rabindranaths-khoai-is-fading-into-oblivion-robbar | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কবিতা, শিল্প আর ইতিহাসের খোয়াই আজ অস্তিত্ব সংকটে

শান্তিনিকেতনের সংস্কৃতি আর ইতিহাসের অঙ্গভূত খোয়াই। ১৯৩২ সালে লেখা ‘খোয়াই’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন খোয়াইয়ের রূপ। এখন অনেক বেশি ক্ষয়িষ্ণু খোয়াই, অস্তিত্ব সংকটে। নন্দলাল বসু, বিনোদবিহারী, অথবা রামকিঙ্করের ছবিতে খোয়াই যেন আলো-আঁধারির খেলায় বিমূর্ততার বহুপাঠ। লীলা মজুমদার তাঁর ফ্যান্টাসি ফিকশনে মিথ আর ম্যাজিক জড়িয়ে দিয়েছিলেন খোয়াইয়ের সঙ্গে। একদিকে প্রাকৃতিক ক্ষয় অব্যাহত, অন্যদিকে মানুষজনের চলাচল, বসতি, আর নগরায়নের কিছু আপাত-অনিবার্য প্রভাবে সেই আদিরূপ এখন প্রায় রূপকথা।

শেষ আপডেট: জানুয়ারি ১৬, ২০২৬, ২১:২৪   
Facebook WhatsApp Messenger

উর্মিল লাল কাঁকরের নিস্তব্ধ তোলপাড়। ১৯৩২ সালে লেখা খোয়াই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ এইভাবে দেখলেন শান্তিনিকেতন আর তার সংলগ্ন অঞ্চল ঘিরে থাকা খোয়াইয়ের রূপ; এর মধ্যে পার হয়েছে নয় দশকেরও বেশি, আর এখন আরও অনেক বেশি ক্ষয়িষ্ণু খোয়াই, প্রায় অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে। এক সময়ে যে খোয়াইয়ের ছোট ছোট লাল টিলা নিয়ে আশ্চর্য ভূমিরূপ কবির, শিল্পীর কল্পনায় উচ্ছ্বাস যোগ করেছে বারবার, সেই খোয়াই যে ক্রমশ ওপরের কঠিন আবরণ ক্ষয়ে গিয়ে প্রায়-সমতল হয়ে উঠছে, এই ক্ষয় প্রাকৃতিক দিক থেকে খানিকটা অবধারিতই ছিল। তবে এই-যে বীরভূমের এই প্রান্তে লাল মাটির উঁচু-নিচু প্রান্তর, যা এক সময়ে শান্তিনিকেতনের প্রকৃতির প্রায়-সমার্থক ছিল, বাংলা কাব্য-শিল্প-সংস্কৃতি-ইতিহাসের সঙ্গে তা জড়িয়ে রইল অমোঘভাবেই। সবুজের সমারোহে ঢাকা সাঁওতাল-পাড়া একদিকে, রবীন্দ্রনাথ দেখছেন তারই মধ্যে পৃথিবীর একটানা সবুজ উত্তরীয়, আবার তার উত্তর দিকে বিপরীত-রূপমাঝে মাঝে কালো মাটি/ মহিষাসুরের মুণ্ডের মতো। শ্যামলতা আর ঊষরতার এই দ্বৈতের মধ্যেই যেন কবি চিনে নিচ্ছেন প্রকৃতি-লগ্ন তাঁর অস্তিত্বের এক বিপুল বিচিত্র পাঠ। তাঁর মনেও পড়ে যাচ্ছে বাল্যে বর্ষার জলে ভরা খোয়াই তাঁকে দিয়েছিল গুহাগহ্বরে নুড়ি সাজিয়ে নির্জন দুপুরবেলা একলা খেলানোর মুহূর্ত– রচনা করেছি মনগড়া রহস্যকথা। কবি অশোকবিজয় রাহা-র খোয়াই কবিতাটিও (১৯৬১) আমাদের ফিরিয়ে দেয় বিস্ময় আর পূর্ব-ইতিহাস।

zoom
নন্দলাল বসুর ‘খোয়াই’। ১৯৪৮

সৃষ্টি, রহস্য, কল্পনা যেন আদিকাল থেকে খোয়াইকে ঘিরে রইল; লাল মাটির চরাচরে দূরে দূরে কিছু সোনাঝুরি গাছের জটলা নিয়ে এই আশ্চর্য ল্যান্ডস্কেপ শান্তিনিকেতনের শিল্পীদের স্মৃতিতে, সত্তায় কত-না উপলব্ধির মুহূর্ত নির্মাণ করে দিয়েছে। নন্দলাল বসু থেকে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় অথবা রামকিঙ্করের ছবিতে খোয়াই যেন গেরুয়া ধূসর রঙের স্তর নিয়ে, আলো-আঁধারির খেলা নিয়ে এক অর্থে বিমূর্ততার বহুপাঠ। রবীন্দ্রনাথের পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের খোয়াই কবিতাটি তীব্র আবেগ-স্পন্দিত অভিঘাতের একটি দৃশ্যরূপই হয়ে ওঠে যখন খোয়াই দেখে কবি বলে ওঠেন, ক্রন্দিত আকাশের নীচে ওই ধূসর বন্ধুর/ কাঁকরের স্তূপগুলো দেখে মনে হয়েছে/ লাল সমুদ্রে তুফান উঠল,/ ছিটকে পড়ছে তার শীকরবিন্দু। কবির দৃষ্টি একবার বাগান, বন-চষা ক্ষেত, রাঙা মাটির চলার পথের দিকে, আর পরক্ষণেই বুক-ফাটা ধরণীর রক্তিমা-র দিকেপূর্ণতা আর শূন্যতার চিহ্ন মিলিয়ে বিপুল প্রকৃতি-রহস্যের অন্তর্লগ্ন সত্যগুলি ছুঁয়ে যায় তাঁর মন।  

zoom
বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের ‘খোয়াই’। সময়কাল অনিশ্চিত

অশোকবিজয় রাহা-র যেথা এই চৈত্রের শালবন কাব্যগ্রন্থের খোয়াই কবিতাটির পাঠের মধ্যে আমরা   একটা প্রকাণ্ড সম্মোহ আর সমীহও মিশে থাকতে দেখছি। খোয়াইয়ের অনাবৃত ভূমিরূপের সামনে দাঁড়িয়ে কবি বলে উঠলেন, ছিন্নমস্তা পৃথিবীকে দেখি/ এখানে মাঠের এক ধারে/ রক্তাক্ত চীৎকারে/ পৃথিবীর আত্মহত্যা এ কি? রিক্ত, অনুর্বর খোয়াই যেন বিপুল শূন্যতার দ্যোতনা জাগাল। রবীন্দ্রনাথ এক দুর্লভ দিনাবসানে দেখতে পেয়ে যান পৃথিবীর এই ধূসর ছেলেমানুষির উপরে এই মহিমারোহিতসমুদ্রের তীরে তীরে/ জনশূন্য তরুহীন পর্বতের রক্তবর্ণ শিখর-শ্রেণীতে/ রুষ্ট রুদ্রের প্রলয় ভ্রূকুঞ্চনের মতো। তীব্র, সংহত তাঁর কবিতায় অশোকবিজয় রাহাও সূর্যাস্তের আলোয় ভূমিক্ষয়-জাত খোয়াইয়ের মধ্যে পড়ে নিচ্ছেন অনিবার্য কালের রোষ, যেন সভ্যতার উপর দৈব অভিশাপ– চারদিকে ধসা-মাঠ, কাঁকরের স্তূপ/ কালের বিদ্রুপ/ তারি এক পাশে/ শেষ সূর্য একবার জ্বলে ওঠে পশ্চিম-আকাশে। আশ্চর্য নয় যে এই কবিতা শেষ হয় বেদনায় কাতর এক নারীর রূপকল্পে, এক অর্থে আমূল এক সর্বনাশের ইঙ্গিতেতীর-বেঁধা রক্তসন্ধ্যা ত্রস্ত এলোচুলে/ খসে পড়ে দিগন্তের মূলে!  

কবির, শিল্পীর দর্শনে খোয়াই যেন কেবল একটি বিশিষ্ট ভূমিরূপ নয়, একই সঙ্গে মূর্ত আর বিমূর্ত হয়ে উঠেছিল তা। রবীন্দ্রনাথ খোয়াইকে শাশ্বত জীবন-প্রবাহের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন, মিলিয়েও নিচ্ছেন তাঁর সমগ্রতার ধারণার সঙ্গে, আর তিনি নিশ্চিত সভ্যতার শেষ লগ্ন পর্যন্ত বনভূমি আর খোয়াই পাশাপাশি চিনিয়ে দেবে জীবনের বহুমুখ– তারপরে রইবে উত্তর দিকে/ ওই বুক-ফাটা ধরণীর রক্তিমা,/ দক্ষিণ দিকে চাষের ক্ষেত, পূব দিকের মাঠে চরবে গোরু…পশ্চিমের আকাশপ্রান্তে/ আঁকা থাকবে একটি নীলাঞ্জনরেখা। অশোকবিজয় রাহাও একটি ব্যাপ্ত ইতিহাস-বোধের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন সন্ধ্যার খোয়াই, যদিও তার রক্তিম রূপের বর্ণনায় অমোঘ মৃত্যুর অনুষঙ্গ এসে পড়ল। শিল্পী নন্দলাল বসুর গেরুয়া আর কালো রেখায় খোয়াইয়ের ছবিতে, ম্যুরালে আবৃত আর অনাবৃতের দোলাচলে অনন্ত রহস্য; বিনোদবিহারীর কোমল রঙের উদ্ভাসে রুক্ষ অনুর্বর খোয়াই যেন আধো-চেনা, কল্পলোক। 

মনে পড়ছে, লীলা মজুমদার তাঁর ফ্যান্টাসি ফিকশনে মিথ আর ম্যাজিক জড়িয়ে দিয়েছিলেন খোয়াইয়ের সঙ্গে– বর্ষার জলে মাটি খেয়ে খেয়ে লাল কাঁকরের পাঁজরা বেরিয়ে থাকে যে খোয়াইয়ে, সেইখানেই দুই মুগ্ধ শিশুর সামনে উপস্থিত এক জাদু ঘোড়া (হলদে পাখির পালক)। তবে উর্মিল লাল কাঁকরের যে খোয়াই সাহিত্যিক, শিল্পীর ভাব-উচ্ছ্বাস জাগিয়েছে বারবার, কালের নিয়মে তার কিছুটা ক্রমশ মিশে যাচ্ছে আশপাশের লালমাটির সমতলে; একদিকে প্রাকৃতিক ক্ষয় অব্যাহত, অন্যদিকে মানুষজনের চলাচল, বসতি, আর নগরায়নের কিছু আপাত-অনিবার্য প্রভাবে সেই আদি রূপ এখন প্রায় রূপকথা। আমাদেরও ছাত্রবেলায় শান্তিনিকেতনের খোয়াই আর তাকে ঘিরে সোনাঝুরি বন ছিল প্রিয় চারণভূমি, শীতে, বসন্তে, আর বর্ষায় তার খাঁজে ভাঁজে লালচে রঙের জমা জল নিয়ে আমাদের ছেলেমানুষি কল্পনা। খোয়াই নিয়ে মানুষের মুগ্ধতার এখনও শেষ নেই; সোনাঝুরি বনের সংলগ্ন অঞ্চল, আরও পশ্চিমে আমার কুটির-এর পথ ঘিরে লালমাটির প্রান্তরের মধ্যেই এখনও চোখে পড়ে খোয়াইয়ের বিস্তার আর বিস্ময়। একাধিক অর্থে শান্তিনিকেতনের সংস্কৃতি আর ইতিহাসের অঙ্গভূত খোয়াই, আর আমাদের স্মৃতিমেদুরতার মধ্যেও লগ্ন হয়ে রইল। 

Ashokbijoy Raha Benode Behari Mukherjee Leela Majumdar Nandalal Bose Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on