


ট্রয়ের যুদ্ধ এক বিরাট ঘটনা। যাকে সত্যি সত্যিই বলা যেতে পারে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’। ওডিসিয়াস সেই যুদ্ধের একজন প্রধান যোদ্ধা। যার মন ক্ষুদ্র স্বার্থত্যাগ করে বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভাবতে চায়। চরিত্রটির ঠিক এই মনের ওপর আলো ধরলেন এক স্রষ্টা। যিনি এই গল্প সৃষ্টি করেননি ঠিকই, কিন্তু এই সৃষ্টির কয়েক সহস্রাব্দ পর এক সম্পূর্ণ ভিন্ন সময়ে সেটিকে জীবন্ত করে তুললেন দর্শকের সামনে! স্থান-কালের এক রকম ডাইমেনশন থেকে একদম অন্য এক ডাইমেনশনে তুলে আনলেন এক মহাকাব্যকে। কবিকেও কী নয়? শ্রুতি যেমন একসময় পেয়েছিল লিপিরূপ, এবার তা হল দৃশ্যকাব্য! চলচ্চিত্র-পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান, এই দৃশ্যকাব্যের রচয়িতা।
মহাকাব্য কী?
শুধুই লার্জার-দ্যান-লাইফ, মানব অভিজ্ঞতায় কূল-কিনারা না-করতে পারা, সময়ের শিরার ভিতর দিয়ে বয়ে চলা এক দীর্ঘ কাহিনিস্রোত, যার কেন্দ্রে থাকতেই হবে কোনও সুদীর্ঘ যুদ্ধের ইতিহাস? সেই গল্পনদীর ঘাটে ঘাটে খুঁজে পাওয়া কিছু নাম? শহরের, যুদ্ধের, যোদ্ধাদের? মূল গল্প থেকে ছড়িয়ে পড়া শাখাকাহিনি, সময়প্রবাহের চঞ্চল উপশিরাদের কাটাকুটি খেলা? প্রায় কোনও মহাকাব্যেই শুধুমাত্র মানুষদের আমরা চরিত্র হিসেবে দেখি না, যেন মানুষ একা সামলাতে অক্ষম মহাকাব্যের তুমুল ঘটনাস্রোত। তাই ঈশ্বর আসেন, আসে পিশাচ, দৈত্য, জাদুকর, সন্ন্যাসীরা। সাধারণ মানবচরিত্রের মতোই এই পৃথিবীতে দেবতা এবং দৈত্যের স্বাভাবিক বিচরণ।

মহাকাব্যকার কে? কে কবি?
সেইসব দীর্ঘ গল্প, গানে-কবিতায় বলতে বলতে চলা কোনও অন্ধ ভ্রামণিক? এক আপনভোলা চারণকবি?
না, মহাকাব্য যেমন শুধুমাত্র সময়-অতিক্রম করে মানবস্মৃতিতে টিকে যাওয়া কোনও কাহিনিমাত্র নয়, সেরকমই তিনিই কবি নন, যিনি গানে-কবিতায় তৈরি করে দেন এক চিরন্তন স্মৃতিস্রোত। অ্যারিস্টটল তাঁর ‘পোয়েটিক্স’-এ কবিদের কর্তব্য বিষয়ে জানিয়েছিলেন–
“The poet should prefer probable impossibilities to improbable possibilities.”
অর্থাৎ, অসম্ভবকে বলে চলা হল এক কবির কাজ। আর ঠিক সেই কারণেই কবির কলমে ধরা দেয় এমন সৃষ্টি, যা মহাকাব্যের রূপ নেয়। সহজ কথায়, কবির কলম লিখে চলে ঈশ্বর-মানুষ-দানবের সহাবস্থানের কথা, দেবতা নিয়ন্ত্রিত মানুষের নিয়তির কথা, নিয়তির প্রকোপ উপেক্ষা করে মানবচরিত্রের কার্যকলাপ ও তার ফলাফলের কথা।

মহাকাব্য আসলে হতে পারে একজন যোদ্ধার নৈঃশব্দ্য, একজন হত্যাকারীর বিবেক-দংশন, একজন সম্রাজ্ঞীর অপেক্ষা ও বিশ্বাস, একজন পুত্রের তার না-দেখা পিতার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতীক্ষা! আর এই সমস্ত কিছু দেখার জন্য কেবলমাত্র বহির্দৃষ্টি নয়, প্রয়োজন অন্তর্দৃষ্টিরও, দরকার মানুষের মনের মধ্যে অতল অবগাহন। সেই নিবিড় দেখা যার, তিনিই কবি। কবি অন্ধ হতে পারেন, কিন্তু কবিত্ব সত্যদ্রষ্টা!
খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর শেষাংশে, গ্রিক কবি হোমার রচিত ‘ওডিসি’ এমন এক মহাকাব্য, যা শুধুমাত্র কবিতা হিসাবে রচিত হয়নি, এই সৃষ্টি মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির (হিংস্রতা, ক্ষমতা প্রদর্শন, ক্ষমতার জন্য লড়াই, পরশ্রীকাতরতা, স্বজনবিদ্বেষ, বিশ্বাসঘাতকতা) মধ্যে থেকে তুলে এনেছে এমন কিছু উপলব্ধি, আত্ম-আবিষ্কার, কোমলতা– যা আসলে হয়ে উঠেছে কবিতা।
ট্রয়ের যুদ্ধ যেমন ওডিসি মহাকাব্যের কেন্দ্রে রয়েছে, ঠিক তেমনই এই গল্পের কেন্দ্রেরও কেন্দ্রে হোমার বসিয়েছেন ওডিসিয়াসকে। ট্রয়ের যুদ্ধ এক বিরাট ঘটনা। যাকে সত্যি সত্যিই বলা যেতে পারে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’। ওডিসিয়াস সেই যুদ্ধের একজন প্রধান যোদ্ধা। তিনি ইথাকার রাজা। মাইসিনির রাজা আগামেমননের নেতৃত্বে ট্রয়ের যুদ্ধে বিশেষ কীর্তি রেখেছেন ওডিসিয়াস। তার কৌশলগত পরিকল্পনার কারণেই ট্রয় জয় করতে সক্ষম হয় আগামেমননের সেনাবাহিনী।

এই গল্প আমাদের জানা। হোমার এই ঘটনাক্রম আমাদের বলে গিয়েছেন। কিন্তু এই অসীম সাহসী, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, বিচক্ষণ যুদ্ধকুশলী ওডিসিয়াস অন্তর থেকে হতেই পারেন একজন অত্যন্ত বিবেকবান মানুষ। যোদ্ধার রণপোশাকের আড়ালে হয়তো তিনি বয়ে নিয়ে বেড়ান এমন এক মন, যে মন নিজেকে অতিক্রম করে অপরের জন্য বাঁচতে চায়। যে মন ক্ষুদ্র স্বার্থত্যাগ করে বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভাবতে চায়। চরিত্রটির ঠিক এই মনের ওপর আলো ধরলেন আরেক স্রষ্টা। যিনি এই গল্প সৃষ্টি করেননি ঠিকই, কিন্তু এই সৃষ্টির কয়েক সহস্রাব্দ পর এক সম্পূর্ণ ভিন্ন সময়ে সেটিকে জীবন্ত করে তুললেন দর্শকের সামনে! স্থান-কালের এক রকম ডাইমেনশন থেকে একদম অন্য এক ডাইমেনশনে তুলে আনলেন এক মহাকাব্যকে। কবিকেও কী নয়? শ্রুতি যেমন একসময় পেয়েছিল লিপিরূপ, এবার তা হল দৃশ্যকাব্য! চলচ্চিত্র-পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান, এই দৃশ্যকাব্যের রচয়িতা। তার নির্মাণ কি একরকম বিনির্মাণও নয়? নয় কি এক ভিন্ন মহাকাব্য?

নোলান দেখিয়েছেন, যিনি প্রকৃত যোদ্ধা, তিনি যদি রাজাও হন, তবুও তিনি সর্বাগ্রে একজন যোদ্ধাই। তাই ট্রয় জয় করার পরও, গোটা সেনাদল যখন উৎসবে মত্ত, চলছে যথেচ্ছ লুটপাট, অক্ষতযোনি মেয়েদের বন্দি করা হচ্ছে আগামেমননের সেবাদাসী হিসাবে, তাদের মধ্যে কোনও কোনও মেয়েকে উপহার হিসাবে দান করা হচ্ছে বীর সেনাপতিদের হাতে, তখন ওডিসিয়াস ভাবছেন, তাঁর সেনাবাহিনীর সেইসব যোদ্ধাদের কথা, যাঁরা যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন, ভাবছেন স্ত্রী পেনেলোপির কথা, ভাবছেন পুত্র টেলিমাকাসের কথা, যাকে শিশু অবস্থায় রেখে যুদ্ধে বেরিয়ে পড়েছিলেন তিনি।
ওডিসিয়াস আসলে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও, যুদ্ধ করে চলেছেন নিজের সঙ্গে। নিজের কৃতকর্মকে প্রশ্ন করছেন। যুদ্ধ-পরবর্তী হিংসা তাঁর মনে জাগাচ্ছে অপরাধবোধ। নিরপরাধদের মৃত্যু ওডিসিয়াসের ভিতরে জন্ম দিচ্ছে তাঁরই এক অন্য সত্তাকে। তাঁর অপরাধবোধ, আত্মগ্লানি তাঁকে বাধা দিচ্ছে নিজের দেশে ফিরে যেতে, তাঁর নিষ্পাপ প্রেমের সামনে গিয়ে দাড়াতে। প্রিয়তম স্ত্রী পেনেলোপির কাছে তিনি এই অপরাধী-বেশে ফিরে যেতে চাইছেন না। পুত্র টেলিমাকাসের মনে তিনি ফেলতে চাইছেন না নিজের পাপকর্মের ছায়া। তাই তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, এদিক-সেদিক, পথভ্রষ্ট হচ্ছেন, ভুল করছেন, আসলে চাইছেন প্রায়শ্চিত্ত করতে কিন্তু নিয়তির কৌশলে তাঁরই কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন তাঁর নিজের সেনাবাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু একসময় তিনি বুঝতে পারেন, পালিয়ে বাঁচা প্রায়শ্চিত্ত করার সঠিক উপায় নয়, প্রায়শ্চিত্ত করতে হলে প্রিয়জনদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, তাঁদের জন্য এক নিরাপদ পৃথিবী নির্মাণ করা প্রয়োজন। তাই একসময় তিনি ফিরে আসেন নিজের দেশে। ফিরে আসেন কল্যাণের চিন্তা নিয়ে। ফিরে আসেন ভালোবাসার কাছে, পরিবারের কাছে, বিশ্বাসের, আত্মমর্যাদার কাছে।

ওডিসিয়াস এমন এক চরিত্র যিনি পেশিশক্তির থেকে বেশি গুরুত্ব দেন স্নায়ুশক্তিকে। যিনি যুদ্ধ করেন, ক্ষমতা প্রদর্শন করেন। যিনি চিন্তা করেন। বুদ্ধি প্রয়োগ করে। মানুষের কদর করেন। তাই তাঁর আত্মোপলব্ধি হয়। তাই তিনি ভুল বুঝতে পারেন। নোলান দর্শককে দেখাতে চেয়েছেন এই ওডিসিয়াসকে। হোমারের ওডিসিয়াস কৌশলী। তাঁর ক্ষুরধার বুদ্ধির কাছে হার মানে সবরকম জটিল পরিস্থিতি, দুর্ধর্ষ শত্রুপক্ষ। কিন্তু আমরা মহাকাব্যের বর্ণনায় ওডিসিয়াসের ব্যাপারে যা জানতে পারি, শুধু সেটুকুই কি দেখব? সাবটেক্সট দেখব না? ওডিসিয়াসের স্তব্ধতা, সংলাপের মধ্যবর্তী নীরবতা, দ্বিধা, ভাবনার মিশ্র স্রোত দেখব না? না দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা অবশ্য থেকেই যায়। তাই বীর ওডিসিয়াসের সাধারণ স্বাভাবিক মানবরূপ আমাদের দেখালেন নোলান। তাঁর বীরত্বের বোঝা চাপিয়ে দিলেন না গল্পের ওপর, দেখালেন তার অসহায়তা, দেখালেন তাঁর ভুল সিদ্ধান্তের মর্মান্তিক ফলাফল, তাঁর মানসিক দ্বন্দ্ব, দেখালেন মানুষকে ঈশ্বররূপে দেখার প্রতিবন্ধকতা, দেখালেন তাঁর বুদ্ধিমত্তা বহুপ্রশংসিত হলেও তিনিও মানুষ, এবং ভুল করতে পারেন।
নোলান শুধু ওডিসিয়াস নয়, পেনেলোপি, টেলিমাকাস, সিনন, ইউমেইস প্রতিটি চরিত্রের দুর্বল এবং চারিত্রিক দৃঢ়তার দিকগুলির ওপর আলোকপাত করেছেন। দেখিয়েছেন মহাকাব্য মানেই তা দুর্বোধ্য নয়, প্রকাণ্ড কিছু নয়। মানুষের সাধারণ অনুভূতির বিচিত্র প্রকাশধারা এবং বিভিন্ন ঘটনার অভিঘাতে মানবমনে তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠতে পারে এক মহাকাব্য।

এবার আসা যাক, নোলান কীভাবে এই চলচ্চিত্রে ফ্রেমের পর ফ্রেমে তৈরি করেছেন এক অদ্ভুত জাদুময়তা এবং দৃশ্যসৌন্দর্যের বিস্ময়, সেই বিষয়ে। গোধূলি আকাশের প্রেক্ষাপটে সমুদ্র-সৈকতের বালিতে গেঁথে রয়েছে বিশালকায় ট্রোজান ঘোড়া। এই দৃশ্যনির্মাণকে দৈবের হাতে আঁকা এক অলৌকিক ছবি ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় কি না, আমার জানা নেই। সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমই বিস্ময়ের উদ্রেক ঘটায়, কোনও না কোনও ভাবে। কিছু দৃশ্য আবার যেমন ভীষণভাবে গতিময়। কিন্তু সেই গতির মধ্যেও রয়েছে এক আশ্চর্য নান্দনিকতা। বর্তমানে এআই এবং ভিএফএক্সের সাহায্যে বিভিন্ন মহাকাব্যের চলচ্চিত্রায়ন করা হচ্ছে এবং অতিমানবিক সমস্ত চরিত্র, সে দেবতাই হোক বা অপদেবতা, তাদের সহজেই এমন রূপ দেওয়া হচ্ছে, যা দর্শককে বিস্মিত ও আকর্ষিত করবে। কিন্তু নোলান সুযোগ থাকলেও সমুদ্র-দেবতা পোসেইডনকে একবারও পর্দায় আনেননি। দেবতার ক্ষোভ দেখা গিয়েছে সমুদ্রঝড়, পাহাড়প্রমাণ ঢেউয়ের ধাক্কার মধ্যে দিয়ে। দেবী এথেনাকে এনেছেন সাধারণ এক নারীর বেশে। দেখে মনেই হবে না তিনি দেবী। তিনি বন্ধুর মতো কথা বলেন ওডিসিয়াসের সঙ্গে। তাঁকে সঠিক পথ দেখান।

এই সিনেমার কথা বলতে গেলে কিছু দৃশ্যের কথা না বললেই নয়। সেই দৃশ্য যখন পেনিলোপি, তাঁর পুত্র টেলিমাকাসের সঙ্গে কথোপকথনরত এবং টেলিমাকাস তার মাকে পুনর্বিবাহের পরামর্শ দিচ্ছে, তার অভিঘাতে পেনেলোপি হারিয়ে ফেলছেন নিজের সমস্ত সংযম, চিৎকার করে জানাতে চাইছেন কী অধীর তাঁর অপেক্ষা, বছরের পর বছরের প্রতীক্ষা– শান্তির জন্য নয়, না প্রতিশোধের জন্য নয়, হ্যাঁ প্রেমের জন্য, তার স্বামীর জন্য। ‘I want Odysseus’ বলে চিৎকার করে উঠে সজোরে দরজা খুলে বেরিয়ে যাচ্ছেন! এই দৃশ্যের পর মাথা নত করতে হয়। এই দৃশ্যের পর হৃদয় স্তব্ধ হয়ে থাকে। কিংবা ধরা যাক সেই দৃশ্য, যেখানে জাদুকরী সারসি ওডিসিয়াসের বাহিনীর সমস্ত সেনাদের শূকরে পরিণত করে ফেলেছে, এবং ওডিসিয়াস কৌশলে তাদের আবার ফিরিয়ে আনছেন নিজেদের চেহারায়। সেখানে সারসির সঙ্গে ওডিসিয়াসের কথোপকথন দৃশ্যে তৈরি হয় এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। অথচ ফ্রেম অতি সাধারণ, দু’জন মানুষের স্বাভাবিক বাক্যালাপ। কোনও অতিনাটকীয়তা নেই। যেটুকু চাঞ্চল্য নোলান দেখিয়েছেন তা যৎসামান্য। যেকোনও পরিচালকই এই দৃশ্যকে আরও উচ্চকিতভাবে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে প্রলোভন অনুভব করবেন। কিন্তু নোলান সেদিকে যান না। অথচ এই দৃশ্যে ঘটে যাচ্ছে কী বিশাল ঘটনা! নোলান দেখাচ্ছেন মানুষ আসলে পশুই, তাই তাদের পশু হয়েই থাকা শ্রেয়। এই কথাগুলো বলছে এক জাদুকরী, এক নারী, যে একেবারেই মানুষের মতো জীবনযাপন করে। সে কী বলতে চাইছে যে, পুরুষমানুষ আসলে পশু? বন্য শূকরের মতো? তাই সেই রূপেই তাদের থাকতে দেওয়া উচিত? সেই পাশবিক প্রবৃত্তিই কি ওডিসিয়াস দেখেননি ট্রয় জয় করার পর যখন তাঁর সেনারা উল্লাসে ধর্ষণ করছে ট্রয়ের রমণীদের, যথেচ্ছ হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে গোটা শহর? তাই ওডিসিয়াস সারসির কথা শান্তভাবে মেনে নিচ্ছেন, দোষ স্বীকার করছেন, তাই ফিরে পাচ্ছেন নিজের সৈন্যদের। কী অভাবনীয় দৃশ্যনির্মাণ, তাই না?

আর একটি দৃশ্যের কথা না বললেই নয়, যেখানে ওডিসিয়াস অবশেষে এক বৃদ্ধ ভিখারির বেশে ইথাকায় ফিরে আসেন এবং পেনেলোপি’র সঙ্গে কথা বলে। জাফরিকাটা দরজার এক দিকে পেনেলোপি, বাইরে সিঁড়িতে রানির দিকে পিঠ করে বসে আছেন ওডিসিয়াস। ওই দৃশ্যে যদি কোনও দর্শক চোখ বুজেও থাকেন, তাহলেও তিনি দৃশ্যটির রসাস্বাদনের ক্ষেত্রে কিছুমাত্র বঞ্চিত হবেন না, কারণ ওই দৃশ্যটি দেখার নয়, শোনার। দৃশ্যটি একটি কবিতা!

সিনেমায় গল্প-জুড়ে আমরা শুনতে পাই জিউস’স ল’ মেনে চলার কথা। জিউসের ল’ অনুযায়ী, যেকোনও মানুষ যে দরজায় অতিথি হিসাবে আসছেন, তিনি হতে পারেন ছদ্মবেশী ঈশ্বর। তাই তাকে খাদ্য ও বাসস্থান প্রদান করা সমস্ত মানুষের দায়িত্ব। এবার সেখানে সম্ভাবনা থেকেই যায় যে, সেই অতিথি হতে পারেন ছদ্মবেশী শয়তান। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করেই জিউসের নীতি মেনে চলাই কাম্য, কারণ তার অন্যথা হলে, অতিথিকে অসম্মান করলে দেবতার রোষের প্রকোপ এসে পড়বে তাঁর ওপর, যিনি জিইউজার কথা অমান্য করছেন। এই নীতি মানতে গিয়েই রাজাবিহীন ইথাকায় পেনেলোপিকে স্থান দিতে হয়েছিল বাইরের মানুষদের, যারা কৌশলে পেনেলোপিকে বিবাহ করে ইথাকার দখল নেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। আবার এই নীতির জোরেই ওডিসিয়াস ভিখিরির ছদ্মবেশে প্রবেশ করতে পেরেছেন প্রাসাদের অন্দরমহলে, শাস্তি দিয়েছেন অনাচারীদের। কিন্তু আরও আশ্চর্য ব্যাপার হল, নোলান এই চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও মান্য করেছেন জিউস’স ল’। তাঁর দুয়ারে দর্শক অতিথি, তিনি জানেন না তিনি যা পরিবেশন করছেন, তা থেকে দর্শক কী গ্রহণ করবে? কোনটাকে বড় করে দেখবে? হিংসাকে না আত্মোপলব্ধিকে? সমস্তরকম সম্ভাবনা সত্ত্বেও তিনি আতিথেয়তায় কোনও ত্রুটি কিন্তু রাখেননি।

নোলানের দৃশ্যনির্মাণ-কৌশল তুলনারহিত, এক কথায় অভিনব। বেশিরভাগ দৃশ্যে আলোর ব্যবহার এত মোলায়েম যে, গোটা সিনেমাটাই তৈরি করে এক অদ্ভুত মায়াবী আবহ। নোলান ভিএফএক্স ব্যবহারের বিরোধী। যদিও এই চলচ্চিত্রের কিছু দৃশ্যে তিনি ভিএফএক্স ব্যবহার করেছেন, যাকে বলা হচ্ছে টাচ-আপ ভিএফএক্স। অর্থাৎ, একেবারেই যেখানে না-করলে নয়।
ওডিসিয়াসের চরিত্রে ম্যাট ডেমন অব্যর্থ। অ্যান হ্যাথওয়ে পেনেলোপি’র চরিত্রে এক এমন মাত্রা এনেছেন, যা অন্তত আমাকে এই চরিত্রে অন্য কেউ ভবিষ্যতে অভিনয় করলে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। টেলিমাকাসের ভূমিকায় টম হালান্ড অত্যন্ত সাবলীল। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে, অ্যান্টোনিয়াস চরিত্রে রবার্ট প্যাটিনসন এবং ইওমেইসের ভূমিকায় জন লেগিজামোর কথা।

লুডউইগ গোরানসনের আবহসংগীত বাদ দিলে এই চলচ্চিত্র এক স্বতন্ত্র নির্মাণ হিসাবে এই উচ্চতায় পৌঁছত না যে, সে-বিষয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।
নোলানের ওডিসি অবশ্যই হোমারের মূল কাহিনিস্রোতকে বজায় রেখে এক অনবদ্য বিনির্মাণ। হোমারের এই কালজয়ী মহাকাব্যকে নোলান করে তুলেছেন আরও বেশিমাত্রায় এক মানবিক দলিল, একজন সাধারণ মানুষের জীবন-অভিজ্ঞতা। তাই নোলানের ওডিসিয়াস অতি সাবলীল কণ্ঠে বলতে পারেন– ‘Do not try to find gods in men.’ অস্বীকার করতে পারেন নিজের বিশালতা, খুঁজতে পারেন নিজের দুর্বলতা, বুঝতে পারেন নিজের অপারগতা। মহাকাব্য হয়ে ওঠে সাধারণের গল্প।
…………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন রবীনা মিত্র-র অন্যান্য লেখা
…………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved