Robbar

নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 27, 2026 7:26 pm
  • Updated:July 27, 2026 7:26 pm  

ভারতের বন্যার ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, প্রকৃতিকে জয় করার চেষ্টা নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই ভবিষ্যতের পথ। বিগত শতকে মানুষ নদীকে বুঝত, বুঝতে চেষ্টা করত। পরে নদীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। বর্তমান সময় আমাদের আবার শিখিয়ে দিচ্ছে যে নদীকে তার প্রাকৃতিক স্থান ফিরিয়ে না দিলে উন্নয়নও নিরাপদ হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে বন্যা আরও অনিশ্চিত হবে। তাই আমাদের প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রকৃতিনির্ভর সমাধান, স্থানীয় জ্ঞানের প্রতি সম্মান এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি।

দীপাঞ্জন মিশ্র

‘নদী আমাদের কাছে কেবল একটি জলস্রোত নয়; স্মৃতি, মৃত্যু, বেদনা এবং নতুন করে বেঁচে ওঠার মাধ্যম।’

১.

ভারতবর্ষের ইতিহাস নদীর ইতিহাস। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, মহানদী, গোদাবরী, নর্মদা কিংবা কাবেরী– নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে জনপদ, কৃষি, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির বিস্তীর্ণ পরিসর। আবার এই নদীগুলিই বর্ষাকালে কখনও আশীর্বাদ, কখনও অভিশাপ হয়ে মানুষের জীবনে নেমে এসেছে বারবার। তাই ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে বন্যা একটি হাজার বছরের সহাবস্থানের নাম।

একসময় বন্যা ছিল প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক ও পর্যায়ক্রমিক ঘটনা। বর্ষার অতিরিক্ত জল নদী উপচে সমভূমিতে ছড়িয়ে পড়ত, সঙ্গে নিয়ে আসত উর্বর পলি। কৃষিজমির উর্বরতা বৃদ্ধি পেত, মাছের প্রজনন হত, জলাভূমি পুনর্জীবিত হত। সেই সময় মানুষ নদীকে দমন করার চেষ্টা করেনি; বরং নদীর ছন্দে বেঁধেছিল জীবনের গান।

নদীর ছন্দে জীবনের গান

কিন্তু গত দুই শতাব্দীতে এই সম্পর্ক আমূল বদলে গেছে। ঔপনিবেশিক শাসনের সময় নদী নিয়ন্ত্রণের ধারণা, পরবর্তীকালে বৃহৎ বাঁধ, নদীবাঁধ, খাল ভরাট, বন উজাড়, নগরায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যার চরিত্র আর আগের মতো নেই। আজকের বন্যা অনেক বেশি আকস্মিক, তীব্র এবং প্রাণঘাতী। ভারতের বিভিন্ন নদী অববাহিকায় সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে বন্যার সময়, তীব্রতা এবং মৌসুমি বৈশিষ্ট্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছে, যা জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

উনিশ শতকের ভারত ছিল প্রধানত কৃষিনির্ভর। বন্যাকে মানুষ জীবনের অংশ হিসেবেই দেখত, বর্ষা এলে গ্রামের মানুষ গবাদি পশু, বীজ, খাদ্যশস্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস উঁচু জায়গায় সরিয়ে রাখত। বাঁশের মাচা, উঁচু কুঁড়েঘর এবং নৌকা ছিল তাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বহু পরিবার বর্ষার চার মাস নৌকাকেই বাড়ি হিসেবে ব্যবহার করত। বাংলার নিম্নভূমিতে কৃষকেরা এমন ধানের জাত চাষ করতেন, যা দীর্ঘদিন জলে ডুবে থাকলেও টিকে থাকতে পারত। এই অভিযোজন ছিল শতাব্দী জুড়ে অর্জিত স্থানীয় জ্ঞানের ফল। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে সঙ্গে নদীকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করার ধারণা সামনে আসে। রেললাইন, সড়ক, বাঁধ এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলে নদীর স্বাভাবিক বন্যাপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। এর ফলে কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও আবার আকস্মিক প্লাবনের ঝুঁকি বাড়ে। ইতিহাসবিদ রাধিকা ডি’সুজা দেখিয়েছেন, পূর্ব ভারতের নদী নিয়ন্ত্রণ নীতিই পরবর্তীকালে বহু অঞ্চলে বন্যার তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে এক নদীতীরের বাসিন্দার প্রশ্ন বিশেষ উল্লেখযোগ্য: ‘নদীপাড়ে ছেলেবেলার স্মৃতি কি ফিরিয়ে দিতে পারবে উন্নয়ন?’

বাংলার মানুষের কাছে নদী বরাবরই মায়ের মতো, ঠিক আমরা যেমন মায়ের আদরে বেড়ে উঠি আবার মাকে ভয়ও করি– মানুষের সঙ্গে নদীর সম্পর্কটা বরাবরই সেরকম ছিল। গঙ্গা, পদ্মা, দামোদর, তিস্তা, অজয়, ময়ূরাক্ষী– প্রতিটি নদীরই আলাদা চরিত্র ছিল। বর্ষায় নদী উপচে পড়ত, মাঠ ডুবে যেত, কিন্তু পরবর্তী মৌসুমে সেই জমিতেই হত শ্রেষ্ঠ ফসল।

বন্যাপ্রবণ দামোদর

লোকসাহিত্যে তাই বন্যাকে কেবল ধ্বংস হিসেবে দেখা হয়নি। বহু পালাগান, ভাটিয়ালি, বাউল ও লোককথায় নদীকে একই সঙ্গে জীবনদাত্রী এবং জীবনহরণকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

উনিশ শতকের শেষদিকে বিহারের কোসি নদীর তীরে অবস্থিত বহু গ্রাম প্রায় প্রতি বছরই স্থান পরিবর্তন করত। নদী কখনও পশ্চিমে, কখনও পূর্বে সরে যেত। একটি ইংরেজ জরিপে উল্লেখ রয়েছে, এমন বহু পরিবার ছিল যারা জীবনে তিন থেকে চারবার নিজেদের গ্রাম বদলাতে বাধ্য হয়েছিল। এক বৃদ্ধ কৃষকের কথাটি আজও ইতিহাসে উদ্ধৃত হয়– ‘নদী আমার ঘর নিয়ে গেছে, কিন্তু নদীই আবার নতুন জমি দিয়েছে।’ এই একটি বাক্যই বোঝায়, তখনকার মানুষ নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করেনি; তারা নদীর সঙ্গে বাঁচতে শিখেছিল।

স্বাধীনতার আগে এবং পরে ভারতের উন্নয়নের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে বৃহৎ বাঁধ। ভাকরা-নাঙ্গাল, হিরাকুদ, তেহরি, ফারাক্কা, একাধিক বৃহৎ প্রকল্প নির্মিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন।

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, সব সমস্যার সমাধান হয়নি। বহু নদীর প্রাকৃতিক বন্যাপ্রবাহ ব্যাহত হল, নদীর তলদেশে পলি সঞ্চয় বাড়ল, নদী নাব্যতা হারাল, অনেক অঞ্চলে নদীর জলধারণ ক্ষমতা কমে গেল। এর ফলে কোথাও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, কোথাও আবার হঠাৎ প্রবল বন্যা দেখা দিতে লাগল।

একই সময়ে দ্রুত নগরায়নের ফলে শহরের খাল, পুকুর ও জলাভূমি ভরাট হতে শুরু করে। কলকাতা, মুম্বই, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু প্রায় সব বড় শহরেই প্রাকৃতিক জলনিকাশ ব্যবস্থা সংকুচিত হতে শুরু করল। ফলে ভারী বৃষ্টির পর শহর ডুবে যাওয়া এক নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়।

আগে বন্যা ছিল মূলত নদীকেন্দ্রিক। এখন বন্যা অনেক সময় নদীর জল উপচে পড়ার আগেই শুরু হয়। কয়েক ঘণ্টার অতি ভারী বৃষ্টি শহরকে ডুবিয়ে দেয়। পাহাড়ে ভূমিধ্বস, হিমবাহ হ্রদ ভেঙে যাওয়া Glacial Lake Outburst (GLOF), সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস এবং নদীর বন্যা সব মিলিয়ে আজকের বন্যা বহুস্তরীয়।

উত্তরাখণ্ডের যোশীমঠে হিমবাহ হ্রদ ভেঙে বন্যা

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি জাতীয় গবেষণায় ১৭৩টি নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার সময় ও তীব্রতা পরিবর্তিত হচ্ছে। পশ্চিম ও মধ্য গঙ্গা অববাহিকায় বর্ষাকালে বন্যার প্রবণতা কমলেও মালাবার উপকূলে প্রাক-বর্ষার অতিবৃষ্টিজনিত বন্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গবেষণাটি আরও দেখায় যে জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির আর্দ্রতা এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন বন্যার এই নতুন বৈশিষ্ট্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

২.

স্বাধীনতার পর ভারত উন্নয়নের নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। নদীর ওপর একের পর এক বাঁধ, ব্যারেজ, সেচ প্রকল্প এবং নদী নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গড়ে উঠল। ভাকরা-নাঙ্গাল, হিরাকুদ, ফারাক্কা, তেহরি এসব প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি সম্প্রসারণ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে শুধুমাত্র বাঁধ নির্মাণ বন্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বরং অনেকক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়, পলি জমে নদীর গভীরতা কমে যায় এবং নিম্ন অববাহিকায় আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ে।

এদিকে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শহর সম্প্রসারণ এবং জলাভূমি ভরাটের ফলে নদী ও বৃষ্টির জল ধারণ করার প্রাকৃতিক ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পায়। একসময়ের মৌসুমি বন্যা ধীরে ধীরে রূপ নিতে থাকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, নগর বন্যা এবং আকস্মিক প্লাবনে।

বাংলার মানুষ এখনও ‘আটাত্তরের বন্যা’ নামটি শুনলে শিউরে ওঠেন। ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পরপর কয়েকটি নিম্নচাপ এবং অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে দামোদর, অজয়, ময়ূরাক্ষী, দ্বারকেশ্বর, রূপনারায়ণ-সহ দক্ষিণবঙ্গের বহু নদী বিপজ্জনকভাবে ফুলে ওঠে। আবহাওয়াবিদদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের উপর গভীর নিম্নচাপ এবং দামোদর অববাহিকায় অতিবৃষ্টি এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ ছিল।

‘আটাত্তরের বন্যা’, সূত্র: ইন্টারনেট

বাঁধ থেকে জল ছাড়ার ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। নদীবাঁধ ভেঙে যায়, হাজার হাজার গ্রাম জলের নিচে চলে যায়। কৃষিজমি, রাস্তা, রেলপথ, বিদ্যালয়, হাসপাতাল সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষকে ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিতে হয়। বহু পরিবার দিনের পর দিন বাঁধের উপর, স্কুলবাড়িতে কিংবা গাছের ডালে অস্থায়ী আশ্রয় নিয়ে জীবন কাটায়।

আজও নদিয়ার, হুগলির, পূর্ব বর্ধমানের কিংবা হাওড়ার বহু প্রবীণ মানুষ বলেন, ‘সেই বন্যার জল বুক ছুঁয়ে গিয়েছিল’; কেউ হারিয়েছিলেন সন্তান, কেউ জমি, কেউ আবার গোটা সংসার।

দাদুর মুখে শুনেছিলাম, সেই বন্যা সাপকেও বাধ্য করেছিল মানুষের গায়ে উঠে বিশ্রাম নিতে। বিশ শতকের কয়েকটি ভয়ংকর বন্যার দিকে তাকালে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়।

বিহারের কোসি নদীকে বহুদিন ধরেই বলা হয় ‘বিহারের দুঃখ’। হিমালয় থেকে বিপুল পলি বহন করে আনা এই নদী বারবার গতিপথ পরিবর্তন করে। এই নদীর ১৯৮৭ সালের বন্যা ছিল বিহারের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ। ভূমিধ্বস, অতিবৃষ্টি এবং নদীর প্রবল স্রোতের কারণে বিপুল এলাকা প্লাবিত হয়। সরকারি হিসাবে প্রায় ২.৯ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং ১,৩৯৯ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে।

সীতামারহি জেলার এক বৃদ্ধা পরবর্তীকালে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘জল যখন বাড়িতে ঢুকল, তখন শুধু নাতির হাতটা ধরে দৌড়েছিলাম। বহুদূরে গিয়ে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, বাড়ি আর নেই।’ এই একটি বাক্যই বুঝিয়ে দেয় বন্যার প্রকৃত ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়; স্মৃতি, পরিচয় এবং নিরাপত্তাবোধও বন্যার জলে ভেসে যায়।

কোসি নদীর বন্যা

বিশ শতকের শেষ দশক থেকে ভারতের বড় শহরগুলিতে এক নতুন ধরনের বন্যা দেখা দিতে শুরু করে। এই বন্যার জন্য নদীর জল উপচে পড়ার প্রয়োজন হত না। কয়েক ঘণ্টার প্রবল বৃষ্টিই যথেষ্ট। যার উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বরের কলকাতার বন্যার কথা উল্লেখযোগ্য।

কলকাতার বহু খাল ও জলাভূমি ভরাট হয়েছে। মুম্বইয়ে মিষ্টি জলের নদীর প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে। চেন্নাইয়ের অসংখ্য জলাধার ও ট্যাঙ্ক দখল হয়েছে। ফলে বৃষ্টির জল দ্রুত বেরতে না পেরে শহর ডুবে যাচ্ছে। এই ঘটনাকে বলা হয় Urban Flood। এটি মূলত মানুষের তৈরি বিপর্যয়। প্রকৃতির বৃষ্টি, অগভীর নদী ও অপরিকল্পিত নগরায়ন বিপর্যয়ের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে।

একসময় মানুষ নদীর সঙ্গে মানিয়ে চলত। এখন মানুষ নদীকে বদলাতে চায়। নদীকে কংক্রিটের বাঁধে বেঁধে রাখা, জলাভূমি ভরাট, নদীর তীর দখল এবং বন উজাড়ের ফলে নদীর স্বাভাবিক বিস্তার কমে গিয়েছে।

অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে। ফলে অল্পসময়ে অত্যন্ত বেশি বৃষ্টিপাতের ঘটনা বেড়েছে। সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে ভারতের বহু নদী-অববাহিকায় বন্যার সময় ও তীব্রতার ধরন বদলে যাচ্ছে; কোথাও বর্ষাকালের বন্যা কমলেও প্রাক্-বর্ষা বা স্বল্পসময়ের অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।

আজকের বন্যা তাই কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্বল পরিকল্পনা, পরিবেশ ধ্বংস এবং সামাজিক বৈষম্যের সম্মিলিত প্রতিফলন।

সাম্প্রতিকতম আসাম বন্যার ছবি

৩.

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছিলেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর জলচক্র আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। ভারত সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ। আগে যেখানে বন্যা প্রধানত বর্ষাকালের দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টির ফল ছিল, এখন কয়েক ঘণ্টার অতিভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি অঞ্চলে হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে যাওয়া (Glacial Lake Outburst Flood বা GLOF), আকস্মিক ভূমিধ্বস এবং ঘূর্ণিঝড়জনিত জলোচ্ছ্বাস– সব মিলিয়ে বন্যার প্রকৃতি সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় আকস্মিক বৃষ্টিপাতের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে, যা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে (IPCC, ২০২৩)।

ক. মুম্বই, ২০০৫– একদিনের বৃষ্টি ও ব্যাপক বন্যা:

২০০৫ সালের ২৬ জুলাই ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বই মাত্র ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৯৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের সাক্ষী হয়। এটি ভারতের নাগরিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ বৃষ্টিপাত। রাস্তাঘাট, রেলপথ, বিমানবন্দর, হাসপাতাল– সবই জলের নিচে চলে যায়। সরকারি হিসাবে এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

কিন্তু এই বন্যার কারণ শুধু বৃষ্টি ছিল না। নদীর সংকুচিত প্রবাহ, জলাভূমি দখল, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং অপ্রতুল নিকাশী ব্যবস্থা শহরটিকে অচল করে দেয়। মুম্বইয়ের এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে ‘Urban Flood’ বা নগর-বন্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন অফিসকর্মী পরে স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন– ‘বাড়ি ফিরতে ১৮ ঘণ্টা লেগেছিল। মোবাইল বন্ধ, খাবার নেই, চারদিকে শুধু জল। কিন্তু অচেনা মানুষই আমাকে খাবার দিয়েছিল, আশ্রয় দিয়েছিল। এত জল আমি জীবনেও কোনওদিন দেখিনি।

মুম্বইয়ের বন্যা, ২৬ জুলাই ২০০৫

খ. উত্তরাখণ্ড, ২০১৩– পাহাড়ের কান্না:

২০১৩ সালের জুন মাস। রাতের বেলা সকলে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন, কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পেলেন না কেদারনাথ-সহ সমগ্র উত্তরাখণ্ডে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত, দ্রুত হিমবাহ গলন এবং আকস্মিক জলপ্রবাহ এক অভূতপূর্ব বিপর্যয় ডেকে আনছে। কিন্তু সেদিন ভোর-রাতেই মন্দাকিনী, অলকানন্দা এবং ভাগীরথী নদীর অববাহিকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন থেকে চার হাজার মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন এবং লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।

বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে অতিবৃষ্টি, ভঙ্গুর পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, নির্বিচারে সড়ক নির্মাণ, নদীতীরে অবৈজ্ঞানিক নির্মাণ এবং পর্যটনের চাপ সব মিলিয়ে এই বিপর্যয়ের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। উত্তরাখণ্ডের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে পাহাড়ি অঞ্চলে বন্যা আর শুধুমাত্র নদীর জল বাড়ার ঘটনা নয়; এটি ভূমিধ্বস, পাথরধ্বস এবং আকস্মিক জলপ্রবাহের সম্মিলিত রূপ।

রুদ্রপ্রয়াগের এক উদ্ধারকর্মী পরে বলেছিলেন– ‘আমরা শুধু মানুষ উদ্ধার করিনি; উদ্ধার করেছি তাদের স্মৃতি, ছবি, আর বেঁচে থাকার ইচ্ছেটুকু।’

পাহাড়ের কান্না, উত্তরাখণ্ড, ২০১৩

গ. কেরল, ২০১৮– শতাব্দীর অন্যতম বড় বন্যা:

২০১৮ সালে কেরলে অস্বাভাবিক মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ফলে রাজ্যের প্রায় সব নদী বিপদসীমা অতিক্রম করে। একাধিক বাঁধ থেকে একসঙ্গে জল ছাড়তে হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রায় চারশোর বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং লক্ষাধিক মানুষকে ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিতে হয়।

কেরলের এই বন্যা দেখিয়ে দিয়েছিল যে বন্যা ব্যবস্থাপনা শুধু বাঁধ নির্মাণের উপর নির্ভর করতে পারে না। নদী অববাহিকা, জলাধার, বন, ভূমি ব্যবহার এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস সব কিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

এই দুর্যোগে জেলেদের ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। নিজেদের মাছ ধরার নৌকা নিয়ে হাজার হাজার জেলে উদ্ধারকাজে অংশ নেন। তাঁদের অনেকেই শত শত মানুষকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন। কেরলের মানুষ তাঁদের নাম দিয়েছিলেন ‘Sea Angels’– সমুদ্রের দেবদূত।

ঘ. সিকিম, ২০২৩– হিমবাহের হ্রদ ভেঙে বন্যা:

২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে সিকিমের দক্ষিণ লোনাক হ্রদ (South Lhonak Lake) ভেঙে যাওয়ার ফলে তিস্তা নদীতে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাকে Glacial Lake Outburst Flood (GLOF) বলা হয়। প্রবল স্রোতে তিস্তা অববাহিকার বহু গ্রাম, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয়ে যায়।

হিমালয়ের পার্বত্য বন্যায় বিপর্যস্ত সিকিম, ২০২৩

বিজ্ঞানীদের মতে, হিমালয়ের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ দ্রুত গলছে এবং হিমবাহ-হ্রদগুলির আয়তন বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এটি একবিংশ শতাব্দীর বন্যার এমন একটি রূপ, যার অস্তিত্ব উনিশ শতকে প্রায় ছিলই না।

একবিংশ শতাব্দীর বন্যা আমাদের নতুন একটি শিক্ষা দিয়েছে, বন্যা মানেই শুধু নদীর জল উপচে পড়া নয়। এটি এখন জলবায়ু, নগর পরিকল্পনা, বন উজাড়, নদী দখল, অবৈজ্ঞানিক নির্মাণ এবং সামাজিক বৈষম্যের সম্মিলিত ফল।

আজ বন্যা সবচেয়ে বেশি আঘাত করে সেই মানুষদের, যাদের ঘর নদীর ধারে, শহরের বস্তিতে কিংবা পাহাড়ের ভঙ্গুর ঢালে। তাদের কাছে বন্যা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি জীবিকা হারানোর গল্প, স্কুল হারানোর গল্প, জমি হারানোর গল্প, কখনও বা নিজের প্রিয়জনকে হারানোর গল্প।

তবুও প্রতিটি বিপর্যয়ের পর মানুষ আবার ঘর তোলে, জমিতে বীজ বোনে, নৌকা মেরামত করে এবং নতুন করে জীবন শুরু করে। এই পুনর্গঠনের শক্তিই ভারতের বন্যা-ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

৪.

নদীকে জয় করা যায় না; নদীকে বুঝতে হয়। যে সভ্যতা নদীকে শত্রু ভাবে, সে একদিন নদীর কাছেই পরাজিত হয়। ভারতের বন্যার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে– বন্যা বদলেছে, আর তার সঙ্গে বদলেছে মানুষের সঙ্গে নদীর সম্পর্কও। উনিশ শতকে মানুষ নদীর ছন্দ বুঝে জীবন গড়ে তুলেছিল। বিশ শতকে উন্নয়নের নামে নদীকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা বাড়ে। আর একুশ শতকে জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন বন্যাকে আরও জটিল, অনিশ্চিত এবং বিধ্বংসী করে তুলেছে।

নগর বন্যা

উনিশ শতকের বন্যা ছিল মূলত নদীনির্ভর। দীর্ঘস্থায়ী বর্ষণের ফলে নদী উপচে সমভূমি প্লাবিত হত। মানুষ জানত কোন জমি বন্যাপ্রবণ, কোথায় বসতি গড়তে হবে এবং কীভাবে বর্ষার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। বন্যা ছিল ধ্বংসের পাশাপাশি উর্বরতারও উৎস। বিশ শতকে বাঁধ, ব্যারাজ, নদীশাসন, বৃহৎ সেচ প্রকল্প এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হতে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে নদীর তলদেশে পলি জমে জলধারণ ক্ষমতা কমে যায়। একইসঙ্গে নদীর বন্যাপ্রবাহের স্বাভাবিক বিস্তার সংকুচিত হয়। ফলে অনেক এলাকায় বন্যার তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি পায়। একুশ শতকে এসে বন্যা আর কেবল নদীর সমস্যা নয়। এটি এখন জলবায়ু পরিবর্তন, চরম আবহাওয়া, নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতা, জলাভূমি ধ্বংস, বন উজাড় এবং সামাজিক বৈষম্যের সম্মিলিত প্রতিফলন। ভারতীয় উপমহাদেশে অল্পসময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাত, হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা (GLOF), উপকূলীয় জলোচ্ছ্বাস এবং নগর বন্যার সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে (IPCC, ২০২৩; Kuntla et al., ২০২৫)।

দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের ধারণা ছিল, বাঁধ তৈরি করলেই বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এই ধারণা সবক্ষেত্রে কার্যকর নয়। নদী একটি জীবন্ত ব্যবস্থা। তার নিজস্ব প্রবাহ, বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল, পলি পরিবহন এবং মৌসুমি পরিবর্তন রয়েছে। নদীকে কংক্রিটের বাঁধে আবদ্ধ করলে অনেক সময় উজানে জলাবদ্ধতা এবং ভাটিতে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ে। একইসঙ্গে নদীতীর দখল, বালি খনন, খাল ভরাট এবং জলাভূমি ধ্বংসের ফলে নদীর অতিরিক্ত জলধারণ করার স্বাভাবিক ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিতেও বহু এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

ভারতের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত সুন্দরবন বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের এক অনন্য উদাহরণ। এখানে নদীর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি সবকিছু একসঙ্গে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। আইলা (২০০৯), আম্ফান (২০২০), ইয়াস (২০২১) এবং রেমাল (২০২৪) দেখিয়েছে যে উপকূলীয় বন্যা এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। লবণাক্ত জল কৃষিজমিতে প্রবেশ করছে, পানীয় জলের উৎস নষ্ট হচ্ছে, মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরে চলে যাচ্ছে। অনেক পরিবার বারবার ঘর নির্মাণ করছে, আবার হারাচ্ছে।

আয়লা-বিধ্বস্ত সুন্দরবন

তবুও সুন্দরবনের মানুষ হাল ছাড়েননি। তাঁরা উঁচু মাচার ঘর তৈরি করছেন, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করছেন, ম্যানগ্রোভ রোপণ করছেন এবং বিকল্প জীবিকার পথ খুঁজছেন। এই অভিযোজন আমাদের শেখায় যে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

বন্যাকে সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন–

১. নদীর প্রাকৃতিক বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল সংরক্ষণ।
২. জলাভূমি, বিল, হাওর ও পুকুর রক্ষা।
৩. শহরে বিজ্ঞানসম্মত নিকাশী ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৪. বন্যাপ্রবণ এলাকায় গৃহ নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ।
৫. আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কীকরণ আরও শক্তিশালী করা।
৬. স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করা।
৭. নদী অববাহিকাভিত্তিক (River Basin) সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ।
৮. ম্যানগ্রোভ ও প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধার।
৯. বিদ্যালয় ও সম্প্রদায়ভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতি কর্মসূচি চালু করা।

বিশ্বব্যাপী এখন Nature-based Solutions (NbS) বা প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। নদীর প্রাকৃতিক বন্যাপ্রবাহ এলাকা ফিরিয়ে দেওয়া, জলাভূমি পুনরুদ্ধার, বনায়ন এবং নদী পুনর্জীবন এসব ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে বন্যা ঝুঁকি কমাতে কার্যকর হতে পারে।

প্রতিটি বন্যার পর সংবাদপত্রে আমরা সংখ্যার হিসাব দেখি, কতজন মারা গেলেন, কত ঘর ভাঙল, কত কোটি টাকার ক্ষতি হল। কিন্তু সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ব্যক্তিগত গল্প, স্মৃতি। কোথাও একজন মা তাঁর সন্তানের স্কুলের বই হারিয়েছেন। কোথাও একজন বৃদ্ধ তাঁর ৫০ বছরের সংসার। কোথাও একজন কৃষক তাঁর একমাত্র জমি। আবার কোথাও একজন জেলে নিজের নৌকা দিয়ে শত শত অচেনা মানুষকে বাঁচিয়েছেন। এই গল্পগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বন্যা শুধু জল নয়; এটি মানুষের স্মৃতি, সম্পর্ক, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যতের গল্প।

ভারতের বন্যার ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, প্রকৃতিকে জয় করার চেষ্টা নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই ভবিষ্যতের পথ। বিগত শতকে মানুষ নদীকে বুঝত, বুঝতে চেষ্টা করত। পরে নদীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। বর্তমান সময় আমাদের আবার শিখিয়ে দিচ্ছে যে নদীকে তার প্রাকৃতিক স্থান ফিরিয়ে না দিলে উন্নয়নও নিরাপদ হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে বন্যা আরও অনিশ্চিত হবে। তাই আমাদের প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রকৃতিনির্ভর সমাধান, স্থানীয় জ্ঞানের প্রতি সম্মান এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি। কারণ, শেষ পর্যন্ত বন্যার বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি কেবল প্রযুক্তি নয়, মানুষের মানবিকতা, সম্মিলিত উদ্যোগ এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।