Robbar

আড়ালের প্রতিমা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 29, 2026 2:57 pm
  • Updated:April 29, 2026 3:42 pm  

‘লেখক’ হিসেবে প্রতিমা ঘোষ আত্মপ্রকাশ করেছিলেন প্রায় বাধ্য হয়ে, অনেকটা দেরিতে। অনেক অনুরোধ-উপরোধে। তিনি যদি আরও আগে আত্মপ্রকাশ করতেন, আরও কিছুদিন আয়ু পেতেন, তাহলে এক নতুন নারীস্বরের স্পষ্টতর খোঁজ আমরা পেতাম। যে-লেখায় প্রত্যক্ষভাবে নারীবাদ বা তীব্র নারীবাদের দিকে তিনি ইঙ্গিত করছেন না, কিন্তু সে লেখায় রয়েছে মেয়েদের নিজস্ব মর্ম। যে লেখা গভীরতম স্তরে যেতে চায়। পর্যবেক্ষণের মগ্নতা রয়েছে যে-লেখার মধ্যে।

জয় গোস্বামী

প্রতিমা ঘোষকে যখন প্রথম দেখি, তখন আমার বয়স মাত্র বাইশ। চলছে, সম্পূর্ণ করিনি। প্রবল বৃষ্টির দিন। সেসময় শঙ্খ ঘোষ থাকতেন শ্যামবাজার মোড়ের কাছে। রাস্তা জলে ভেসে গিয়েছে। আমি শিয়ালদায় নেমে ঝড়বাদলের মধ্যেই হাঁটতে শুরু করেছি। পরনে ঝোলা পাঞ্জাবি, আর ভাইয়ের বাতিল করা প্যান্ট। হাতে চটিটা ধরে আছি। হাঁটতে হাঁটতে উপস্থিত হয়েছি শঙ্খ ঘোষের বাড়ি। সেই প্রথম দেখি প্রতিমা ঘোষকে। দু’-হাতে একগাছি সোনার চুড়ি। সোনার রঙের সঙ্গে আলাদা করা যায় না গায়ের রং। আমাকে একটা তোয়ালে দিলেন। আমার জামাটা যাতে শুকোয়– সে ব্যবস্থা করলেন। আমি গেঞ্জি পরে রইলাম। কথা বলতে শুরু করলাম শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে। কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পড়েছিল একটি খাবারের থালা। প্রথম দেখার দিন এইটুকুই মনে পড়ে। এরপর ৪৫ বছর একটানা সে-বাড়িতে বিভিন্ন সময় আমি গিয়েছি। কিন্তু সেসব ব্যক্তিগত কথা, আজ সেকথা বলব না।

প্রতিমা ঘোষ যখন লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, তখন তাঁর বয়স ৭০ পেরিয়ে গিয়েছে। প্রথম বই ‘নয় বোনের বাড়ি’, বেরিয়েছিল ‘তালপাতা’ থেকে, ২০০৯ সালে। আরও একটি বই ‘‘আপনজন ক’জন কবি’’, প্রকাশ পায় ‘পাঠক’ প্রকাশনী থেকে, ২০১৫ সালে। “ক’জন” কথাটির মধ্যে ‘স্বজন’ শব্দটা লুকনো আছে যে, এই বই পড়লেই টের পাওয়া যায়। এই দুই বই নিয়েই আমার আজকের কথা বলা। অবশ্য় এছাড়াও, তাঁর আরেকটি বই রয়েছে– ‘সেইসব কথা’। সে বই আমার পড়া হয়নি, তবে দ্রুতই পড়ে উঠব তা। কিন্তু এখন, একটা কথা জরিপ করে নিতে হবে, কেন প্রতিমা ঘোষ লেখক হিসেবে আগে আত্মপ্রকাশ করলেন না? কেন প্রায় শেষ জীবনে প্রকাশিত হল ওঁর নানা চিঠিপত্র– এতদিন কোথায় ছিলেন? একথা বোঝার জন্য, আড়ালের জগৎ থেকে ঘুরে আসতে হবে।

মনে পড়ে, ফ্রানস কাফকার কথা। তিনি লিখছেন। না-লিখে পারছেন না। কিন্তু ম্যাক্স ব্রডকে নির্দেশ দিচ্ছেন, পাণ্ডুলিপিগুলো পুড়িয়ে দিতে। কেন এমন বলছেন কাফকার মতো একজন লেখক?

এমিলি ডিকিনসন। প্রয়াত হয়েছিলেন মাত্র ৫৬ বছর বয়সে। প্রথম জীবনে ৪-৫টি মাত্র কবিতা প্রকাশ করেছিলেন। তারপর থেকে সারাদিনরাত তিনি শুধু কবিতাই লিখতেন। সুতো দিয়ে সেসব কবিতা বাঁধতেন। ড্রয়ারে নিক্ষেপ করতেন। তারপর ড্রয়ার বন্ধ করে দিতেন। তিনি চাইতেন না, সেইসব কবিতা লোকসমক্ষে আসুক, প্রকাশ পাক। যে-ডাক্তার চিকিৎসা করতেন এমিলি ডিকিনসনের, তিনি একটি পর্দার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে এমিলির উপসর্গ শুনতেন। ভেতরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। এমিলির মৃত্যু হয় ১৮৮৬ সালে। দিদির মৃত্যুর পর ড্রয়ার থেকে কবিতাগুলি বাইরে এনেছিলেন তাঁর বোন। প্রকাশ করেছিলেন। তৎকালীন যাঁরা সমালোচক-সম্পাদক, বেশ কিছু পরিমার্জনা করেছিলেন সেইসব কবিতার। তখনই এমিলি ডিকিনসনের নাম প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ে একজন সত্যিকারের ‘কবি’ হিসেবে। যদিও তাঁর কবিতার পুরোপুরি চেহারাটা পাওয়া যায় ১৯৫৫ সালে, অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর ৬৯ বছর পরে। এই বছর কোনও সম্পাদনা না-করে, অবিকৃত অবস্থায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। আমরা এখন সেই অসম্পাদিত মূল ডিকিনসনকেই পড়ি।

এমিলি ডিকিনসন

কিন্তু কেন এমিলি ডিকিনসন বলেছিলেন, নিজের কোনও লেখা তিনি প্রকাশ করতে চান না? বাংলাদেশের এক অধ্যাপক, ডিকিনসনকে নিয়ে তাঁর কাজ, তাঁর লেখা বই আমাকে দিয়েছিলেন। সেখানে দেখেছি, এমিলি তাঁর বোনকে চিঠি লিখছেন। যদিও একই বাড়িতে থাকতেন দুই বোন। গ্যালিলিও-র মেয়ে একই বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও গ্যালিলিওকে যেমন চিঠি লিখতেন, তেমনই ডিকিনসনও বোনকে লিখছেন চিঠি। কেন? তাঁর জীবন বলে তিনি মগ্ন ছিলেন সাইলেন্সের সাধনায়। তারই একটি চিঠিতে লেখা: ‘আমার শরীরের সঙ্গে আমার এই লেখাগুলোও যেন কবরে নামিয়ে দেওয়া হয়।’

ডিকিনসনের মৃত্যুর বছরেই, ১৮৮৬ সালে, লিও টলস্টয় রাশিয়ায় লিখছেন ‘দ্য পাওয়ার অফ ডার্কনেস’ নামের নাটকটি। তিনিও বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল এক গ্রাম্য স্টেশনে। এক স্টেশন মাস্টার চিনতে পেরে নিজের ঘরে নিয়ে যান যখন, তাঁর গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। সেই জ্বর বদলে যায় নিউমোনিয়ায়। তাঁকে যখন ঘরে নিয়ে আসা হয়, তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯১০ সালে।

আমাদের প্রতিমা ঘোষও যতদিন না পর্যন্ত বই লিখলেন, ততদিন পর্যন্ত, এমনকী, বই লেখার পরেও নিজেকে সকলের থেকে আড়ালে রাখলেন। তিনি নিশ্চয়ই এমিলি ডিকিনসনের মতো কারও সঙ্গে দেখা করব না বলেননি, টলস্টয়ের মতো বাড়ি ছেড়ে চলে যাননি, কাফকার মতো ‘আমার লেখা পুড়িও দিও’ বলেননি– কিন্তু তিনি নিজেকে অন্তরালে রেখেছিলেন। আসলে বলতে চাইছি, আড়ালের মনোভঙ্গির এই মিলের কথা।

আমি এই সমস্ত ঘটনাই যোগ করছি। যেমন ইশকুলে ‘কালপুরুষ’ যখন পড়ানো হত, তখন ব্ল্যাকবোর্ডে একটা-একটা করে ফুটকি দিয়ে দাগ টেনে এনে মাস্টারমশাই দেখাতেন– ‘এইটা হল কোমরবন্ধ।’ ‘এইটা হল কালপুরুষের পা।’ ‘এইটা আরেকটা পায়ের অগ্রভাগ।’ আমি এভাবেই এই ইতিহাসটা যোগ করছি। কিন্তু আমার বলার কথা, কেন একজন লেখক বলেন– এই লেখাটা কিছু হয়নি?

অমৃতা ভট্টাচার্য, একবার দীর্ঘ কবিতা পাঠিয়ে বলেছিলেন, ‘এটা কিছু দাঁড়ায়নি।’ সে দীর্ঘ রচনা প্রকাশ পায় বর্ধমানের প্রত্যন্ত একটি লিট্‌ল ম্যাগাজিনে। নাম: ‘ইমন ও কিছু জীবনশৈলীকথা’। কিছুদিন পরে, চেকোস্লোভাকিয়ার প্রথম সুররিয়ালিস্ট কবি ভিচেস্লাভ নেজভাল-এর বই ‘দ্য অ্যাবসলিউট গ্রেভডিগার’ আমি সংগ্রহ করলাম। বইটি ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল ২০১৬ সালে। অনুবাদক দু’জন– স্তেফান ডেলবস এবং তেরেজা নভিকা। সে-বইয়ে, অমৃতা যে-আঙ্গিক ব্যবহার করেছেন, ঠিক সেরকমই একটি ধরন ব্যবহার করা হয়েছে। কীরকম সে ধরন? সে রচনা এগচ্ছে কখনও সংলাপে, কখনও কবিতায়, কখনও দীর্ঘ বর্ণনায়– অর্থাৎ, একটা লেখায় অনেকগুলি আঙ্গিক-ধাপ কাজ করছে। চেকোস্লোভাকিয়ার সেই কবি ১৯৩৫-’৩৭ সাল– এই তিন বছর জুড়ে বইটি লিখেছেন। বইটি তাঁকে দিই। আমি বললাম, ‘এই বই আপনি পড়বেন। নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নেবেন। আপনার রচনা সম্পর্কে তাহলে অনাস্থা থাকবে না।’

ফ্রানস কাফকা

তাহলে এই ‘অনাস্থা’ কেবল কাফকার নয়, এমিলি ডিকিনসনের নয়, যে কোনও লেখকেরই হতে পারে। কিন্তু কেন? কারণ, একজন লেখক তো একজন পাঠকও। একজন লেখকেরও রুচি তৈরি হয় পূর্বে যা যা পড়েছি, বা এই মুহূর্তে যা যা পড়ছি, তারই একটা মান্য ধারা যা উত্তরকালে তৈরি হয়ে উঠছে, সেটাকেই বাকি সকলের মতো ‘বিকল্পহীন’ ধরে নেওয়া। এখন যে-ধরনের উপন্যাস লেখা হয়, তার ৯৮ ভাগ উপন্যাস পুজোসংখ্যায় যাঁরা উপন্যাস লিখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন গত ৫০ বছরে, তাঁদের ধারায় রচিত। পূর্বসূরিরা সাফল্য পেয়েছেন, ফলে, যে-ধারায় সাফল্য আছে– সেই ধারাটাই ‘মান্য ধারা’ হয়ে যায়। তার পরবর্তী লেখক-কবিরা মনে করেন– এই ধারাটাই তাহলে ঠিক। ফলে ওই ধারার বাইরে যিনি লিখছেন, লিখে ফেলছেন, সে লেখকের নিজের ভেতরের এক সন্দেহ ক্রমাগত বলে চলেছে– ওটা যদি ‘সাহিত্য’ হয়, তাহলে আমারটা কী করে সাহিত্য হতে পারে? ফলে এটা ‘পুড়িয়ে দাও, প্রকাশ করো না।’ কোনও কোনও জিনিয়াস থাকেন, তাঁরা অন্যরকম ভাবে ভাবেন। কলমে তো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। লিখতে শুরু করলে খুলে যায় অবচেতন। শেষ হয়ে যাওয়ার পর, মনে হয়, এটা কী হল! তাঁদের জন্য আমার মতো দু’-চারজন লোক থাকে। যারা রাজার চিঠি দেশে-দেশে ঘরে-ঘরে বিলি করে বেড়ায়। তারা এমন একটা বইয়ের খোঁজ পেলে বলে, এই দেখুন, এটা পড়ে দেখুন। এটা ওই সালে লেখা হয়েছিল। উল্টোদিকের পাঠক তখন বলেন, আরেহ! আমি তো এটা পড়িনি!

১৯৫৬ সালে, শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে বিবাহ হয় প্রতিমা ঘোষের– তারপর থেকে অন্তত চারটি দশক এবং তারও বেশি সময় তিনি যে ‘লেখক’, তিনি যে লিখতে জানেন, তার কোনও প্রকাশ তিনি বাইরে রাখেননি। নিজের লেখকসত্তাকে অন্তরালে স্থাপিত করেছিলেন। কিন্তু যে-জিনিসের সাধনা করেছেন, তা লিখিত শব্দের সাধনা। জনসমক্ষের ‘পারফর্মিং আর্ট’-এর সাধনা নয়।

জীবনানন্দর উপন্যাসগুলিও তো তাঁর জীবদ্দশায় বেরয়নি। কিন্তু জীবদ্দশায় প্রকাশ পায়নি বলেই কাফকা, জীবনানন্দর উপন্যাস, এমিলি ডিকিনসনের কবিতা– মানুষের দ্বারা, মর্মগ্রাহী রসিক পাঠকের দ্বারা গৃহীত হয়নি কি? সম্মান পায়নি? পেয়েছে তো! এঁদের প্রত্যক্ষ হাততালির দরকার পড়েনি। কারণ ওঁরা বুঝেছেন লেখা তো ঘরে বসে রেওয়াজ করলেই হয়। প্রতিমা ঘোষও এই রেওয়াজ করে গিয়েছেন নিভৃতে।

শঙ্খ ঘোষ নিজের জীবন উপান্তে এসে খুলে বসেছিলেন ‘পুরনো চিঠির ঝাঁপি’। সেখানে একে একে অসামান্য সব চিঠি প্রকাশিত হতে লাগল। তখন দেখা গেল অমিয় চক্রবর্তী, অমিতা সেন, সমর সেন– আরও বহু মান্যগণ্য মানুষের চিঠি। সমর সেন যে চেরাবান্দা রাজুর কবিতার অনুবাদ করেছেন এবং সেই অনুবাদের প্রয়োজনীয় সংশোধন করে দিতে বলছেন ওঁকে, ৪৫ বছর মিশেছি– একথা কখনও শঙ্খ ঘোষকে ভুলক্রমেও বলতে শুনিনি। ভারতের সমস্ত পুরস্কার পেয়েছেন, কিন্তু আত্মপ্রচারের খুদকুঁড়োও শঙ্খ ঘোষ কখনও ঠোঁটে তুলে নেননি। এই আড়ালের কথাই তো তিনি ‘নিঃশব্দের তর্জনী’তে লিখেছেন। কিন্তু এই আড়ালেরই আরেকটা অসম্ভব উদাহরণ হয়ে, একই বাড়িতে, প্রতিমা ঘোষ বেঁচেছিলেন।

২.
বারটোল্ড ব্রেশট একটি গদ্যরচনায় লিখেছিলেন: ‘একটি পুরুষ, একটি নারী– ক্ষুদ্রতম সামাজিক একক।’ আমার মন সচল হয়ে ওঠেছিল এই বাক্যে। ভাবতে থাকি, একটি পুরুষ, একটি নারী মানে একটি পরিবার? তাহলে কয়েকটি পরিবার মিলে একটি পল্লি বা পাড়া। কয়েকটি পল্লি মিলে একটি জনপদ। কয়েকটি জনপদ নিয়ে একটি শহর। আরও কয়েকটি শহর মিলে একটি রাজ্য। রাজ্য থেকে দেশ। কয়েকটি দেশ মিলে সম্পূর্ণ পৃথিবী!

বারটোল্ড ব্রেশট

কিন্তু আমি যখন একটি গদ্যরচনা পড়ি, কীভাবে পড়ি আসলে? কোন জিনিসটা আমাকে আকর্ষণ করে? ব্রেশটের ওই সামাজিক এককের ধারণাটি আমি ওই পাঠের ধারণায় প্রয়োগ করি। একটা উপন্যাসের বা গল্পের ক্ষুদ্রতম একক কী? উত্তর পাই: তার প্রথম বাক্য। একেবারে অজানা-অচেনা একজন লেখিকা, রাজ্যশ্রী ঘোষ, লিট্‌ল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক গল্পে তাঁর প্রথম বাক্যটি লিখছেন: ‘বিয়ের চক্করে রাবেয়াকে পড়তেই হত না, যদি না পদ্মদিঘির ধারে সূর্যাস্তের সময় ঝোপজঙ্গলের ভেতর থেকে ওই মুশকো মতো একটা লোক উঁকিঝুঁকি মারা শুরু করত।’ এই হল একটা ‘গ্রিপিং সেনটেন্স’। পাঠককে কামড়ে-ধরা বাক্য। কয়েকটি বাক্য নিয়ে একটা প্যারাগ্রাফ, কয়েকটি প্যারাগ্রাফ নিয়ে একটি অধ্যায়। কয়েকটি অধ্যায় নিয়ে একটি গদ্যবই। তাহলে যে কোনও গদ্যের ক্ষুদ্রতম একক একটি বাক্য।

অজিত গঙ্গোপাধ্যায়ের অনূদিত ‘হ্যামলেট’-এর অভিনয় হয়েছিল বেতারকেন্দ্রে। সে নাটকে একটি সংলাপ ছিল এইরকম: ‘মিতব্যয়, হোরেশিও, মিতব্যয়।’ প্রতিমা ঘোষের লেখায় পেয়েছিলাম সেই মিতব্যয়ী বাক্যগঠন। এই বইয়ে, চরিত্ররা জীবন্ত, অল্প আঁচড়েই। এমন একটা দিক, এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যা একজন নারীই বলতে পারেন। অথচ ‘নারীবাদী’ লেখা নয়। নারীবাদী লেখার নিন্দা বা প্রশংসা করছি না। শুধুমাত্র প্রতিমা ঘোষের লেখা আমার কাছে কীরকম, তা বলতে চাইছি।

নিজের লেখায় উচ্ছ্বাসকে সংবরণ করেছেন তিনি। সেই সংবরণের মধ্যে কোনও জোর খাটাননি। স্বভাবের অন্তঃসারজাত সংবরণ। এই বই পড়া একটা স্প্রিংয়ের মতো, পড়া হয়ে গেল যখন, আপনি স্প্রিংয়ের ওপর থেকে হাতটা সরিয়ে নিলেন, স্প্রিংটা লাফিয়ে উঠল। এই স্পিংয়ের উপমাটি আমার উপমা নয়। অরুণ মিত্রর উপমা। অর্থাৎ, লেখাটি পড়া শেষ হয়ে গেল যখন, তখনই লেখাটি জীবন্ত হয়ে আবার কাজ করতে শুরু করল পাঠকের মনে। লেখক মিলিয়ে গেলেন। একথা আমরা রঁলা বার্থের সূত্রে জানি। ১৯৬৭ সালে রঁলা বার্থ একথা বলেছিলেন, কিন্তু অরুণ মিত্রও মণীন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত ১৯৭৮ সালের ‘পরমা’ পত্রিকায় নিজের কবিতাজীবন নিয়ে লেখা এক গদ্যে এই উপমা ব্যবহার করেছিলেন।

প্রতিমা ঘোষের ‘নয় বোনের বাড়ি’র মিতকথন পাঠকের ভেতরে তৈরি করেছে বইয়ের সময়টা। যে-সময় পাঠক জন্মাননি কিংবা জন্মালেও মাত্র কয়েক বছরই বয়স, যে-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পাঠক যাননি আদৌ, যে-পরিবেশ দেখেননি– সেই আবহ পাঠকের মধ্যে তৈরি হয়ে ওঠে। তাঁর এই দক্ষতা ও পর্যবেক্ষণ, সংবেদনের নম্র উদ্ভাস প্রমাণ করে– তিনি নিজেকে গোপনে তৈরি করেছেন। নইলে এই মিতব্যয়ী রচনাপথে এত অনায়াসে তিনি এই শান্ত অভিযাত্রায় আমাদের সামনে এনে দিতেন না এক তীর্থস্নান। বিস্মিত হতে হয়– কী করে গোপনে এতটাই প্রস্তুত করলেন তিনি নিজেকে! হয়তো শুধুই শুনে-শুনে। ধ্রুপদী সংগীতের ঘরনায় যাকে ‘শুন্‌নি শারগীদ্‌’ বলে, অনেকটা সেইরকম।

প্রতিমা ঘোষের ‘নয় বোনের বাড়ি’তে তিনি আত্মস্মৃতি ও অবলোকন কথা বলেছেন। যেমন গানে লাগে স্পর্শস্বর, তেমনই মৃদুতায়। ধাপে ধাপে। কয়েকটা বাক্যে। প্যারাগ্রাফে। ব্রেশট যেমন বলেছিলেন ওই ক্ষুদ্রতম সামাজিক একক– সেই উপায়াবলম্বন করেই যেন। তিনি শব্দ নিয়ে সতর্ক। কিন্তু সেই সতর্কতা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বা কমলকুমারের মতো নয়। তাঁদের মতো মারকাটারি বাক্যের প্রতি যে-আকুতি, তা প্রতিমা ঘোষের লেখার মধ্যে অনুপস্থিত। প্রতিমা ঘোষ তা ইচ্ছে করেই রাখেননি। আসলে তো বাক্য তো গুরুত্বপূর্ণ নয়, রচনাটির হয়ে ওঠাটাই আসল। তানকর্তব, বোলতান, সরগম– এইসব করার থেকে যেমন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাগদারী। নীলাক্ষ গুপ্ত একবার লিখেছিলেন, ‘উন্নতমানের হস্তকৌশলই একজন সেতারবাদকের পরিচয় নয়।’ ওস্তাদ শাহিদ পারভেজ একই কথা বলেছেন অন্য জায়গায়। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বা কমলকুমার মজুমদার তুলনাহীন সাহিত্যসৃষ্টি করেছেন, সন্দেহ নেই। কমলকুমার মজুমদার একটা বাক্য লিখতে যে-পদ্ধতি নিতেন, সেই পদ্ধতি কিন্তু নিচ্ছেন না প্রতিমা ঘোষ। কারণ তিনি ‘লেখক’ হওয়ার জন্য লিখছেন না। তিনি যা দেখতে পাচ্ছেন, স্মৃতিপটে যা উদ্ভাসিত হচ্ছে, তিনি তাই-ই লিখছেন।

কমলকুমার মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

শঙ্খ ঘোষ কথা বলতেন কম। তাঁর কম কথা বলা খুবই বিখ্যাত। কিন্তু প্রতিমা ঘোষ শঙ্খ ঘোষের চাইতেও কম বলতেন। কথা বলার ‘মিতব্যয়’ ঢুকে পড়েছে তাঁর লেখার মধ্যেও।

৩.
বুদ্ধদেব বসুর কথা আমি বারেবারে টেনে আনি। নানা লেখায়। তাঁর স্মৃতিকথা, গদ্য, প্রবন্ধ আমার প্রিয়। বিশেষ করে, ‘আমার শৈশব’, ‘আমার যৌবন’, ‘আমাদের কবিতাভবন’। উচ্ছ্বসিত বিশেষণ ব্যবহার– তাঁর প্রকৃতি। পাঁচের দশকে যাঁরা ওঁর বাড়ি যেতেন, কবিতা-লিখিয়ে, তাঁরা অনেকেই আমাকে বুদ্ধদেব বসু নিয়ে কথা হলে, বলেছেন, ‘ও কিছু না।’ কিংবা, ‘বড় বিশেষণের বাহার’। ওঁর ক্লাসের ছাত্র, পরবর্তীকালে কবি হিসেবে নাম করেছেন, এমনকী, তিনিও বলেছেন। কিন্তু কথা হল, বুদ্ধদেব বসু তো তাঁর প্রকৃতি ছেড়ে চলে যেতে পারেন না।

বুদ্ধদেব বসু

প্রতিমা ঘোষের দ্বিতীয় বইয়ের কথায় আসি। ‘‘আপনজন ক’জন কবি’’। বুদ্ধদেব বসুর কথা বললাম কেন একটু আগে? কারণ বুদ্ধদেব যখন কবিদের প্রসঙ্গে কথা বলতেন, তখন যাঁদের ভালোবাসতেন, তাঁদের ব্যাপারে অনেক বিশেষণ ব্যবহার করতেন। কিন্তু প্রতিমা ঘোষের এই বই পড়ে বিস্মিত হলাম কেন! পড়তে গিয়ে দেখলাম, যে-যে কবির কথা তিনি বলছেন, তাঁদের প্রত্যেককে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, স্নেহ করেন। কিন্তু তিনিই যখন লিখছেন তাঁদের রচনার প্রসঙ্গে, সূক্ষ্মতম বিশ্লেষণ করছেন, তখন তিনি আলাদা প্রতিমা ঘোষ। এক প্রতিমা– যিনি সংস্পর্শে এসেছেন কবিদের, আরেক প্রতিমা যিনি কবিদের লেখা নিয়ে কথা বলছেন– এই দুই প্রতিমা মিশে গিয়েছেন এই বইয়ে। যেভাবে দু’টি নদী মিশে যায়। শুধু একটা ধারাই সত্য নয়। তিনি দেখিয়ে দিলেন, ভালোবাসার পরও, ব্যক্তিগত আলাপ-পরিচয়ের পরও এই দূরত্ব রচনা করে এমন লেখা সম্ভব। ফলে কবিদের নিয়ে লেখা এই বই অনেকটা বুদ্ধদেব বসুর উত্তরসূরি হয়েও আলাদা। এবং লক্ষণীয়, এ-বইতে বাহুল্য এসে পড়ল না কোথাও। বুদ্ধদেব কিন্তু বাহুল্যকেও শিল্প করে তুলতেন। কিন্তু প্রতিমা ঘোষ সে পথে যাননি। তাঁর শিল্প তাঁর হাতে তৈরি ‘দশহাত দুগ্গা’।

‘লেখক’ হিসেবে প্রতিমা ঘোষ আত্মপ্রকাশ করেছিলেন প্রায় বাধ্য হয়ে, অনেকটা দেরিতে। অনেক অনুরোধ-উপরোধে। তিনি যদি আরও আগে আত্মপ্রকাশ করতেন, আরও কিছুদিন আয়ু পেতেন, তাহলে এক নতুন নারীস্বরের স্পষ্টতর খোঁজ আমরা পেতাম। যে-লেখায় প্রত্যক্ষভাবে নারীবাদ বা তীব্র নারীবাদের দিকে তিনি ইঙ্গিত করছেন না, কিন্তু সে লেখায় রয়েছে মেয়েদের নিজস্ব মর্ম। যে লেখা গভীরতম স্তরে যেতে চায়। পর্যবেক্ষণের মগ্নতা রয়েছে যে-লেখার মধ্যে।

প্রতিমা ঘোষ লিখলেন, আর আড়ালটুকু তাঁর সমস্ত লেখকজীবনের বর্ম হয়ে রইল। আড়ালের আয়ু আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিলেন তিনি, তাঁর নিজস্ব নারীকলম দিয়ে।

………………………………….
(কথা বলে অনুলিখিত)