Robbar

দারিদ্র ১ স্বপ্ন ৭

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 25, 2026 5:40 am
  • Updated:June 25, 2026 5:52 am  

ইতিহাসবিদদের হিসেব অনুযায়ী, আফ্রিকা থেকে আমেরিকা মহাদেশে যে কয়েক কোটি মানুষকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাদের প্রায় অর্ধেকের গন্তব্য ছিল ব্রাজিল। অগণিত মানুষকে নিজেদের বাড়ি, পরিবার, ভাষা, সংস্কৃতি থেকে ছিঁড়ে এনে এমন এক পৃথিবীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে তারা ছিল কেবল শ্রমশক্তি। দাসপ্রথা শেষ হল ১৮৮৮ সালে। পশ্চিমা বিশ্বের বড় দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলই সবার শেষে এই ব্যবস্থা তুলে দেয়। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পরও সাবেক ক্রীতদাসদের জীবনে খুব বেশি পরিবর্তন এল না। জমি দেওয়া হল না, শিক্ষা দেওয়া হল না, কাজের সুযোগ তৈরি হল না।

অরিত্র মজুমদার

ব্রাজিল নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হলুদ জার্সি, সাম্বার তালে নাচতে থাকা জনতা আর ফুটবল। পেলে, রোনাল্ডো, রোনাল্ডিনহো, রিভাল্ডো, নেইমার, ভিনি জুনিয়র– প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পৃথিবীর সেরা ফুটবলারদের জন্ম দিয়েছে যে দেশ, তাকে আমরা মূলত ফুটবলের দেশ হিসেবেই চিনি।

কিন্তু ব্রাজিলের গল্প শুধু ফুটবলের গল্প নয়।

এ এমন এক দেশের গল্প, যে দেশ শোষণের ভিতর থেকে উঠে এসেছে। যে দেশ দাসপ্রথার কলঙ্ক বয়ে নিয়ে চলেছে, আবার সেই ইতিহাসের বিরুদ্ধে লড়ে জিতেছে। যে দেশ সামরিক স্বৈরতন্ত্র দেখেছে, আবার গণতন্ত্রের জন্য রাস্তায় নেমেছে। আর এই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি বাঁকে ফুটবল কখনও সঙ্গী, কখনও অস্ত্র, কখনও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে থেকেছে।

একসময় ব্রাজিল ছিল পর্তুগালের উপনিবেশ। ইউরোপের বাজারে কফি, আখ আর অন্যান্য কৃষিজ পণ্যের চাহিদা মেটাতে বিশাল বিশাল জমিতে শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। সেই শ্রমিক এল আফ্রিকা থেকে। অবশ্য শ্রমিক বলা ভুল। তারা ছিল ক্রীতদাস।

ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপজয়ী দল, মধ্যমণি পেলে, ১৯৫৮

ইতিহাসবিদদের হিসেব অনুযায়ী, আফ্রিকা থেকে আমেরিকা মহাদেশে যে কয়েক কোটি মানুষকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাদের প্রায় অর্ধেকের গন্তব্য ছিল ব্রাজিল। অগণিত মানুষকে নিজেদের বাড়ি, পরিবার, ভাষা, সংস্কৃতি থেকে ছিঁড়ে এনে এমন এক পৃথিবীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে তারা ছিল কেবল শ্রমশক্তি।

দাসপ্রথা শেষ হল ১৮৮৮ সালে। পশ্চিমা বিশ্বের বড় দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলই সবার শেষে এই ব্যবস্থা তুলে দেয়। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পরও সাবেক ক্রীতদাসদের জীবনে খুব বেশি পরিবর্তন এল না। জমি দেওয়া হল না, শিক্ষা দেওয়া হল না, কাজের সুযোগ তৈরি হল না। তারা শহরে এল। পাহাড়ের ঢালে, শহরের প্রান্তে, পরিত্যক্ত জমিতে নিজেদের মতো করে ঘর তৈরি করল।

সেখান থেকেই জন্ম নিল ফাভেলা।

আজও পৃথিবীর বহু মানুষ ‘ফাভেলা’ শব্দটাকে শুধু বস্তি হিসেবে চেনে। কিন্তু ফাভেলা আসলে শুধু দারিদ্রের গল্প নয়। ফাভেলা হল বেঁচে থাকার জেদ। রাষ্ট্রের অবহেলার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ।

এই ফাভেলার সরু গলিতেই ফুটবলের নতুন ভাষা তৈরি হয়েছিল।

ফাভেলার ফুটবল, আলোকচিত্র: ড্যানিয়েল মালিক্যার

খালি পায়ে খেলা। জঞ্জাল দিয়ে বানানো বল। অসমান মাঠ। কোনও কোচ নেই, কোনও রেফারি নেই। আছে শুধু খেলাটাকে ভালোবাসা। এই পরিবেশেই জন্ম নেয় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বড় দর্শন– জোগো বোনিতো অর্থাৎ সুন্দর ফুটবল।

এই ফুটবলে জেতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সুন্দরভাবে জেতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। গোল দেওয়া জরুরি, কিন্তু সেই গোলের আগে প্রতিপক্ষকে মুগ্ধ করে দেওয়াও সমান জরুরি।

এ যেন ফুটবল নয়, শিল্প।

এই শিল্পের প্রথম মহাতারকা পেলে।

দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এক কৃষ্ণাঙ্গ ছেলে। যার প্রথম ফুটবল ছিল পুরনো মোজা আর কাপড় জড়িয়ে বানানো। সেই ছেলেটিই একদিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আইকনে পরিণত হলেন। পেলে শুধু বিশ্বকাপ জেতেননি। তিনি লক্ষ লক্ষ দরিদ্র ব্রাজিলিয়ানকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে, তাদের সন্তানও পৃথিবীর সেরা হতে পারে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আইকন পেলে

১৯৫৮ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর যখন জনতা পেলেকে কাঁধে তুলে নিয়েছিল, তখন তা শুধু একজন ফুটবলারের সাফল্য ছিল না। তা ছিল ব্রাজিলের প্রান্তিক মানুষের স্বীকৃতি পাওয়ার মুহূর্ত।

পেলের পরে এসেছে রিভাল্ডো, রোনাল্ডো নাজারিও, রোনাল্ডিনহো, আদ্রিয়ানো। প্রত্যেকেই কোনও না কোনওভাবে সেই ফাভেলার সন্তান।

কিন্তু ব্রাজিলের ইতিহাসে ফুটবল শুধু আনন্দের গল্প লেখেনি। কখনও কখনও সে লিখেছে প্রতিবাদের ইতিহাসও।

১৯৬৪ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ব্রাজিলে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের সূচনা হয়েছিল। রাজনৈতিক কর্মী, শ্রমিক নেতা, সাংবাদিক, ছাত্র– হাজার হাজার মানুষ নির্যাতনের শিকার হন। বই পোড়ানো হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়।

এই সময়েই ফুটবল মাঠে আবির্ভূত হন এক অদ্ভুত মানুষ।

সক্রেটিস।

সক্রেটিস

তিনি শুধু ব্রাজিলের অধিনায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন ডাক্তার, বুদ্ধিজীবী এবং গণতন্ত্রের একজন অকুতোভয় সমর্থক।

স্বৈরশাসনের সময় তিনি তাঁর ক্লাব করিন্থিয়াসে এমন একটি ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, যা আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে।

‘করিন্থিয়ান ডেমোক্রেসি’।

ক্লাবের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভোটে নেওয়া হত। খেলোয়াড়, কোচ, কিটম্যান, ফিজিও– সবার ভোট সমান। একজন তারকা ফুটবলার এবং একজন মাঠকর্মীর মতামতের মূল্য ছিল একই। একটি ফুটবল ক্লাবের মধ্যে সরাসরি গণতন্ত্রের এই অনুশীলন তখনকার ব্রাজিলের জন্য ছিল প্রায় বিপ্লবী ঘটনা। যখন দেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য লড়ছিল, তখন ফুটবল মাঠেও গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছিল।

১৯৮২ সালে করিন্থিয়াসের খেলোয়াড়রা জার্সিতে ‘Democracia’ লিখে মাঠে নামলেন। একটি শব্দ। কিন্তু সেই এক শব্দই হয়ে উঠেছিল স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা।

একই সময়ে আরেকজন মানুষ শ্রমিকদের সংগঠিত করছিলেন।

লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।

লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা

জুতো পালিশ করা, বাদাম বিক্রি করা, কারখানায় কাজ করা এক শ্রমিক থেকে তিনি হয়ে উঠলেন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। পরে রাষ্ট্রপতি।

ব্রাজিলের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে লুলা যেমন ছিলেন রাজপথের মুখ, তেমনি সক্রেটিস ছিলেন ফুটবল মাঠের মুখ।

দুই ভিন্ন জগতের দুই মানুষ।

কিন্তু লক্ষ্য একটাই– মানুষের মর্যাদা।

আজ বহু বছর পরে পৃথিবী আবার নতুন এক ব্রাজিলিয়ান তারকার দিকে তাকিয়ে আছে।

ভিনিসিয়াস জুনিয়র।

পেলে বা রোনাল্ডিনহোর মতোই তিনিও দরিদ্র পটভূমি থেকে উঠে এসেছেন। ইউরোপের মাঠে আজও তাকে বর্ণবিদ্বেষী গালাগাল শুনতে হয়। দর্শকাসন থেকে বানরের ডাকও শুনতে হয়। কিন্তু তিনি থামেন না।

প্রতিবার একটি ড্রিবল দিয়ে জবাব দেন। একটি গোল দিয়ে জবাব দেন। একটি উদ্‌যাপন দিয়ে জবাব দেন।

ভিনিসিয়াস জুনিয়র

আর তখন মনে হয়, পেলে, সক্রেটিস, রোনাল্ডিনহো-রা সবাই যেন কোথাও না কোথাও তাঁর মধ্যেই বেঁচে আছেন।

ব্রাজিলের ইতিহাস আসলে পাঁচটি বিশ্বকাপের ইতিহাস নয়। তা এমন এক দেশের ইতিহাস, যারা বারবার পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়িয়েছে। যারা শোষণ দেখেছে, কিন্তু মাথা নত করেনি। স্বৈরশাসন দেখেছে, কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্ন ছাড়েনি। দারিদ্র দেখেছে, কিন্তু সৌন্দর্য সৃষ্টি করা বন্ধ করেনি।

তাই ব্রাজিলের ফুটবলকে বুঝতে হলে শুধু গোল আর ট্রফি দেখলে হবে না। দেখতে হবে ফাভেলার গলি। দেখতে হবে শ্রমিকের হাত। দেখতে হবে গণতন্ত্রের মিছিল।

কারণ ব্রাজিলের ফুটবল কখনও শুধু ফুটবল নয়।

মানুষের মুক্তির স্বপ্ন।

প্রতিরোধের ভাষা।

ব্রাজিলের ফুটবল একথা বিশ্বাস করার গল্প যে, পৃথিবী যেমন আছে, তার চেয়েও সুন্দর একটা পৃথিবী তৈরি করা সম্ভব।