Sunil Gangopadhyay: Writer, Poet, Forgotten?। Robbar
Robbar
  • ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিস্মৃত সুনীল, স্মৃতিবদ্ধ সুনীল

একটা সময় সুনীলদা মনে করতেন ‘শিক্ষিত’ বাঙালি মানেই তাঁকে চিনবে। আমি প্রশ্ন করেছিলাম: কোন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে চিনবে? বিন্দুমাত্র সময় না ভেবেই বলেছিলেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে চিনলে সবচেয়ে খুশি হতাম, কিন্তু দুর্ভাগ্য উপন্যাসিক সুনীলকেই সবাই বেশি চেনে। 

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ১৭:১৫   
Facebook WhatsApp Messenger

রবীন্দ্রনাথের পর সমসাময়িক সময়ে, জনমানসে, সামাজিক বলয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো প্রভাব আর কেউ ফেলতে পারেননি। তাঁর চলে যাওয়ার প্রায় ১৫ বছরের কাছাকাছি অতিক্রান্ত সময়ে দাঁড়িয়ে যখন এর কারণ বোঝার চেষ্টা করি, তখন মনে হয় রবীন্দ্রনাথের মতো বহুধাবিস্তৃত প্রতিভা রবীন্দ্রোত্তর সময় থেকে এখনও অবধি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়া আর কারও ছিল না। শুধু ছবিটাই যা তিনি চর্চা করেননি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় উপন্যাসিক, সম্পাদক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার আবার সংগঠকও। সবেতেই সহজ বিচরণ। অথচ তাঁর সমসময়ে কবিতা লিখছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, শঙ্খ ঘোষ। তাঁর সমসময় উপন্যাস লিখছেন দেবেশ রায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, মতি নন্দীরা, নাটক লিখছেন মোহিত চট্টোপাধ্যায়, প্রবন্ধ লিখছেন শিশিরকুমার দাশ, অমিয় দেব, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। এঁরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কেউ-ই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চেয়ে কম নন, তবু বাংলা সাহিত্যের একটা সময়কে চিহ্নিত করতে, গত শতকে ছয়ের দশক থেকে এই শতকের শেষ অবধি সময়টাকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সময় বলেই চিহ্নিত করা যায়, যেখানে পাঁচ ও ছয়ের দশক ‘কৃত্তিবাসের যুগ’ বলে ইতিমধ্যেই পরিচিত। 

zoom
কৃত্তিবাস পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর বহু বছর পরে তাঁর সৃষ্টির যে-শাখা সর্বাধিক চর্চিত তা হল গান, ছবি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে সর্বাধিক চর্চিত কী– এই প্রশ্নের সামনে সামান্য থামতে হয়। কোন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে লোকে বেশি মনে রেখেছে? 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জীবনে বহু পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু প্রধান সব পুরস্কারই তিনি পেয়েছেন তাঁর উপন্যাসের জন্য। এই নিয়ে সুনীলদার মনে কি সামান্য ক্ষোভ ছিল? এই প্রশ্ন কখনও উত্থাপন করতে তিনি এক ধরনের ঔদাসীন্য মাখা হাসি দিয়ে এড়িয়ে গিয়েছেন। অথচ তাঁর সাহিত্য জীবনের যাত্রা শুরু কবিতা দিয়ে, তাঁর খ্যাতির শুরু কবিতা থেকে, তাঁর প্রথম বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ কবিতার জন্যই। তাঁর শেষ ১০-১২ বছর তাঁকে ঘিরে তরুণ লেখকদের বলয় তৈরি হয়েছিল তাঁরা প্রত্যেকেই কবি। প্রায় ৭০ বছরের কাছাকাছি এসে তিনি যে নবপর্যায়ের কৃত্তিবাস আবার সম্পাদনা শুরু করলেন, তা ছিল কবিতার পত্রিকা। 

২৫ বৈশাখ রবীন্দ্রসদন প্রাঙ্গণে তাঁকে তাঁর সম্পাদিত কৃত্তিবাস পত্রিকা নিয়ে বসতেও দেখা যেত অন্যান্য লিটল ম্যাগাজিন পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে। বহির্বিশ্বের কাছে রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা কবিতায় তিনিই ছিলেন একমাত্র মুখ। বহু আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবে কবিতা পড়তে গিয়ে কোনও বিদেশি কবির সঙ্গে আলাপ হলে দেখেছি, তাঁরা অনেকেই কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে চেনেন। অথচ ইংরেজি অনুবাদে সুনীলদার কবিতার বই কোনও বড় প্রকাশনা থেকে কখনও প্রকাশিত হয়নি, পাশাপাশি তাঁর উপন্যাস অনুবাদে প্রকাশ পেয়েছে ভারতের সব বড় প্রকাশনা থেকেই। 

zoom
ফোটোগ্রাফ: তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়

একটা সময় সুনীলদা মনে করতেন ‘শিক্ষিত’ বাঙালি মানেই তাঁকে চিনবে। আমি প্রশ্ন করেছিলাম: কোন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে চিনবে? বিন্দুমাত্র সময় না ভেবেই বলেছিলেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে চিনলে সবচেয়ে খুশি হতাম, কিন্তু দুর্ভাগ্য উপন্যাসিক সুনীলকেই সবাই বেশি চেনে। 

আমার মনে হয়েছে একজন লেখক বেঁচে থাকেন শুধু তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে নয়, সামাজিক বলয়ে ব্যক্তি-প্রভাবের মধ্যে দিয়েও। লেখক একজন ব্যক্তি হিসেবে তাঁর সমসময়ের মানুষজনকে যখন স্পর্শ করেন তিনি অনেকটাই প্রাসঙ্গিক থেকে যান তাঁদের মধ্য দিয়েও। তাঁদের স্মৃতিকথায়, তাঁদের লেখালিখিতেও। কারও আমন্ত্রণ সাধারণত ফেরাতেন না সুনীলদা। একবার সুনীলদার বাড়িতে একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা এসেছেন মুর্শিদাবাদের কোনও এক গ্রাম থেকে। ওঁদের ওখানে কোনও মেলা হয়, সুনীলদাকে নিয়ে যেতে চান। ‘নাছোড়বান্দা’ বলতে যা বোঝায়, তাই। সুনীলদা শেষমেষ কথা দিলেন যাবেন। গেলেনও। আমরা জানতে চাইলাম এইরকম গ্রামে আপনি চলে যাচ্ছেন যেখানে ঠিকমতো থাকার ব্যবস্থা নেই। উনি বললেন বেশ কয়েকমাস ধরে এসে এমনভাবে বলছে যে, না বলি কী করে! সুনীলদার মৃত্যুর পর সেই ভদ্রমহিলাকে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখেছিলাম। 

দুটো সংগঠন সুনীলদা তৈরি করেছিলেন– ‘আত্মীয়সভা’ আর ‘বুধসন্ধ্যা’। আত্মীয়সভা থেকে দুঃস্থ লেখকদের চিকিৎসায় সাহায্য করা হত। আর বুধসন্ধ্যায় হত বিশুদ্ধ আড্ডা তার সঙ্গে সংস্কৃতি চর্চা। কলকাতায় থাকলে বুধবার সন্ধ্যায় বুধসন্ধ্যার আড্ডা মিস করতেন না। প্রতিটি আড্ডায় একজন বা দু’জন কবিতা পড়তেন, একজন গান গাইতেন। কখনও কেউ কিছু বলতেনও। সবটাই হত পূর্বপরিকল্পনা মতো। তরুণ কবিরা যে প্রতি রবিবার সকালে তাঁর বাড়িতে আড্ডা দিতে যেতেন যাঁর একটা ফলশ্রুতি হল মাসে একটা শনিবার কৃত্তিবাসের আড্ডা– যেখানে কবিতা পাঠে আমন্ত্রিত হলে কবিরা নিজেদের ধন্য মনে করতেন, শিল্পীরা গান গাওয়ার সুযোগ পেলে একইভাবে আহ্লাদিত হতেন, সেটা তো অনেকেটাই ব্যক্তি-আকর্ষণের কারণে। নিজের লেখালিখির বাইরে একজন লেখকের যে সামাজিক ভূমিকা, পাঁচের দশকের কবি লেখকদের পর তা যেন উধাও হয়ে গেল। এই যে শহরটার নাম ব্রিটিশদের ক্যালকাটা থেকে বাঙালির কলকাতা হল– এর নেপথ্যে মুখ্য ভূমিকা তো সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়েরই। একটা সময়ের প্রতিভূ। 

An article about Sunil Gangopadhyay on his birthday। Robbar

একসময় বাংলা কবিতায় আন্তর্জাতিক ভাষা নিয়ে এসেছিলেন তিনি। আইওয়া যাওয়ার আগে তাঁর লেখা আর আইওয়া থেকে ফেরার পর তাঁর লেখা একেবারে আলাদা। ১৯৬৫-’৬৬ পর যে-ভাষায় তিনি লিখলেন, তাঁর পরবর্তী বহু কবি সেই ভাষাতে লিখেই বাংলা কবিতাকে মেশালেন আন্তর্জাতিক কাব্যভাষার স্রোতে। তাঁর নীরা সিরিজের কবিতা পাঠ বাঙালি পাঠকের কাছে ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। তাঁর কিছু কবিতার পঙ‌্ক্তি তো ‘মিথ’ হয়ে গিয়েছে বাঙালির যাপনে। কিন্তু অনেক পাঠকের মত: কবিতা যে মানুষের আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে– সেই বৈশিষ্ট্য তাঁর কবিতায় নেই। আছে উন্মোচন আর কল্পনার প্রসার। সুনীলদা মনে করতেন কবিতায় ফর্মই প্রধান, দর্শন নয়। এই নিয়ে সুনীলদার সঙ্গে কয়েকবার আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু কোনওবারই আমরা একমত হইনি। নিজের কবিতায় ফর্মের উপর জোর দিতে গিয়ে তাঁর লেখার দর্শন অবহেলিত থেকেছে। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে সাহিত্যদর্শনই তো সময়কে অতিক্রম করায়।

সুনীলদার উপন্যাসের কথা বললে বেশিরভাগই তাঁর ‘পূর্ব পশ্চিম’, ‘সেই সময়’ আর ‘প্রথম আলো’তে আটকে থাকেন। কিন্তু এমনও বহু পাঠক আছে, যাঁরা তাঁর ‘সুদূর ঝর্ণার জলে’ বা ‘সাদা রাস্তা কালো বাড়ি’র পাঠ অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেন না! 

zoom
গদ্যের সুনীলে ঢাকা পড়েছেন কবিতার সুনীল?

আমার কাছে আরও অনেকের মতো নীললোহিত খুব কাছের। একসময় অপেক্ষা করে থাকতাম কখন পরবর্তী লেখা বেরবে। যদিও পরে মনে হয়েছে, নীললোহিতের মতো সৃষ্টি বিশ্বসাহিত্যে বিরল হলেও, এর প্রধান ত্রুটি হল নীললোহিতের সব কিছু ভালো– কোনও অন্ধকার দিক নেই। সুনীলদাকে একবার এই কথাটা বলাতে উনি মেনেও নিয়েছিলেন। যদিও কোনও যুক্তি দেননি। যেমন কিছু পাঠক ভুলতে পারেন না তাঁর বেশ কিছু ছোট গল্প। আর প্রবন্ধ সাহিত্যে আমার ব্যক্তিগত অভিমত– তিনি অনন্য। এত সহজ ভাষায়, সাবলীলভাবে কোনও গুঢ় বিষয়কে যে পাঠকের দরবারে উপস্থিত করা যায়– এটা তাঁর আগে আর কেউ করেননি। নানা সময় নানা ঘরোয়া আলোচনায় সুনীলদার প্রসঙ্গ এলে দেখেছি অনেকের কাছে যেমন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কারও কাছে উপন্যাসিক, আবার কারও কাছে নানা বিষয়ে তাঁর গদ্য, কারও কাছে কাকাবাবু সিরিজ প্রিয়। কিন্তু আমার কাছে ব্যক্তি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অন্যসব অতিক্রম করে অপরিহার্য! হয়তো আমার মতো আরও অনেকের কাছে যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে জানার সুযোগ পেয়েছেন বা যাঁরা তেমনভাবে ওঁকে জানেনই না। একটি কিশোর ছেলের কথা মনে পড়ে, যে, সুনীলদার রবিবাসরীয় আড্ডায় এসে পড়েছিল কবিতার খাতা নিয়ে। আড্ডার সময় সুনীলদা কবিতা দেখতেন না। আরেকদিন তাকে আসতে বললে সুনীলদা যত্ন করে তা দেখে দিয়েছিলেন। সেই ছেলেটি নিশ্চয়ই এখন বড় হয়ে গিয়েছে। সে কোন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে মনে রাখবে? 

আসলে তিনি একটি ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব, মণিমুক্তোয় ভরা। কোনওটাই বাদ দেওয়ার নয়। তবু নতুন কাব্যভাষা আনয়নে তিনি পথিকৃৎ৷

Krittibas Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sunil Gangopadhyay Sunil Gangopadhyay poems

Share this article on