


বইটা বেরয় বুকফেয়ারের একটু আগে। স্যরের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল প্রতিমাদির সঙ্গে ওঁর সম্পর্কের কথা লেখা তো দূর, বলাও যাবে না। কিন্তু এসব তো আর চাপা থাকে না। বইপাড়ার পুরনো দু’-একজন বলেছিলেন– উত্তম-সুচিত্রা একসঙ্গে, নামালি কী করে? বইটা প্রথম ২-৩ দিনে তেমন কিছু বিক্রি হল না। সম্ভবত মলাটের কারণে নেড়চেড়ে অনেকেই দেখলেন। একটু মনখারাপ হয়নি বললে মিথ্যে বলা হবে। তবে গুরুদেব প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য বলে দিয়েছেন, শুধু সেই বই করবে যাতে তুমি বিশ্বাস করো। বিক্রি হলে ভালো, না-হলে তুমি তো বিশ্বাস করো।
স্যর বা শঙ্খ ঘোষের বাড়িতে নিয়মিত যাওয়ার প্রায় বছরখানেক পর প্রতিমাদির সঙ্গে আলাপ। না, সাহিত্য নয়, মটরশুঁটির কচুরি নিয়ে। ঠাকুমার তৈরি কচুরি ওরকমই স্বাদু। উনি ছিলেন প্রতিমাদির মতোই দাপুটে, সুন্দরী, রান্নার হাত অসামান্য বললেও কম বলা হয়! শুনেছি, ঠাকুরদা বেশ সমঝে চলতেন, স্যরও কি? কে জানে! ঠাকুমার কথা (আমি বলতাম ‘আম্মা’ ) প্রতিমাদি অনেক শুনেছেন। মা-বাবার কথাও হয়েছে। তবে কম।

বেশ ভাব হয়ে যাওয়ার পর প্রতিমাদির কাছে অনেকের অনেক গল্প শুনেছি। লিখতে বসে মনে পড়ছে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা (নাকি কবিতা সংগ্রহ?) কাজ চলছে। বাইরের ঘরে তা নিয়ে শঙ্খবাবু সৌরীনবাবুরা জেরবার! আর সুভাষ মুখোপাধ্যায় তখন ‘এসো তো প্রতিমা’ বলে ওঁকে ভিতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে বোঝাচ্ছেন অটোমেটিক ওয়াশিং মেশিন তৈরির পরিকল্পনা।
ব্যাপারটা কী? প্রশ্ন করায় প্রতিমাদি হেসে বললেন, ‘কিছুই না। আসলে সুভাষদার ধারণা ছিল উনি মস্ত মেকানিক। বাড়িতে এলেই কিছু খারাপ হয়েছে শুনলেই চেয়ে নিয়ে খুলে ফেলতেন তারপর জুড়তে পারতেন না।’

চারটে বই নিয়ে আমি শুরু করেছিলাম পাবলিকেশন ‘তালপাতা’। সবাই বলেছিল, এভাবে হয়! অন্তত ১০-২০টা বই তো লাগেই। না-হলে অন্য প্রকাশনীর বই নাও। রাজি হইনি। আমার কথা শুনে যে-তিনজন সাপোর্ট করেছিলেন তাঁর প্রথম জন– আমার গুরু প্রদ্য়ুম্নবাবু হলে, পরের দু’জন পার্থদা আর প্রতিমাদি।
প্রথম বছরের বইগুলো বেশ ভালো বিক্রি হওয়ার পর দ্বিতীয় বছর ঠিক করলাম প্রতিমাদির বই করব। বেশ খানিকটা তক্কাতক্কির পর বললাম, ‘বলেছি যখন বই তো করবই। আপনি পাণ্ডুলিপি করে দিলে ভালো, না-হলে আমি বানিয়ে নেব।’
ওঁর লেখা ছিল অদ্ভুত মায়াময়। লীলা মজুমদারের শার্প মজা নেই ঠিকই, কিন্তু মা-ঠাকুমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মতো। যেন-বা পাশে বসে গল্প শোনাচ্ছেন সুখলতা রাও!
বই নিয়ে কথা হচ্ছে স্যরের শোওয়ার ঘরের বারান্দার দিকের দরজার সামনে। উনি মোড়ায়, আমি খাটে। ওদিকের দরজার সামনে স্যর। সে-বছর রবীন্দ্রনাথের চারপাশের মানুষজনদের নিয়ে স্যরের একটা বই হচ্ছে– ‘ভিন্নরুচির অধিকার’। এমনিতে কোনও লেখা ছাপার ব্যাপারেই ওঁর একটা অদ্ভুত সংকোচ কাজ করত। এবারে প্রতিমাদির বইয়ের কারণে তার মাত্রা একটু বেশিই চড়া।
দরজার সামনে থেকে, রেগে ওঠা গলার চেয়ে আরও এক-দু’-ধাপ চড়িয়ে বললেন, ‘উঠে যাবে, তোমার প্রকাশনা উঠে যাবে।’

জবাবে বলতেই পারতাম, ‘গেলে যাবে।’ তা না, বলে ফেললাম, ‘আপনি যত বড় কবি আমি তার চেয়ে কিছু ছোট সেলসম্যান নই।’ ব্যস, স্যরের দৃষ্টি স্থির, চোয়াল শক্ত! প্রতিমাদি আমার দিকে তাকিয়ে হেসে অল্প ঘাড় হেলিয়ে বললেন, ‘করে ফেল।’ এরপর স্যরের সঙ্গে ওঁর কী কথা হয়েছিল, সেসবের মধ্যে ঢুকছি না। বইটা বেরয় বুকফেয়ারের একটু আগে। স্যরের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, প্রতিমাদির সঙ্গে ওঁর সম্পর্কের কথা লেখা তো দূর, বলাও যাবে না। কিন্তু এসব তো আর চাপা থাকে না। বইপাড়ার পুরনো দু’-একজন বলেছিলেন– উত্তম-সুচিত্রা একসঙ্গে, নামালি কী করে?

বইটা প্রথম ২-৩ দিনে তেমন কিছু বিক্রি হল না। সম্ভবত মলাটের কারণে নেড়চেড়ে অনেকেই দেখলেন। একটু মনখারাপ হয়নি বললে মিথ্যে বলা হবে। তবে গুরুদেব প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য বলে দিয়েছেন, শুধু সেই বই করবে যাতে তুমি বিশ্বাস করো। বিক্রি হলে ভালো, না-হলে তুমি তো বিশ্বাস করো।
এই যুক্তি আঁকড়ে বসে আছি। মনে মনে হিসেব করছি, কমপক্ষে কত বিক্রি হতে পারে। কত সময়ে কোন কৌশলে সামাল দেওয়া যাবে খরচের। কিন্তু ৩ নম্বর দিন আমার সমস্ত হিসেব বানের জলে ভাসিয়ে শুরু হল বিক্রি! হাতে গরম জিলিপিকে লজ্জা দিয়ে এক একজন ৫, ১০ এমনকী, ২৫ কপি অবধি কিনলেন। এঁদের মধ্যে দু’-একজন বাদে কেউই ‘দোকানি’ নন। নিজের পড়ে এতটাই ভালো লেগেছে যে, আত্মীয়-বন্ধুদের জন্য কিনছেন।

বুঝতেই পারছেন, এরপর প্রথম সংস্করণ শেষ হতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়, লাগেওনি। এরপর স্যরকে তো বটেই, এমনকী, আমাকেও অবাক করে বইটির বেশ ক’টি এডিশন হয়।
২.
প্রতিমাদি যে-ক’বার আমাদের বাড়ি এসেছেন, আমার মেয়ের সঙ্গে লম্বা গল্প করেছেন, স্ত্রী-কে কই মাছের গঙ্গা-যমুনা করা শিখিয়েছেন। ওদের বিরাটির বাড়ি বা বিয়ে হয়ে বালিগঞ্জে আসার গল্প শুনেছেন। বলেছেন, ওঁদের জলপাইগুড়ি, বহরমপুরের বাড়ি আর বাগানের গল্প। ‘এত যে বেড়াতে যান, কখনও কিছু আনেন না কেন?’ বলায় প্রথম আসে নৌকায় জিনিস বিক্রি করতে আসা একটি মেয়ে। নৌকায় বসা সেই মূর্তিটি চোট গেলেও ঘুমের মধ্যে এখনও মাঝেমধ্যে তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় আমার। তবে জলপাইগুড়ি থেকে আনা ব্রাউন গণ্ডারটা অবশ্য এখনও আমার পাশেই থাকে, আমির হামজা-র রোমাঞ্চ কাহিনির ওপর।
লেখালিখি নিয়ে ওঁর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট এবং অনেক সময়ই মর্মঘাতী। স্যরের এক ছাত্র পাণ্ডুলিপি ফেরত নিতে এসেছে। স্যরের হাতে তার ম্যানুস্ক্রিপ্ট। এহেন সময় প্রতিমাদি শোওয়ার ঘর থেকে বসার ঘরে এসেছেন, বেরবেন। ছাত্রটি দুম করে বলে বসে, ‘এই কবিতাগুলো দেখেছেন দিদি?’
মাথা নাড়েন প্রতিমাদি। ‘দেখেছি, খুব খারাপ। কখনও লিখো না তুমি।’

আমার লেখা কম-বেশি ভালোই বলেছেন। শুধু একবার একটা ভজন অনুবাদ করতে না-পেরে স্যরকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছিলাম। জানতে পেরে প্রতিমাদি বলেছিলেন, ‘যে-কাজ নিজে পারো না করতে যাও কেন!’
৩.
অনেক মানুষ থাকেন এই মর-পৃথিবীর ধোঁয়াধুলো যাঁদের স্পর্শ করে না, আমার দেখায় প্রতিমাদি ছিলেন তেমনই একজন। বারান্দায় ফুলগাছ দোলানো হাওয়ার পাশে মোড়ায় বসে আলো দেওয়া ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে একমনে বই পড়ছেন– এই ছবিটার কথাই মনে পড়ছে বারবার। আগে বিকেলে নিয়মিত হাঁটতেন হাউজিংয়ের মধ্যে। পরে অবশ্য শরীরের কারণে সেটা বন্ধ হয়ে যায়।

ওঁর যুক্তিগুলো ছিল অনন্য! তেমনই একটা ঘটনা দিয়ে শেষ করা যাক। এটা আজকের কথা নয়, মোবাইল তখনও এতটা জলচল হয়নি। দেবেশ রায়ের মায়ের শ্রাদ্ধের নেমন্তন্ন খেয়ে ফিরছি। আমি, শঙ্খবাবু, প্রতিমাদি ও আরও কেউ কেউ। পাশে, দেবেশ রায়। হাতে ঝাঁ-চকচকে মোবাইল। হাঁটতে হাঁটতে প্রতিমাদিকে বললেন, ‘এবার শঙ্খদাকে একটা মোবাইল নিতে বলুন।’
প্রতিমাদি আকাশ দেখছিলেন আপনমনে। খেয়াল করেননি। দ্বিতীয়বার বলার পর অবাক চোখে তাকালেন, ‘মোবাইল টেলিফোন! কী লাভ? বাড়িতে দুটো ফোন আর ওর তো দুটোই কান।’
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved