Robbar

তবু, মনে রেখো…

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 7, 2026 8:24 pm
  • Updated:July 7, 2026 8:24 pm  

রোনাল্ডো,  আপনার সামনে পর্বতসম লিওনেল মেসি– চিরকাল, আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী। স্কুলের ফার্স্টবয়– যাকে বহুচেষ্টাতেও ফাইনাল পরীক্ষায় হারানো যায় না। তার প্রতি গোপন ক্ষোভ জমানোর বয়স আমরা পেরিয়ে যাই। আমাদের উঁচু-নিচু-কম-বেশির বোধ শেষাবধি মাঝবয়েসের স্বাভাবিকতায় এসে মিশে যায় একেবারে। কিন্তু, সেই নিখাদ-নিটোল চাওয়াটুকু হারায়, এক্কেবারে হারিয়ে যায়, আপনার বিশ্বকাপ থেকে পাকাপাকিভাবে বেরিয়ে যাওয়ার এই মুহূর্তটা– আমাদের কৈশোরের সঙ্গে চিরবিচ্ছেদরেখার মতো চকচক করে।

অর্পণ গুপ্ত

রোনাল্ডো বেরিয়ে গেলেন। বিশ্বকাপ অভিযান শেষ! যেন বলে যাওয়া– ‘এবারের মতো আমি এই…’।

কোথায় যাচ্ছেন রোনাল্ডো? কোথায়ই বা যাবেন? এমন কবিতা, এমন মায়াবী গদ্যে একটা নিস্তব্ধতার ভিতর খুঁজতে থাকা স্মৃতিচিহ্নের মতো ভারী ফেয়ারওয়েল নোট, আপনার জন্য বরাদ্দ রাখার দুঃসাধ্য কেউ দেখায় কীভাবে!

আলবিদা: বিশ্বকাপ মঞ্চ থেকে বিদায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর

আপনি যখন মাঠে, ডালাসের গ্যালারিতে তখন পোর্তো-ব্রাগা-লাগোস-আভেইরো থেকে আসা হাজার হাজার পর্তুগিজ সমর্থক কাঁদছেন। এবারেও হল না! পর্তুগালের বিশ্বকাপ ইতিহাসে একটা ইউসেবিও-র সেমিফাইনাল আছে। সেমিফাইনাল গোল আছে। ২০০৬-এর সেমিফাইনাল যত না আপনার, তার চেয়েও বেশি করে লুইস ফিগোর। আপনার সুপারস্টার হয়ে যাওয়ার পর বরাতে বড়জোর সুপার সিক্সটিন বা কোয়ার্টার ফাইনাল। তবু, আমাদের ভাবতে কষ্ট হয়, আম-সমর্থকের মতো আপনি কাঁদলেন? আপনিও? ওই কয়েকটা মুহূর্তে মনে হল, আপনি বদলে গিয়েছেন! আপনার ওই সুঠাম শরীরের ওপর চাপানো ফুলস্লিভ জার্সি-আপনার ওই ভরাট ডেল্টয়েড মাসলের ওপর চেপে থাকা ‘রোনাল্ডো-সেভেন’ লেখাটা, আপনার ওই ফেসিয়াল মাসলের কায়দায় বিরক্তি-অসহায়তা-খুশির মতো ভণিতাহীন অনুভব ফুটিয়ে তোলা শরীরে যেন অন্য এক ব্যক্তি-অন্য এক ফুটবলার। যে বৌদ্ধিক চেতনায় অনায়াসে মেনে নেয় সাফল্য, মেনে নেয় ব্যর্থতা, মেনে নেয় যাবতীয় জাগতিক সত্যকে। কান্না-হাসি-বিষাদ-হরষের মতো প্রকাশ জীবনে যাঁর নিত্যসঙ্গী।

গতবার, কাতারে, মরক্কোর সঙ্গে হারের পরও আপনি কেঁদেছিলেন। সেদিনও একই কথা মনে হয়েছিল! অথচ, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আপনি জানান দিয়ে দেন আপনার স্বকীয়তা। পিয়ার্স মরগ্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলে দেন– ছয়-সাত ম্যাচের টুর্নামেন্ট দিয়ে আপনার শ্রেষ্ঠত্ব মাপা সম্ভব না। এবার, আপনার বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রেস কনফারেন্সে আপনি বলে গেলেন আপনার শ্রেষ্ঠত্বের কথা, বললেন, আপনি একা পর্তুগালকে বয়েছেন, আপনার আগমনের আগে পর্তুগালের ট্রফি ক্যাবিনেট ছিল শূন্য। আপনার প্রস্থানে সেখানে ঢুকেছে ইউরো আর দুটো নেশনস লিগ। আপনার কাছে ইউরো জয় বিশ্বকাপের চেয়ে কম কিছু না। এই রোনাল্ডো, এই নাছোড় রোনাল্ডো, এই যাবতীয় লিখিত স্ট্যাটিস্টিক্স, চোখের সামনে পড়ে থাকা জাগতিক সত্যকে সামনে রেখে ব্যক্তিগত ডিনায়াল মোডে চলে যাওয়া রোনাল্ডো আমাদের পরিচিত। আমাদের অতি-পরিচিত সেই ছেলে, যাঁর ভিতরে খেলা শেষ হয়নি এখনও। শেষ হয় না কোনওদিন।

সেই ছেলেটা, সেই ক্লাস এইট, সেই চুলে ছাঁট, সেই অকালপক্ব কৈশোর, যেখানে মোজার ভিতর সিগারেট লুকিয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার পর অনুশোচনাহীন বেপরোয়া মন, যেখানে বেঞ্চে লিখে রাখা কৈশোর প্রেমের কথা বাড়িতে জানাজানি হলে রাত-বিরেতে আড্ডার ঠেকে চলে যাওয়ার বিলাসিতা, সেখানেই এখনও পড়ে আছে একটা আস্ত সময়। সে-সময় আমাদের পরিণত অবয়বের দিকে তাকিয়ে হাসে। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে। সেই কবিতার মনখারাপি লাইনটা মনে পড়ে খুব– ‘অন্ধকারে অদৃশ্য ওই নদীর দুঃখ হঠাৎ উঠল জেগে…’।

চোখের জলে বিদায়, মাঠ ছাড়ছেন সিআর সেভেন

অদৃশ্য নদীর ভিতর আমাদের খেলা দেখা। আমাদের বিশ্বকাপ। আমাদের কারণবিহীন কত ঝগড়া, আমাদের হারতে না-চাওয়া যুক্তির স্রোত, আমাদের কম জানা ফুটবলে বেশি গলার জোর, আমাদের ঝগড়া শেষে আড়াইদিনের বন্ধু বিচ্ছেদ– সবকিছু জমা হয়ে আছে। আমরা বড় হতে গিয়ে বুড়িয়ে গিয়েছি রোজ। যুক্তির হাতকড়ায় বাঁধা পড়ে আছে যৌবন। আমাদের নিখাদ ভালোবাসার ভিতর যুক্তি-বুদ্ধি ভেজাল মিশিয়ে দিয়েছে সময়। আপনার ওপর বিরক্ত হয় তামাম দুনিয়া। আপনাকে দেখে, আপনার পরিণতমনস্ক ভক্তকুল অবধি অস্বস্তিতে পড়ে– ‘এমন স্টেটমেন্ট না দিলেই তো পারত…’। আপনার সামনে পর্বতসম লিওনেল মেসি– চিরকাল, আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী। স্কুলের ফার্স্টবয়– যাকে বহু চেষ্টাতেও ফাইনাল পরীক্ষায় হারানো যায় না। তার প্রতি গোপন ক্ষোভ জমানোর বয়স আমরা পেরিয়ে যাই। আমাদের উঁচু-নিচু-কম-বেশির বোধ শেষাবধি মাঝবয়েসের স্বাভাবিকতায় এসে মিশে যায় একেবারে। কিন্তু, সেই নিখাদ-নিটোল চাওয়াটুকু হারায়, এক্কেবারে হারিয়ে যায়, আপনার বিশ্বকাপ থেকে পাকাপাকিভাবে বেরিয়ে যাওয়ার এই মুহূর্তটা– আমাদের কৈশোরের সঙ্গে চিরবিচ্ছেদরেখার মতো চকচক করে।

চোখের জল সামলে সমর্থকদের অভিবাদন জানাচ্ছেন রোনাল্ডো

ঘুড়ির তলায় থাকা অদৃশ্য অথচ ধারালো মাঞ্জা আমাদের আঙুলে বসে যায়। অসাড় হয়ে যায় জীবন। লুকা মডরিচ চলে গেলেন বিশ্বকাপ থেকে। ম্যানুয়েল নয়ার চলে গেলেন। চলে গেলেন গিলের্মো ওচোয়া-নেইমার, আরও কত তারকা-মহাতারকা! তাঁদের প্রস্থান মার্গে লেখা রইল কত বাহারি ফেয়ারওয়েল নোট। আপনার শেষবেলা, আপনার বিদায়পর্বের একেবারে অন্তিম মুহূর্তটিতেও আপনি আমাদের কৈশোরের গায়ে আঁচড় কেটে গেলেন। যেন বুঝিয়ে গেলেন আমরা আদতে এমনই।

আমাদের ওপর স্বাভাবিকতার, পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের বর্ম চাপিয়েছে সময়। সে-বর্মের ভিতর আমাদের কৈশোরের মরে যাওয়া স্বতঃস্ফূর্ততার যে শেষ ধুকপুক, তা যদি বেঁচে থাকে, সেই আঁচড় তাকে স্পর্শ করবে। করবেই।

বান্টির কথা মনে পড়ে। দু’বার ফেল করে ক্লাস এইটে আমাদের ব্যাচমেট। ওর গোঁফের রেখার নিচে বিড়ি খেয়ে কালো হয়ে যাওয়া ঠোঁট, ওর গায়ে সিআর সেভেন জার্সি, ওর চুলের লাল রং-কানে দুল সবকিছু নিয়ে ও ভেঙে দিতে পারত ডিফেন্স। আমাদের আতুপুতু ফুটবলে ও-ই ছিল ছিলাকাটা ধনুকের গতি। স্পোর্টস স্যরের কথায়, ‘তুই বড় প্লেয়ার হবি রে বান্টি, পড়াশোনা তো হবে না, খেলাটাই হবে তোর দ্বারা…’। বান্টিও তাই চেয়েছিল। কিন্তু মেসি হতে চায়নি। চেয়েছিল সিআর সেভেন হতে!

‘ক্রিশ্চিয়ানো’ নামটাও ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে না-পারা বান্টি জীবনে কোনও কিছুই গুছিয়ে উঠতে পারেনি। শুনেছিলাম, শাড়ির দোকানে কাজ নিয়েছে স্কুল ছেড়ে। রোনাল্ডোর ফুরিয়ে যাওয়ার খবর ও আর রাখে না বোধহয়! ও কি জানে, সেই ম্যাঞ্চেস্টার– সেই রুনি-রোনাল্ডো– সেই সোনালি চুল– সেই এমিরেটসের বুক চিরে চলে যাওয়া আগুনে ফ্রি-কিক– সেই অ্যাশলে কোলের নাভিশ্বাস তুলে দেওয়া স্টেপ-ওভার– সেই শূন্য দশক– সেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-জার্মানির মক্কায় এসে যাওয়া পর্তুগিজ সুপারস্টার আজও, আজও কেবল এই হারিয়ে-যাওয়া বোকা বান্টিদের জন্য লড়ে গিয়েছে? বাকি দুনিয়ার মতো ‘বড়’ হয়ে যায়নি!

এডুয়ার্ড গ্যালিয়ানো। আপনার সেই বিখ্যাত উক্তি– ‘We are all mortals until the first kiss and second glass of wine…’-এর প্রথম চুমু কিংবা ওয়াইনের দ্বিতীয় পেয়ালার স্বাদ দেওয়ার জন্য লিওনেল মেসি তো আছেনই। তবে, কিছু মুহূর্তে, কিছু টানেল বেয়ে নেমে আসা অবয়বের কান্নায় আমাদের এই অমরত্বের প্রত্যাশা ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। আমরা নশ্বর জীবনের ফেলে আসা সরলতাকে, ফেলে আসা পাপবোধকে, ফেলে আসা নিখাদ ক্রোধ-রাগ কিংবা নস্টালজিক অভিমানকে যুক্তি-বুদ্ধিহীনভাবে ভালোবাসতে শুরু করি। হঠাৎ ফেরারি স্মৃতি কাঁদিয়ে দেয় রাত-বিরেতে।

মহাপ্রস্থানের পথে

যে অপরিণত সময়ের কাছে আর ফেরা যাবে না কোনওদিন, সেই সময়টাকে নিয়ে চলে গেলেন ঝগড়ুটে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। আমাদের বড় হওয়ার বৃত্ত সম্পূর্ণ হল শেষমেশ…