cannes 2026 a kaleidoscope of world cinema and politics | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিনেমার উৎসব, না কি বিশ্ব রাজনীতি?

এখানে এখনও পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আসে অসম্ভবকে বিশ্বাস করতে। কেউ বাসে, কেউ ট্রেনে, কেউ সস্তা আবাসে থেকে, কেউ ছোট নৌকায় ঘুমিয়ে। শুধু এই আশায়– কোনও একদিন হয়তো তাঁদের ছবির নামও সমুদ্রের ধারে ফিসফিস করে উচ্চারণ করবে পৃথিবী। তবু সব সমালোচনার পরেও কান গুরুত্বপূর্ণ থেকে যায়। কারণ পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই সিনেমাকে এখনও এত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। এখনও কোনও রাজনৈতিক নাটক শেষ হলে দশ মিনিট দাঁড়িয়ে হাততালি পড়ে। এখনও কোনও ছোট দেশের নির্মাতা বিশ্বকে চমকে দেন।

শেষ আপডেট: মে ১৮, ২০২৬, ০৯:৩৮   
Facebook WhatsApp Messenger

ভিডিও কল হলেও, মনে হচ্ছিল একই ঘরে আমরা তিন চলচ্চিত্র নির্মাতা আড্ডা দিচ্ছি। মিন বাহাদুর ভাম, প্রযোজক সতীশ গৌতম আর আমি। মিন তখন সদ্য বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। কথার পর কথা উঠছিল দক্ষিণ এশিয়ার সিনেমা নিয়ে। কেন ভারতীয় সিনেমা সেইভাবে কানের মূল প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নিতে পারছে না, কেন এত বিশাল দেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক বাজারে এখনও প্রান্তিক– এসব নিয়েই আলোচনা চলছিল।

‘স্যাক্সোফোন সিস্টার্স’ নিয়ে মিন সতীশের কাছে শুনেছিলেন। ‘স্যাক্সোফোন সিস্টার্স’ মিনের খুব ভালো লেগেছিল। এটা আমার কাছে বিরাট প্রাপ্তি। এই অল্প বয়সে বিশ্ববিখ্যাত এক পরিচালকের আমার তথ্যচিত্র পছন্দ হওয়া, একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতার কাছে প্রায় অস্কারের সমান। কিছুদিন পর সতীশের কাছ থেকেই শুনলাম, মিনের ‘শাম্ভালা’ এবারে কানে দেখানো হবে। সঙ্গে আর-একটি নেপালি ছবি– ‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’, যার প্রযোজকও মিন বাহাদুর।

zoom
‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’

অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এসেছিল আমার ভিতরে। গর্ব, আনন্দ, বিষণ্ণতা– সব মিলেমিশে থাকা এক অনুভূতি। মনে হচ্ছিল, দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ছোট দেশগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের সিনেমার ভাষা তৈরি করে ফেলছে। অথচ ভারত? পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র শিল্পগুলোর একটি হয়েও আমরা কোথাও যেন নিজেদের হারিয়ে ফেলেছি।

আর সেই কথোপকথনের মাঝেই আচমকা চোখে জল চলে এসেছিল অন্য এক কারণে। যেদিন শুনলাম, আমার প্রিয় পরিচালক জন আব্রাহামের ‘আম্মা আরিয়ান’-এর ফোর-কে পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ কানে প্রথম প্রদর্শিত হবে। প্রদর্শন হবে ১৬ মে, কানের ক্লাসিক বিভাগে। দেখানো হবে জন আব্রাহামের প্রিয় পরিচালক বুনুয়েলের নামাঙ্কিত বুনুয়েল প্রেক্ষাগৃহে। মনে হয়েছিল, মৃত মানুষরাও কখনও কখনও ফিরে আসেন। কোনও কোনও চলচ্চিত্র নির্মাতা আসলে মারা যান না। তাঁরা শুধু সময়ের নিচে চাপা পড়ে থাকেন। তারপর একদিন আচমকা সমুদ্রের ওপারের কোনও পর্দায় আবার জেগে ওঠেন।

zoom
‘আম্মা আরিয়ান’

‘আম্মা আরিয়ান’ আমার কাছে শুধু একটি সিনেমা নয়। এটি ভারতীয় স্বাধীন চলচ্চিত্রের এক অসমাপ্ত চিঠি। যে চিঠির ভিতরে ছিল রাজনৈতিক ক্রোধ, কবিতা, রাস্তা, ক্লান্ত যুবক, বিপ্লবের ব্যর্থতা আর মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি। জন আব্রাহামের সিনেমা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের শিল্প কখনও ক্ষমতার ভিতর জন্মায় না। বরং জন্মায় ভাঙা মানুষের মধ্যে। যাদের ঘুম কম, উদ্বেগ বেশি আর পকেটে টাকা প্রায় থাকে না।

খুব মনে পড়ছিল হেলসিঙ্কি থেকে কানে যাওয়ার কথা। ফিনল্যান্ডের ঠান্ডা বিকেলে বসে একটি তুলনামূলক ভ্রমণ-সাইট খুলে দিনের পর দিন সবচেয়ে সস্তা বিমানের টিকিট খুঁজতাম। নামটার অর্থই ‘ভের্তা’ বা ‘তুলনা’। যেন জীবনটাই তখন তুলনার মধ্যে আটকে ছিল। কোন পথে গেলে একটু কম খরচ হবে, কোথায় নামলে দুটো ইউরো বাঁচবে, কোন বাস ধরলে রাতের থাকার খরচ কমবে।

zoom
‘আম্মা আরিয়ান’ ছবির একটি দৃশ্য

শেষপর্যন্ত কোনওমতে একটা টিকিট কেটে নিস পৌঁছনো। সরাসরি বিমানও ছিল না। তারপর নিস থেকে রাতের শেষ বাসে চোখ কান খোলা রেখে কান যাত্রা । ভারতীয় মুদ্রায় ৪০০-৪৫০ টাকার মতো ভাড়া পড়ল। ভূমধ্যসাগরের ধারে বাস ছুটে চলেছে। জানলার বাইরে নীল সমুদ্র, পাম গাছ, পাহাড়ের গায়ে ইউরোপীয় বাড়ি। মাত্র ২৯ মিনিটের জার্নি । মনে হল নাকতলা থেকে হাজরা যাচ্ছি। শুধু আকাশ বদলে গিয়েছে।

বেশিরভাগ সময়ই কানে থাকিনি। ভয়ংকর হোটেল ভাড়ার কারণে নিসেই থেকেছি। কখনও ট্রেনে, কখনও ছোট আবাসে, কখনও অচেনা মানুষের সঙ্গে ভাগ করে থাকা ঘরে। দিনে সিনেমা, রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে শহরের মধ্যে হাঁটা। কখনও চিনা খাবার, কখনও বহুজাতিক খাবারের দোকানের বার্গার। কখনও ভারতীয় রেস্তোরাঁয় গিয়ে ডাল-ভাত খেয়ে আচমকা মনে হয়েছে, যেন কলকাতার গন্ধ পেলাম। বিদেশে ভারতীয় খাবারের স্বাদ আসলে শুধু খাবার নয়, স্মৃতিও।

লা ক্রোয়াজেত ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হত, পৃথিবীটা যেন আলাদা আলাদা শ্রেণিতে ভাগ হয়ে গিয়েছে। একদিকে উৎসব প্রাসাদের সামনে ক্যামেরার ঝলকানি। কালো গাড়ি এসে থামছে। তারকারা নামছেন। অন্যদিকে সমুদ্রের ধারে কোনও বেঞ্চে বসে হয়তো এক তরুণ পরিচালক নিজের অসমাপ্ত চিত্রনাট্যটা আবার পড়ছে।

রাত নামলে বিলাসবহুল নৌ-যানে পার্টি শুরু হয়। আলো কাঁপতে থাকে জলের উপর। দূরে দূরে সেই নৌ-যানগুলোকে মনে হয় ভাসমান শহর। আর সেইসব আলো দেখে কখনও মনে হয়, পৃথিবীর ৯৯ শতাংশ সম্পদ হয়তো এক শতাংশ মানুষের হাতেই জমা হয়েছে। কান সেই উৎসবেরও সাক্ষী।

এক পরিচিত, একদিন ছোট নৌকায় করে ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিল। খুব বেশি ঢেউ ছিল না। তবু নৌকা দুলছিল। অবাক হয়ে দেখলাম, কয়েকজন তরুণ-তরুণী ক্লান্ত হয়ে নৌকার মেঝেতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুনলাম, সারাদিন তারা প্রযোজকদের চিত্রনাট্য শুনিয়েছে। কাল আবার নতুন দিন। আবার নতুন দরজায় কড়া নাড়া। আবার হয়তো পাঁচ মিনিট সময় পাবে কারও দপ্তরে।

এই পাঁচ মিনিটই হয়তো ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। একদিকে কয়েক ইউরো হাতে নিয়ে কোনওমতে কানে পৌঁছনো তরুণ পরিচালক। অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ ইউরোর বিলাসবহুল নৌযান-আসর। এই দুই পৃথিবী একই শহরে পাশাপাশি বেঁচে থাকে।

একসময় শুনেছিলাম, কানে পঞ্চাশ ইউরোতেও ঘর পাওয়া যেত। এখন সাধারণ ঘরই শুরু হয় দেড়শো-দুশো ইউরো থেকে। সমুদ্রের ধারের হোটেল? দু’হাজার থেকে পনেরো হাজার ইউরো প্রতি রাত। ভারতীয় মুদ্রায় যা কয়েক লক্ষ টাকা।

অনেক তরুণ নির্মাতা তাই ছোট আবাসে থাকেন। কেউ ট্রেনে, কেউ বন্ধুদের মেঝেতে, কেউ ছোট নৌকায়। গল্পগুলো সিনেমার মতো শোনালেও এগুলো বাস্তব। পৃথিবীর বহু বিখ্যাত পরিচালক তাঁদের শুরুর জীবনে প্রায় এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই গিয়েছেন। কেউ পোস্টার বিলিয়েছেন। কেউ পরিচয়পত্র ছাড়া লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কেউ পার্টিতে ঢোকার চেষ্টা করেছেন শুধুমাত্র কোনও প্রযোজকের সঙ্গে এক মিনিট কথা বলার আশায়।

হেলসিঙ্কি লাভ অ্যান্ড অ্যানার্কি উৎসবের ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর পেক্কা ল্যানেরভা বলেছিলেন, ‘কান আসলে শিল্পের চেয়ে ব্যবসার জায়গা বেশি।’ কথাটা প্রথমে খারাপ লেগেছিল। পরে ধীরে ধীরে বুঝেছি, পুরোপুরি মিথ্যে নয়। এখানে কবিতা আছে, কিন্তু তার পাশে বাজারও আছে। এখানে শিল্প আছে, কিন্তু তার পাশেই অদৃশ্য ক্ষমতার লিফট।

খুব কাছ থেকে দেখেছি, দাদা বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় আর বিমুক্তি সুন্দরমকে ‘মাশরুম’ বা ‘ছত্রাক’ বানানোর সময়। ছবিটি ‘আঁ সার্তেঁ রিগা’ বিভাগে দেখানো হয়েছিল। তখনই বুঝেছিলাম, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কেবল পুরস্কারের জায়গা নয়। এটি স্মৃতির জায়গা, সংগ্রামের জায়গা।

ফরাসি নবতরঙ্গ পরিচালক ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোকে নিয়ে একটি কিংবদন্তি এখনও শোনা যায় – হলিউডের বাণিজ্যিক ছবির আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে নাকি তিনি কানের পর্দা ছিঁড়ে দিয়েছিলেন। গল্পটা সত্যি কি না জানি না। কিন্তু এই গল্পের অস্তিত্বই বলে দেয়, কান বরাবরই ছিল শিল্প বনাম বাজারের সংঘর্ষের জায়গা।

zoom
ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো

২০২৬ সালের কান উৎসবেও সেই সংঘাত স্পষ্ট। এবারের সবচেয়ে বড় বিতর্ক এসেছে নতুন পোশাকবিধি নিয়ে। গত কয়েক বছরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভাইরাল সংস্কৃতি লাল গালিচাকে প্রায় ফ্যাশন প্রদর্শনীতে পরিণত করেছিল। এবারে অতিরিক্ত অঙ্গপ্রদর্শন নিষিদ্ধ। বিশাল লম্বা ঘেরওয়ালা পোশাক নিষিদ্ধ। যেন উৎসব বলতে চাইছে– সিনেমা এখনও পোশাকের চেয়ে বড়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সত্যিই কি সিনেমা এখনও কেন্দ্রে আছে?

কারণ একই সময়ে গাজা যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক কাঁপিয়েছে কানকে। পল লাভের্টির মতো মানুষ অভিযোগ করেছেন, ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলায় হলিউডের কিছু অভিনেতাকে অলিখিতভাবে বয়কট করা হচ্ছে। সুসান সারান্ডন, মার্ক রাফালো, হাভিয়ের বারদেমদের নাম উঠে এসেছে আলোচনায়।

অর্থাৎ কান শুধু সিনেমার উৎসব নয়। এটি বিশ্ব রাজনীতিরও আয়না।

zoom
সুসান সারান্ডন

আর এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভারতীয় সিনেমার অনুপস্থিতি আরও স্পষ্ট লাগে। মিন বাহাদুর বলছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র শিল্প হয়েও ভারতীয় সিনেমা সেইভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। এবারে কিছু আঞ্চলিক সিনেমা ও তথ্যচিত্র গিয়েছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করছি না। কিন্তু কোথাও যেন আমরা আয়নায় নিজেদের দেখতে পাচ্ছি না। কিংবা এভাবেও বলা যায়– আয়নার মুখোমুখি হতে চাইছি না।

সম্ভাব্য কারণ, আন্তর্জাতিক যৌথ প্রযোজনার সংস্কৃতিতে আমরা দুর্বল। সম্ভবত স্বাধীন নির্মাতাদের জন্য পরিকাঠামোও কম। গোয়ার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মতো যদি আরও বড় উৎসব তৈরি করা যায়, যদি সেখানে নিয়মিত চলচ্চিত্র বাজার বিভাগ চালু হয়, তাহলে স্বাধীন নির্মাতাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিবেশক বা যৌথ প্রযোজনার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। এই দিকে নজর না দিলে, ভারতীয় সিনেমা হয়তো ধীরে ধীরে শুধু বলিউডেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

তার মধ্যে আবার নতুন আতঙ্ক– কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা!

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে লেখা চিত্রনাট্য কি সত্যিই মানবিক শিল্প? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নির্মিত দৃশ্য কি সিনেমার আত্মাকে বদলে দেবে? অনেকেই বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন ভাষা তৈরি করবে। আবার অনেকে মনে করছেন, ছোট শিল্পীরা আরও কোণঠাসা হয়ে পড়বেন।

আমি জ্যোতিষে বিশ্বাস করি না। তবু কানের সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে মাঝরাতে কখনও কখনও মনে হয়, কিছু কিছু ছবির চারপাশে এক অদ্ভুত নিয়তি ভাসতে থাকে। যেন সিনেমাগুলো শুধু তৈরি হয়নি, বহু বছর ধরে ধীরে ধীরে জন্ম নিয়েছে।

২০২৬ সালের কানে সেইরকম কয়েকটি ছবিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই অদ্ভুত এক নীরব উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। উৎসব প্রাসাদের করিডরে, সমুদ্রের ধারের ক্যাফেতে, মধ্যরাতের পার্টিতে, সাংবাদিকদের ধোঁয়াভরা আড্ডায় – বারবার কিছু নাম ঘুরে ফিরে আসছে।

মনে হচ্ছে, বাইশটি ছবির ভিড়ের মধ্যেও কয়েকটি সিনেমা যেন একটু আলাদা আলোয় দাঁড়িয়ে আছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার না হং-জিনের ‘হোপ’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি গুঞ্জন। প্রায় উনিশ শতাংশ সমালোচক এই ছবিকেই এগিয়ে রাখছেন। প্রত্যন্ত গ্রামের এক পুলিশ প্রধানকে ঘিরে তৈরি রহস্য-রোমাঞ্চ। কিন্তু কানে কেউই শুধু গল্পের জন্য ছবি দেখে না। ছবির আবহ, সময়, নীরবতা– সব মিলিয়েই সিনেমা হয়ে ওঠে। শুনছি, ‘প্যারাসাইট’-খ্যাত হং ক্যুং-পিওর ক্যামেরা না কি গ্রামের অন্ধকারকে এমনভাবে ধরেছে, যেন কুয়াশার মধ্যেও অপরাধের গন্ধ পাওয়া যায়। মাইকেল ফাসবেন্ডার আর অ্যালিসিয়া ভিকান্দারের উপস্থিতিও ছবিটিকে ঘিরে রহস্য বাড়িয়েছে।

zoom
না হং-জিনের ‘হোপ’

তারপর ‘ফাদারল্যান্ড’। পোল্যান্ডের পাওয়েল পাভলিকোভস্কি। তাঁর সাদা-কালো ফ্রেমগুলো সবসময় আমার কাছে মৃত মানুষের স্মৃতির মতো লাগে। ‘আইডা’-র পর আবার ইতিহাসে ফিরে যাওয়া। টমাস মানের জার্মানিতে ফিরে আসার গল্প। মনে হয় যেন যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে কোনও বৃদ্ধ লেখক নিজের ছায়া খুঁজছেন। কানের মতো উৎসবে এই ধরনের বিষণ্ণ সিনেমা প্রায়শই গভীর ছাপ ফেলে যায়।

রোমানিয়ার ক্রিস্টিয়ান মুঞ্জিউয়ের ‘ফিয়র্ড’ নিয়েও প্রবল আগ্রহ। নরওয়ের প্রত্যন্ত গ্রাম, দু’টি পরিবারের দ্বন্দ্ব, ঠান্ডা আকাশ, জমে থাকা নীরবতা– এই ধরনের সিনেমা ইউরোপীয় সমালোচকদের ভীষণ প্রিয়। মুঞ্জিউ আগেও পাম দ’র জিতেছেন। ফলে তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে উত্তেজনা থাকবেই। শুনছি, রেনেট রেইনসভের অভিনয় না কি ছবিটিকে আরও তীক্ষ্ণ করেছে।

রাশিয়া-ফ্রান্স যৌথ প্রযোজনার ‘মিনোটর’ নিয়ে কানের করিডরে সবচেয়ে বেশি ফিসফাস। আন্দ্রে জেভিয়াগিনৎসেভের ছবিগুলো সবসময় যেন রাষ্ট্রের ভিতরের অন্ধকারে ঢুকে পড়ে। তাঁর সিনেমায় বরফও রাজনৈতিক লাগে। এই নতুন ছবিটিকে অনেকে বলছেন, এবারের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক নাটক। কানের প্রথম প্রদর্শনের পর দীর্ঘ করতালির কথাও শুনলাম। এমনকী কেউ কেউ বলছেন, এই ছবির নীরবতা না কি শব্দের থেকেও বেশি সহিংস।

zoom
আন্দ্রে জেভিয়াগিনৎসেভের ‘মিনোটর’

আর আছে জাপানের রিউসুকে হামাগুচির ‘অল অফ আ সাডেন’। ‘ড্রাইভ মাই কার’-এর পর পৃথিবী তাঁর দিকে অন্য চোখে তাকায়। হামাগুচির সিনেমা আমাকে সবসময় ট্রেনের জানলার কথা মনে করিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে দৃশ্য বদলায়, মানুষ বদলায়, অথচ কোথাও এক গভীর একাকিত্ব থেকে যায়। এবারের ছবিটিও না কি সেইরকম। অনেকেই বলছেন, প্রযুক্তিগত নিখুঁততা আর আবেগের সূক্ষ্মতার কারণে ছবিটি শেষপর্যন্ত জুরি বোর্ডকে নাড়িয়ে দিতে পারে।

তবু কান সবসময় ভবিষ্যদ্বাণী মানে না।

কখনও কখনও কোনও অপ্রত্যাশিত ছবি আচমকা উঠে আসে। যেমন পেড্রো আলমোদোভারের ‘আমারগা নাভিদাদ’ বা ‘বিটার ক্রিসমাস’। আলমোদোভারের বয়স বাড়লেও তাঁর সিনেমার রং এখনও জীবন্ত ক্ষতের মতো। বিষণ্ণতাকেও তিনি এমন উজ্জ্বল রঙে আঁকেন, যেন দুঃখও উৎসব হয়ে ওঠে।

zoom
‘আমারগা নাভিদাদ’ বা ‘বিটার ক্রিসমাস’

আর-একটি নাম বারবার শুনছি– জেমস গ্রে-র ‘পেপার টাইগার’। স্কারলেট জোহানসন, অ্যাডাম ড্রাইভার– হলিউডের বড় মুখ। কিন্তু এই ছবিটিকে ঘিরে আলোচনার কারণ শুধু তারকা নয়। অনেকে বলছেন, বহুদিন পর হলিউড আবার কানের শিল্পভাষার সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করছে।

সবশেষে সিদ্ধান্ত নেবে পার্ক চ্যান-উকের নেতৃত্বাধীন জুরি বোর্ড। পার্কের সিনেমাগুলো দেখলে সবসময় মনে হয়, সহিংসতার মধ্যেও কবিতা লুকিয়ে আছে। ফলে তাঁর নেতৃত্বে জুরি কোন ছবির দিকে ঝুঁকবে, তা নিয়ে কৌতূহল আরও বেড়েছে।

কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হল, কানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো অনেক সময় পুরস্কারের তালিকায় থাকে না। বরং থাকে কোনও এক মধ্যরাতের প্রদর্শনীতে। কোনও এক তরুণ পরিচালকের কাঁপা কণ্ঠে। কিংবা কোনও পুরনো চলচ্চিত্রের পুনর্জন্মে।

যেমন ‘আম্মা আরিয়ান’। জন আব্রাহামের সেই ছবির ফোর-কে পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ যখন কানে দেখানো হবে শুনলাম, মনে হল ভারতীয় সিনেমার এক মৃত নদী হয়তো আবার একটু জেগে উঠল। কারণ সত্যিকারের সিনেমা কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। কখনও সমুদ্রের নিচে ডুবে থাকে। কখনও আর্কাইভের অন্ধকারে। কখনও কোনও ক্লান্ত চলচ্চিত্রপ্রেমীর স্মৃতিতে। তারপর একদিন আচমকা আবার আলো জ্বলে ওঠে। সম্ভবত সেই কারণেই কান এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

zoom
জেমস গ্রে-র ‘পেপার টাইগার’

এখানে এখনও পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আসে অসম্ভবকে বিশ্বাস করতে। কেউ বাসে, কেউ ট্রেনে, কেউ সস্তা আবাসে থেকে, কেউ ছোট নৌকায় ঘুমিয়ে। শুধু এই আশায়– কোনও একদিন হয়তো তাঁদের ছবির নামও সমুদ্রের ধারে ফিসফিস করে উচ্চারণ করবে পৃথিবী।

তবু সব সমালোচনার পরেও কান গুরুত্বপূর্ণ থেকে যায়। কারণ পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই সিনেমাকে এখনও এত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। এখনও কোনও রাজনৈতিক নাটক শেষ হলে দশ মিনিট দাঁড়িয়ে হাততালি পড়ে। এখনও কোনও ছোট দেশের নির্মাতা বিশ্বকে চমকে দেন।

মধ্যরাতের বাস ধরে নিস ফিরছি। তখন দেখি কয়েকজন তরুণ পরিচালক এখনও প্রযোজকদের সামনে উপস্থাপনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হয়তো সর্বসাকুল্যে পাঁচ মিনিট সময় পাবেন। সেই অল্প সময়ের মধ্যে যদি কোনও প্রযোজক বা বিক্রয় প্রতিনিধি মুগ্ধ হন, ভবিষ্যৎ বদলে যেতে পারে।

ঝলমলে নিয়ন আলোর নিচে অনেক অন্ধকার। অনেক প্রত্যাখ্যান। অনেক নিঃসঙ্গতা।

মানুষ এখন প্রকাশ্যেই বলছে– গদার, ত্রুফোর সেই কান আর নেই।

তবু কান, কানই থেকে যাবে। কারণ পৃথিবীর কোথাও না কোথাও এখনও একজন তরুণ নির্মাতা জেগে আছেন। হয়তো সস্তা আবাসের ছোট্ট বিছানায়। হয়তো বন্দরের ধারে কোনও নৌকায়। হাতে শুধু একটি অসমাপ্ত চিত্রনাট্য।

আর সেই মুহূর্তে মনে হয়, সত্যিকারের সিনেমা এখনও বেঁচে আছে।

গ্ল্যামারের মধ্যে নয়।

বরং ক্লান্ত, অনিশ্চিত, ঘুমহীন মানুষের স্বপ্নের মধ্যে। 

Amma Ariyan Bappaditya Bandopadhyay Cannes Film Festival Indian Film John Abraham Luis Buñuel Paul Laverty Restored Print Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on