন বা মনোরঞ্জনের ইঙ্গিত দিয়ে থাকতে পারে, ভাষ্যান্তরে সে ইঙ্গিত মেয়েদের কুণ্ঠিত সামাজিক অবস্থানের দিকেই। তবে সবটাই ফ্যান্টাসি সন্দেহ নেই, তাই একটা মনোরম অসম্ভবতা নিয়ে খেলা চলতেই থাকে! শেষে ‘যার নাম রেণুবালা/ গলায় দেবো যশোরের মালা’ (পাঠান্তরে ‘মুক্তার মালা’) যোগ করে দেয় একটা আঞ্চলিক অনুকাহিনির মাত্রা, রূপকথাও। ‘টায়োস্কোপ’-এর মতো অপূর্ব অন্ত্যমিল বাংলা ছড়া ছাড়া আর কোথায় সম্ভব! শৈশবের ‘ইকড়ি মিকড়ি’ জনৈক ‘দামোদর’-এর ঘরদোর নিয়ে টুকরো অসংলগ্ন ছবিতে কত গল্পই বলে গেল; এইসব ছড়া বাংলা মৌখিক ধারায় ‘ননসেন্স রাইম’-এর আদিরূপ যেন। তবে খামখেয়ালের মধ্যেই ছড়ার ম্যাজিক– ‘আনি মানি জানি না পরের ছেলে মানি না!’ একরকম সেই মূল কথাটাই জানিয়ে দেয়। খেলার ছড়ার রকমফেরও ছিল, কালের নিয়মে অথবা অঞ্চলের প্রভাবে বদল, ভাষ্যও এমনকী, তবে সবই দেশজ সংস্কৃতির বহুমুখ দেখায়।

রবীন্দ্রনাথ নিজে সংগ্রহ করেছেন ছড়ার পাঠান্তর তাঁর ‘লোকসাহিত্য’ প্রবন্ধের পরিশিষ্টে, যে আলোচনায় তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন পুরনো ছড়ায় ‘সংলগ্নতা নেই কিন্তু ছবি আছে।’ ‘আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে’ ছড়াটির চারটি পাঠ পরের পর সাজিয়েছেন তিনি, এইটা দেখাতে যে কীভাবে মূল পাঠ সামান্য বদলেছে মুখে মুখে, হয়তো অপভ্রষ্ট, আর দ্বিতীয় লাইন ‘ঢাক মৃদং ঝাঁঝর বাজে’ হয়ে যাচ্ছে ‘টাঁই মিরগেল ঘাঘর বাজে’, ‘লাল মিরগেল ঘাঘর বাজে’ অথবা ‘ডান মেকড়া ঘাঘর বাজে’। ‘কোনো পরিষ্কার অর্থ আছে কিনা জানি না’ বলেও তিনি একটি ভাষ্য তৈরি করে নিচ্ছেন এর পরেই– ‘কিন্তু ইহা স্পষ্ট দেখা যাইতেছে, প্রথম কয়েক ছত্র বিবাহযাত্রার বর্ণনা, দ্বিতীয় ছত্রে যে বাজনা কয়েকটির উল্লেখ আছে, তাহা ভিন্ন ভিন্ন পাঠে কতই বিকৃত হইয়াছে।’ মনে পড়ছে ছড়ার খেলা অথবা খেলার ছড়া: Ring-a-ring o’ roses/ pocket full of posies/ A-tishoo! A-tishoo!/ We all fall down; এদেশেও শিশুপ্রিয় এই খেলায় বাচ্চাদের হাত ধরে গোল হয়ে ঘোরা, আর শেষে সকলের একসঙ্গে পড়ে-যাওয়া, শুনতে পাই চোদ্দ শতকের ইউরোপের মহামারি প্লেগ আর তার পরিণামের অনুষঙ্গ এর মধ্যে লীন হয়ে থাকা সম্ভব।

এই-যে দিনে দিনে বদলেছে ছোটদের খেলার ধরন, প্রযুক্তি আর পণ্যের প্রসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, সে বিবর্তন অমোঘ। নামমাত্র উপকরণ আর ঘন আবেগ নিয়ে সেই আমাদের নস্টালজিয়া-জাগানো ছেলেবেলার খেলা, তার চিৎকার, উচ্ছ্বাস আর হুল্লোড় নিয়ে, যেন একটা সময়ের ক্যানভাসে লগ্ন হয়ে রইল। নিশ্চিত করে সে অনেকটা কম উদ্বেগের সময়, ভিতরে আর বাইরেও; মেধা দিয়ে, কৃতি দিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অথবা তার উৎকণ্ঠা বাল্যকে ছায়ায় ঢাকেনি তখনও। খেলাগুলিও যেন এক-একটি নিটোল গল্প, আর গল্প বলা, শোনার চল তখনও প্রবল। পরে টিভির পর্দায় কার্টুন দেখার সুযোগ এসে গিয়ে শ্রাব্যের থেকে দৃশ্য বড় হয়ে উঠবে, আর পুরনো খেলাগুলি আরও পুরনো হয়ে থেকে যাবে সিপিয়া টোনের ছবির মতো।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved