Robbar

হাউল থেকে বাউল

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 26, 2026 10:32 am
  • Updated:April 26, 2026 10:32 am  

২৪ এপ্রিল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি গিন্সবার্গ সম্পর্কে যে বক্তৃতা দিয়েছি, সেটি একটি লিখিত বক্তৃতা। সেই বক্তৃতার মূল দু’টি কথা আমি এখানে, রোববার ডট ইন পাঠকের জন্য লিখে পাঠালাম হার্ভার্ড থেকে।

সুবোধ সরকার

১৯৯২ সালে, আমি জীবনে প্রথম বিমানে উঠে, সেই বিমান থেকে নামি নিউ ইয়র্কের জিএফকে বিমানবন্দরে। আমি নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতায় এসেছি মাত্র কয়েকদিন হল। ভারত সরকার এবং আমেরিকান সেন্টারের সহযোগিতায় আমি গিনসবার্গের সঙ্গে দেখা করলাম ম্যানহাটনের বাড়িতে।

গিনসবার্গের শতবর্ষ বলে আমার বিষয় গিনসবার্গের ভারত। ৩৫ বছর ধরে আমি গিনসবার্গের ভারত নিয়ে কাজ করে চলেছি। এখনও বইটি লেখা হয়নি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে আমি সেই ইঙ্গিত দিলাম যে, এবার বইটি লিখে ফেলতে হবে। অ্যালেন প্রথমবার যখন ভারতে এলেন, তখন ১৯৬২ সালের মার্চ মাস। থাকলেন ১৯৬৩ সালের মে মাস পর্যন্ত। অর্থাৎ, ১৪ মাস। বাংলা ভাষার কোনও কবি কি কল্পনা করতে পারেন যে, তিনি ঘানা কিংবা ইথিওপিয়া গিয়ে নিজের খরচে গরিবস্য গরিব হোটেলে থেকে ইথিওপিয়ার কবিতা, ইথিওপিয়ার সংস্কৃতি-জীবন নিজের বুকে ধারণ করে আবার ভারতে ফিরে আসবেন? আমি কি পেরেছি ঘানা কিংবা সেনেগালে গিয়ে থাকতে?

কলকাতায় অ্যালেন গিনসবার্গ

কলজের জোর থাকতে হয়। সেটা আগে ছিল। নিমতলা শ্মশানঘাটে সুনীল-শক্তির সঙ্গে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে থাকা, এলএসডি থেকে গাঁজা টানতে টানতে কেন নিজেকে এতটা ক্ষয় করছিলেন গিনসবার্গ? এসবের কী দরকার ছিল? একজন আমেরিকান কবিকে যদি মা কালীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়? যদি বীরভূমের বাউলদের সঙ্গে রাতের পর রাত কাটাতে হয়? যদি বারাণসীর গঙ্গার ঘাটে বসে থাকতে হয়? কী প্রয়োজন ছিল?

গিনসবার্গ ও অরলভস্কি, মধ্যমণি শক্তি চট্টোপাধ্যায়

১৯৫৬ সালে ‘হাউল’ বেরনোর পর আমেরিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক কবি হিসেবে এতটাই সর্বব্যাপী ছিল যে, আমেরিকার রাস্তাঘাটে লোকে বলত– ‘ওই দ্যাখো, সাংঘাতিক লোকটা হেঁটে যাচ্ছে।’ একটা ছোট্ট কবিতার বই লিখে আমেরিকার মেরুদণ্ডে মাইনাস ৫৫ ফারেনহাইট বইয়ে দেওয়া কবি তার আগে আসেনি। ‘হাউল’-এর লাইন লিখে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ছেলেমেয়েরা ঘুরে বেড়াতে লাগল। তাকে ফেলে দিতে পারল না আমেরিকা। তাকে দু’হাত দিয়ে সরিয়ে দিতে পারল না আমেরিকা। তাকে বুকে টেনে নিতেও পারল না আমেরিকা। আমেরিকার ভেতর এক নতুন আমেরিকা উঠে এল নতুন কবিতাকে ভালোবাসতে। তাছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অশ্লীলতার অভিযোগ তাঁকে টেনে নিয়ে গেল আদালতে। আইন– কবিতার কাছে, শিল্পের কাছে, সাহিত্যের কাছে হার মেনে নিজেকেই সংশোধিত করে নিল। এর নাম গিনসবার্গ। সেই গিনসবার্গ কলকাতার রাস্তায় নগ্ন দাঁড়িয়ে আছেন। কেন, কী চাইতে এসেছেন কলকাতায়? এই নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি আমি ’৯২ সালে বব রজেনথালের অফিসে বসে দেখেছিলাম। তরুণ কবি বব তখন অ্যালেনের বিবলিওগ্রাফার। বব আমাকে সেই দুর্লভ ছবি দেখিয়েছিলেন টাইম স্কোয়ারের ৪২ তলা অফিসে বসে। আমি জীবনে প্রথম কোনও পুরুষ কবিকে নগ্ন দেখলাম। পুরুষের সৌন্দর্য সেই প্রথম আমাকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল।

দ্য হাউল, স্বাক্ষরিত কপি

অ্যালেন কী চাইতে এসেছিলেন ভারতে? গৌতম বুদ্ধের স্পর্শ? বাউলদের পায়ের কাছে বসে বাউল কবিতা লিখতে চেয়েছিলেন? যে-কেউ দেখলে বলবে এটা এক ধরনের ধাপ্পাবাজি! আমেরিকার বিষ পান করে বিষ ঝরাতে এসেছিল বীরভূমে? নিমতলায়? গত ৩৫ বছর ধরে আমি প্রশ্নটা করে এসেছি– তুমি কী পেলে অ্যালেন? কী পেলে তার আগে দেখা যাক, তুমি কী দিয়েছিলে? তুমি যখন কলকাতায় এসে দাঁড়ালে, কলকাতা একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল! তোমার সঙ্গে যে-পুরুষবন্ধুটিকে দেখা গেল তার নাম পিটার অরলভস্কি। এই পুরুষটি তোমার বউ। এভাবেই তার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলে। এত বড় সাংস্কৃতিক ধাক্কা কলকাতা এর আগে পায়নি! তোমার আকর্ষণে ‘কৃত্তিবাস’-এর শক্তি-সুনীল এসে দাঁড়াল। তখনও তাদের ‘নাম’ হয়নি। বদনামটাই বেশি। ‘ক্ষুধার্ত’ প্রজন্মের মলয় রায়চৌধুরী। জমে উঠল বাংলা কবিতার কফি হাউস! কফি হাউস ছড়িয়ে পড়ল শ্মশান পর্যন্ত। মধ্যরাতের কলকাতা পর্যন্ত। শ্যামবাজার থেকে খালাসিটোলা পর্যন্ত।

বিষ পান করে বিষ ঝরাতে

এরকম আগুন বাংলা কবিতায় এর আগে লাগেনি। অ্যালেন, তুমি কি আগুন লাগাতে এসেছিলে? আমাদের কবিতার সংসারে তুমি কি শুকনো পাতা, ঝরাপাতা পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিলে? বাংলা কবিতায় ‘গিনসবার্গ’ নামক এই আগুনটার প্রয়োজন ছিল। এই আগুনটা না-লাগলে বাংলা কবিতাকে বাংলা কবিতা থেকে বের করে আনা যেত না। তুমি আগুন এনে দিলে, কিন্তু তার বদলে কোন আগুন তুমি পেলে? আমি তোমার লেখা পড়ে যতটা বুঝেছি যে, তোমার কবিতা হল, আমেরিকাকে আমেরিকায় দাঁড়িয়ে হোয়াইট হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে, থুতনি নেড়ে এটা বলা– ভিয়েতনামে তুমি ভালো করোনি, লাওসে গিয়ে ঠিক করনি, কম্বোডিয়া তোমার বাপের জায়গা নয়। সেখানকার মানুষগুলো মানুষ– তুমি তাদের মেরে ফেলতে পারো না। এসব কথা বলার লোক, এসব লেখার লোক আর নেই। আমেরিকায় দাঁড়িয়ে কোনও কবির আজ সাহস নেই এটা বলার। হার্ভার্ডে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলাম, গত সপ্তাহে একজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কী তার দোষ? সে তার ফেসবুকে লিখেছিল ‘আমি ডেমোক্রেটিক, আমি সেকুলার, আমি মানবতাবাদী।’ এইজন্য তার শাস্তি! আমি ‘মানবতাবাদী’– এ কথাটা লেখা যাবে না? অ্যালেন, তোমাকে এখন দরকার।

বাংলা কবিতায় ‘গিনসবার্গ’ নামক এই আগুনটার প্রয়োজন ছিল

ভারতে এসে গিনসবার্গ হয়ে উঠলেন আর-একজন গিনসবার্গ। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়ে, বারাণসীর গঙ্গার ঘাট থেকে গঙ্গাকে পিঠে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন সাধু-সন্তদের গুহায়, ঘুরে বেড়ালেন, ভারতের আত্মাকে খুঁজে বেড়ালেন, বৌদ্ধ লামাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ালেন, বীরভূমের বাউলদের সঙ্গে রাতের পর রাত কাটালেন গাছতলায়। ১৪ মাস ধরে একটা একটা মেটামরফোসিস চলল। এক কবির আত্মায়, কবির শরীরে যেন ধারণ করলেন এক নতুন শরীর। হয়ে উঠলেন একজন বাউল, যিনি লিখে চললেন একটার পর একটা বাউল কবিতা। একটা বাউল কবিতায় তিনি লিখলেন: ‘‘আই’ম হোল্ডিং মাই কক টু পি, দ্য আটলান্টিক গাসেস আউট’’। সবাই জানতে চাইল এর মানে কী? আটলান্টিক উঠে যাচ্ছে আকাশে, আকাশ ফিরিয়ে দিচ্ছে জল, সেই জল গ্লাসে ধরে পান করছি, তারপর উইরিন করে বের করে দিচ্ছি আটলান্টিকে।

অ্যালেন গিনসবার্গ ভারতে

আজ হার্ভার্ডে দাঁড়িয়ে আমার বলতে ইচ্ছা করছে– অ্যালেন গিনসবার্গ আসলে একজন মাছে-মাঝি। যিনি নদীর এপার থেকে নৌকো করে একটা সভ্যতা নিয়ে চলেছেন নদীর ওপারে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে। এক উঠোন থেকে আর এক উঠোনে– এটার নামই তো বিশ্বমানবতা। এক আমেরিকা গরল পান করে গঙ্গার ঘাটে দাঁড়িয়ে নিজেকে বিষমুক্ত করার নাম অ্যালেন গিনসবার্গ।