is wolf cursed in Zoroastrian mythology |,Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

নেকড়ে অশুভ প্রাণী?

জরাথুস্ট্রবাদে যা কিছু ভালো, তার উৎস হল হিতৈষী আত্মা ‘ওহরমাজদ’-এর সৃজনশীলতা; আর সমস্ত মন্দ বা খারাপ আসে অশুভ শক্তির আত্মা ‘আহরিমান’ থেকে। নবম শতাব্দীর পাহলভি গ্রন্থগুলিতে এই দ্বৈতবাদ ছিল সর্বব্যাপী। ভালো এবং মন্দ শক্তিকে প্রায় নিখুঁত প্রতিসাম্যে উপস্থাপন করা হয়েছে সেখানে, এবং প্রতিটি ভালো প্রাণীর জন্য একটি প্রতিসম মন্দ প্রাণীও রয়েছে। ‘হিতৈষী’ প্রাণী, হিতৈষী আত্মার সৃষ্টি, এবং ‘অশুভ’ প্রাণী, অর্থাৎ অশুভ আত্মার সৃষ্টি– এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রাণীদের হিতৈষী বা অশুভ হিসেবে এই বিভাজন প্রাচীন ইরানি ধর্মীয় বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক দিকগুলোর একটিকে তুলে ধরে। জরাথুস্ট্রবাদের দ্বৈতবাদী নীতি অনুসারে, নেকড়ে হল একটি ‘অশুভ প্রাণী’, যার নাম ‘খ্রাফস্তার’।

Published by: Robbar Digital

Posted:May 3, 2026 7:07 pm | Updated:May 3, 2026 7:07 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

নেকড়ের পূর্বপুরুষদের জন্ম উত্তর আমেরিকায় হলেও আধুনিক ধূসর নেকড়ের পূর্ণ বিকাশ ও বিবর্তন ঘটেছিল ইউরেশিয়া অঞ্চলে। গবেষকেরা বলেছেন, আদি নেকড়েরা উত্তর আমেরিকা থেকে বেরিং ল্যান্ড ব্রিজ পার হয়ে ইউরেশিয়ায় প্রবেশ করে এবং আনুমানিক এক মিলিয়ন বছর আগে ইউরেশিয়াতেই আধুনিক ধূসর নেকড়ের (Canis lupus) জন্ম হয়। মধ্য প্লেইস্টোসিন যুগ থেকেই তারা পারস্যের মালভূমি, যা পরে ‘ইরান’ নামে পরিচিত হয়, এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। বর্তমানে ইরানে যে নেকড়ে দেখা যায় (Canis lupus pallipes)– সেগুলো অন্য ধূসর নেকড়েদের থেকে আলাদা হতে শুরু করে প্রায় ৪,০০,০০০ বছর আগে। ইরানের কেরমানশাহ প্রদেশের পাহাড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকালে প্রায় ১২,০০০ থেকে ৪০,০০০ বছর পুরনো নেকড়ের যে হাড় ও পশমের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে, সেগুলো প্রমাণ করে যে, প্রাচীন প্রস্তর যুগেও নেকড়েরা পারস্যের পাহাড়ি ও বনাঞ্চলে দাপটের সাথে বিচরণ করত এবং মানুষের সাথে তাদের সংঘাত বা মিথস্ক্রিয়া ছিল।

প্রাচীন পারস্য ভাষায় নেকড়েদের বলা হত ‘গুরগ’। ‘হিরকানিয়া’ ছিল প্রাচীন পারস্য বা আজকের ইরানের একটি সুপরিচিত অঞ্চল। এটি বিশ্বের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ জলাশয় কাস্পিয়ান সাগরের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত ছিল। এই অঞ্চলটিকে ইরানের নিজস্ব ‘মেঘ অরণ্য’ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়। এই ‘হিরকানিয়া’কে বলা হয় ‘উলফ ল্যান্ড’ বা নেকড়ের দেশ। এখানের বনগুলিতে এখনও ইরানের চিতা, বাদামি ভালুক এবং নেকড়ের মতো বড় শিকারী প্রাণীর পাশাপাশি লাল হরিণ এবং রো হরিণের মতো তৃণভোজী প্রাণীও বাস করে।

ইরানে বেশ কয়েক প্রজাতির নেকড়ে আছে। দক্ষিণ কাস্পিয়ান অঞ্চলের নেকড়েগুলো ককেশীয় উপপ্রজাতির ও উত্তর-পূর্বের নেকড়েগুলো ইউরোপীয় উপপ্রজাতির এবং ইরানের অন্যান্য অঞ্চলের নেকড়েগুলো ভারতীয় বা ইরানি উপপ্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটাতে অবস্থিত ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল উলফ সেন্টার’-এর মতে, ইরানে এখনও ১,০০০-এরও বেশি নেকড়ে রয়েছে। তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিকারের পশু কমে যাওয়ায় এবং গবাদি পশু ও মানুষের উপর আক্রমণের ফলে যে মানব-সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছিল, তার কারণে ইরানের নেকড়ের সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে এবং কিছু এলাকায় এদের সম্পূর্ণ বিলুপ্তিও ঘটেছে।

সেখানে নেকড়েদের এই বিলুপ্তির পিছনে রয়েছে ইরানিদের ধর্মীয় বিশ্বাসও। ইতিহাস বলছে, নেকড়ে এবং ইরানি জনগণের মধ্যেকার সম্পর্কটা অত্যন্ত প্রাচীন হলেও, সেই সম্পর্ক কখনই সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল না। ইরানিরা মনে করতেন নেকড়ে আসলে শয়তানের প্রতিভূ। প্রাচীন ইরানিদের বিশ্বাস ছিল নেকড়ে নিধন করা একটি পুণ্যের কাজ, কারণ নেকড়ে শিকার অশুভ শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। বেশিরভাগ ইরানি লোককথায় নেকড়েকে ঐতিহ্যগতভাবে লোভী ও রাগী হিসেবে দেখানো হয়েছিল। সেখানে নেকড়ে নির্বুদ্ধিতা বা অন্ধ ক্রোধের প্রতীক হিসেবে ধূর্ত ও বুদ্ধিমান শিয়ালের কাছে পরাজিত হয়েছে বারবার। এর প্রেক্ষিতে ছিল প্রাচীন পারস্যে জরাথুস্ট্রবাদের প্রবল প্রভাব।

ইতিহাসের গবেষকেরা বলেছেন, ইরানে জরাথুস্ট্রবাদীদের এই প্রভাব প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত অত্যন্ত গভীর এবং দেশটির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইসলাম-পূর্ব যুগে এটি পারস্যের প্রধান ধর্ম ছিল। প্রায় এক সহস্রাব্দ ধরে তিনটি বিশাল পারস্য সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে টিকে ছিল জরাথুস্ট্রবাদ। সেই জরাথুস্ট্রবাদে নেকড়েকে কেবল একটি অশুভ প্রাণী হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়নি, তাদের মেরে পুণ্য অর্জন করার কথাও বলা হয়েছিল।

প্রাচীন ইরানে নেকড়ে এবং মানুষের সাথে তাদের সম্পর্ক কেমন ছিল সেই সম্পর্কে শ্রেষ্ঠ ভাষ্যটি রয়েছে মাহনাজ মোয়াজামির ২০০৫ সালে লেখা ‘জোরোস্ট্রিয়ান ধর্মে দুষ্ট প্রাণী’ প্রবন্ধটিতে। তিনি লিখেছেন জরাথুস্ট্রবাদীদের সকল প্রাণীর প্রতি মনোভাব এই ধর্মমতের ‘দ্বৈতবাদ’-এর উপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল।

দ্বৈতবাদ হল জরাথুস্ট্রবাদী ধর্মের সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উপাদান, এবং এই দ্বৈতবাদ ইরানি সভ্যতাকে সব দিক থেকে প্রভাবিত করেছিল।

জরাথুস্ট্রবাদে যা কিছু ভালো, তার উৎস হল হিতৈষী আত্মা ‘ওহরমাজদ’-এর সৃজনশীলতা; আর সমস্ত মন্দ বা খারাপ আসে অশুভ শক্তির আত্মা ‘আহরিমান’ থেকে। নবম শতাব্দীর পাহলভি গ্রন্থগুলিতে এই দ্বৈতবাদ ছিল সর্বব্যাপী। ভালো এবং মন্দ শক্তিকে প্রায় নিখুঁত প্রতিসাম্যে উপস্থাপন করা হয়েছে সেখানে, এবং প্রতিটি ভালো প্রাণীর জন্য একটি প্রতিসম মন্দ প্রাণীও রয়েছে। ‘হিতৈষী’ প্রাণী, হিতৈষী আত্মার সৃষ্টি, এবং ‘অশুভ’ প্রাণী, অর্থাৎ অশুভ আত্মার সৃষ্টি– এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রাণীদের হিতৈষী বা অশুভ হিসেবে এই বিভাজন প্রাচীন ইরানি ধর্মীয় বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক দিকগুলোর একটিকে তুলে ধরে। জরাথুস্ট্রবাদের দ্বৈতবাদী নীতি অনুসারে, নেকড়ে হল একটি ‘অশুভ প্রাণী’, যার নাম ‘খ্রাফস্তার’।

মোয়াজামি পর্যবেক্ষণ করেন যে, অশুভ আত্মা কর্তৃক জন্ম হওয়া বন্য প্রাণীদের মধ্যে নেকড়ের সাথে অশুভ আত্মা ও দানবদের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এটিকে সর্বদা বিকৃত ও ব্যঙ্গাত্মক এবং অতিরিক্ত নেতিবাচক গুণাবলিসম্পন্ন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

জরাথুস্ট্রবাদে নেকড়েকে প্রথম থেকেই ইরানিদের আদর্শ শত্রু হিসেবে দেখা হয়েছিল। ইরানে নেকড়ে হত্যা করা ছিল একটি মহাপুণ্যের কাজ। একটি পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, জরাথুস্ট্রকে তুরানীয় তুর-ই-ব্রাদ্রেস হত্যা করেছিল, যার চাল চলন ছিল নেকড়ের মতো। জরাথুস্ট্রীয় সাহিত্যে নেকড়েকে মৃতদেহ-ভক্ষণকারী হিসেবেও দেখা যায়। পাখি ও কুকুরের পাশাপাশি নেকড়েদেরও পচা-গলা মাংস-ভক্ষণকারীদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হত।

প্রাণীটি এমনকী জরাথুস্ট্রবাদী পরকালতত্ত্বেও আবির্ভূত হয়। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পরেও ইরানে নেকড়ের প্রতি সেই বিদ্বেষ থেমে থাকেনি। জরাথুস্ট্রবাদের সেই ‘অশুভ শক্তির প্রতীক’ হিসেবে নেকড়েকে দেখার মানসিকতা ইরানিদের অবচেতন মনে থেকে গিয়েছিল। ফেরদৌসী তুরানিও তাঁর শাহনামায় শত্রুদের নেকড়ের সাথে তুলনা করেছিলেন, যা এই প্রাণীর প্রতি ঘৃণাকে আরও উস্‌কে দিয়েছে।

বর্তমানে ইরানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের আইনের কারণে, নেকড়ে মারার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তবুও প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামারিদের মধ্যে এখনও সেই প্রাচীন ‘নেকড়ে-বিদ্বেষ’ কিছুটা হলেও বজায় রয়েছে।

Mythology Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar wolf Zoroastrianism

Share this article on