what we gained from Bengali language on International Mother Language Day
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলা ভাষার থেকে আমি কী পেলাম

আমাদের ব্লাডগ্রুপ জানার উপায় আছে, কিন্তু ভাষাগ্রুপ? সেটিও যে কোথাও না কোথাও আমাদের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত হচ্ছে, তা আমাদের কেউ ধরিয়ে দেয় না। মাতৃভাষায় কথা না বলা মানে অনেক দিন উপবাসী থাকা। আমার মা যে ভাষায় কথা বলেছিলেন, যে ভাষায় কথা বলেছিলেন আমার বাবা– সেই ভাষা আমার অস্তিত্বের কোষে কোষে জড়িয়ে রয়েছে।  আমি এই ভাষাতেই গল্প-কবিতা-উপন্যাস-চিঠি লিখব। আমি সেই ভাষাতেই তিরস্কার করব, সেই ভাষাতেই সোহাগ-আদর করব। সে কারণে ‘আয় বাবা’ বলে আমার মা আমাকে জড়িয়ে ধরতেন– যেন মনে হত ভাষাই হাত বাড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরছে।

প্রচ্ছদ শিল্পী: দীপঙ্কর ভৌমিক

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ১৫:২৭   
Facebook WhatsApp Messenger
what we gained from Bengali language on International Mother Language Day

কীসে মানুষের পরিচয়? পিতা-মাতা, দেশ, ভূমি, জলবায়ু, আবহাওয়া– এর মাঝেই তো একটা প্রাণের আগমন। আমার মা, আমার বাবা, আমার দেশের মানুষ যে ভাষায় কথা বলেন, আমার মাটি আমাকে যে দৃশ্য দেখায়, আমার আকাশ মাথার ওপর যে চাঁদোয়া সৃষ্টি করে রেখেছে– এটাই আমার বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার! আমরা তো অসীমের প্রজা। অথচ এই অসীমের মধ্যেই সসীম ঘুরে বেড়াচ্ছে। ‘সসীম’ ব্যাপারটা আমাদের এমনভাবেই আবৃত করে রেখেছে যে, আমরা বলি ‘আমার’ বাড়ি– একটা ঘর, একটা ছাদ, কয়েক বর্গফুট এলাকা। কিন্তু তা তো নয়, আমরা একটা দেশের আশ্রয়ে আছি। সেই দেশ, সেই ভূমি, সেই আকাশ, সেই বাতাস, সেই পরিবেশ– এগুলো আমার মনের মধ্যে যে আবেগ সৃষ্টি করে, আমার ভেতরে যে ধ্বনির সৃষ্টি করে, তা আমার ভাষা। এই যে বিশ্বজুড়ে নানা পকেট– সেখানে যাদের বসবাস, তাদের বলা হয় ‘ভূমিপুত্র’। আমিও তো ভূমিতে আছি, এই ভূমিতেই আমার পিতা-পিতামহ-মা-গুরু যে ভাষায় কথা বলেছেন, সে ভাষা আমার বড় আপন। সে ভাষা আমার রক্তের স্রোতের সঙ্গে মিশে আছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিছু করা হয়নি বটে, কিন্তু মনে হয় এরও কিছু কণা আমাদের রক্তপ্রবাহে প্রবাহিত হচ্ছে। যে কারণে বিদেশে দীর্ঘকাল থাকার পরও, বিদেশি ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পরও, একজন তাঁর নিজস্ব ভাষাটিকে ভুলতে পারছেন না। মনের ভেতর তৈরি হয় অহরহ আবেগ। খুঁজতে থাকেন কবে তাঁর সম-ভাষাভাষী মানুষকে পাবেন, কথা বলবেন! মূল কথা: নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার ইচ্ছেটা গজিয়ে ওঠে।

মাতৃভাষায় যখন কথা বলি, তার মধ্য দিয়ে আমার ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায়। কোন কথা জোরে বলব, কোন কথাটা আস্তে বলব, কোন কথাটা আদুরে গলায় বলব– তা যখন মাতৃভাষায় কথা বলি, তখনই আসে। এখন এই আধুনিক সমাজে যখন দেখি, ছোটরা ‘মামি’, ‘ড্যাডি’– এইসব বলছে তখন কেমন যেন ধাক্কা খাই! এমনকী, ‘ম্যাম’ বললেও মনে হয় কেমন জানি কৃত্রিম ভাষায় কথা বলছে। এতে কি এই ভাষা বলিয়ের সম্মান বেড়ে যাচ্ছে? না কি প্রমাণিত হচ্ছে যে, তারা আমাদের থেকে অনেক বেশি শিক্ষিত? মুখে তো ‘আমরি বাংলাভাষা’ই বলি।

আমাদের ব্লাডগ্রুপ জানার উপায় আছে, কিন্তু ভাষাগ্রুপ? সেটিও যে কোথাও না কোথাও আমাদের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত হচ্ছে, তা আমাদের কেউ ধরিয়ে দেয় না। মাতৃভাষায় কথা না বলা মানে অনেক দিন উপবাসী থাকা। আমার মা যে ভাষায় কথা বলেছিলেন, যে ভাষায় কথা বলেছিলেন আমার বাবা– সেই ভাষা আমার অস্তিত্বের কোষে কোষে জড়িয়ে রয়েছে। বাংলা আমার কাছে একটা ভাইব্রেশন– উই আর ভাইব্রেটিং ইন আওয়ার ওন ল্যাংগুয়েজ। আমাদের ভাষার ধ্বনিতে আমরা নিজেরাই তরঙ্গায়িত হচ্ছি। ফলে, আমি এই ভাষাতেই গল্প-কবিতা-উপন্যাস-চিঠি লিখব। আমি সেই ভাষাতেই তিরস্কার করব, সেই ভাষাতেই সোহাগ-আদর করব। সে কারণে ‘আয় বাবা’ বলে আমার মা আমাকে জড়িয়ে ধরতেন– যেন মনে হত ভাষাই হাত বাড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরছে।

আমরা তো এমনি ছটফটে প্রাণী, সারাদিন ধরে এদিক-ওদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। কিন্তু যদি একজন মানুষকে বলা হয়– তুমি কিছুক্ষণ ধ্যানে বসো। যেই ধ্যানে বসবে, দেখা যাবে ভেতর থেকে একটি ধ্বনি উঠছে– সেই ধ্বনি ওঁ-কার। ওঁ-কারই তো এ জগতের সৃষ্টির মূল কথা– বেদান্ত যা বলছে। এই ওঁ-কার থেকেই সমস্ত ভাষা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আমার ধ্যানে যদি প্রথমেই একটা ওঁ আসে, সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু তার পাশাপাশি বাংলাভাষায় আসতে থাকবে দেব-দেবীদের নাম। মা দুর্গা, মা কালী, মা লক্ষ্মী, মা সরস্বতী– তখন কিন্তু আমি ‘গডেস’ বলব না। আমরা খাওয়া-দাওয়ার পর একটা উদ্‌গার তুলি– ঢেঁকুর। সেরকমই খানিক চুপ থাকার পর আমরা বুঝতে পারি আমাদের চারপাশে অনেক অ-আ-ই-ঈ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা সেসব কথা ধরে শুরু করি কথা বলা। ভেবে দেখুন, মা কালীর মুণ্ডমালা– সেটি তো পঞ্চাশৎ বর্ণমালা। অ-আ-ই-ঈ– এইসব মিলেই।

আমার এই ভাষার প্রবাহেই গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী। এগুলো সবই হয়তো সংস্কৃত থেকে এসেছে। কিন্তু আমরা বাংলা করে নিয়েছি। ভাষা নিজের সঙ্গেই নিজেকে ‘আপন’ হতে শিখিয়েছে। আমাকে আমার সঙ্গে জড়িত করেছে। তৈরি করেছে বন্ধন। এই বন্ধন, অপূর্ব বন্ধনই আমি পেয়েছি বাংলা ভাষার কাছে।

Bengal Bengali bengali language International Mother Language Day Mother tongue Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sanjib Chattopadhyay

Share this article on