Robbar

সমলিঙ্গ কবিতার নিভৃত দেশ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 30, 2026 8:50 pm
  • Updated:June 30, 2026 9:15 pm  

জুন মাস শেষ হচ্ছে আজ। সিংহের দলকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘pride’। যেমন কোনও মানবিক অনুভূতি লিঙ্গপরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, তেমনই সিংহশিশুদের এই প্রাইড মার্চও সীমাবদ্ধ থাকবে না একটি মাসের সময়-পরিসরে। তাই চলুক এই রঙিন উদ্‌যাপন। মুখে মুখে উঠে আসুক মানবতার জয়গান। শরীর ছাপিয়ে ভালোবাসার রং লাগুক মনে-মননে-চিন্তনে। গর্ব কীসে হয়? মানবতার উত্থানে হয়। সংকীর্ণতার অবসানে হয়। ভালোবাসার জয়ে হয়। ঘৃণার পরাজয়ে হয়। তাই এই উৎসব জারি থাক।

রবীনা মিত্র

কবিতা কোন লিঙ্গ? স্ত্রী না পুরুষ? 

এই প্রশ্নে আর কত যুগ ধরে কেঁপে উঠবে ভিটে?

কবিতা প্রেমলিঙ্গ।

কবিতার অক্ষরে অক্ষরে বিচিত্র বর্ণচ্ছটা। শব্দ-মধ্যের শূন্য অবকাশে শঙ্খলাগা দেহস্রোত, তুচ্ছতার শান্ত উৎসব, আশ্চর্য বিস্ফোরণ, শান্তিচুক্তি, গোধূলিস্নান, নীরব বিষোদগার! কবিতায় পক্ষপাত নেই। কবিতায় বলা বারণ, এমন কোনও কথা থাকার কথা নয়। অবশ্যই ছাপার অক্ষরের কবিতার কথা বলছি না। কবিতামাত্রেই তা ছাপাখানায় যাবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। কবির বসবাস এক নিভৃত মায়াকুঞ্জে। যে মানুষ কোনওদিনও এক লাইনও কবিতা লেখেননি, তিনিও কবি হতে পারেন। তার ভোরের দিকে চেয়ে থাকা, ফুলকারি পর্দা সেলাই করা, জ্যোৎস্নারাতে সাঁতার দেওয়া, যথেচ্ছ সঙ্গমকল্পনা– সবই কবিতা হতে পারে। কবি কে আর কে কবি নয়– কবিতা তার খোঁজ রাখে না। কবিতা এক অলৌকিক আবির্ভাব। কবিতা হয়। যেমন করে ভোর হয় সকাল, সকাল হয় সন্ধ্যা, সন্ধ্যা হয় রাত… 

আসলে কুইয়ার কবিতা আলাদা করে যে সংকলিত হয়েছে এবং হচ্ছে– তা সাহিত্য-সংকলক এবং প্রকাশকদের কাছে চূড়ান্ত লজ্জার। পৃথিবীর সমস্ত নারী এবং পুরুষ কবিদের লেখা যেভাবে সংকলিত হয়ে থাকে, সেই সংকলনগুলিতেই ভিন্ন কোনও লিঙ্গপরিচয়ের নিরিখে নয়, শুধুমাত্র কবি পরিচয়ে প্রান্তিক যৌনতার কবিদের কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কবিতা আমরা-ওরা বোঝে না। সমাজ বিভেদ তৈরি করে। 

প্রান্তিক যৌনতার কবিতার জগতে সব থেকে প্রাচীন কুইয়ার কবি হিসাবে বারবারই স্যাফোর (খ্রিস্টপূর্ব ৬৩০-৫৭০) নাম উঠে এলেও, খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ২৩ শতাব্দীতে কবি Enheduanna-র নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীনতম কবি এবং সাহিত্যিকদের মধ্যে যাঁদের নাম গ্রন্থকার হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে, তার মধ্যে তিনি অন্যতম। তিনি ছিলেন সুমেরীয় শহর উরের চন্দ্রদেব নান্নার মন্দিরের প্রধান পুরোহিত্রী। তিনি লিঙ্গ-রূপান্তর এবং লিঙ্গ-তরলতার দেবী ইনান্নাকে উৎসর্গ করে অনেকগুলি স্তোত্র রচনা করেছিলেন। এই কবি একটি গ্রন্থে দেবী ইনান্নার উদ্দেশে লিখেছিলেন– 

‘পুরুষকে নারী এবং নারীকে পুরুষে রূপান্তর করার ক্ষমতা তোমার।’

স্যাফো ও এরিনা, সাইমন সলোমনের আঁকা ছবি

সুতরাং Enheduanna-র রচনায় প্রথম আসে রূপান্তরকামী মানুষদের কথা। লিঙ্গ প্রবহমানতার এই দেবীকে উদ্দেশ্য করে, সচেতনভাবে তিনি রচনা করেন দেবী উপাসনার স্তোত্রগুলি। 

গ্রিক কবি Strato of Sardis দ্বিতীয় শতাব্দীতে ছোট ছোট আকারের বেশ কিছু কবিতা রচনা করেছিলেন । সেগুলিকে বলা হয় এপিগ্রাম। তাঁর এইসব কবিতার অধিকাংশই সংকলিত হয় Musa Puerilis-এ– যেটিকে বলা যেতে পারে আজ পর্যন্ত টিকে থাকা প্রাচীনতম গ্রিক কাব্যসংকলন গুলির মধ্যে অন্যতম। স্ট্র‍্যাটোর কবিতাগুলিতে তিনি ব্যক্ত করেন পুরুষের প্রতি পুরুষের তীব্র প্রেমের আকুতি, পুরুষ-শরীরের প্রতি মুগ্ধতার কথা। এই প্রেমপ্রকাশের ভাষায় রয়েছে প্রেমের পূর্ণতা, প্রত্যাখ্যান, প্রেমজনিত ঈর্ষা, বিচ্ছেদ ও বিরহের নানা রং। তাঁর কবিতায় সমকামী প্রেমকে স্বাভাবিক মানবিক প্রেম হিসেবেই প্রকাশ করা হয়েছে। সেই প্রেমপ্রকাশের মধ্যে নেই কোনও দ্বিধাগ্রস্ত স্বর, নেই কোনও কুণ্ঠা বা সংশয়। 

মেসোপটেমিয়ায় খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ শতকে গিলগামেশ ও এনকিডুর সমলিঙ্গ সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন কবি পৃথক পৃথকভাবে প্রচুর কবিতা রচনা করেন। খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ১০০০ শতকে Sîn-lēqi-unninni কবিতাগুলোকে সম্পাদনা এবং মহাকাব্যরূপে সংকলিত করেন। এই কবিতাগুলিতে গিলগামেশ ও এনকিডু, দুই যোদ্ধার মধ্যেকার আবেগঘন এবং সুতীব্র ভালোবাসার অনুভূতিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এনকিডুর মৃত্যুর পর গিলগামেশ গভীর শোকে নিমজ্জিত হন এবং কিছুতেই তাঁর প্রিয় সখার সঙ্গ ত্যাগ করতে চান না। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এনকিডুর মৃতদেহ আগলে বসে থাকেন। এই মহাকাব্যে গিলগামেশ এনকিডুর উদ্দেশ্যে বলছেন–

‘I love him as a wife’ 

এই উক্তি থেকে দু’জনের মধ্যে যে নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তা সহজেই অনুমান করা সম্ভব৷ 

খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০ থেকে ৭২০ শতকের মধ্যে হোমার রচনা করেন ইলিয়াড। এই মহাকাব্যেও দেখা যায় দুই যোদ্ধা– আকিলিস ও প্যাট্রোক্লাস পারস্পরিক মুগ্ধতা এবং অন্তরঙ্গতার মায়ায় নিমজ্জিত। ট্রয়ের যুবরাজ হেক্টর প্যাট্রোক্লাসকে হত্যা করার পর আকিলিস শোকে প্রায় বাহ্যজ্ঞান হারান। একসময় তিনি বলেন, 

‘I shall not live long… but first I will win great glory and avenge Patroclus.’

প্যাট্রোক্লাস-এর ক্ষত বেঁধে দিচ্ছেন আকিলিস, ইউরোপীয় চিত্র

প্যাট্রোক্লাসের আত্মা তাঁর বন্ধুকে অনুরোধ করে–

‘Do not bury me apart from you, Achilles, but together.’

এর উত্তরে আকিলিস বলেন– 

‘So even in death we shall not be divided.’ 

আকিলিস তাঁর অনুগত যোদ্ধাদের নির্দেশ দেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর যেন তাঁর অস্থি, প্যাট্রোক্লাসের অস্থির সঙ্গে একই স্বর্ণকলসে সংরক্ষণ করা হয়। 

মধ্যযুগীয় আরবি কবি আবু নুওয়াস (আনুমানিক ৭৫৬-৮১৪ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর কবিতায় অকপটে প্রকাশ করেছেন পুরুষের প্রতি তাঁর মুগ্ধতার কথা। সরাসরি তিনি ব্যক্ত করেছেন পুরুষ শরীরের প্রতি তীব্র আকর্ষণ। সামাজিক এবং ধর্মীয় রক্ষণশীলতাকে তিনি ব্যঙ্গ করেছেন নিজের কবিতায়। আবু নুওয়াস তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন–

‘My heart belongs to a beautiful youth’ বা ‘His cheeks outshine the roses.’-এর মতো সমকামী প্রেমের ইঙ্গিতবাহী অভিব্যক্তি।

আরবি কবি আবু নুওয়াস, খলিল জিব্রানের করা স্কেচ

ভিন্ন যৌনতার কবিতার বিষয়ে বলতে গেলে উল্লেখ করা প্রয়োজন পারস্যের মধ্যযুগীয় সুফি কবি রুমির কথা। Shams of Tabriz-এর প্রতি গভীর প্রেমানুরাগ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কবিতায়। Shams of Tabriz-কে উৎসর্গ করে রুমির লেখা গজলগুলিতে রয়েছে দু’টি মানুষের একাত্ম হয়ে যাওয়ার এবং একে অপরের মধ্যে চিরস্থায়ী আশ্রয় খুঁজে পাওয়ার এক আধ্যাত্মিক অথচ প্রেমময় ভাষা। একটি গজলে রুমি লিখছেন– 

‘I am you, and you are I.
Is it not obvious that you and I are one?’

এই একই চিন্তার সূত্র ধরে মনে পড়ে যায় ভারতীয় কবি আমির খুসরোর কথা। তাঁকে সংগীতে খেয়ালের প্রবর্তকও বলা হয়। তিনিও নিজের কবিতায় নারী-পুরুষের প্রেম-সম্পর্কের সীমানা অতিক্রম করেছেন। তিনিও নিজের কবিতায় লিখেছেন– 

‘I have become you, and you have become me.’

রুমির শামস অফ তাবরিজকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতার একটি পৃষ্ঠা

শেক্সপিয়ার তাঁর ১৫৪-টি সনেটগুচ্ছের মধ্যে প্রথম ১২৬-টি সনেট লিখেছিলেন তাঁর প্রেমিক ‘ফেয়ার ইয়ুথ’-কে উদ্দেশ্য করে। এই ফেয়ার ইয়ুথের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে কিছু সন্দেহের অবকাশ এখনও রয়েছে। তবে এই প্রেমিককে উৎসর্গ করে লেখা সনেটগুলি দেশ-কালের সীমানা পার করে পৃথিবীর মধুরতম প্রেমের কবিতার রত্নভাণ্ডারে অতি মূল্যবান মণিমানিক্য হিসেবে স্থান পেয়েছে। 

১৫ নম্বর সনেটে তিনি লিখছেন–

‘And all in war with Time for love of you’ 

সমাজে অস্বীকৃত এই সমলিঙ্গ প্রেমের জন্য তিনি সময়ের সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। খেয়াল করতে হবে, এই বাক্যে ‘Time’ কথাটি শুরু হচ্ছে capital letter দিয়ে, অর্থাৎ সময় এখানে কবির সব থেকে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। এমন একটা সময়ে তিনি নিজে পুরুষ হয়ে একজন পুরুষের প্রেমে মজেছিলেন, যখন এই প্রেমের কথা সমাজে প্রকাশ হয়ে পড়লে তাঁকে কঠোর শাস্তি এবং অপমানের মুখোমুখি হতে হত। ১০৮ নম্বর সনেটে কবি আবেগাপ্লুত, প্রেমিকের সৌন্দর্যের মাদকতায় আচ্ছন্ন– 

“What’s in the brain that ink may character,
Which hath not figured to thee my true spirit?
What’s new to speak, what now to register,
That may express my love, or thy dear merit?
Nothing, sweet boy; but yet, like prayers divine,
I must each day say o’er the very same,
Counting no old thing old…”

এই ‘sweet boy’ সম্ভাষণটির মাধ্যমে কবি তাঁর তরুণ প্রেমিকের প্রতি আকর্ষণকে দ্ব্যর্থহীনভাবে ব্যক্ত করেছেন। কবি এই তরুণের প্রেমে এত গভীর অবগাহন করেছেন যে, নিজের আবেগের প্রাবল্য প্রকাশ করার জন্য তিনি নতুন ভাষা আর খুঁজে পাচ্ছেন না। তাই তিনি বলছেন ঈশ্বরের কাছে মানুষ যেমন প্রতিদিন একই মন্ত্র বা স্তোত্রপাঠ করে প্রার্থনা করেন, কবিও সেরকমই একই ভাষায় নিজের প্রেম প্রকাশ করে যাবেন, কারণ প্রকৃত প্রেমের সম্পর্কে কোনওকিছুই একঘেয়ে বা পুরনো হয় না। 

সতেরো শতকের কবি ক্যাথরিন ফিলিপ্‌স তাঁর সমসাময়িক কবিতায় বিপ্লব এনেছিলেন নারীর প্রতি নারীর ভালোবাসা, নিবিড় সখ্যতা, আত্মিক যোগাযোগের কথা প্রকাশ করে। তাঁর প্রিয় বান্ধবী Anne Owen-কে কবিতায় তিনি ‘Lucasia’ বলে সম্বোধন করেছেন। একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন– 

‘We court our own captivity…
Since we wear fetters whose intent
Not Bondage is, but Ornament.’

এই কবিতার অর্থ অনেকগুলি স্তরে ছড়িয়ে রয়েছে। কবি নিজের নারীসত্তার পরাধীন কোণটিতে আলো ফেলছেন। নারীজন্ম একটি কারাগার। সেই কারাগারের সঙ্গেই তিনি প্রেমে মগ্ন। অর্থাৎ যার সঙ্গে তাঁর ভালোবাসার সম্পর্ক তিনিও নারী এবং সহবন্দিনী। কিন্তু যে সখীর সঙ্গে প্রেমবন্ধনে তিনি আবদ্ধ, সেই প্রেমের শেকল আসলে তাঁদের কাছে স্বাধীনতা, কারুকাজ-করা গয়না। এই শেকল তাঁরা স্বেচ্ছায় পড়েছেন এবং তা হয়ে উঠেছে দুই নারীর প্রেমাকাঙ্ক্ষার প্রতীক। অপরূপ অলংকার। 

এই প্রসঙ্গে যাঁর কবিতার কথা না বললে শুধুমাত্র অন্যায় নয়, পাপ করে ফেলা হবে– তিনি হলেন সাহিত্যের অমর সৃষ্টি ‘Don Juan’-এর সৃষ্টিকর্তা লর্ড বায়রন। ইতিহাস খুঁজে জানা যায় যে, লর্ড বায়রন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে নারী এবং পুরুষ উভয়ের প্রতিই আকৃষ্ট ছিলেন। তাঁর লেখা চিঠিপত্র এবং জার্নালে সেই প্রমাণ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। বায়রনের চিঠি থেকে বন্ধু John Edleston-এর প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ এবং অন্তরঙ্গতার কথা জানা যায়। Edleston এর সঙ্গে বায়রনের প্রথম পরিচয় হয় ১৮০৫ সালে এবং এই সম্পর্ক বায়রনের কাছে হয়ে ওঠে অনস্বীকার্য। তাঁর চিঠিপত্র পড়ে বোঝা যায় তিনি Edleston-এর প্রতি যতখানি অনুরক্ত ছিলেন, অন্য কারও প্রতি তাঁর ভালোবাসার এই তীব্রতা কখনও প্রকাশ পায়নি। ১৮১১ সালে Edleston-এর মৃত্যুর পর বায়রন শোকসন্তপ্ত অবস্থায় রচনা করেন সেই সুবিখ্যাত ‘Thyrza’ এলিজি। এই ‘Thyrza’ আসলে Edleston বলেই মনে করেন বহু গবেষক। এই এলিজিতে বায়রন লিখেছেন–

‘And thou art dead as young and fair
As aught of mortal birth.’

বায়রন তাঁর প্রিয় সখাকে বলছেন, মৃত্যুও তাঁর অতুলনীয় সৌন্দর্যকে মলিন করতে পারেনি। মৃত্যুতেও সে একইরকম সুন্দর; এবং মানুষের মন ও মস্তিষ্কে সৌন্দর্যের যা ধারণা, তারই মূর্ত রূপ ধারণ করে আছে তাঁর প্রিয়সখা। তিনি চূড়ান্ত বিষাদ থেকে লিখেছেন তাঁদের অপূর্ণ প্রেমের কথা, লিখেছেন বিচ্ছেদের পরও তাঁদের ভালোবাসার বেঁচে থাকার কথা– 

‘Divided, yet beloved in vain’

ফরাসি কবি রেনে ভিভিয়েন

কুইয়ার কবিতা-প্রসঙ্গে এরপর এসে পড়বে ফরাসি কবি Renee Vivien-এর (১৮৭৭-১৯০৯) নাম। রেনেকে বলা হয় ‘Modern Sappho’, কারণ তিনি প্রকাশ্যে এবং দ্বিধাহীনভাবে নারীর প্রতি নারীর আকর্ষণ বিষয়ে কবিতা লিখে গিয়েছেন। তিনি নিজেই বলেছিলেন– ‘আমি স্যাফোর বোন।’

রেনে, স্যাফোর লেখা অনুবাদ করেছিলেন এবং তাঁর নিজের কবিতায় বারবার বলেছেন নারীদের সমলিঙ্গ সম্পর্ক, শারীরিক চাহিদা, বিচ্ছেদ ও বিষাদের কথা। কুইয়ার কবিতায় আরও এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠে এলেন মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গী ও লেসবিয়ান, কবি Audre Lorde। তাঁর বহু কবিতা কুইয়ার আন্দোলনের প্রতিবাদী স্বর হয়ে উঠেছে। লর্ড লিখেছেন আশ্চর্য কিছু কথা! 

‘love is a word, another kind of open.’

মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গী নারী সমকামী কবি অড্রে লর্ড

‘ভালোবাসা’ একটি উন্মুক্ত শব্দ। এতটা তো ঠিকই ছিল। চমক এল ‘another kind’ কথায়। অন্যরকম উন্মুক্ত। কীরকম? যে উন্মুক্ততা সামগ্রিক। ‘ভালোবাসা’ শব্দটি কোনও লিঙ্গ, বর্ণ, জাতি, শ্রেণির বিভেদ করে না। যেহেতু প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের এবং কৃষ্ণাঙ্গদের সমাজের মূল স্রোতের মানুষদের থেকে পৃথকভাবে দেখা হয়, তাদের ‘other’ বলে গণ্য করা হয়, তাই ভালোবাসা বলতে মূল স্রোতের মানুষরা যা বোঝেন, লর্ড সেই বোধগম্যতাকে আঘাত করলেন ‘another kind’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে। এই চিন্তাসূত্র ধরেই তিনি লিখছেন–

‘Only those who stay dead
Shall remember death.’ 

এবার চলে আসা যাক তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে লিখিত কুইয়ার কবিতার ঐশ্বর্যময় এক অধ্যায়ের কাছে। এখানে আলো ফেলা দরকার এমন কিছু স্বতন্ত্র রচনার ওপর, যেখানে কুইয়ার কবিতার ধারা প্রবাহিত হয়েছে একেবারে ভিন্ন স্বর, আলো এবং অন্তর্গত স্রোত নিয়ে। এইসব কবিতা দৃপ্ত, সাহসী, সামাজিক রীতিভাঙা অকপট প্রকাশ। 

ব্রিটিশ কবি এরিকা গিলিংহ্যাম

সমসাময়িক ব্রিটিশ কবি Erica Gillingham-এর একটি কবিতা “Let’s make a baby with science” শুরু হচ্ছে এইভাবে– 

“We can’t fuck our way to a family
so let’s do the furthest thing possible
from the intimacy of our bedroom”

এখানে একটি লেসবিয়ান দম্পতির সন্তান-আকাঙ্ক্ষার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে– যেখানে তাঁরা স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, স্বাভাবিক প্রাকৃতিক উপায়ে তাঁরা গর্ভবতী হতে পারবেন না। তাই নিজেদের শয়নকক্ষেই চিকিৎসকদের ডেকে এনে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তাঁরা সন্তানধারণ করবেন। লেসবিয়ান সম্পর্কেও যে বিসমলিঙ্গ সম্পর্কের মতো একইরকম চাহিদা থাকতে পারে– তা এই কবিতায় অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই দেখানো হয়েছে। কবিতার শুরুতেই এসেছে ‘fuck’ শব্দটি, অতি-অনায়াসে। এই শব্দের সঙ্গে সংযুক্ত সমস্ত লঘুতাকে বা অসামাজিকতাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে আবির্ভূত হয়েছে কথাটি, কারণ এখানে চর্চা হচ্ছে সন্তান জন্ম দেওয়া নিয়ে, যা কোনওমতেই কোনও লঘু বিষয় হতে পারে না। 

ভিয়েতনামের কবি ওশান ভ্যুয়ং

ভিয়েতনামের কবি Ocean Vuong তাঁর ‘Reasons for Staying’ কবিতায় লিখছেন–

‘That you can blow a man and your voice speaks through his voice’

এই কবিতায় পুরুষের যৌনাঙ্গের শোষণক্রিয়ার কথা কী সহজে এবং অকপটে বলেছেন কবি। এই শারীরিক সুখ উপভোগ করার সময় দু’জনের স্বর মিলে যাচ্ছে এক জায়গায়, অর্থাৎ দু’জন পুরুষই সমানভাবে তৃপ্ত, পূর্ণ, আনন্দিত। এই কবিতায় Vuong লিখছেন– 

‘this body is my last address’

তিনি যে সমকামী হিসেবে তাঁর শরীর, শরীরের চাহিদা, ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষাকে সম্পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়েছেন তা সহজেই বোঝা যায়। 

ব্রিটিশ কবি Ella Duffy তাঁর ‘Shy Supper’ কবিতায় লিখছেন– 

‘Here the garden is in knots;
Old green lifts new green.
But I have found part of our supper
And it is rare. Under my thumb,
It offers a kind of blush.’

ব্রিটিশ কবি এলা ডাফি

এই কবিতা বিস্ময়! কবিতাটি বহুস্তরীয় অর্থ নিয়ে নিজেকে মেলে ধরেছে। একটি মাশরুমের বাগান অগোছালো পড়ে রয়েছে। জায়গায় জায়গায় ঝোপজঙ্গল গতিপথ রোধ করছে। কিন্তু কবি সেই মাশরুমের বাগান থেকে নিজের খাবার সংগ্রহ করতে পেরেছেন সঠিকভাবেই। তিনি পেয়েছেন বিরল ধরনের এক মাশরুম– যেটিকে আঙুলের চাপ দিয়ে তুলতে গেলে সে লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে। এই বাগান যে এক মানব-শরীর তা আর বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। এমন হতে পারে সেই শরীর অসম্পূর্ণ। এমন শরীর যা ধারণ করে আছে স্ত্রী এবং পুরুষ উভয়েরই যৌনাঙ্গ। তাই এই শরীরকে বলা হচ্ছে জটিল বাগান– ‘garden is in knots’। কিন্তু ভালোবাসা ঠিক পথ খুঁজে নিয়েছে এবং এমন জায়গায় স্পর্শ করেছে যে, সমস্ত জটিলতা কাটিয়ে সেই প্রেমস্পর্শে সেই শরীর সাড়া দিয়েছে। 

সমসাময়িক নাইজেরীয়-ব্রিটিশ কবি Patience Agbabi তাঁর ‘Josephine Baker Finds Herself’ কবিতায় লিখছেন– 

“Lipstick lesbians,
Techno so hardcore its spewing out Audis.
She samples my heartbeat and mixes it with
vodka on the rocks. I’m her light-skinned negative,
twenty-something, short black wavy-bobbed diva.”

নাইজেরীয়-ব্রিটিশ কবি পেসেন্স আগবাবি

এই কবিতা আশ্চর্য স্বতঃস্ফূর্ত। খুব সহজেই একটি নাইট-ক্লাবের ছবি সামনে আসছে যেখানে চড়া লিপস্টিক মেখে লেসবিয়ান মেয়েরা অডি গাড়ি চড়ে পৌঁছেছে। টেকনো অর্থাৎ যান্ত্রিক সুরে কান ঝালাপালা। কুড়ির কোঠায় বয়স এমন এক তরুণী জানাচ্ছে যে ওই ক্লাবের বারটেন্ডার মেয়েটি তার হৃদস্পন্দনকে স্যাম্পল করে পানীয়ের সঙ্গে মেশাচ্ছে। একজন নারীর প্রতি আকর্ষণ প্রকাশ করার ক্ষেত্রে যে অভিনব ভাষা ব্যবহার করেছেন কবি, তা অভাবনীয়! নাইটক্লাবের লাল-নীল আলোয় সে নিজেকে ভাবছে ওই বারটেন্ডার মেয়েটির দ্বিতীয় সত্তা; কিন্তু সে নিজে শ্বেতাঙ্গী, এবং ওই মেয়েটি কৃষ্ণাঙ্গী, ছোট বব-কাট চুলের এক দেবী। ছবির নেগেটিভে যার ছবি তোলা হয় তার সাদা-কালো ঝাপসা প্রতিকৃতি দেখা যায়। এখানে কৃষ্ণাঙ্গী মেয়েটিকে কবি দেবীরূপে পাঠকের সামনে এনেছেন, ক্যামেরার ফোকাস রেখেছেন সেই দেবীমূর্তির উপর এবং নিজেকে বলছেন সেই দেবীর নেগেটিভ সত্তা, যে সত্তা অস্পষ্ট, বিবর্ণ, ঝাপসা। কুইয়ার প্রেমের এক নতুন কণ্ঠস্বর যেন আগবাবির কলম। 

‘May a transsexual hear a bird?’ কবিতায় স্কটিশ কবি Harry Josephine Giles লিখছেন–

‘when I, a transsexual, here a bird
I am a transsexual hearing a bird,
When you hear a bird, you are
A person hearing a bird, that is,
I am specific, you are general.’ 

স্কটিশ কবি হ্যারি জোসেফাইন

এই কবিতায় এসে পড়ছে সেই ‘otherness’-এর প্রসঙ্গ যেখানে প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের সমাজের মূল স্রোতের মানুষদের থেকে সবসময় আলাদা করে দেখা একটি দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবি বলছেন, একটি পাখির ডাক শোনার মতো স্বাভাবিক কাজকেও আলাদা করে দেখা হয়, যখন সেই কাজে লিপ্ত থাকেন একজন ট্রান্সসেক্সুয়াল মানুষ। চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে সে আমাদের মতো নয়, সে আলাদা। সে ‘other’।

ইন্দো-ত্রিনিদাদীয় কবি Shivanee Ramlochan তাঁর ‘I See That Lilith Hath Been With Thee Again’ কবিতায় বলছেন– 

“She said, ‘Tell Mum don’t worry. I’ve got a nice place. No boys.
I’m finishing up my degrees and I don’t dream of having fathers;
Not anymore.”

ইন্দো-ত্রিনিদাদীয় কবি শিবানী রামলোচন

এই কবিতা পুরুষতন্ত্রকে সরাসরি অস্বীকার করবার কবিতা। এই কবিতা নারীদের সমলিঙ্গ সম্পর্কের স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে নির্দ্বিধায় স্বীকৃতি দেওয়ার কবিতা। ‘No boys’ কথাটি একটি বিশেষ জায়গার সৌন্দর্য বোঝাতে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। মানে পুরুষ না থাকায় জায়গাটি সুন্দর। “I don’t dream of having fathers, not anymore”– এই ভাবপ্রকাশ পিতৃতন্ত্র এবং সমাজ-স্বীকৃত নারী-পুরুষ সম্পর্ককে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করার এক দৃঢ় সংকল্প। 

ভারতীয় কবি Akhil Katyal-এর কবিতাও হয়ে উঠেছে সমসাময়িক কুইয়ার কবিতার এক অনন্য কণ্ঠ। তিনি তাঁর ‘The last time I saw you’ কবিতায় লিখেছেন– 

‘Your touch and the sun are indistinguishable.’ 

তাঁর কাছে প্রেমিকের স্পর্শ সূর্যের মতই আলোকময়, উজ্জ্বল! 

ভারতীয় কবি অখিল কাটিয়াল

এই লেখা পূর্ণতা পাবে না যদি আমার মাতৃভাষায়, অর্থাৎ বাংলা সাহিত্যে কুইয়ার কবিতার পথচলার কথা কিছু অন্তত আলোচনা করতে না পারি। বাংলা কবিতায় পুরুষ এবং নারীকলমে সময়ের ফেরে উঠে এসেছে প্রান্তিক যৌনতাকেন্দ্রিক এমন সব কবিতা– যা পাঠককে বিস্ময়ে স্তম্ভিত করে দেয়। এই বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে যে কবিতার কথা প্রথমেই মনে পড়ছে তা হল– শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের চতুর্দশপদী কবিতার ৬৮ নম্বর সনেট, যেটি লেখা হয় আজ থেকে ৬৬ বছর আগে ১৯৬০ সালে। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় এ কবিতাটি প্রথম ছাপা হয়েছিল। এই কবিতায় দুই পুরুষের শরীরক্রিয়ার ‘সিক্সটি-নাইন’ (69) দেহভঙ্গিকে স্পষ্ট তুলে ধরা হয়েছে। নিচের লাইনটিকে গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করলে সহজেই সেই দৃশ্যকল্প পাঠকের চোখে ধরা দেবে– 

‘পদতল-মধ্য-মাথা তাল করে ওষ্ঠ পেতে দেওয়া
খেতে ও খাওয়াতে।’ 

‘খেতে ও খাওয়াতে’ পাঠকের চিন্তাকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। 

এই কবিতার শেষেই আবার আসছে ছুটন্ত উল্কার মতো একটি বাক্য– 

“শিল্প কি বিমূঢ়
অনাসৃষ্টি আলিঙ্গন, ‘সাংঘাতিক পুরুষে পুরুষে?’” 

কিসিং কপারস, ব্যাকসির বিখ্যাত গ্রাফিত্তি

এই বাক্য সজোড়ে ধাক্কা দেয়। পুরুষে পুরুষে প্রেম যেমন এক শিল্প, তেমনই সেই প্রেম থেকে উদ্ভুত শিল্পকর্ম তৈরি করতে পারে প্রবল সামাজিক অনাসৃষ্টি! কিন্তু প্রেম বিভ্রান্ত, হতবুদ্ধি। প্রেম সমাজ মানে না, তাই প্রেম থেকে উদ্ভূত শিল্প বিমূঢ়। ‘সাংঘাতিক’ শব্দটির মধ্যেই আমরা সংঘাত-এর ধ্বনি পাই। আত্মনিমগ্ন পুরুষ এবং সামাজিক পুরুষের সংঘাত। সংঘাত কি আলিঙ্গনাবদ্ধ দুই পুরুষকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে? তাই বাক্যের শেষে কবি বসিয়েছেন প্রশ্নচিহ্ন। 

বাংলাদেশি সমকামী কবি শামিম কবীরের কবিতাকে এই আলোচনার বাইরে রাখলে ঘোর অন্যায় হবে। সেই অন্যায় হবে ক্ষমার অযোগ্য। এই কবি মাত্র ২৪ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। তিনি ‘সমকাম’ নামে কবিতায় লিখছেন– 

“সেই পথে সাক্ষ্য ঢোকে
উপশম হয় ব্যথা ক্লোরো চিকিৎসায়

আমার বন্ধুর কথা জানি এক
পাছা মারা দিতো
সুনীল আকাশ ব্যথা পায়
কোথায় সে বৃক্ষগুলি
যাদের সে পাছা ভ’রে নিতো।” 

হ্যাঁ, এই কবিতাকে অনেক পাঠকই বলবেন অশ্লীল, অপাঠ্য। কিন্তু কবিতাটির মন স্পর্শ করলে বোঝা যায় কী অসম্ভব সাবলীল অথচ মর্মস্পর্শী এই কবির কন্ঠস্বর! ‘পাছা’ এবং ‘বৃক্ষ’ শব্দগুলি পর পর দু’টি বাক্যে ব্যবহার করেছেন। ‘বৃক্ষ’ শব্দটি এইভাবে বাংলা ভাষার কোনও কবিতায় এর আগে প্রয়োগ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। বৃক্ষের সঙ্গে তিনি এনেছেন ‘যাদের’ কথাটি। অর্থাৎ বৃক্ষদের উনি মানবরূপ দিয়েছেন, হিউম্যানাইজ করেছেন। ‘বৃক্ষ’ শব্দের মধ্যে নিহিত রয়েছে বলশালী পুরুষের ছবি। কবি বলছেন তার সেই বন্ধু এখন একা, যেসব সুঠাম পুরুষ তাকে সঙ্গমসুখ দিত, তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই কবিতার অন্তরে রয়েছে চরম একাকিত্ব। ভাষার অদ্ভুত বলিষ্ঠ প্রয়োগ দেখে বোঝা যায়, এই কবি সমকামিতাকে তার জীবনের পরম সত্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। 

এই প্রসঙ্গে না বললেই নয় বাংলা কবিতার সমসাময়িক এক সাহসী ও জোরালো নারী-কবির কবিতার কথা। মন্দাক্রান্তা সেন তাঁর ‘প্রসাধনময়ী’ কবিতায় লিখছেন–

“মুখে রক্ত বুকে রক্ত রক্ত তার দু’পায়ের ফাঁকে
রক্তের আদিম গন্ধে সে আকুল করেছে আমাকে
রক্তের আমিষ গন্ধে আকাঙ্ক্ষাও তিলে তিলে রাঙা
সাধের অকূল গাঙ, মধ্যিখানে তিনকোনা ডাঙা
কে কাকে পুরুষ বলে কে বা কাকে বলতে পারে নারী
অন্ধকারে যাকে পাই সে আলো তো আমার আমারই…”

এই কবিতা যতখানি সমলিঙ্গ প্রেমের, ঠিক ততখানিই লিঙ্গ-প্রবহমানতার। এই কবিতার শুরুতে মাসিককালীন নারী-শরীরের প্রতি আকর্ষণের কথা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ‘আমিষ’ কথাটির ব্যবহার কবিতাটিকে মুহূর্তে এক অন্য স্তরে ঠেলে দিয়েছে। শরীরের আকাঙ্ক্ষা এবং শারীরিক চাহিদাকে খিদের মতো স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি হিসেবে দেখিয়েছেন কবি। শেষ দু’টি বাক্য আলোকদ্যুতিময়। পুরুষ-নারীর লিঙ্গভেদ এখানে গুরুত্ব হারিয়েছে। কবি বলছেন অন্ধকারে অর্থাৎ একাকিত্বের সময় যে মানুষ সঙ্গ দেয়, ভালোবাসা দেয়, বন্ধুত্ব দেয়, সাহচর্য দেয়– সে পুরুষ না নারী তাতে কিছু যায় আসে না। সেই মানুষ ঐশ্বরিক আলোর উৎস। বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। 

এই আলোচনার একেবারে শেষে এসে আমি এমন একটি কবিতার কথা বলতে চাই যে কবিতা লেখা হয়েছে ২০২৬-এই। কিন্তু কবির পরিচয় প্রকাশ করতে আমি অপারগ, পাঠক আমায় ক্ষমা করে দেবেন আশা করি। নাম প্রকাশ করব না এই শর্তেই এই লেখায় কবিতাটি তুলে দেওয়ার অনুমতি আমি পেয়েছি কবির কাছ থেকে। কবির বক্তব্য: ‘আমার এইসব লেখা প্রকাশযোগ্য নয় আর প্রকাশযোগ্য লেখা আমি লিখতে চাই না।’ এমন একটি অতুলনীয় কবিতা জন্ম নিয়েছে তার খবর পেয়েও সেই কবিতা আমি পাঠকের সামনে নিয়ে আসব না, তা হতে পারে না। তাই অগত্যা কবির শর্ত মেনে নিয়েছি। 

কবিতাটি এরকম–

“এক প্রস্তর দুই প্রস্তর
ছুড়ছি রাত্রি-মেঘের ভিতর

শূন্যে দু’জন নগ্ন পুরুষ
চওড়া বক্ষ চওড়া উরু

দণ্ডায়মান লৌহ-কঠিন
লিঙ্গ আঁকড়ে রাত আর দিন

এ অন্যের শাবল ধরে
মুঠো চালায় প্রবল জোরে

সকল বজ্র ঢেলে দেবার
সময় আসছে… আসছে… এ-বা-র…

হচ্ছে… হচ্ছে… দুগ্ধ-প্রপাত

না দিন আছে… না আছে রাত…”

গুহাচিত্র, টোম্ব অফ দিভার, ইতালি, খ্রি.পূ. ৪৮০

এই কবিতা যে উদ্‌যাপনের কবিতা তা বলাই বাহুল্য। দু’জন পুরুষ একে অপরের হস্তমৈথুনে মগ্ন। একসময় দু’জনেরই চূড়ান্ত মুহূর্ত উপস্থিত হয়। এই বীর্যপাতের ঠিক আগের যে রোমাঞ্চিত অপেক্ষা– তা কবি বুঝিয়েছেন যতিচিহ্নের বিচক্ষণ ব্যবহারে। ‘আসছে’ কথাটির পর ‘…’-এর ব্যবহার তৈরি করছে এক আশ্চর্য উত্তেজনা! এমনকী ‘এ-বা-র’, ‘হচ্ছে… হচ্ছে… দুগ্ধ-প্রপাত’ এই বাক্যগুলির গঠনই যেন গোটা দৃশ্যটি দেখিয়ে দিচ্ছে পাঠককে। পুরুষের বীর্যপাত নল খুলে জল ঢালার মতো কখনওই নয়। আগ্নেয়গিরি যেমন দমকে দমকে লাভা-উদ্‌গীরণ করে পুরুষের বীর্যপাতের ধরনও অনেকটা সেরকমই। এই বাক্যগুলিও তাই ভাঙা-ভাঙা। অবশেষে দু’জনের বীর্যধারায় যখন ধুয়ে যাচ্ছে চরাচর, তখন দুই প্রেমিক ভেসে রয়েছে মহাশূন্যে। সেই মহাশূন্যে নেই কোনও ভর, নেই দিন, নেই রাত, নেই সমকাম, উভকাম, বিষমকামের ভেদাভেদ, নেই পুরুষ, নেই নারী। শুধু ধকধক করে জ্বলছে প্রেম এবং প্রবৃত্তির দুরন্ত অঙ্গার। 

জুন মাস শেষ হচ্ছে আজ। সিংহের দলকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘pride’। যেমন কোনও মানবিক অনুভূতি লিঙ্গপরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, তেমনই সিংহশিশুদের এই প্রাইড মার্চও সীমাবদ্ধ থাকবে না একটি মাসের সময়-পরিসরে। তাই চলুক এই রঙিন উদ্‌যাপন। মুখে মুখে উঠে আসুক মানবতার জয়গান। শরীর ছাপিয়ে ভালোবাসার রং লাগুক মনে-মননে-চিন্তনে।

গর্ব কীসে হয়? 

মানবতার উত্থানে হয়। সংকীর্ণতার অবসানে হয়। ভালোবাসার জয়ে হয়। ঘৃণার পরাজয়ে হয়। তাই এই উৎসব জারি থাক। কারণ–

‘Pride is a journey, not a destination’