


৪ নভেম্বর ১৯১৮ যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যান কবি ও সৈনিক উইলফ্রেড আওয়েন। যুদ্ধবিরোধী এই কবি এক সহজ দর্শন লিখেছিলেন ‘Strange Meeting’ কবিতাটিতে। যেখানে দুই সৈনিক মৃত্যুর পর বুঝতে পারেন, আসলে তাদের স্বপ্ন একই ছিল। কেবলমাত্র যুদ্ধ তাদের আলাদা করেছে। ‘I am the enemy you killed, my friend’। আর যুদ্ধ সম্পর্কে সবচেয়ে অদ্ভুত সত্যটি বলেছিলেন আইরিশ কবি ইয়েটস– ‘Those that I fought I do not hate/ Those that I guard I do not love’। আর চমকে উঠতে হয় রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন নাটকে রঘুপতির কথাটিতে: ‘এ জগৎ মহা হত্যাশালা’।
‘there is nothing more dangerous than… a paint brush in the hands of a painter.’
–Pablo Picasso
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপে। নাৎসি বাহিনী তখনও প্যারিস দখল করেনি। কিন্তু যুদ্ধের আঁচ লেগেছে ফ্রান্সের মাটিতে। সেই উত্তাল সময়ে অত্যাশ্চর্যভাবে দেখা গেল, একটি লাইব্রেরি খোলা। প্যারিস আমেরিকান লাইব্রেরি। লাইব্রেরিটি চালু হয়েছিল ১৯২০ সালে। বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন আক্রমণের আশঙ্কায় দিন গুনছে ফ্রান্স, সেই দুঃসময়ে জীবন-জীবিকার হিসেবের বাইরে লাইব্রেরি খোলা। লাইব্রেরির গায়ে লেখা ছিল– ‘Atrum post bellum, ex libris lux’। যার ইংরেজি মানে করলে দাঁড়ায়, ‘after the darkness of war, the light of books’। বাংলায় যার অর্থ ‘যুদ্ধের অন্ধকারের শেষে, বইয়ের আলো’। যেন লাইব্রেরির বইয়ের পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা শিল্প বিদ্রুপ করছে যুদ্ধকে। ভয় পাচ্ছে না।

তারপর ফ্রন্টিয়ারে প্রবল যুদ্ধ। হিটলারের জার্মান সেনাবাহিনীর কাছে ভেঙে পড়েছে ফরাসি প্রতিরোধ। শোনা যায়, যেদিন নাৎসি বাহিনী প্যারিস দখল করে, তার ঠিক আগের দিন ফরাসি রেডিও সম্প্রচার করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক ‘ডাকঘর’। যা অনুবাদ করেছিলেন ফরাসি সাহিত্যিক আঁদ্রে জিঁদ। ‘ডাকঘর’ নাটকটি ১৯১২ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আবহাওয়ায় লেখা। কিন্তু সে নাটক যুদ্ধবিধ্বস্ত ফরাসিদের মানসিক শক্তি দিতে পেরেছিল কি না, সেকথা বোঝা কঠিন।
স্পেনে তখন গৃহযুদ্ধ! ১৯ আগস্ট, ১৯৩৬ খুন হয়ে গিয়েছেন কবি ও নাট্যকার ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা। স্পেনের পথেঘাটে অলিতে-গলিতে যুদ্ধকালীন চাপা উত্তেজনা। চলেছে গণহত্যা। সৈন্যদের তল্লাশি, গ্রেফতার, খুন– এ যেন রুটিন মাফিক। ঠিক সেই সময় ২৬ এপ্রিল, ১৯৩৭– উত্তর স্পেনের বাস্ক কান্ট্রির এক ছোট্ট শহরে বিকেলবেলার আকাশে দেখা দিল নাৎসি জার্মানির বোমারু বিমান। জার্মানির কনডর লেজিয়ানের তিনটি বোমারু প্রায় ঘণ্টাদুয়েক ধরে সেই ছোট্ট শহরের উপর বোমা বর্ষণ করে। সাজানো শহর হয়ে ওঠে এক ধ্বংসস্তূপ। বারুদ আর ধোঁয়ার গন্ধে মানুষ পালাতে গেলে, তাদের থামিয়ে দেয় মেশিনগান। ছোট্ট শহর হয়ে ওঠে লাশের স্তূপ। ইতালি ও জার্মানি সরাসরি নেমে পড়েছিল স্পেনের গৃহযুদ্ধে। যুদ্ধবিশারদরা বলেন যে, স্পেনের গৃহযুদ্ধ আসলে ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়া। কিন্তু, এই যুদ্ধ জন্ম দিয়েছিল এক বিখ্যাত শিল্পীর আধুনিক শিল্পকলার। আর সেই অচেনা শহর উঠে এল সারা পৃথিবীর এক যুদ্ধ-অত্যাচারিত শহরের প্রতীক হিসেবে। ‘গের্নিকা’, যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর। ছবি আঁকলেন পাবলো পিকাসো।

যুদ্ধের বাইরেও এই ছবির অবশ্য একটা ইতিহাস আছে। রিপাবলিকান সরকার পিকাসোকে একটি ছবি আঁকতে বলেছিল। প্যারিসের বিশ্বমেলায় স্প্যানিশ গ্যালারির জন্য একটি মুরাল তৈরি করবেন, এমনটি ইচ্ছা ছিল পিকাসোর। গের্নিকার হত্যাকাণ্ড যেন চিন্তার রাস্তা খুলে দিল। গণহত্যার জবাব দিলেন পিকাসো। একটি ছবির নীরব প্রতিবাদের ভাষায়। ২৫ ফুট বাই ১১ ফুটের বিশাল ক্যানভাস। সাদা-কালোর কালজয়ী ‘কিউবিজম’। ত্রিমাত্রিক এক বাস্তবতা বা রিয়ালিটিকে দ্বিমাত্রিক কাগজে ফুটিয়ে তোলাই ছিল পিকাসোর কিউবিজমের বৈশিষ্ট্য।

ছবিটি ভারী অদ্ভুত। একটি ঘোড়া। যেন ধারালো বর্ষার আঘাতে আহত। ঘোড়ার মাথার নিচে মাটিতে এক সৈনিক। একহাতে ভাঙা অস্ত্র। আরও অনেক দৃশ্যপট রয়েছে ছবিটিতে। গের্নিকায় বোমা পড়ার পরে পৃথিবী জুড়ে হাজার মানুষের প্রতিবাদী মিছিল, কাগজে কাগজে রিপোর্টিংয়ের চেয়ে একটি ছবিই যেন সারা পৃথিবীর যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষ, জীবজন্তু ও ভাঙাচোরা বাড়ি ঘরের অস্তিত্বকে জীবন্ত করে তুলেছিল। রহস্যময় এই ছবিটি সম্পর্কে বলা হয়:
“Guernica is to painting what Beethoven’s Ninth Symphony is to music:
a cultural icon that speaks to mankind not only against war but also of hope and peace.”

দু’-হাজার বছর আগে চিনের এক যোদ্ধা সেনাপতি যুদ্ধবিষয়ক একটি যুগান্তকারী বই লিখেছিলেন। ১৯১০ সালে বইটি প্রথম ইংরেজি ভাষায় অনুবাদিত হয়– ‘The art of war’। যুদ্ধ বিশেষজ্ঞরা বলেন, সেই বইতে না কি বলা আছে– ‘যুদ্ধের সর্বোচ্চ শিল্প হল, যুদ্ধ না করেই শত্রুকে থামিয়ে দেওয়া’। অথচ তারপরেও রক্তে রক্তে ধুয়ে গেল রাজপথ। এডওয়ার্ড টমাসকে (Edward Thomas) লিখতে হল চার লাইনের সেই কবিতা– ‘In memoriam’। কবি লিখলেন– সন্ধে নেমেছে, বনের ফুল ফুটেছে ঘন হয়ে। ইস্টার উৎসব। বাড়ি থেকে অনেক দূরে তারা। যে-ফুলগুলো প্রেমিকাদের জন্য তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তারা আর কখনও সেগুলো তুলবে না। অন্যদিকে কবি সিগফ্রড স্যাঁসুন (Siegfried Sassoon) লিখলেন ‘Suicide in the trenches’। সীমান্তবর্তী ট্রেঞ্চের ভিতরে এক সরল সৈনিকের নিঃশব্দে মরে যাওয়ার কবিতা: ‘He put a bullet through his brain/ No one spoke of him again.’

ফিরে আসি এই সময়ে। রিফাত আলারির (Refaat Alareer)। তিনি এক ফিলিস্তিনি কবি, লেখক, অধ্যাপক এবং তরুণ সাহিত্যিক। গাজার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়াতেন। ২০২৩ সালের ৭ ডিসেম্বর গাজা সিটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় সপরিবার নিহত হন। তাঁর লেখা ‘If I Must Die’ (যদি আমাকে মরতে হয়) কবিতাটি মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভাইরাল হয়। যুদ্ধ চিনিয়ে দিল এই কবি-মানুষটিকে আর তাঁর কবিতাকে।

তেমনভাবে ১৯৯২ সালে এক আন্তর্জাতিক খবরের কাগজে একটি ছবি হয়ে উঠেছিল এক যুদ্ধবিরোধী শিল্প। সারায়েভো শহরের বোমাবিধ্বস্ত জাতীয় গ্রন্থাগারে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একা একা বসে ‘চেলো’ বাজাচ্ছেন এক যন্ত্র শিল্পী ভেদ্রান স্মাইলোভিচ। প্রায় একইরকম ছবি সম্প্রতি আবার দেখা গিয়েছে। যেখানে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ঘরের মধ্যে একা বসে ‘কামানচে’ নামে এক তারযন্ত্রে বিষাদের সুর বাজাচ্ছেন এক ইরানি মিউজিক শিক্ষক।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর। তার ঠিক এক সপ্তাহ আগে, অর্থাৎ ৪ নভেম্বর ১৯১৮ যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যান কবি ও সৈনিক উইলফ্রেড আওয়েন। যুদ্ধবিরোধী এই কবি এক সহজ দর্শন লিখেছিলেন ‘Strange Meeting’ কবিতাটিতে। যেখানে দুই সৈনিক মৃত্যুর পর বুঝতে পারেন, আসলে তাঁদের স্বপ্ন একই ছিল। কেবলমাত্র যুদ্ধ তাদের আলাদা করেছে। ‘I am the enemy you killed, my friend’। আর যুদ্ধ সম্পর্কে সবচেয়ে অদ্ভুত সত্যটি বলেছিলেন আইরিশ কবি ইয়েটস– ‘Those that I fought I do not hate/ Those that I guard I do not love’। আর চমকে উঠতে হয় রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকে রঘুপতির কথাটিতে: ‘এ জগৎ মহা হত্যাশালা’।
তাও যুদ্ধ হয়। কেন হয়? কে জানে? যুদ্ধের ধংসস্তূপে আলো জ্বেলে রাখে নতুন নতুন শিল্প। শিল্পের মৃত্যু নেই।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved