Robbar

হৃদয়ে জাপান ফুটুক

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 26, 2026 7:42 pm
  • Updated:June 26, 2026 7:42 pm  

‘ওয়া কালচার’ থেকে জাপানের ফুটবল মহার্ঘ কী পেয়েছে? স্যামুরাই স্পিরিট। অর্থ হয়, ফুটবল খেলতে গিয়ে দেশীয় ঐতিহ্য ক্ষুণ্ণ হয় না। খেলা শেষে, সমর্থকেরা স্টেডিয়াম সাফ করে দেয়। খেলোয়াড়েরা ড্রেসিংরুম। তাই কেউ যখন বলে, জাপানের ফুটবল একটা ফ্লুক, তখন হাসিই পায়। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ফ্রেন্ডলি ম্যাচে, ব্রাজিলের এবং ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুরন্ত জয়। গত বিশ্বকাপেও আমরা দেখেছি, জার্মানি এবং স্পেন– উভয়ের বিরুদ্ধেই স্কোরলাইন ২-১। আসলে জাপানের এই সিস্টেম একটা লুপের মতো। ট্যালেন্ট উঠে আসবে সহজাত প্রক্রিয়ায়।

রোদ্দুর মিত্র

সুবাসা ওজোরা– ১১ বছরের এক কিশোর।
সুবাসা ওজোরা– অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার।
সুবাসা ওজোরা– বিশ্বাস করে জাপান একদিন ফুটবল বিশ্বকাপ জিতবে। সে হবে ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন সুবাসা!

ওই কিশোরকে আপনারা চেনেন?

মাঙ্গা সিরিজের পরিচিত মুখ– সুবাসা ওজোরা

জাপানের কোনও শহরে, মায়ের সঙ্গে, ফুটবলের সঙ্গে, প্রিয় বন্ধু তারো মিসাকির সঙ্গে, সুবাসা বেড়ে উঠেছে। ছড়িয়ে দিয়েছে ফুটবলের মায়া অথবা তাড়না। দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। দেশ ছাড়িয়ে আপৃথিবী। আন্দ্রে ইনিয়েস্তা। জিনেদিন জিদান। ফার্নান্দো তোরেস। আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো। প্রত্যেকের ফুটবল কেরিয়ারে, ক্যাপ্টেন সুবাসার অমোঘ ছায়া– যে ছায়ার শুরুয়াত ১৯৮১ সালে। ক্যাপ্টেন সুবাসা– একটা মাঙ্গা সিরিজ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানে, বেসবল আর সুমো রেসলিং থেকে স্পটলাইট ঘুরে গেল ফুটবলে। চলতি বিশ্বকাপে, জাপানের প্রথম ম্যাচ– নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে– ড্র! দ্বিতীয় ম্যাচে, তিউনিশিয়াকে চার গোল! স্যর অ্যালেক্স ফাগুর্সন বলছেন:
বিশ্বকাপের আগে, স্বাভাবিকভাবেই আমাদের তর্কের বিষয় ছিল– যারা ‘ট্র্যাডিশনাল জায়ান্ট’। কিন্তু এই তর্ক-ব্যস্ততার ফাঁকেই, জাপানের খেলা দেখে মনে হল, ‘সামথিং ভেরি স্পেশাল’! আমাদের অজান্তেই প্রস্তুত করেছে নিজেদের।

বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে জাপানের দাপট

এ এক লুন্যাটিক সময়, ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনায় দু’ভাগ হয় আমার দেশ। কদাচিৎ জার্মানি। ক্রুয়েফ থেকে ভ্যান পার্সি হয়ে ফ্র্যাঙ্কি ডে ইয়ং– ইতিউতি তাকিয়ে দেখি, কেউ কেউ নেদারল্যান্ডস হয়ে আছে। টোটাল ফুটবলের আঁচ পোহাচ্ছে মনেপ্রাণে। আর ক্রিশ্চিয়ানো-পরবর্তী সময়ে, পর্তুগালের পতাকা উড়েছে ভীষণ। বাইনারি ভেঙে যেন তৃতীয় পক্ষ। কলকাতা শহরের ভাইরাল ‘বিশ্বকাপের গলি’ এবং যে কোনও গলির প্রায় প্রত্যেক দেওয়াল এবং খানিকটা আকাশ, এই মুহূর্তে– মেসি, রোনাল্ডো এবং নেইমারের। অর্থ হয়, আমরা আসলে সুন্দরের পক্ষে। রোজের হেডলাইন থাকবে আমাদের নামে। আমাদের নামের পিছনে থাকবে গ্লোরিফায়েড যত ইতিহাস। যখন খুশি রোয়াব তুলব এবং তোলাব। আমরা ট্র্যাডিশনাল জায়ান্ট।

স্যর অ্যালেক্স কী বলছেন তারপর?

“টিম হিসেবে কে শ্রেষ্ঠ? যে দলে একাধিক বৃহৎ নাম আছে? না! যে দল একটা ‘ইউনিট’, যে দলে প্রত্যেকের মধ্যে দুর্দান্ত বোঝাপড়া এবং জানকবুল লড়তে প্রস্তুত যে কোনও মুহূর্তে! জাপানের ফুটবল স্কোয়াডে সেই সমস্ত কোয়ালিটি আছে।”

কলকাতার অলিতে-গলিতে ছবিটা এখন এমনই

প্রশ্ন হল, কেন আর কীভাবে পেল সেই কোয়ালিটি? জাপান প্রথমবারের জন্য বিশ্বকাপের মূল পর্বে পৌঁছেছে– ১৯৯৮-এ। দৌড়, রাউন্ড অফ সিক্সটিন পর্যন্তই। এই বছরের ডার্ক হর্সের লিস্টেও– কলম্বিয়া, নরওয়ে। জাপান বড়জোর আন্ডারডগ। ফুটবলের গ্লোবাল কোনও ফেনোমেনা নেই। হালফিলে এশিয়ান ফুটবলের যে মুখ– সন হিয়ং-মিন, তাঁর দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। স্যর অ্যালেক্স বলছেন: জাপান যখন ফুটবল খেলে, ওদের চোখে দেখতে পাই খিদে। দেখতে পাই অর্গানাইজেশন।

অপেশাদার জাপান সকার লিগ থেকে জে লিগ হয়ে বর্তমানে, ইউরোপিয়ান ফরম্যাটের জে-ওয়ান লিগ। উরাওয়া রেড ডায়মন্ডস, গাম্বা ওসাকা, কাশিমা অ্যান্টলার্স– এলিট এলিট জাপানি ক্লাবের ঘরে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি, যার অর্থ হয় এশিয়ার শ্রেষ্ঠ ক্লাব। অফুরন্ত ট্যালেন্ট, যাঁরা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে প্রতি-মুহূর্তে। এহেন সকল কথাই লেখা হবে ঢালাও। সেখানে থাকে, ১৯৯২ সালের সেই উদ্যোগের কথাও, টার্গেট ২০৯২। জাপানের ১০০ বছরের ব্লু-প্রিন্ট ঘেঁটে, আমি লিখি কাওরু মিটোমা-র কথা। তাহলে এই বিশ্লেষণ যথার্থ হয়। আরও স্পষ্ট হবে, আমার দেশের নেগলিজেন্সি।

কাওরু মিটোমা

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে মিটোমা খেলতে এলেন ব্রাইটনে। লেফট উইঙ্গার। ২০২৪-’২৫ মরশুমে, ৩৬ ম্যাচে ১০ গোল। অ্যাসিস্টের সংখ্যা ৪। সঙ্গে দুরন্ত ড্রিবলিং। মিটোমা ফুটবল কেরিয়ার শুরু হয়েছিল কোনও ফুটবল অ্যাকাডেমি নয়, জাপানের সুকুবা ইউনিভার্সিটি থেকে। ইউনিভার্সিটির দলে খেলাকালীন, জাপানের অনূর্ধ্ব-২৩ জাতীয় দলে সুযোগ। তবু মিটোমা, কাওয়াসাকি ফ্রন্টলাইন ক্লাবে প্রফেশনাল ফুটবলে এলেন আরও পাঁচ বছর পরে। ততদিন ইউনিভার্সিটিতেই ফুটবল খেললেন আর গবেষণাপত্র জমা দিলেন, বিষয়– ‘দ্য আর্ট অফ ড্রিবলিং’।

আরেকটা উদাহরণ দিই। দাইচি কামাদা। তিউনিশিয়া ম্যাচে দু’গোল করেছেন এবং সৃষ্টি করেছেন ইতিহাস। বিশ্বকাপের মঞ্চে, জাপান, একটা ম্যাচে ৪ গোলের ব্যবধানে জয় পেল। এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে এই প্রথম!

কামাদা কীভাবে প্রবেশ করেছিলেন ফুটবল খেলায়? জাপানের হিগাশিয়ামা হাই স্কুলে। টিমের ক্যাপ্টেন। মিটোমার মতোই, প্রফেশনাল ফুটবল শুরু করলেন পড়াশোনা সম্পূর্ণ করে। দু’টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। ব্যাঙের ছাতার মতো কাঁড়ি কাঁড়ি ফুটবল অ্যাকাডেমির তুলনায় দেশের হাইস্কুল এবং ইউনিভার্সিটির ফুটবল স্কোয়াড– প্রতিভাবান ফুটবলারের নারচারে পারদর্শী। কারণ ওটাই বেসিক। তাই, হাইস্কুল এবং ইউনিভার্সিটি ফুটবল টুর্নামেন্টের দেশ জুড়ে রমরমা। তারপর ধীরে ধীরে জে লিগ। অবশেষে, বুন্দেশলিগা, প্রিমিয়ার লিগ, সিরি-এ। দুই, অ্যাকাডেমিক্স এবং প্রতিনিয়ত ফুটবল– উভয়ে মিলে তৈরি করে একটা দর্শন– যে কোনও দেশেরই ফুটবল অ্যাকাডেমিগুলোয় এমন কোনও ফুটবলীয় দর্শনের চর্চা হয় না। একমাত্র ব্যতিক্রম, বার্সেলোনার ‘লা মাসিয়া’।

দাইচি কামাদা

আসলে একটা ডিসিপ্লিন। একটা সাংগঠনিক মন। সঙ্গে থাকেন ক্যাপ্টেন সুবাসা। এভাবেই উঠে এসেছেন, আয়াসে উয়েদা। কাশিমা হাই স্কুল– হোসেই ইউনিভার্সিটি– তারপর জে-ওয়ান লিগের ক্লাব, কাশিমা অ্যান্টলার্স। বর্তমানে, নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত ক্লাব, ফেইনুর্ড। কেরিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ খেলছেন। ২ ম্যাচে ২ গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট।

আয়াসে উয়েদা

জাপান ফুটবল ফেডারেশন মারফত একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছে। নাম, “জাপান’স ওয়ে”। সেই পুস্তিকা লিখছে, একজন ইয়ুথ প্লেয়ার তৈরি হয় কীভাবে? ধরা যাক, একটি ত্রিভুজ। যার ভূমি অথবা ভিত তৈরির সময় বলা হয়েছে– ফুটবলকে প্রথমে উপভোগ করো। তারপর শেখো। দ্বিতীয় ধাপ, ভালো ফুটবল খেলার যে আনন্দ, ভরপুর উপভোগ করে নাও। কিন্তু তৃতীয় ধাপেই ত্রিভুজ দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে! একটা ভাগ চলে যাচ্ছে, যারা পরবর্তীতে ফুটবল খেলবে শখে। অন্য ভাগে তৈরি হবে সেই সমস্ত এলিট ফুটবলার! এই যে রাস্তা পৃথক হল, শেষাবধি এক হল। দুইয়ের সাহচর্যেই– জাপানি ফুটবলের সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধ– ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আনাচে-কানাচে।

জাপানের ফুটবল সিস্টেমের ত্রিভুজ

অতএব কী বুঝলেন? শুধু ট্যালেন্ট কিংবা শুধু পুঁজির বিনিয়োগে ফুটবল উৎকর্ষের রাস্তায় গড়ায় না। প্রয়োজন একটা সম্মিলিত চেতনা– জাপানের সংস্কৃতির শিকড়ে সেই চেতনা গেঁথে আছে অনাদিকাল থেকে। ‘দ্য কালচার অফ ওয়া’। একটা হারমোনি। সেখান থেকে উৎপন্ন হয় অর্গানাইজেশন। ইউনিট। কালেক্টিভনেস। স্যর অ্যালেক্স যেমন বলেছিলেন। তিনি বলছেন:
‘যদি কোনও ট্র্যাডিশনাল জায়ান্ট দলের দায়িত্বে থাকতাম আমি, তাহলে চলতি বিশ্বকাপে জাপানের বিরুদ্ধে কখনওই খেলতে চাইতাম না। ওরা ফেভারিট নয়, আর এটাই ওদের শক্তি।’

‘ওয়া কালচার’ থেকে জাপানের ফুটবল মহার্ঘ কী পেয়েছে? স্যামুরাই স্পিরিট। অর্থ হয়, ফুটবল খেলতে গিয়ে দেশীয় ঐতিহ্য ক্ষুণ্ণ হয় না। খেলা শেষে, সমর্থকেরা স্টেডিয়াম সাফ করে দেয়। খেলোয়াড়েরা ড্রেসিংরুম। তাই কেউ যখন বলে, জাপানের ফুটবল একটা ফ্লুক, তখন হাসিই পায়। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ফ্রেন্ডলি ম্যাচে, ব্রাজিলের এবং ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুরন্ত জয়। গত বিশ্বকাপেও আমরা দেখেছি, জার্মানি এবং স্পেন– উভয়ের বিরুদ্ধেই স্কোরলাইন ২-১। আসলে জাপানের এই সিস্টেম একটা লুপের মতো। ট্যালেন্ট উঠে আসবে সহজাত প্রক্রিয়ায়।

জাপানের সামুরাই স্পিরিট

আমার দেশের দিকে তাকাই। ফুটবল নিয়ে অন্ধ আর অকারণ উন্মাদনা দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা কি সম্ভব?

বিশ্বকাপের আগে কাওরু মিটোমা, তাকুমি মিনামিনো– স্টার ফুটবলার ছিটকে গিয়েছেন দল থেকে। আর ছিটকে গিয়েছেন দলের ক্যাপ্টেন, ওয়াতারু এন্ডো। তবু মনে হয়, জাপানের প্রতিটি ফুটবলারের মধ্যে ক্যাপ্টেন সুবাসা এবং একজন স্যামুরাই সহাবস্থান করে।

যে চোট বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে জাপান অধিনায়ক ওয়াতারু এন্ডোর

শেষ করি এন্ডোর কথা বলেই। লিভারপুল বনাম সান্ডারল্যান্ড এফসি। অ্যাওয়ে ম্যাচ। লিভারপুল হেরে গেলে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ স্পট হাতছাড়া হয়ে যাবে। এন্ডো খেলছিলেন রাইট ব্যাকে। ৬৯ মিনিটে একটা দুরন্ত ক্লিয়ারেন্স করতে গিয়ে পা মুচকে যায়। তিনি মাঠ ছাড়েন না। ডিফেন্স আঁকড়ে থাকেন এবং আরও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ দুটো ক্লিয়ারেন্সের পর মাঠ ছাড়েন স্ট্রেচারে। লিভারপুল সেই ম্যাচ ১-০ গোলে জিতেছিল। এন্ডোর বিশ্বকাপের স্বপ্নগুলো ভেঙে ভেঙে ধুলো হয়ে যাচ্ছিল। মাঠ ছাড়েননি তবু। স্যর অ্যালেক্স বলেছিলেন:
‘জাপানের ফুটবলারদের মধ্যে আমি দেখতে পাই খিদে। একাত্মতা। আত্মত্যাগ…’।