8 unpublished entries of diary of dwijen Bandyopadhyay | Robbar
Robbar
  • ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ১৫ অক্টোবর ২০২৬

অপ্রকাশিত দিনলিপি

অপ্রকাশিত দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের মন, থিয়েটার, অভিনয়– সব মিলিয়ে উদাত্ত এক কলম ছিল তাঁর। ১৫ নভেম্বর ১৯৯৩ থেকে ১৬ জুন ২০১০ অবধি তাঁর ডায়েরির আটটি এন্ট্রি। প্রকাশিত হল রোববার.ইন-এ।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ১০:৫৯   
Facebook WhatsApp Messenger

১৫ নভেম্বর। সোমবার। ১৯৯৩

সবসময়েই মনে হয় বেঁচে থাকা বোধহয় এক প্রকারের অপেক্ষায় থাকা। অপেক্ষা অথবা কখনও প্রতীক্ষাও। কিন্তু প্রতীক্ষায় যে কারও আসার সংবাদ থাকে অপেক্ষাতেও কি তা থাকে। রাত্রি যত দীর্ণ হয় অপেক্ষাও তত প্রবলতা আহরণ করে। ধীরে ধীরে নির্ঘুম হতে থাকে সত্তা। অথচ এই কিছুক্ষণ আগেও যখন বাড়ির দিকে ফেরা– কেমন এলিয়ে পড়ে শরীর, বিশেষত আজ ট্যাক্সিতে । এইবার নামতে হবে জানার অমোঘতা সত্ত্বেও কী নিবিড় ক্লান্তিতে জুড়ে যায় দু’চোখের পাতা। অনুভবে আশ্চর্য abstract সব ছবি স্বপ্নের মতো হতে চায়– আর তখনই উল্টোডাঙার মোড় এসে ভেঙে দেয় একটানা চলার নিয়তিকে। সল্টলেকের নির্দিষ্টতায় পৌঁছতে তারপর নতুন পর্বে আরও একটা যুদ্ধ। যদিও রাত্রি তবু ঘুম ভেঙে নতুন দিনের প্রেরণা নিয়েই। গৃহে নিশ্চিন্ত ফেরার যে সাবলীলতা– তা অনেকের নেই– এই গ্লানি ইদানীং বিক্ষত করে ফেরার সময়ে। প্রতিদিন তারপর সেই বেঁচে থাকার অপেক্ষায়। কিন্তু অপেক্ষাও আয়াসহীন হতে পারে না কখনও, তাকে অর্জন করে নিতে হয় পরিশ্রমে। কিন্তু কোনওদিন সেই স্বাভাবিক রাত্রি আসে না। অচেতন হওয়ার আগে নির্ঘুম জেগে থাকায় প্রহরার কোনও অনুষঙ্গ নেই। কারণ কোনও প্রহরা থাকে না কোথাও। তাই দিনলিপি অবান্তর হয়ে যায় শুধু কয়েকটি মুহূর্তের অনুভব ছাড়া। সেই অনুভবেই আছে অসংখ‌্য রং আর বড় ভয়ংকরভাবে আকাঙ্ক্ষা। যাচনা।

১৫ নভেম্বর। সোমবার। রাত্রি ১২টা ৩০। ১৯৯৩ 

ডিলান টমাসের কবিতার বই আছে আমার
কালই খুঁজে বার করতে হবে।

zoom

৬ মে। সোমবার। ২০০২

দম ফেলার ফুরসৎ নেই।

দম ফেলার ফুরসৎ না থাকাটা সুখের হয় যদি সমাজের পক্ষে কোনও দরকারি কাজ করে উঠতে পারি। কিন্তু না গত তিন চারদিন এবং আগামী দু’-তিনদিন সিরিয়ালের কাজেই ব্যস্ত আছি। এদিকে কত সাংসারিক কাজ পড়ে আছে। সবচেয়ে বড় যে ক্ষত তা হল নতুন নাটক না করতে পারার কষ্ট। বড় সাধ হয় আমার মনের মতো একটা নতুন নাটকের জন্য সর্বশক্তি– আমার এই বয়সে আর যেটুকু সম্ভব– তার প্রয়োগ করি। কিন্তু না– বড় বিধ্বস্ত, বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি। এ জীবনে কোনও বড় কাজ করা হল না আমার।

zoom

২০ এপ্রিল। রবিবার। ২০০৩
লিভারপুল– Suites Hotel Knowsley

এখন ভোর ৭টা ৫। আর কলকাতায় সকাল সোয়া ১১টা। ছবির মতো হোটেলে ঘুম থেকে উঠেছি। আজ রাতে ‘অক্টোপাস’-এর অভিনয় হবে। গতরাতে ‘ব্রজসংবাদ’ খুবই সফল হয়েছে। মুহুর্মুহু হাসিতে ফেটে পড়েছে দর্শক। সেই তুলনায় আজকের নাটক হয়তো কিছুটা কঠিন হবে।

প্রচণ্ড ঠান্ডা এখানে। হাড় কাঁপানো হাওয়া দিচ্ছে সবসময়। আরও গরমজামা আনা যেত। ইতিমধ‌্যে পরশু থেকেই ভয়ংকর সর্দিজ্বর। আজ থেকে নীলাঞ্জনার কাছ থেকে নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করলাম। এই হোটেলে লিভারপুল football Team-কে দেখলাম। গতকাল। 

এই প্রথম লেখার সুযোগ পেলাম।

zoom

২৯ জুলাই। মঙ্গলবার। ২০০৩ 

জীবনটাকে নিয়ে ভাবতে গেলে কেমন দিশাহারা লাগে। কোনও হিসেবই মেলে না। বাইরে সারাজীবন ছিমছাম। কিন্তু ভেতরে ভয়ংকর ভাঙন আছে। একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছি। বুঝতে পারছি আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। শরীরে অল্পেই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। শ্যামল গাঙ্গুলির মতো করে জীবনটাকে অর্জন করা গেল না। তেমন সাহসী উচ্চারণে বলতে পারি কই– ‘জীবনে এখনও যে নানান রকমের স্বাদ পাই’। আমার আর কোন স্বাদ নেই। বিস্বাদ সবকিছু।

আসলে আমি তো শুধু ব্যস্ত আছি। কোনও কাজ তো করতে পারছি না। আমার কোনও নির্মাণ নেই। আমি কোনও থিয়েটার দেখতে পারি না। অথচ থিয়েটার দেখতে আমার এত ভালো লাগে। আমি কোনও সিনেমা দেখতে পারি না, অথচ সিনেমা দেখে নিজেকে কত সমৃদ্ধ করা যায়। আমি নিজে যে অভিনয় করি তা বস্তাপচা। শুধু আবেগটাকে ঠিক ব্যবহার করতে পারলেই তো হল না, আমার দরকার এমন এক আকর্ষণীয় অস্তিত্ব– যা দেখে শুধু দর্শক নয় অন্যান্য অভিনেতারাও প্রেরণা পাবে, উৎসাহিত হবে। পারি না। এই স্বপ্ন আজও দেখি, কিন্তু আমি জানি আমি শেষ হয়ে গিয়েছি। এখন শুধু একটা শবদেহ বহন করে বেড়াচ্ছি। যে কোমায় আছে, তার ক্লিনিকাল ডেথ হয়ে গেছে, শুধু জীবন-গ্রন্থিটা খুলে নিলেই হয়।

zoom

১৯ সেপ্টেম্বর। সোমবার। রাত। ২০০৫ 

খুব কষ্ট হয়। খুব কষ্ট হয়। অবচেতনে জানা আছে কারণ। তার বাইরে আনতে ভয় হয়।

সেদিন রাতে T.V.তে উষা উত্থুপের গাওয়া We Shall Over Come শুনছিলাম। শুনতে শুনতে খুব কাঁদছিলাম। কান্না পায়। অবচেতনে যত পরাজয়ের গল্প জমে আছে, তার কথা ভেবে কান্না পায়। আবছা আবছা সত্তার গভীরে জমে থাকা পরাজয়। পরাজয়ই তো আছে জীবনে শুধু। একদিন, একদিন পারবই। একদিন সব তুচ্ছতার ঊর্ধ্বে উঠে জয় ছিনিয়ে আনব। একদিন পারব আমার স্বপ্নের থিয়েটার করতে।

zoom

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭
লাবণ্যর সংসার

সকাল সোয়া ৯টার মধ‌্যে লাবণ‌্যয় পৌঁছেছি। ১১টাতেই ছাড়া পেলাম। রবীন্দ্রভারতী। খুব মন দিয়ে ক্লাস করলাম। বাড়ি ৪টের মধ‌্যে। 

চুনীপান্না শো

Show করতে গেলাম ৬টায় বেরিয়ে। অনেকদিন পর সেই আগের মতো। টাটা সুমোয় রমেন রাজশ্রী বিপ্লবকেতন। আজ অবশ‌্য কল‌্যাণদা নেই। রাজুকে তোলা হল। গেলাম উলুবেড়িয়া পেরিয়ে কুলগাছিয়ায় একটা মেলায়। গ্রামীণ মেলা। সত্যিই গ্রামীণ। অসংখ্য মানুষ। আজ একটা নতুন গল্প ‘গুলবাজ’ করা হল। ঠিকমতো তৈরি হওয়ার সুযোগ পাইনি। তাও মোটামুটি হল। ফেরার পথে বৃষ্টি এল। দারুণ লাগছিল। বিপ্লবকেতনকে নামিয়ে আমরা বালিগঞ্জ ধাবায় গিয়ে খেলাম। অনেকদিন পর ভালো লাগছিল। সবাইকে নামিয়ে সাড়ে বারোটায় বাড়ি এলাম।

zoom

২৯ সেপ্টেম্বর। শনিবার। ২০০৭

অনেকদিন পর আজ ‘এই ঘুম’ নাটকটা ছিল আকাদেমিতে সন্ধেবেলা। পুজোর আগে। আজ আবার সাম্প্রতিকে ২০-২০ বিশ্বকাপ জয়ের পর ভারত খেলছে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ব্যাঙ্গালোরে । ইত্যাদি সব মিলিয়ে যেমন দর্শক হওয়ার কথা তাই হয়েছে। 

এই একটা অসময় চলছে আমার। অর্থনৈতিক ঠকে যাওয়ায় এখন আমার দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে, এইসব কিছুর মধ্যে একমাত্র ভালো– আজকের অভিনয়।

বিভাসদা আর সৌমিত্রদা ছিলেন। বিভাসদা এর আগে প্রথম শো দেখেছিলেন। উচ্ছ্বসিত হয়েছেন আজকের অভিনয় দেখে। প্রত্যেকের অভিনয় ভালো লেগেছে! আজ শর্বরী সাইকিয়াট্রিস্ট-এর ভূমিকায় প্রথম অভিনয় করল। ভালো করেছে। খুব ছোটখাটো Business-এ আমার একটু অপছন্দ হয়েছে, কিন্তু সার্বিকভাবে এখন খুব স্বাভাবিক কারণেই ভালো অভিনয় করেছে। 

বিভাসদা বারবার বলেছেন– সবাইকার অভিনয় খুব ভালো লেগেছে। সুমিতার খুব প্রশংসা হয়েছে। তাছাড়া আমার সম্পর্কে বলেছেন এইরকম অভিনয় করার এই মুহূর্তে কেউ নেই। সৌমিত্রদা বলেছেন ‘তোমার মতো অভিনয় করতে পারলে আমি গর্ব বোধ করতাম’।

আমি জানি এইসবই আমার প্রতি স্নেহের প্রকাশ।

zoom

১৬ জুন। বুধবার। ২০১০

সে অসহ্য  শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে চলেছি তার কোনও তুলনা হয় না। কত দীর্ঘকাল হয়ে গেল আমি ভালোভাবে হাঁটতে পারি না। আমার ডান পায়ের পাতার উপর কোনও জোর দিতে পারি না। তার সঙ্গে অসহ্য ব্যথা। সর্বক্ষণই, ২৪ ঘণ্টা। কত ডাক্তার দেখালাম– কত ওষুধ। ওষুধ ছাড়তেও পারি না, তাহলে ব‌্যথা বাড়ে। আমার ওষুধ খেয়েও আমার ব‌্যথা কমে না। আমার সেই গটগট করে হেঁটে যাবার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। এই তো মাসদেড়েক আগেও সেটা পারতাম। কিন্তু এখন আয়ত্তের বাইরে। এতে দিশাহারা লাগে। অথচ আমাকে আরও বহুদিন কাজ করে যেতে হবে আমার সংসারের জন্য। আমার বয়সি কত লোক কত নীরোগ। কিন্তু আমি কেবল চলৎশক্তিহীন।

zoom

[দিনলিপির মুদ্রিত বানান সংশোধিত]

bengali movie Diary Dwijen Bandyopadhyay Indian Theatre Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Theatre Unpublished Diary

Share this article on