Robbar

বাঁশির লিঙ্গ নেই

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 27, 2026 2:22 pm
  • Updated:June 27, 2026 2:22 pm  

সামান্য স্কুল-কলেজ জেলা-স্তরের খেলা চালাতেই সিরিয়াস রেফারিকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। সেখানে হাজার হাজার দর্শকের সামনে মাঠে খেলা চালানো ভীষণ কঠিন কাজ। গত বছর হংকং এডুকেশন ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণাপত্রে পুরুষদের ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করেছেন– এমন নারী ও পুরুষ রেফারিদের পারফরম্যান্স-ভিত্তিক নানা তথ্যের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে দেখা গেছে– ফাউল, পেনাল্টি, অফসাইড, কার্ড ব্যবহারের হার এবং ম্যাচ পরিচালনার সামগ্রিক দক্ষতায় নারী বা পুরুষের রেফারি হিসেবে পারফরম্যান্স প্রায় সমান।

পৌলমী ঘোষ

এই মুহূর্তে দুনিয়া সুদ্ধু মানুষ বুঁদ হয়ে রয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবলে। মানে পুরুষের বিশ্বকাপ ফুটবলে। কিন্তু খেলা শুরুর আগে মহাযুদ্ধের উন্মাদনা উসকে দিলেন শাকিরা। বললেন– ‘…লেটস গো’। নেচে উঠল গোটা পৃথিবী। নোরা ফাতেহিও নাচিয়ে তুললেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দর্শকদের। এটুকু আমরা চোখে দেখেছি। আর চোখের আড়ালে ‘ট্রাইওন্ডা’র কারিগর শিয়ালকোটের অসংখ্য শ্রমিক নারী। পুরুষের ফুটবল বিশ্বকাপ জুড়ে আড়াল থেকে আলো সর্বত্র নারীর কোমল স্পর্শ। আবার খেলা চলাকালীন মাঠে নারীর কঠোর শাসন আর নির্দেশকে অমান্য করার সাধ্য নেই দাপুটে ফুটবলারদেরও। আটলান্টায় চেক প্রজাতন্ত্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচে নারীশক্তির ঝলক দেখল ফুটবল বিশ্ব।

কাতার বিশ্বকাপে অনফিল্ড রেফারি হিসাবে ফরাসি স্টেফানি ফ্রাপার্ট ও তাঁর সহকারীরা সমতার ইতিহাস তৈরি করেছিলেন। এবার তিন আমেরিকান মহিলা টোরি পেনসো, ব্রুক মায়ো, ক্যাথরিন নেসবিট সমতার সেই ধারাবাহিকতাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। ক্যাথরিন নেসবিট অবশ্য গত বিশ্বকাপেও প্যানেলে ছিলেন। অনফিল্ড রেফারি হিসাবে খেলার রাশ ছিল টোরি পেনসোর হাতে। বাকি দু’জন সামলেছেন লাইন। মোট ছ’জন মহিলা রেফারি আছেন এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের প্যানেলে। মাঝমাঠে ষোলআনা পৌরুষেয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক নারী! খেলার মাঠ আর চলমান সময়কে ছাপিয়ে ফিফার এই সিদ্ধান্ত সংবেদনশীল গভীর এবং সুদূরপ্রসারী। 

দুই পুরুষ সহ-রেফারির সঙ্গে ব্রুক মায়ো, টোরি পেনসো ও ক্যাথরিন নেসবিট

কিন্তু একজন মহিলার এই পর্যায়ে পৌঁছনো চাট্টিখানি কথা নয়। একটা বিষয় মানতেই হবে শারীরিক গঠন ও ক্ষমতায় লিঙ্গ-পার্থক্য খুব স্পষ্ট এবং তীব্র। আর ক্রীড়া বিষয়টি শারীরিক ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল। ফুটবলও এর বাইরে নয়। সবাই জানে ফুটবল পাওয়ার প্লে। আর এই পাওয়ারটা হল গতি এবং শক্তির পারফেক্ট কম্বিনেশন। ক্রীড়াবিজ্ঞানের এইসব খুঁটিনাটি বিচার করলে বোঝা যায়, মাস্‌ল পাওয়ারের দিক থেকে পুরুষ অনেক বেশি ক্ষমতাবান। কারণ তাদের দৈহিক শক্তি নারীর তুলনায় বেশি। সহনশীলতা বা গতি– সব দিক থেকেই মেয়েরা তুলনামূলক পিছিয়ে পড়া। কিন্তু এত শরীরী ব্যাকরণের কী প্রয়োজন? মেয়েরা তো খেলা পরিচালনাই করবে। পুরুষের প্রতিপক্ষ হয়ে মাঠে তো আর খেলতে নামছে না। ঠিকই। কিন্তু ফুটবল খেলতে গেলে দরকার রিপিটেড স্প্রিন্ট এবিলিটির। আর তারপর বেশ খানিকটা ইন্টারভ্যাল। মানে রিকভারি। এরপরই হয়তো হঠাৎ প্রয়োজনে ৬০-৭০ মিটারের একটা দুর্ধর্ষ স্প্রিন্ট। আবার রিকভারি। কিন্তু রেফারিকে যে সারাক্ষণ বলের সঙ্গে, বলের গতিতে ছুটে বেড়াতে হয়। তাই একজন ফুটবলারের থেকে একজন রেফারির প্রয়োজনীয় সক্ষমতা কোনও অংশে কম নয়। বরং কিছু কিছু প্যারামিটার একটু বেশিই শক্তিশালী হওয়া দরকার। 

ফিফা এবং বিভিন্ন মহাদেশীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর নিয়ম অনুযায়ী কোনও মহিলা যদি পুরুষদের আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করতে চান, তবে তাঁকে পুরুষ রেফারিদের জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করে মাঠে নামতে হবে। ‘ফিফা মেন ক্যাটাগরি ওয়ান’ উত্তীর্ণ হতে হবে। যেমন, নর্মস অনুযায়ী নিজের রিপিটেড স্প্রিন্ট অ্যাবিলিটির (RSA) প্রমাণ দিতে হবে। ৪০ মিটার দূরত্ব দ্রুত গতিতে দৌড়াতে হবে ৬ বার। আন্তর্জাতিক পুরুষ ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করতে হলে প্রতিটি স্প্রিন্ট ৬.০ থেকে ৬.২ সেকেন্ডের মধ্যে শেষ করতেই হবে। এরপর ইন্টারভ্যাল টেস্ট। মানে সহনশীলতার পরীক্ষা। হাই ইনটেন্সিটিতে দৌড়তে হবে ৭৫ মিটার। পরবর্তী ২৫ মিটার রিকভারির জন্য। সে দৌড়ে-হেঁটে যে রকম ভাবে হোক শেষ করতে হবে। এখানেই শেষ নয়। এই গোটা ১০০ মিটার পথ এক-দু’বার নয়, পূর্ণ করতে হবে ৪০ বার। ৭৫ মিটার দৌড় ১৫ সেকেন্ডে শেষ করতেই হবে। আর হাঁটার জন্য বরাদ্দ ১৮-২০ সেকেন্ড। ওই সময়ের মধ্যেই সেরে নিতে হবে রিকভারি। আরও আছে। ক্ষিপ্রতা বা এজিলিটি। মাঠে খেলা চলাকালীন বারবার গতির অভিমুখ পালটে যায়। মাত্র ২০.৫ সেকেন্ডের মধ্যে এঁকেবেঁকে সামনে-পাশে-পিছনে-কোনাকুনি দৌড়ে পৌঁছতে হবে পরিবর্তিত স্থানগুলিতে। শুনেই বোঝা যাচ্ছে কতটা কঠিন ব্যাপার-স্যাপার।

২০২৬ ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের তিন মহিলা মাঠ-রেফারি

কাতার বিশ্বকাপ বা চলতি বিশ্বকাপে যে নারীরা পুরুষদের ফুটবল ম্যাচ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন– তাঁদের রীতিমতো চূড়ান্ত কঠিন এই শারীরিক পারদর্শিতার প্রমাণ দিতে হয়েছে। তারপরে মিলেছে মাঠ শাসন করার ছাড়পত্র। সেখানে কোনও লেডিস কম্পার্টমেন্ট নেই। যাত্রাপথে ছাড় নেই একটুও। পথে নামলে নিজের শক্তির পরীক্ষা দিয়ে অর্জন করে নিতে হবে গন্তব্যে পৌঁছনোর ক্ষমতা।

তাই মহিলা রেফারিদের পুরুষ ফুটবলের বিশ্ব মঞ্চে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া ফিফার একটি উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তে মনোসামাজিক বিকাশ হবে। খেলায় উগ্রতা কমবে। সবচেয়ে বড় কথা লিঙ্গসমতা তৈরি হবে। মেয়েরা রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসবে। বিশ্বের আনাচে-কানাচে পরবর্তী প্রজন্ম উৎসাহিত হবে। সাংস্কৃতিক পরিশুদ্ধি ঘটবে মানুষের। সত্যিই কি এত কিছু হবে? আবার এর থেকে বেশি কিছুও হতে পারে। কিন্তু পরিশীলিত সংস্কৃতি গড়ে ওঠা খুব সহজ নয়। তবে এক্ষেত্রে ফিফার উদ্দেশ্য সৎ। এবং যে মহিলা মাঠে ফুটবল খেলা পরিচালনা করছেন তিনিও ফুটবল-নিষ্ঠ। যে নারী শরীরের সক্ষমতায় পুরুষের তুল্য এবং আন্তর্জাতিক স্তরে পুরুষের আঙিনায় রাজ করছেন, তিনি মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে নিঃসন্দেহে শক্তিশালী। কিন্তু গ্যালারি এবং সামাজিক মাধ্যম এখনও ততটা সংস্কৃতি-সম্পন্ন হয়নি। তাই ম্যাচ পরিচালনার ক্ষেত্রে মহিলা রেফারিদের সামান্যতম ত্রুটিকে ট্রোল করা হয় লজ্জাজনকভাবে। টেনে আনা হয় লিঙ্গ পরিচয়কে। অজ্ঞ দর্শক, অন্ধ অনুরাগী প্রশ্ন তোলে মহিলা রেফারির যোগ্যতার! বিপরীতে, পুরুষ রেফারিদের ভুল ‘মানুষ মাত্রই ভুল করে’ বাক্যের একটি উদাহরণ মাত্র। কিন্তু নারী মনস্তত্ত্বের সাধারণ প্রবণতাই চাপের মুখে একটু বেশি হিসেবী হয়ে যাওয়া। শুধু কঠিন পরিস্থিতি নয়, মহিলারা যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো যতটা দরদ দিয়ে ভাবেন, ঠিক ততটাই যুক্তি দিয়ে চিন্তা করেন। একইসঙ্গে অনেক বেশি নিয়মনিষ্ঠ থাকেন। আসলে এগুলিই নারীর স্বভাবসিদ্ধ আচরণ। সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বতঃস্ফূর্ততা।

সহযোগী রেফারির ভূমিকায় ক্যাথরিন নেসবিট

সামান্য স্কুল-কলেজ জেলা-স্তরের খেলা চালাতেই সিরিয়াস রেফারিকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। সেখানে হাজার হাজার দর্শকের সামনে মাঠে খেলা চালানো ভীষণ কঠিন কাজ। গত বছর হংকং এডুকেশন ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণাপত্রে পুরুষদের ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করেছেন– এমন নারী ও পুরুষ রেফারিদের পারফরম্যান্স-ভিত্তিক নানা তথ্যের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে দেখা গেছে– ফাউল, পেনাল্টি, অফসাইড, কার্ড ব্যবহারের হার এবং ম্যাচ পরিচালনার সামগ্রিক দক্ষতায় নারী বা পুরুষের রেফারি হিসেবে পারফরম্যান্স প্রায় সমান।

এই সমীক্ষার সঙ্গে যথেষ্ট সামঞ্জস্য রয়েছে টোরি পেনসোর দক্ষ রেফারিং পারফরম্যান্সের। ৩৯ বছর বয়সি এই মহিলা রেফারি ২০২১ সাল থেকে ফিফার রেফারি হিসাবে নানা আন্তর্জাতিক ম্যাচে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন রকম ফরম্যাটেই তিনি খেলা পরিচালনা করেছেন। হলুদ কার্ড দেখিয়েছেন ৪২৩টি। আন্দাজ করা যায়, যে কোনও পরিস্থিতিতেই তিনি মাঠ সামলে রাখতে পারেন। হাতের ইশারায় ২২ জন ফুটবলারকে নীতিনিষ্ঠ থাকতে বাধ্য করেন। মহিলা বলে, ক্ষমা-ঘেন্না করে খেলার ছন্দপতন তিনি বরদাস্ত করেন না মোটে। গুরুতর ফাউলে লাল কার্ডও দেখিয়েছেন। গ্যালারির উন্মাদনা, খেলোয়াড়দের ক্ষোভ এবং স্টারডমের পরোয়া না করে সুনিপুণ কৌশলে ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। অবশ্যই তাঁর সহযোগীরাও চূড়ান্ত পারদর্শী। দারুন ভাবে সঙ্গত করেছেন তাঁকে। কারণ ক্রীড়া পরিচালনা করাও দলগত প্রচেষ্টা। চেক প্রজাতন্ত্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ ১-১ গোলের সমতায় শেষ হয়। আর সেইসঙ্গে এইসব ব্যতিক্রমী তেজস্বিনীদের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় ফুটবল-আশ্রিত লিঙ্গসমতার মহাযাত্রা। 

বিশ্বকাপে টোরি পেনসোর দক্ষ রেফারিং

আসলে ফুটবল সবার। ফুটবল যেমন প্রতিযোগের, তেমনই প্রতিশোধের। ফুটবল প্রতিস্পর্ধার। তাই প্রচলিত ফুটবলের মূল ধারায় পুরুষ ফুটবলকে অনায়াসে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে নারী। ‘নারীর নিয়ন্ত্রণে পুরুষের ফুটবল খেলা’; মানবতার প্রতিটি ক্ষেত্রের লিঙ্গ নিরপেক্ষতার এর থেকে গভীর বার্তা আর কী হতে পারে?