hinduism of vivekananda and beef controversy। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘গোমাতার সন্তান’ বনাম স্বামী বিবেকানন্দ!

নিরামিষ আহার যদি অহিংসার পন্থা হয়, তবে কে কী মাংস খেল তার নিরিখে মানুষকে মেরে ফেলা চরম অধর্ম– এই কথাই মনে হয়েছিল ২০১৫ সালে গোরক্ষার নামে আখলাক খানকে পিটিয়ে মারার ভয়াবহ সংবাদটি দেখে। শুনেছি ব্রহ্মজ্ঞান হলে বামুন হয়। সর্বভূতে ব্রহ্ম না দেখতে পেলে বামুনের বামনাই কীসে! এই বাংলায় সেই কোন কালে জয়রামবাটি নামের এক অজ পাড়া-গাঁয়ে সারদামণি নামের এক বামুনের বিধবা আমজাদ নামের এক মুসলিম জোলার এঁটো পাত কুড়িয়ে তাঁকে সন্তানের সম্মান দিয়েছিলেন, এই কথাটি ভুলে গেলে চলবে?

প্রচ্ছদ শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬, ১৯:১২   
Facebook WhatsApp Messenger

সাল ১৮৯৭। বাগবাজারের প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে রয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ। গো-রক্ষিণী সমিতির এক হিন্দুস্থানী প্রচারক এসেছেন তাঁর কাছে। স্বামীজি জিজ্ঞেস করলেন, তাঁদের সমিতির উদ্দেশ্য কী? প্রতিনিধি জানালেন, তাঁদের লক্ষ রুগন গোমাতার সেবা এবং গোমাতাদের কসাইদের হাত থেকে রক্ষা করা। স্বামীজি তাঁকে জানতে চাইলেন, মধ্য ভারতে দুর্ভিক্ষে যে ৯ লক্ষ লোকের প্রাণহানি হয়েছে, সেখানে তাঁরা কি কিছু করছেন? উত্তর এল, না। কারণ যারা মরছে তারা তাদের কর্মফলেই মরছে।

স্বামীজি চটে লাল! বললেন, ‘গরুদের ক্ষেত্রেও একথা খাটে, কর্মফলেই তারা নিহত হচ্ছে। তবে?’ ‘কী করি, গোমাতা যে!’ জবাব দিলেন গো-রক্ষক। ‘আপনি যে গোমাতার সন্তান তা বিলক্ষণ বুঝেছি’– এই হল শিকাগোর ধর্মসভার হিন্দুধর্মের বিশ্বজয়ী সন্ন্যাসীর উত্তর।

আজ, হিন্দুর যাবতীয় ধর্মবোধ যখন হেঁশেলে এসে ঢুকছে, আর উত্তর ভারতীয় আগমার্কা হিন্দুয়ানি দেশের মানুষের শান্তি আর উন্নতির দফারফা করতে বদ্ধপরিকর, তখন বিবেকানন্দের মতো জাত হিন্দু সন্ন্যাসীর এই প্রতিবাদী রসিকতাটা একবার স্মরণ করে নেওয়া গেল। ইতিহাস বলে– যত মত তত পথে বিশ্বাসী তাঁর গুরু পরমহংসদেব স্বয়ং ইসলামমতে সাধনা করেছিলেন, মুসলমানের অন্ন খেয়েছিলেন এবং সেকালের নিরিখে ‘নিষিদ্ধ’ মাংসও মুখে তুলতে চেয়েছিলেন।

অথচ বৈদিক যুগে হিন্দু, এমনকী, ব্রাহ্মণের আহার্য হিসাবে গোমাংস একবারে অচ্ছুৎ ছিল না। বরং যাগযজ্ঞ, বলি, উৎসবে, অতিথি সৎকারে গোমাংসের যে যথেষ্ট ব্যবহার আর কদর ছিল, তার ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে ঋকবেদে, স্মৃতি সংহিতায়, মহাভারতে ও রামায়ণে। এই শুদ্ধ শাকাহারী গুজরাতি হিন্দুবাদের যুগে একটি কথা বলি– মধুপর্কে আর হিন্দুশ্রাদ্ধে মাংস খাবার চল ছিল, শাস্ত্রীয় নির্দেশ মেনেই। মনুসংহিতা বলছে, ‘যে ব্যক্তি যথাবিধি নিযুক্ত হইয়া শ্রাদ্ধে ও মধুপর্কে মাংস ভোজন না করে, সে মৃত্যুর পর একবিংশতি জন্ম পশুযোনি প্রাপ্ত হয়।

অসংস্কৃতান পশূন মন্ত্রৈর্নাদ্যাৎ বিপ্র কদাচন।
মন্ত্রৈস্তু সংস্কৃতানদ্যাচ্ছাশ্বতং বিধিমাশ্রিতঃ।। ৩৬।।

এই শ্লোক দেখে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সেই পদ্য মনে পড়ছে–

এমন পাঁঠার মাংস নাহি খায় যারা
মরে যেন ছাগীগর্ভে জন্ম লয় তারা।

আর প্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতিতে মদ? বাল্মীকি রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে রামচন্দ্র সীতার হাতে মৈরেয় মদ্য (মৌরি থেকে তৈরি মদ) তুলে দিচ্ছেন। ‘সীতামাদায় হস্তেন মধুমৈরেয়কং শুচি।।’ (উত্তরকাণ্ড, ১৮/৫২), সঙ্গে মাংস, ফল এসব তো আছেই।

এবার আসি গোমাংসের কথায়। ঋকবেদের দশম মণ্ডলের ৮৬ নং সূক্তে ইন্দ্র সগর্বে ইন্দ্রাণীকে বলছেন: ‘আমি পনেরো অথবা কুড়িটি বৃষের মাংস খেতে পারি।’ ঠিক তার আগেই, এই দশম মণ্ডলেই, ৮৫নং সূক্তে আছে এই ষাঁড়ের মাংস রান্নায় উল্লেখ। প্রাচীন সংস্কৃতে (পাণিনি,) ‘গোঘ্ন’ শব্দটি আছে, গো হননকারী যার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ, অপর অর্থ ‘অতিথি’, অর্থাৎ গোমাংসভক্ষণকারী অতিথি। শতপথ ব্রাহ্মণে অতিথি সৎকারের জন্য উপাদেয় ‘মহাক্ষ’ বা বিশালাকার বৃষমাংসের কথা রয়েছে, রাজসূয় যজ্ঞের প্রসঙ্গে সেখানে যে ‘গোসভ’ অংশটি আছে সেখানেও রয়েছে গোমাংসের উল্লেখ। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণের তৃতীয় অধ্যায়ে উচ্চারিত হচ্ছে ‘অথো অন্নম বৈ গৌঃ’। রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডে দেখি, ‘সেই ধীমান রাজপুত্রের বাক্য শুনিয়া ধর্মাত্মা বশিষ্ঠ গোমাংসের অর্ঘ্য আনয়ন করিলেন’ (২, ৫৪, ১৭)।

পণ্ডিত মহল মনে করেন, অনেক পরের দিকে গাভীর দুধ ও নানা দানের কথা ভেবে গো-হত্যায় বারণ আসতে থাকে হিন্দু বিধানে। আর জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার দায়ও এসে পড়ে হিন্দুধর্মের রক্ষকদের হাতে। কিন্তু তার মানে এই নয়, হিন্দুধর্মের সনাতন ইতিহাসে গোমাংস অস্পৃশ্য ছিল।

……………………

আরও পড়ুন: বিফের মতো সুপাচ্য, পুষ্টিকর মাংস ভূ-ভারতে নেই, মেয়েকে চিঠিতে লিখেছিলেন বুদ্ধদেব বসু

……………………

ধর্ম যখন ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার হয়, তখন তা আর ধর্ম থাকে না। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দল হিন্দুধর্মের এক আগ্রাসী একরৈখিক চেহারা তৈরি করেছে। নিরামিষ আহার যদি অহিংসার পন্থা হয়, তবে কে কী মাংস খেল তার নিরিখে মানুষকে মেরে ফেলা চরম অধর্ম– এই কথাই মনে হয়েছিল ২০১৫ সালে গোরক্ষার নামে আখলাক খানকে পিটিয়ে মারার ভয়াবহ সংবাদটি দেখে। শুনেছি ব্রহ্মজ্ঞান হলে বামুন হয়। সর্বভূতে ব্রহ্ম না দেখতে পেলে বামুনের বামনাই কীসে! এই বাংলায় সেই কোন কালে জয়রামবাটি নামের এক অজ পাড়া গাঁয়ে সারদামণি নামের এক বামুনের বিধবা আমজাদ নামের এক মুসলিম জোলার এঁটো পাত কুড়িয়ে তাঁকে সন্তানের সম্মান দিয়েছিলেন, এই কথাটি ভুলে গেলে চলবে?

 

ঋণ

স্বামী শিষ্য সংবাদ, শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ: স্বামী সারদানন্দ
Beef, Brahmins and Broken Men:An annotated critical selection from the Untouchables, Dr.Bhimrao Ambedkar
বাল্মীকির রাম ও রামায়ণ: নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি
‘নিরামিষ’ হিন্দু ভারত, ‘আমিষ’ সেকুলার ভারত: ব্রাত্য বসু

…………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন শৈবাল বসু-র অন্যান্য লেখা

…………………

beefsteak brahmin Culture Olypub controversy Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sarada Devi Swami Vivekananda Vedas

Share this article on