


ভাবুন দিকি, দক্ষিণেশ্বরের নবতের ঘরে পাটের শিকেয় হাঁড়িতে রাখা আছে জিওল মাছ। কস্তাপেড়ে শাড়ি পরে মা সারদা আঁশবঁটি পেতে মাছ কুটছেন। ঠাকুরের জন্য গোলমরিচ দিয়ে ঝোল রাঁধবেন। সে মাছ কি নিছক মাছ? আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বলছেন, বাংলায় বৈষ্ণবধর্ম আসার পর অনেক বাড়িতে শিলপাটাতে না কি চন্দন বাটা শুরু হয়েছিল। কিন্তু মাছ? হুঁ বাবা, বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে কিনে এনেছেন পেল্লায় কাতলা। আঁশবঁটিতে সেই মাছ কেটে চার পদ হয়েছে। মাছই শ্রীহরি। মাছই পরম ব্রহ্ম। দশাবতারের প্রথম অবতার। সময় আসে, যখন প্রলয়ে এই সমাজের জ্ঞানগম্মি, বোধবুদ্ধি সব ভেসে যায়। তখন যিনি ত্রাতা, তিনি মীনরূপ ধরে গভীর জলে জ্ঞানকে বাঁচিয়ে রাখেন, ধারণ করে রাখেন। ধৃতবানসি বেদং।
গলায় রুপোর হাঁসুলি, দু’-হাতে পুরু পইছা, ধারালো নাকে গোল নথ, বিন্দু বিন্দু ঘাম-জমা কপালে সিঁদুরের গোল টিপ। চিবুক বাঁদিকে হেলিয়ে চাঁপা-মেছুনি বাঁ-হাতের পাঁচ আঙুল দেখিয়ে নিবারণ চকোত্তিকে বলল, ‘পাঁচ টাকা সের দরে দিতি পারবনি বাবু, আমার এক্কিরে চাঁদের টুকরোর মতো জিওল মাছ সব!’
নিবারণ, চাঁপার টিকলো শ্যামলা নাকের গোল নথের দিকে তাকিয়ে ভাবল গেয়ে দেই, ‘ডোরসা মাছ বেচতে এসে মেছুনি তোর গুমোর কেনে?’ কিন্তু বাদ সাধল ওই, না, রুপোর হাঁসুলির চিকন বাঁক নয়, লাল খড়কে ডুরে আঁচলের পাশের চাঁপার ওই নিটোল কাঁখও নয়। তবে? চাঁপার হাতের পুরুষ্ঠ পইছা? তাও নয়। চাঁপার আলতাপরা আঙুল।

আঙুল? নাহ্। আলতা-পরা আঙুল দিয়ে চেপে ধরা শালকাঠের পাটার ডগায় গোঁজা, আর ওদিকে লম্বায় চাঁপার দুই ভুরুর মধ্যিখানের লাল টিপ ছাড়ানো সাড়ে তিনহাতি আঁশবঁটি। গোখরো সাপের গ্রীবার মতো বঁটির শান দেওয়া লোহার ফলা। তিন সের সোমত্থ সরপুঁটি দেখে নিবারণের নোলা যত সকসক করে, চাঁপার আঁশবঁটির ফলাও তত চকচক করে। কালো নরুনপেড়ে ধুতির ট্যাঁক থেকে গুনে গুনে ১৫টি টাকা বের করে নিবারণ চক্রবর্তী।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বেড়া’ গল্প মনে আছে, পাঠক? ‘গোবর্ধন একদিন কোথা থেকে জোগাড় করে নিয়ে এল একটা আধসেরি রুইমাছ। মাছ দেখে খুশি হয়ে হাসি ফুটল সবার মুখে। দু মুঠো চাল সেদিন বেশি নেওয়া হল এই উপলক্ষ্যে। গোবর্ধনের ছেলে সূর্যকান্তের বউ লক্ষ্মীরাণী আঁশবঁটি পেতে কুটতে বসল মাছ।’
তা, বাঙালি হেঁশেলের আঁশবঁটি কি যে-সে বস্তু? সিড়িঙ্গে আখ থেকে নধর কুমড়ো কাটে যে নিরিমিষ বঁটিখানি, তার কি পাকঘর বা নিদেনপক্ষে ঠাকুরঘরের বাইরে যাওয়ার জো আছে? কিন্তু আঁশবঁটি? আমাদের পাশের বাড়ির হারুর মেজজ্যাঠা বোশেখ মাসে যখন তখন ভিরমি খেতেন। হারুর ঠাকুমা, খাস ঘটিবাড়ির বেধবা, আদুল গায়ে সাতহাতি গামছা জড়িয়ে ঠাকুরঘরের বারান্দায় এসে চিল চিৎকারে বলতে লাগলেন, ও বড়বউমা আমার মেজখোকার কপালে একটু গরম আঁশবঁটির ছ্যাঁকা দাও না গো! আমরা গেঁড়ির দল, হাঁ করে দেখতাম হারুর মেজমা একগলা ঘোমটা দিয়ে শালু লাগানো তালপাতার পাখা দিয়ে ভিরমি খাওয়া স্বামীর মাথায় বাতাস করছে, আর হারুর বড় মা, হেঁশেল থেকে বেরিয়ে আসছেন শাঁখাপরা ফরসা হাতে পেল্লায় আঁশবঁটি নিয়ে। সেই আঁশবঁটির ডগা তোলা উনুনে গরম করে। নাকের উপর দিয়ে ফলাটা নিয়ে হারুর জ্যাঠার চওড়া কপালে যেই না…

ব্যাস, অমনি বাড়ির মেজকত্তা এক ঝাঁকুনি দিয়ে দু’চোখ মেলে চেয়ে বললেন, ‘বড় বৌঠান জল খাব।’ ‘এই তো মেজঠাকুর পো’, বলে মাথার ঘোমটা টেনে বড় গিন্নি কুঁজো থেকে কাঁসার গেলাসে জল গড়িয়ে আনলেন। তবে! হেঁশেলের সম্পদ ওই একফালি বঁটি মা জননীর অস্ত্রটি হয়ে ভিরমি খাওয়া তাগড়াই পুরুষের জ্ঞানচক্ষুটি মেলে দেন। বাঙালির আঁশবঁটির কি সোজা মহিমা!
ওদিকে ভাবুন দিকি, দক্ষিণেশ্বরের নবতের ঘরে পাটের শিকেয় হাঁড়িতে রাখা আছে জিওল মাছ। কস্তাপেড়ে শাড়ি পরে মা সারদা আঁশবঁটি পেতে মাছ কুটছেন। ঠাকুরের জন্য গোলমরিচ দিয়ে ঝোল রাঁধবেন। সে মাছ কি নিছক মাছ? আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বলছেন, বাংলায় বৈষ্ণবধর্ম আসার পর অনেক বাড়িতে শিলপাটাতে না কি চন্দন বাটা শুরু হয়েছিল। কিন্তু মাছ? হুঁ বাবা, বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে কিনে এনেছেন পেল্লায় কাতলা। আঁশবঁটিতে সেই মাছ কেটে চার পদ হয়েছে। মাছই শ্রীহরি। মাছই পরম ব্রহ্ম। দশাবতারের প্রথম অবতার। সময় আসে, যখন প্রলয়ে এই সমাজের জ্ঞানগম্মি, বোধবুদ্ধি সব ভেসে যায়। তখন যিনি ত্রাতা, তিনি মীনরূপ ধরে গভীর জলে জ্ঞানকে বাঁচিয়ে রাখেন, ধারণ করে রাখেন। ধৃতবানসি বেদং।

না, লেখাটা সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। ভুলে গিয়েছিলাম বাঙালি হিন্দুর হেঁশেল আর বাঙালি মুসলমানের পাকঘর কিন্ত এক নয়। বাঙালি মুসলিমের পাকঘরে, আর দুলে-বাগদিদের মতো উচ্চবর্ণের হিন্দুয়ানি দ্বারা চিরকালের অপমানিত মানুষের হেঁশেলে আমিষ-নিরামিষের অত ভেদ নেই, সেই অসংখ্য কিন্তু অদম্য বাঙালির সব বঁটিই আঁশবঁটি।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved