Politics on Plate: Why Fish Matters in Bengal’s Landscape | Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

মাছ যখন রাজনৈতিক

নীহাররঞ্জন লিখেছেন, বাঙালির খাদ্যপ্রীতি আজকের নয়। প্রাচীনকালের বাঙালিও মাছ ভালোবাসত। ইদানীং অবশ্য অতীতের ঝোল-ঝাল, কালিয়া, চচ্চড়ি, ছেঁচড়া নয়, নতুন প্রজন্মের পরিবারে অনলাইনে আসছে ধোয়া-বাছা, পিস করা মাছের প্যাকেট। সাঁতলানো, গ্রিল আর বেক করা রান্নার প্রাধান্য ক্রমেই দখল করছে গৃহস্থের ডাইনিং টেবিল। অথচ মাছের পোলাও, সর-সহ মৎস্য পাক, আম-কই, মাছের তক্তি কাবাব কিংবা পার্সলে ও সেলেরির ডাঁটা আর করমচা দিয়ে ট্যাংরা মাছের স্ট্যু অথবা শশা, কচি পটল ও নারকেল দিয়ে চিংড়ির ট্রামফ্রাডুর মতো কত বিচিত্র রান্না যে আছে! সেইসব কি আর একালের কোনও ফাইন ডাইনিং রেস্তোঁরায় পাওয়া যায়! মাছের ঐতিহ্যসম্পন্ন রন্ধনশৈলী সংরক্ষণ করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ দরকার। 

Published by: Robbar Digital

Posted:April 24, 2026 7:00 pm | Updated:May 26, 2026 5:16 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

এতদিন ছিল ঘটি-বাঙালের রেষারেষি আর চিংড়ি-ইলিশের তরজা। ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’ যতদিন কালজয়ী গান হিসেবে মুখে মুখে ফিরত, ততদিন ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের জয়-পরাজয়ে বাজারে দাম বেড়ে যেত ইলিশ বা চিংড়ির। খেলা দেখে জয়ী দলের উল্লসিত সমর্থকেরা কাপড়ের থলেতে ঝকঝকে একটা ইলিশ বা বড় বড় দাঁড়াওয়ালা গলদা চিংড়ি নিয়ে ঘরে ফিরত। কালোজিরে বেগুন দিয়ে ইলিশের মরিচ পোড়া পাতলা ঝোল কিংবা চিংড়ির মালাইকারি– এই ছিল বাঙালির অকৃত্রিম সংস্কৃতি। তারপরে প্রথম শোনা গেল ‘ইলিশ কূটনীতি’-র কথা। ইলিশ ততদিনে সাধারণ বাঙালি মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। ১৯৯৬ সালে ফারাক্কার জলবণ্টন নিয়ে ঐতিহাসিক চুক্তির ঠিক আগে, সেইসময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে কয়েক ঝুড়ি ইলিশ পাঠালেন উপহার হিসেবে। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন জয় করার জন্যেও ইলিশ পাঠিয়েছেন একাধিকবার। শুধু তাই নয়, ২০১৭ সালে ভারত সফরে এসে রাষ্ট্রপতি ভবনের হেঁশেলে ঢুকে নিজে হাতে ইলিশ ভাপা রেঁধে খাইয়েছিলেন ‘নিজের দাদার মতো’ রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে। শুখা মরশুমে গঙ্গা ও তিস্তার জলের ভাগ আদায় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের মন কষাকষির বৃত্তান্ত সবারই জানা। তারই মধ্যে সীমান্ত ভাগ হলেও সংস্কৃতিতে এক, দুই বাংলার মানুষের কাছে যে মাছ বিশেষ প্রিয় সেই ইলিশ উপঢৌকন একটা কূটনৈতিক কৌশল– মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের প্রাক্তন সহকারী সচিব ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ নাই সেই কৌশলকেই বলেছিলেন ‘সফট পাওয়ার’– কোনও জোর বা বলপ্রয়োগ ছাড়াই নিজের লক্ষ্য অর্জনে অন্যকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা। তবে পশ্চিমবঙ্গে পদ্মার ইলিশ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ কিংবা দুর্গাপুজোর উৎসবের মরশুমে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ইলিশ পাঠিয়েও তিস্তার জল আদায়ে পশ্চিমবঙ্গকে প্রভাবিত করতে না পারা অন্য প্রসঙ্গ!

আর সেইসব না হয় কূটনীতির ব্যাপার! কিন্তু এবারে ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে মাছ কেবল আর রসনা বা খাদ্য-সংস্কৃতির অংশ রইল না, তা হয়ে উঠল রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রধান হাতিয়ার। ভোটের প্রচারে এবারই দেখা গেল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া এবং লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে বিক্ষোভের পাশাপাশি রাজনীতির ময়দানে স্লোগান বা উন্নয়নের খতিয়ান ছাপিয়ে নজর কেড়ে নিল ‘মাছ’। যে-মাছ ছিল বাঙালির হেঁশেলের মুখ্য চরিত্র, তা হঠাৎ করেই যেন হয়ে উঠল ভোটবাক্সের ভাগ্যনিয়ন্তা। বাংলার ইতিহাসে এই প্রথমবার মাছ কেবল ‘খাদ্য’ হিসেবে নয়, বরং আত্মপ্রকাশ করল ‘সাংস্কৃতিক পরিচিতি’ বা আইডেন্টিটি পলিটিক্সের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে। নির্বাচনী ফলাফলে পাশা উল্টে বিজেপি কি সত্যিই ক্ষমতায় এসে বাঙালির পাত থেকে মাছ তুলে দেবে? 

বিজেপি যে উত্তর ভারতীয় নিরামিষাশী সংস্কৃতির ধারক, বাঙালি ভোটারদের মধ্যে সেই ধারণা তো রয়েইছে। তার ওপরে তৃণমূল কংগ্রেস ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’-র চিরন্তন আবেগকে উস্‌কে দিয়ে মাছ-মাংস-ডিম নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কার কথা বলে ভোটারদের মনে সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব সংকটের ভয় তৈরি করে দিয়েছে। খাদ্যরুচির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের আশঙ্কা ছড়িয়ে তৃণমূল চায় বাঙালি ভোটারদের বিজেপি-র বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতে। আসলে চতুর্থবার সরকার টিকিয়ে রাখতে তৎপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার সতর্ক করেছেন যে, ক্ষমতায় এলে বিজেপি ‘মাছ, মাংস, এমনকী ডিমও নিষিদ্ধ করবে।’ এই মন্তব্য ছড়িয়ে দিয়ে বিজেপিকে তিনি বহিরাগত এবং বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ হিসেবে দেগে দিয়েছেন। এইসব অভিযোগ বিজেপি যতই অস্বীকার করুক, উপেক্ষা করতে পারছে না মোটেই। তৃণমূলের অভিযোগ অস্বীকার করে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও বাংলার একাধিক জনসভায় বলতে হয়েছে, তাঁরা আমিষ-বিরোধী নন। সেই সূত্রে বিজেপির প্রার্থীদের মাছ নিয়ে শোভাযাত্রা করে মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেখা গিয়েছে, বিজেপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা জনসমক্ষে মাছ খেয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন যে, তাঁরা ক্ষমতায় এলে বাঙালির খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করার চেষ্টা হবে না। বরং তাঁরা অন্য রাজ্য বা উগান্ডা ও মরিটানিয়ার মতো বিদেশ থেকে মাছ আমদানির প্রয়োজন ঘুচিয়ে মাছ উৎপাদন ও বাজারের উন্নতির দিকে নজর দেবেন। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক প্রচার, পত্রপত্রিকা, টিভি, ইউটিউব, ডিজিটাল মাধ্যম– সর্বত্র আলোচনায় সরগরম ‘মাছ’ আর মাছ-সংক্রান্ত এই পুরো বিষয়টিই ‘সফলভাবে তৈরি করে’ বিজেপিকে মমতা রক্ষণাত্মক জায়গায় ঠেলে দিতে পেরেছেন বলেও অনেকের অভিমত। 

গেরুয়া দলের রাজনীতিক তো কোন ছার, সেই কোন যুগে কনৌজ থেকে ব্রাহ্মণেরাও বাংলায় এসে থিতু হয়ে মাছ খেতে শিখে গিয়েছিলেন। উত্তরপ্রদেশে তাঁদের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘মছলিখেকো বাঙালি’। তাতে হিন্দুধর্ম এতটুকু টসকায়নি। শুধু ওই ব্রাহ্মণেরা কেন, শাস্ত্রে এমন বিধানও আছে যেখানে ইলিশ, খলিশা, চিংড়ি, মাগুর ও রুই– এই পাঁচটি মাছকে ‘নিরামিষ’ গোত্রভুক্ত করা হয়েছে তো বটেই, এমনকী বেগুন সহযোগে রাঁধলে সব মাছই নিরামিষ, এমন রসে-বশে থাকার প্রশ্রয়ও রয়েছে– ‘বার্তাকু সহযোগেন সর্ব মৎসা নিরামিষা।’ 

আসলে যে-দেশের যা! নদী-পুকুর-খাল-ডোবা-সহ নানা জলাশয় কমতে কমতেও যা রয়েছে, তাতে বাংলার শহরে-গ্রামে মাছ তো এখনও পাওয়া যায়। কাজেই বাঙালির স্বাভাবিক খাদ্য হিসেবে মাছ তো থাকবেই। বাঙালির খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের যে কোনও প্রচ্ছন্ন চেষ্টা হলেও তার ফল হবে বিপরীত। সুকুমার সেন বা নীহাররঞ্জন রায়ের লেখায় প্রাচীনকালে সাধারণ বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের বিবরণ পাওয়া যায় প্রাকৃত পৈঙ্গলে। চতুর্দশ শতকের শেষদিকে সাধারণ বাঙালির পাতটিও ছিল অতি সরল। কলাপাতায় স্ত্রীর বেড়ে দেওয়া গাওয়া ঘি-সহ সফেন গরম ভাত আর দুধ, মৌরলা মাছ, নালিতা বা পাটশাক ভাজা যিনি খান, তিনিই পুণ্যবান। নিছক ফেনাভাত আর মৌরলা মাছ নিশ্চয়ই বাঙালির বৈচিত্রপূর্ণ রন্ধনকলার প্রতিফলন নয়, তবে পরবর্তী কালে পাক-প্রণালীর বিস্তৃত পরিধির সঙ্গে আমাদের পরিচিতি ঘটে। 

‘কটু তৈলে রান্ধে রামা চিতলের কোল।
রুহিতে কুমুড়া বড়ি আলু দিয়া ঝোল।
কটু তৈলে কই মৎস্য ভাজে গণ্ডা দশ।
মুঠো নিঙারিয়া তথি দিল আদারস।…
কতগুলি তোলে রামা চিংড়ির বড়া।
ছোট ছোট গোটা চারি ভাজিল কুমুড়া।’ 

কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে যেসব মাছ ও তার রান্নার বর্ণনা দিয়েছেন, সেইসব শুনে আমাদের রসনা অবশ্যই রসসিক্ত হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা বা মহানদীর ঝকঝকে রুপোলি ইয়া বড় চিতল মাছের দৃশ্য। কালোজিরে-কাঁচালঙ্কা দিয়ে টাটকা চিতল পেটির ঝোল! আহা! সংস্কৃত গ্রন্থ ‘রাজবল্লভ’ বলছেন, ‘চিত্রফলো গুরুঃ স্বাদুঃ স্নিগ্ধ বৃষ্যবলপ্রদঃ’। চিতল মাছ সুস্বাদু তো বটেই এবং বলদায়ক। কিন্তু সেই চিতল আজ কই? যা-ও বা মেলে তা মহার্ঘ। ‘রাজবল্লভ’ অনুযায়ী, আবার মাছের মধ্যে শ্রেষ্ঠ রুইমাছ। ভোজনরসিক কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর অতি প্রিয় মাছ যে রুই, তার পরিচয় মেলে যখন তিনি লেখেন, ‘কাতলা মৃগেল আদি বড় মাছ যত।/ রুইয়ের শ্রীপদতলে সবাই প্রণত।/ কতদূর সুখোদয় ভোজনের বেলা।/ তেল কাঁটা আদি করি নাহি যায় ফেলা।’ শুধু মাছের স্বাদের জয়গান নয়, রোগবালাই দূর করতেও রুইমাছ যে উপকারী, ‘রাজবল্লভ’-এর মতো সেকথাই তিনি লেখেন স্বাদু পদ্যে– ‘পলান্নের রাজা মাছ হয় না এমন।/ সুধার আধার এই রুয়ের ব্যঞ্জন।/ বল দেয় বুদ্ধি দেয় বাত নাশ করে।/ নয়নের জ্যোতি বাড়ে মুড়া খেলে পরে।’ দৈনন্দিন খাবারের পাতে যেমন মিষ্টি কুমড়ো, আলু, বড়ি দিয়ে রুইমাছের ঝোল সকলের পক্ষে তৃপ্তিকর, তেমনই স্বাদ বদলে রুই মাছের কালিয়া, কোর্মা কিংবা রুই-কমলার জুড়ি নেই। কিসমিস আর দারুচিনি বাটা দিয়ে দইমাছের জন্যে পাকা রুইয়ের পেটি না হলে তো চলবেই না! রুই মাছের প্রলেহ, রমনযূষ বা অম্ল-মধুর মৎস্য পাকও যে দারুণ সুস্বাদু সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। প্রবল গরমে খেতে ভালো লাগে কাঁচা আম দিয়ে রুই মাছের চমৎকার স্ট্যু। লেবুর রস, ধনেপাতা, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কাকুচি ও সরষের তেল দিয়ে মাছমাখা কিংবা রাঁধুনিবাটা দিয়ে মাছের কাঁটার ভাঙা। রিলস, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউব স্ক্রোল করলে এই সব রুচিকর রান্নার বিশ্বস্ত প্রণালীর হদিশ মিলবে না! আমাদের ফিরতে হবে পারিবারিক স্মৃতির মণিকোঠায় কিংবা পুরনো দিনের রান্নার বইয়ে। 

আদার রস দিয়ে কইমাছ ভাজার উল্লেখে আমাদের মুহূর্তে মনে পড়ে যায়– বুদ্ধদেব বসুর সেই আক্ষেপ যে আজকাল আর সেই ভালো কই, মাগুর বা ইলিশ পাওয়া যায় না। সবই এখন স্বপ্ন হয়ে গিয়েছে। চিংড়ির কথায় মনে আসে, রসিক যমদত্ত মজা করে লিখেছিলেন– তাঁর পাড়ার নগেনবাবু না কি শীতের কয়েকমাস গলদা চিংড়ি আর ফুলকপি খেয়েই সারা বছরের শক্তি সঞ্চয় করতেন। চিংড়ি-প্রেমে তাঁকেও ছাপিয়ে গিয়েছেন উনিশ শতকের গীতিকার প্যারীমোহন কবিরত্ন। তাঁর রচিত জনপ্রিয় গানে রয়েছে– 

‘মাছের মতন খাসা খাবার জিনিস আর কিছু নাই ভূমণ্ডলে

মোচা চিংড়ি দিয়ে খেলে ছোলার ডাল,
ভবসিন্ধু মাঝে বাঁধে পুণ্যের আল
নির্বাণ মোক্ষ তার পক্ষে শক্ত গাল

কবিরত্ন কয় কৌতুকে, যেতে ইচ্ছা নাই গোলকে,
থাকবো এই ভূলোকে, চিংড়ি যদি বারোমাস মেলে।’ 

সেই গানে রুই, মৃগেল, কাতলা, ভেটকি, ইলিশের গুণকীর্তন তো আছেই, সেইসঙ্গে রয়েছে ডিম-ভরা তোপসে মাছ ভাজার বিবরণ। যে তোপসে মাছে গুপ্তকবি মৎস্যভাব ছাড়াও তপস্বীভাব দেখেছেন। আর এখানে তো প্যারীমোহন বলেই দিয়েছেন, চিংড়ি দিয়ে ছোলার ডাল খেলে নির্বাণ বা মোক্ষলাভের চিন্তা অসার। অন্যদিকে গুপ্তকবি লেখেন, ‘চিঙ্গড়ির সহ যোগ লাউ যদি করে।/ হাতে হাতে স্বর্গে যাই মুখে দিলে পরে।’ এক কবি চিরকাল চিংড়ি খাওয়ার জন্য বেঁচে থাকতে চাইছেন, আর এক কবির কাছে লাউ-চিংড়ির আস্বাদন স্বর্গপ্রাপ্তির সমান। আবার দরিদ্র গৃহস্থের রান্নাঘরে সামান্য পুঁই বা যে কোনও আপাত অবহেলার সবজি যে ‘দীনের তারণকারী’ ঘুষো চিংড়ি সহযোগে অপার্থিব হয়ে উঠতে পারে সেকথাও রন্ধনকলা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কবি জানাতে ভোলেননি তাঁর কবিতায়। চিংড়ির প্রতি দুর্বলতা কি রবীন্দ্রনাথেরও ছিল না! নাহলে একেবারে শিশুপাঠ্য ‘সহজপাঠ’-এ-ই বা তার উল্লেখ করবেন কেন?– ‘কাংলা, তোর ঝুড়িতে কী? ঝুড়িতে আছে পালং শাক, পিড়িং শাক, ট্যাংরা মাছ, চিংড়ি মাছ। সংসারবাবুর মা চেয়েছেন।’ ছোটবেলায় ইশকুল থেকে ফিরে কিশোর রবি নতুন বউঠান কাদম্বরী দেবীর হাতে মাখা পান্তাভাতের সঙ্গে চিংড়ির চচ্চড়ি খেতেন। সেই থেকেই নিশ্চয়ই এই ভালো-লাগা তৈরি হয়েছিল।

বাঙালির মৎস্যপ্রীতির ইঙ্গিত রয়েছে সর্বানন্দের টীকাসর্বস্ব গ্রন্থে সিহুল্লি অর্থাৎ শুঁটকি মাছের উল্লেখে। আবার মাছ শুধু রসনাতৃপ্তির উপকরণ নয়, মাছের ভাগ থেকেই টের পাওয়া যেত হেঁশেলে কর্তৃত্বের চেহারা। লহনা-খুল্লনার কলহ সাময়িকভাবে মিটে গেলে ‘মুড়া লই ফেলাফেলি কেহ নাহি খায়ে।’ তখন মাচার তলায় বেড়ালটিরই পোয়াবারো। মাছ নিয়ে মেয়েলি ছড়ারও কমতি নেই। ‘ইচা কাটলে-কুটলে মিছা/ রানলে বাড়লে মৌ/ সকলই খাইল বৌ।’ কোটা-বাছার পরে চিংড়ি মাছ এত কমে যায় যে, অধিকার সচেতন গৃহকর্তার সন্দেহ গিয়ে পড়ে বাড়ির বধূটির ওপরেই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এ-ও এক নিন্দনীয় দৃষ্টান্ত। বিভিন্ন মাছের প্রধান কিছু রান্না বজায় থাকলেও মাছের তেল, মুড়ো, লেজা, কাঁটা, মাছের ডিম দিয়ে রান্না প্রচুর স্বাদু পদ আজ হারিয়ে গিয়েছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর ‘বেনের মেয়ে’ উপন্যাসে সাতগাঁর রূপরাজার গুরু সিদ্ধাচার্য লুইপাদের সেবার জন্য রাঁধা মাছের তেলের বড়া, ছেঁচড়া ইত্যাদির বিবরণ দিয়েছেন। মাছের ডিমের প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায়, অন্নদামঙ্গলে রয়েছে– ‘মাছের ডিমের বড়া মৃতে দেয় ডাক।’ ইলিশের ডিম ভাজার মতো একটি লোভনীয় বস্তুর উল্লেখ রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ছড়ায়– ‘মুল্লুক জুড়ে উল্লুক ডাকে/ ঢোলে কুল্লুক ভট্ট/ ইলিশের ডিম ভাজে বঙ্কিম/ কাঁদে তিনকড়ি চট্টো।’

সেই মধ্যযুগে মুকুন্দরাম তাঁর মঙ্গলকাব্যে খুল্লনার হাতের রান্নার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তাতে আমশোল, তেঁতুল দিয়ে পাঁকাল মাছ ইত্যাদি পদের উল্লেখ রয়েছে। আমশোল জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারে প্রিয় ছিল। আজও অনেক বাঙালি পরিবারে সেটি রান্নার চল রয়েছে। অষ্টাদশ শতকে ভারতচন্দ্র তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে ৩১-টি মাছের নাম জুড়ে ১০ লাইনে যে সুপাঠ্য পদটি রচনা করেছিলেন তার সর্বশেষ নাম হল ‘ইলিশা’। ওই তালিকাতেই ভেটকি, মৃগেল, খয়রা, ভোলা, বাটা, বাচা, কালবোস, ফলুই, শিঙি, ভাঙন, পাবদা, ট্যাংরা, চাঁদা, খলসে ও তোপসের উল্লেখ আছে। তাঁর আগে কোনও লেখায় মাছের এমন বৈচিত্রের সন্ধান তেমন পাওয়া যায় না। ভারতচন্দ্রের রচনায় সম্পন্ন পরিবারের হেঁশেল চিত্রের পরিচয়ও মেলে। সেখানে আমরা দেখি, ভবানন্দ মজুমদারের স্ত্রী পদ্মমুখী সেদিন ব্রাহ্মণভোজনের জন্য ৩০ রকম নিরামিষ পদ ছাড়াও রেঁধেছিলেন কুচোমাছের তেতো শুক্তোনি, ফলুইমাছ ভাজা, কাঁঠালের বীজ দিয়ে ঝোল-ঝাল, কাতলা মাছের মাথা দিয়ে তরকারি, আদা ও বড়ি দিয়ে আড় মাছের ঝোল এবং এইসবের বাইরেও কাতলা-ভেটকি-কই প্রভৃতি মাছের শিককাবাব। ঘনরামের ধর্মমঙ্গলে নিরামিষ রান্না ও খাবারের বৈচিত্রের পাশাপাশি সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়িতে মাছের বিভিন্ন পদের প্রচুর রন্ধনপ্রণালী রয়েছে। বিজয়গুপ্ত ছিলেন পূর্ববঙ্গের নদীপ্রধান অঞ্চল বরিশালের মানুষ। তাঁর রচিত মনসামঙ্গলে তাই ধরা পড়েছে মাছ রান্নার বৈচিত্র–

‘মৎস্য কাটিয়া থুইল ভাগ ভাগ,
রোহিত মৎস্য দিয়া রান্ধে কলতার আগ।
মাগুর মৎস্য দিয়া রান্ধে গিমা গাছ।
ঝাঁঝ কটু তৈলে রান্ধে খরসুন মাছ।
ভিতরে মরিচ গুঁড়া বাহিরে জড়ায়ে সুতা।
তৈলে পাক করিয়া রান্ধে চিংড়ির মাথা।
ভাজিল রোহিত আর চিতলের কোল।
কৈ মৎস্য দিয়া রান্ধে মরিচের ঝোল।’

আবার ময়মনসিংহের ডাকের বচনে অরুচি দূর করতে হিং, আদা দিয়ে মাগুরমাছ রান্না, জামির বা বাতাবিলেবুর রস ও কাসুন্দি সহযোগে পোনামাছ এবং পাতিলেবুর রস, হিং ও মরিচ দিয়ে ইচিলা মাছ রান্নার বিবরণ রয়েছে–

‘পোনামাছ জামিরের রসে
কাসন্দি দিয়া যেজন পরশে।
তাহা খাইলে অরুচি পলাএ।

ইচিলা মাছ তৈলে ভাজিয়া
পাতিলেবু তাহাতে দিয়া
যাহাতে দেই তাতে মেলে,
হিং মরিচ দেই ঝোলে।’ 

এছাড়া আরও হদিস রয়েছে কালোজিরে সম্বরা দিয়ে কইমাছ, শোলমাছের কাঁটা বের করে কাঁচা আমের অম্বল, চ্যাং মাছের সুক্তো, চিতল কুরে বড়া অর্থাৎ মুইঠ্যা বানানোর পদ্ধতি, মাছের মাথা দিয়ে ডাল, কাতলের মুড়িঘণ্ট। এই সবই মধ্যযুগের রন্ধনশৈলী। মধ্যযুগের রমণীরা পাকবিদ্যায় শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় রেখেছেন। বাংলার গ্রামে গ্রামে এমন রমণীর সন্ধান মেলে। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে দেবী দুর্গা, ফুল্লরা, লহনা, খুল্লনা– সকলেই রন্ধনকুশলী। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য থেকে জানা যায়, সেকালে রন্ধনশিল্পীরা নানা কৌশলে খাদ্যবস্তু প্রস্তুত করতেন। আধুনিক যুগে বারোমাস যেমন সব জিনিসই পাওয়া যায়, অতীতে তেমন ছিল না। ‘আকালিক’ অর্থাৎ অন্য ঋতুর শাক-সবজি-ফল দিয়ে তাঁরা এমন সব রান্না করতেন যাতে পাচকদের শিল্পের রহস্য ভেদ করা ছিল অন্যের পক্ষে দুঃসাধ্য। এমনকী নিমন্ত্রিতেরা নিরামিষ খাদ্যকে আমিষ এবং আমিষকে নিরামিষ বলেও ভুল করতেন। সংস্কৃত সাহিত্যে নিরামিষ ব্যঞ্জন তো বটেই, আমিষেরও নানা শ্রেণিবিভাগ ছিল। সেকালের বড় বড় ভোজে নানারকম মাছ, হরিণ, ছাগ ও পক্ষীর মাংস রান্নায় সূক্ষ্ম সুস্বাদ এবং সুগন্ধি-যুক্ত এত রকমারি পদ প্রস্তুত করা হত যে, লোকে তা খেয়ে শেষ করা তো দূরের কথা, কেউ তার সংখ্যা গুণেও শেষ করতে পারত না। 

নীহাররঞ্জন লিখেছেন, বাঙালির খাদ্যপ্রীতি আজকের নয়। প্রাচীনকালের বাঙালিও মাছ ভালোবাসত। ইদানীং অবশ্য অতীতের ঝোল-ঝাল, কালিয়া, চচ্চড়ি, ছেঁচড়া নয়, নতুন প্রজন্মের পরিবারে অনলাইনে আসছে ধোয়া-বাছা, পিস করা মাছের প্যাকেট। সাঁতলানো, গ্রিল আর বেক করা রান্নার প্রাধান্য ক্রমেই দখল করছে গৃহস্থের ডাইনিং টেবিল। অথচ মাছের পোলাও, সর-সহ মৎস্য পাক, আম-কই, মাছের তক্তি কাবাব কিংবা পার্সলে ও সেলেরির ডাঁটা আর করমচা দিয়ে ট্যাংরা মাছের স্ট্যু অথবা শশা, কচি পটল ও নারকেল দিয়ে চিংড়ির ট্রামফ্রাডুর মতো কত বিচিত্র রান্না যে আছে! সেইসব কি আর একালের কোনও ফাইন ডাইনিং রেস্তোঁরায় পাওয়া যায়! মাছের ঐতিহ্যসম্পন্ন রন্ধনশৈলী সংরক্ষণ করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ দরকার। 

তবে এবারের ভোটে ভোজের রাজনীতির চূড়ান্ত গতিপ্রকৃতির দিকে সবার নজর থাকবে। নির্বাচনী জয়-পরাজয়ের নিষ্পত্তির পর প্রতিপক্ষকে মাছ-ভাত খাওয়ানোর চ্যালেঞ্জ বিজেপি সত্যিই রাখতে পারে কি না, লক্ষ্য থাকবে সেদিকেও। শেষের কথাটি হল, বাঙালির আমিষ খাদ্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যহরণ করা কোনও রাজনীতির পক্ষেই সম্ভব নয়।

Bengali Culture bengali food cuisine Fish Fish culture food culture Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on