Palermo shooting and blow-up: existence in photography | Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

মুহূর্ত অস্তিত্ব ছবি

মৃত্যু কোনও ভয়ংকর হুমকি নয়; বরং এক গভীর উপলব্ধির নাম। ‘মৃত্যু’ জীবনকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ দেয়– জীবন সম্পর্কে পুনর্বিবেচনা ও আত্মসমীক্ষার দিকে আমাদের নিয়ে যায়। এক অর্থে, ‘মৃত্যু’ আমাদের জীবনমুখী এক যাত্রায় সঙ্গী হয়। মৃত্যুভয় আসলে জীবনেরই ভয়, এবং উল্টোটাও সমান সত্য। আলোকচিত্রের ভাষায় বলতে গেলে, জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক ঠিক যেমন একটি আলোকচিত্রের সঙ্গে তার negative-এর সম্পর্ক– মৃত্যু হল আলোর বা জীবনের বিপরীত পিঠ, যার উপস্থিতি ছাড়া পূর্ণাঙ্গ ছবিটির অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না।

Published by: Robbar Digital

Posted:August 3, 2026 4:28 pm | Updated:August 3, 2026 4:28 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

যান্ত্রিক ও নান্দনিক মধ্যস্থতাঅন্তর্ভুক্তি ও বর্জন

যে ডিজিটাল জামানার উচ্চ গগনে আমাদের অবস্থান, সেখানে হামেশাই তর্ক ওঠে– কোনটা আসল; কোনটা নকল। কোন ছবিতে কতটা যান্ত্রিক কারসাজি না থাকলে, সেটা সৎ বলে গণ্য? ক্যামেরা, সফটওয়্যার ও কৃত্রিম মেধার মিলিত সহায়তায়– ‘আসল’ বলে কি আদৌ কিছু অবশিষ্ট আছে আর? সব ছবি যদি যন্ত্রই তুলবে, সম্পাদনা করবে, বা আমূল নির্মাণ করে দেবে– তাহলে আর মানুষের দেখার চোখ বা সেই চোখ দিয়ে সত্যের সন্ধানের কী প্রয়োজন? কী প্রয়োজন, ছবি দ্বারা সত্যের সন্ধান, অর্থের সন্ধান বা দৃষ্টিকোণ শানিয়ে নেওয়ার? ছবির জীবন, জীবনের ছবি ও ক্যামেরার ছবির যা সত্য/ সময়/ মুহূর্ত ও অস্তিত্বকে বন্দি করে– তার মধ্যে নিহিত অর্থ ও জীবনের সঙ্গে সেই অর্থের সম্পর্ক নিয়েই এই নিবন্ধ। এই উত্তরগুলি ঝুঝতে ও খুঁজতে আমি দু’টি চলচ্চিত্রের উল্লেখ করব। সে দুটো ছবিই স্থিরচিত্রীর জীবন ও জীবনসংকট নির্ভর। তবে সেখানে যাওয়ার আগে, যান্ত্রিক ছবির নান্দনিক দর্শন নিয়ে কিছু কথা বলে রাখা দরকার। 

এই ডিজিটাল যুগের আগেও– স্থানকালপাত্র উপস্থাপনা এবং রূপান্তর– যান্ত্রিক মধ্যস্থতা ছাড়া, আলোকচিত্র সম্ভব ছিল না। কাগজে বা পর্দায় দৃশ্যমান দ্বিমাত্রিক আলোকচিত্র, আসলে আমাদের ত্রিমাত্রিক জগতের যান্ত্রিক মধ্যস্থতাপূর্ণ নিষ্কাশন। একইভাবে, স্থিরচিত্রে বন্দি যে কোনও মানুষ, স্থান বা মুহূর্ত– যান্ত্রিক মধ্যস্থতায় নিষ্কাশিত। ফলে ছবিতে যা দৃশ্যমান, তা সবসময়ই আলোকচিত্রীর দৃষ্টিতে দেখা এবং তার দ্বারা দেখানো দৃশ্যক্ষেত্র থেকে নান্দনিকভাবে নির্বাচিত এক অংশমাত্র। কীভাবে ও কী অন্তর্ভুক্ত করা হবে আর বাদ দেওয়া হবে– সেই অন্তর্ভুক্তি ও বর্জনের নান্দনিক ও ভাবগত পরিণতিই ছবি। নানাবিধ দৃশ্যগত মধ্যস্থতা ও রূপান্তরের মাধ্যমেই, ‘সেখান’ এবং ‘তখন’-কে ‘এখানে’ এবং ‘এখন’-এর অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়। এই প্রক্রিয়ায় অতীত, বর্তমানের দৃষ্টিক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। দর্শক বর্তমান মুহূর্তে দাঁড়িয়ে অতীতকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পায়।

zoom
‘Palermo Shooting’ ছবির একটি দৃশ্য

ছবি তোলার মানে খুঁজে না পাওয়া– পালেরমো যাত্রা বা অণুবীক্ষণ

‘Palermo Shooting’ এবং ‘Blow-Up’ চলচ্চিত্র– দুই নিরাসক্ত আলোকচিত্রীর জীবন নিয়ে। মৃত্যুর ধারণা বিভিন্নভাবে ফিরে ফিরে আসে তাদের জীবনে– তাদের বেঁচে থাকাকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে। আত্ম-আবিষ্কারের অদ্ভুত যাত্রায়, ভিম ভেন্ডার্সের ‘Palermo Shooting’ চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র ফিনের কাছে মৃত্যু হয়ে ওঠে আরও ভালোভাবে বেঁচে থাকার পথপ্রদর্শক। মৃত্যু জীবনকে নতুন করে ভাবতে সহায়তা করে। সে বারবার মৃত্যুর স্বপ্ন দেখে। আমরা দেখতে পাই এমন সব দৃশ্য, যেখানে ফিনের শরীর, চারপাশের পরিবেশের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ। স্বপ্নে এবং কল্পনায়, ফিন যেন অনুপাতহীন– তুচ্ছ, ক্ষমতাহীন এবং গভীর অসন্তুষ্টিতে আক্রান্ত।

ফিনের চলার পথে, একদিন ফুটপাথ ঊর্ধ্বগামী হয়ে যায়। আর ফিন ক্রমশ পিছলে যেতে থাকে। জীবনকে আঁকড়ে ধরে রাখার এক মরিয়া প্রচেষ্টায়, সে ল্যাম্পপোস্টের ঘড়ির খুঁটিটা শক্ত করে ধরে– যেন সময় হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। সময়ের ওপর– এবং বৃহত্তর অর্থে, নিজের জীবনের ওপর– তার নিয়ন্ত্রণ নেই। সে গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত এবং এক অস্তিত্বসংকটে আটকে পড়েছে। মৃত্যুচিন্তা ফিনকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে। কাজের প্রতি সে ক্রমশ অনাসক্ত। জীবনশক্তি নিঃশেষিত। তার জীবন যেন তার ছবিতে ব্যবহৃত– কৃত্রিম রং, আলোর টোন, অতিরঞ্জিত আকাশ– এসব কিছুর থেকেও অনেক বেশি কৃত্রিম।

মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া, এখানে মূলত এক অন্তর্মুখী আত্মসমীক্ষার অভিজ্ঞতা। মৃত্যু অনিবার্য হলেও, মৃত্যুভয় অনেক সময়, আমাদের বেঁচে থাকার পথ রুদ্ধ করে। ‘মৃত্যু’ নামক চরিত্র, ফিনকে আহ্বান জানায়: একঘেয়েমি ও ক্লান্তিকর জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে; জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে নিতে। কোথা থেকে এই একঘেয়েমির উৎপত্তি? শুধুই কি মৃত্যুভয়? না, একঘেয়ে ও একই ধরনের ফরমায়েশি কাজ করে করে, আমরা যে ছবির পাহাড় নির্মাণ করেছি, সেখানে শুধুই অযথা আধিক্য। এক ঝাঁক ও একই রকমের ছবির স্রোত, নিমেষে ঢেকে দিচ্ছে কয়েক সেকেন্ড আগে তোলা ছবিদের। 

শেষ দৃশ্যে, ‘মৃত্যু’র সঙ্গে ফিনের দীর্ঘ সংলাপ– জীবনের পুনরাবিষ্কৃত অর্থ, তাৎপর্য এবং প্রেরণা ফিরে পেতে একটি মানুষের অন্তর্যাত্রা। সেই সংলাপ, ফিনের মধ্যে নতুন করে প্রাণসঞ্চার করে। পালের্মোতে এসে ফিন ছবি তোলে, উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ায়, প্রেমালাপে জড়ায় এবং এক অপরিহার্য বিরতি আবিষ্কার করে। খেলাচ্ছলে অন্য ধরনের ছবিও তোলে। ফিনের এই নির্ণায়ক পরিবর্তন, আমাদের নিজেদের জীবন ও কাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে আমন্ত্রণ জানায়। অর্থহীনতা থেকে অর্থের সন্ধানে; উপরিতল থেকে গভীরে; এবং যান্ত্রিক কর্মপ্রবাহ থেকে জীবনের ছোট ছোট আনন্দকে পুনরাবিষ্কারের পথে অগ্রসর হওয়ার এক যাত্রা। যার সঙ্গে হয়তো, নাগরিক ব্যস্ততার দ্বারা পিষ্ট, সকল মানব মানবীই– একাত্ম বোধ করতে পারবেন।

এবার আসা যাক আন্তোনিওনির ‘Blow-Up’-এর টমাসের কাছে। সে এক চূড়ান্ত আত্মমগ্ন, উদ্ধত এবং খামখেয়ালি ফ্যাশন-আলোকচিত্রী। ফিনের চেয়েও বেশি, জীবন থেকে সে বিচ্ছিন্ন। সে আত্ম-অহমে পরিপূর্ণ; চারপাশের অধিকাংশ মানুষের প্রতি তাচ্ছিল্য করে অভ্যস্ত। সহকারীদের সঙ্গে, মডেলদের সঙ্গে, এমনকী দোকানদারদের সঙ্গেও সে দুর্ব্যবহার করে থাকে। মডেলদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিয়ে রাখে। তার এলোমেলো স্টুডিওটি যেন তার বিশৃঙ্খল মানসিক অবস্থারই প্রতিফলন। প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও, প্রাচীন সামগ্রীর দোকান থেকে, হঠাৎ করেই, একটি বিমানের প্রপেলার কিনে ফেলতে পারে সে। আবার কোনও রক কনসার্ট থেকে একটি গিটার ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে পালাতেও পারে। আবার কিছু দূর গিয়ে, সেটি নির্বিকারে ফেলেও দিতে পারে। 

টমাস এতটাই অধিকারপ্রাপ্ত যে, একটি পার্কে, প্রেমমগ্ন এক যুগলের ব্যক্তিগত মুহূর্তে, ছবি তুলতেও তার দ্বিধা হয় না। তবে এই সমস্ত আচরণ, মূলত এমন এক চরিত্র নির্মাণের পরিপ্রেক্ষিত– যার কাছে জীবন গভীরভাবে অর্থহীন, আর ফ্যাশন-ফটোগ্রাফির কাজ একঘেয়ে ও ফাঁপা। তাই সে মরিয়া হয়ে খুঁজে বেড়ায় আরও ‘বাস্তব’ কিছু। সে এতটাই মরিয়া যে, অস্পষ্ট এক আলোকচিত্রে, বন্দুকের গুলির চিহ্ন আবিষ্কার করা এবং সেটিকে বারবার বড় করে দেখা– এটাই তার জীবনের এক গভীর উদ্দেশ্যে পরিণত হয়।

zoom
আন্তোনিওনির ‘Blow-Up’-এর টমাস

ফিন এবং টমাস– উভয়েই চাকচিক্যময় জীবনযাপন, দামি গাড়ি, পার্টি এবং সমাজের অভিজাত বৃত্তে বিচরণে আকৃষ্ট। দু’জনেই আত্মমগ্ন, খামখেয়ালি, স্বেচ্ছাচারী এবং দু’জনেই চূড়ান্ত একঘেয়েমিতে ভুগছে– যেমন আমরা অনেকেই। ফ্যাশন-ফটোগ্রাফির যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, উভয়েই মরিয়া। দিনের পর দিন, একই রকমের ছবির ভিড়ে, তারা আর নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছে না। তাই হয়তো তারা নিজের কাজের সঙ্গে আপস করার অনুশোচনা থেকেও মুক্তি খুঁজছে। তাদের সৃজনশীল কাজ, প্রতিনিয়ত একঘেয়েমির ফলে, নীরস হয়ে উঠেছে। তা সৃষ্টি করছে নৈরাশ্য। এই অনুভূতি কি অধিকাংশ পাঠকের খুব কাছের অনুভূতি নয়? আমাদের সকলের মতো: তাদেরও কাঙ্ক্ষিত: মুক্তি।

ফিনের ক্ষেত্রে মৃত্যু– বাস্তব হোক বা কল্পিত; এবং টমাসের ক্ষেত্রে, পার্কে এক যুগলকে অনুসরণ করতে গিয়ে, আকস্মিকভাবে ক্যামেরায় ধরা পড়া, সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড– তাদের জীবনের এক সন্ধিক্ষণে পরিণত হয়। ‘মৃত্যুচেতনা’ এবং ‘মৃতদেহ’– এই দুই অভিজ্ঞতাই, দুই আলোকচিত্রীকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। যেন এক প্রবল অভিঘাতে তারা জেগে ওঠে, এক নতুন জীবনে। এর আগে তারা ছিল অনাগ্রহী এবং বিচ্ছিন্ন। কিন্তু এই ঘটনার পর, তাদের মধ্যে জীবন ও আলোকচিত্র– উভয়তেই নতুন করে এক উদ্দীপনা দেখা যায়। যেন তারা জীবনের এক নতুন উদ্দেশ্য খুঁজে পায়। দু’জনেই, এক আকস্মিক ঘটনার সূত্র ধরে, গভীরে প্রবেশ করে। ক্রমশ জুম-ইন করতে করতে আত্মসমীক্ষা করে। শুরু হয় অণুবীক্ষণ। 

zoom
‘Palermo Shooting’ ছবির আলোকচিত্রী ফিন

প্রমাণের খোঁজে আরও অণুবীক্ষণ– সত্যি বলে আদৌ কিছু আছে কি?

বারবার বড় করে দেখা বা ম্যাগনিফাই করার প্রক্রিয়া– শেষ পর্যন্ত টমাসকে হত্যাকাণ্ডের অকাট্য প্রমাণ দিতে সক্ষম না করলেও, তা নিঃসন্দেহে তাকে আরও বৃহত্তর অস্তিত্বগত সত্যের অনেক কাছাকাছি নিয়ে যায়। টমাস হত্যাকাণ্ডের আলোকচিত্রটিকে, বড় করতে করতে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায়, যেখানে ছবিটি প্রায় বিকৃত হয়ে ওঠে। ওদিকে ফিন, মৃত্যু দ্বারা নিক্ষিপ্ত তীরগুলোর অর্থ সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করতে পারে না পারলেও সে বোঝে: মৃত্যুভয় বা আপাত অর্থহীনতা না কাটাতে পারলে বাঁচার মতো বাঁচা যায় না। 

টমাস বিস্মিত ও বিভ্রান্ত থাকে, কারণ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও সে খুনি কিংবা হত্যাকাণ্ড– কোনওটিই প্রত্যক্ষ করতে পারেনি। যদিও তার তোলা ছবি, অস্পষ্টভাবে হলেও, সেই সম্ভাব্য হত্যার সাক্ষ্য বহন করে। এখানেই আলোকচিত্রের সাক্ষ্য-প্রমাণমূলক গুণটি খণ্ডিত। আলোকচিত্রের প্রমাণীকরণের ক্ষমতা এবং তার উপস্থাপনার ক্ষমতা– এক নিবিড় সম্পর্কে বাঁধা। অন্যভাবে বললে, আলোকচিত্রের উপস্থাপনক্ষমতা, অনেকাংশেই তার প্রামাণ্যতার মধ্য থেকেই উৎসারিত হয়। টমাস যেখানে অজান্তেই, অনিচ্ছাকৃতভাবে, ক্যামেরায় মৃত্যুকে ধরে ফেলে (যদিও এক্ষেত্রে তা বড়ই ঝাপসা); সেখানে ‘Palermo Shooting’-এ ‘মৃত্যু’ নামক চরিত্রটি, নিজেই দাবি করে যে, প্রতিবার মুখোমুখি হওয়ার সময়, মৃত্যুই ফিনকে নিজের দৃষ্টিতে বন্দি করেছে। মৃত্যু সেরকম কিছু মুহূর্তের প্রমাণও পেশ করে। মৃত্যু যেন সবকিছুরই নীরব নথিকার– সবকিছুই সে ধারণ করে।

zoom
বৃহত্তর অস্তিত্বগত সত্যের কাছাকাছি?, ‘Blow-Up’

যে ডিজিটাল ম্যানিপুলেশনের প্রসঙ্গ দিয়ে এ লেখার সূচনা করেছিলাম– ফিন, আলোকচিত্রে সেই ডিজিটাল হস্তক্ষেপের প্রবক্তা। তাকে আমরা নির্দেশ দিতে দেখি– আকাশের রং, প্রতিফলন, কিংবা আলোর আবহ পরিবর্তন করে– ছবির দৃশ্যগত আবেদন বাড়িয়ে তুলতে; অর্থাৎ ‘সত্য’কে যেমন আছে তেমনভাবে উপস্থাপন করার বদলে, তাকে আরও আকর্ষণীয় করতে। তার মাত্রাতিরিক্ত ডিজিটাল হস্তক্ষেপ নিয়ে অনেকের মতো, ‘মৃত্যু’ও আপত্তি করে। ‘Palermo Shooting’-এ ‘মৃত্যু’ চরিত্রটি অ্যানালগ আলোকচিত্রের প্রবক্তা। সে ছবির অতিরিক্ত কারসাজির বিরোধিতা করে। যদিও ফিনকে মৃত্যুভয় থেকে মুক্ত করে, তার জীবনকে রূপান্তরিত করতে, সে দ্বিধা করে না। 

মৃত্যুর চরিত্রটি ফিনকে বলে, মৃত্যু না থাকলে জীবনের প্রকৃত উপলব্ধি সম্ভব নয়। এই সাক্ষাৎকে অবচেতনের সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ মুখোমুখিও বলা যেতে পারে। এখানে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী বিভাজনরেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। মৃত্যু কোনও ভয়ংকর হুমকি নয়; বরং এক গভীর উপলব্ধির নাম। ‘মৃত্যু’ জীবনকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ দেয়– জীবন সম্পর্কে পুনর্বিবেচনা ও আত্মসমীক্ষার দিকে আমাদের নিয়ে যায়। এক অর্থে, ‘মৃত্যু’ আমাদের জীবনমুখী এক যাত্রায় সঙ্গী হয়। মৃত্যুভয় আসলে জীবনেরই ভয়, এবং উল্টোটাও সমান সত্য। আলোকচিত্রের ভাষায় বলতে গেলে, জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক ঠিক যেমন একটি আলোকচিত্রের সঙ্গে তার negative-এর সম্পর্ক– মৃত্যু হল আলোর বা জীবনের বিপরীত পিঠ, যার উপস্থিতি ছাড়া পূর্ণাঙ্গ ছবিটির অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না।

zoom
মৃত্যুর সঙ্গে কথোপকথন, ‘Palermo Shooting’

টমাসের সামনে শেষ পর্যন্ত আর কোনও পথ খোলা থাকে না। তাকে আলোকচিত্রে ধরা পড়া সম্ভাব্য হত্যাকারীর অনুসন্ধান ছেড়ে দিতেই হয়। ঘটনাস্থল থেকে মৃতদেহটি উধাও হয়ে যায়। ছবিটির বড় করা (blow-up) সংস্করণ এতটাই বিকৃত হয়ে ওঠে যে, সেটাকে আর আলোকচিত্র বলে মনে হয় না– বরং অস্পষ্ট এক বিমূর্ত চিত্রকর্ম মনে হয়। এই ম্যাগনিফিকেশন বা অণুবীক্ষণ, আমাদের বাস্তবতার আরও কাছাকাছি নিয়ে যায় না; বরং যে বস্তুনিষ্ঠ সত্যের অস্তিত্ব আমরা ধরে নিয়েছিলাম, তাকেই ক্রমশ বিকৃত ও অনিশ্চিত করে তোলে। ছবিকে যত বেশি ক্রপ করা হয়, এবং যত বেশি বড় করা হয়, সত্য যেন ততই অধরা হয়ে ওঠে। কেউই টমাসের বর্ণনাকে বিশ্বাস করতে চায় না। এর এক অর্থ হতে পারে– সমাজ, হত্যাকাণ্ডের প্রতি তারা এমনই উদাসীন হয়ে পড়েছে যে, বিচ্ছিন্ন কোনও প্রতিবাদ কিংবা হত্যার সত্য উন্মোচনের প্রয়াস তাদের কাছে গুরুত্বহীন। 

সত্য-মিথ্যা ও জীবন-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে

একদল নৈরাজ্যবাদী তরুণ-তরুণী, নিষিদ্ধ লনে প্রবেশ করে, টমাসকে এক কাল্পনিক লন-টেনিস খেলায় অংশ নিতে আহ্বান করে। তারা অদৃশ্য এক বল নিয়ে খেলে, আর টমাসকে সেই অস্তিত্বহীন বলটিকে কুড়িয়ে এনে আবার কোর্টে ছুড়ে দিতে বলে। এই তরুণদের স্বাধীনতা– টমাসের তুলনায় অনেক বেশি। তারা বাস্তবতার সীমারেখাকে অতিক্রম করে খেলতে পারে; কল্পনাকে সত্যের মতো গ্রহণ করতে পারে। টমাস সেই খেলার অর্থ উদ্ধার করার মধ্য দিয়ে, হয়তো, ক্যামেরা মারফত সত্য উন্মোচনের চেষ্টা ও তার বিফলতাকে তুলনা করে। যথেচ্ছ প্রমাণ না থাকায় তার ছবিগত দাবি পাত্তা পায় না। অথচ এখানে, বস্তুগত বল ছাড়াই খেলা চলছে অনায়াসে।

zoom
‘Blow-Up’ ছবির একটি দৃশ্য

ফিন মৃত্যুভয়কে অতিক্রম করে, অথবা জীবন ও মৃত্যুকে একই অস্তিত্বের দুই পিঠ হিসেবে মেনে নিয়ে মুক্তি লাভ করে। টমাস সেখানে তেমন কোনও নির্দিষ্ট পরিণতিতে পৌঁছয় না। সে কেবল সেই কাল্পনিক বলটি আবার কোর্টে ছুড়ে দেয় এবং এই অর্থহীন খেলাটির তাৎপর্য অনুধাবনের চেষ্টা করে। চলচ্চিত্রের শেষে তার ক্লোজ-আপ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় এক সুদীর্ঘ লং-শটে, যেখানে বিস্তীর্ণ শূন্য মাঠের মধ্যে তাকে প্রায় হারিয়ে যেতে দেখা যায়– যেন তার আর কোথাও যাওয়ার নেই, কিংবা যাওয়ার মতো কোনও নির্দিষ্ট গন্তব্য বা সত্য অবশিষ্ট নেই। এই বিলীন হয়ে যাওয়ার সঙ্গে অনেক পাঠক বা দর্শন নিজেদের অস্তিত্বহীনতা মিলিয়ে নিতে পারেন।

Blow-Up Death existence Michelangelo Antonioni Palermo Shooting Photography Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Time Wim Wenders

Share this article on