short stories by nabaneeta devsen acts as a lesson | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রখর তবু তিক্ত নয়

সাপ্তাহিক ‘রোববার’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর শেষ লেখাটিতে নবনীতা এই সংকলন-সহ তাঁর আরও কিছু বইয়ের আসন্ন প্রকাশের কথা জানাচ্ছেন, ‘মাঝে মাঝে কখনও হাওয়াবাতাস পালটে যায়। মেঘ ছেঁড়া আলো এসে পড়ে জীবনে… এই যেমন হঠাৎ জানতে পেরেছি আমার একগুচ্ছ বই বেরচ্ছে খুবই শিগগির!’ (২৭ অক্টোবর, ২০১৯) প্রচ্ছদে তাঁর সহাস্য মুখের ছবিটি নিয়ে এই সংকলন যেন আজও আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় তাঁর চিরকালের ভালোবাসার বারান্দায়।

শেষ আপডেট: জুলাই ২, ২০২৬, ১২:০২   
Facebook WhatsApp Messenger

যেন বহুবর্ণ হীরকখণ্ডের মতো ঝলকায় নবনীতা দেবসেনের রম্য হাসির ছোটগল্প; তাঁর বিদগ্ধ মনন আর কৌতুকের বিচ্ছুরণের আশ্চর্য সংযোগ পাঠককে মুগ্ধ করে রাখে সারাক্ষণ। শানিত, প্রখর তাঁর দৃষ্টি, তিনি পরিহাসের সুযোগেই দেখে নিচ্ছেন নগরের, জীবনের খুঁটিনাটি আর তুখোড় রঙ্গরসের আড়ালে ছুঁয়ে থাকছেন সমকালের বাস্তব। লাইনে লাইনে নবনীতা-সুলভ উইট স্ফুলিঙ্গের মতো ঝরে, আমরা উপভোগ করতে করতে এগই, ভাবতে ভাবতেও। মুক্ত-চিন্তার স্বর তাঁর, গেড়ে-বসা যে কোনও একপেশে ধারণা অথবা বিশ্বাসের সমালোচনায় ক্লান্তিহীন, তবে তাঁর গল্পে অন্তঃশায়ী করুণা চিনে নিতে পাঠকের ভুল হয় না কখনও।

zoom
নবনীতা দেবসেন

‘পত্রভারতী’ থেকে তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত রচনা-সংকলন ‘নানারঙের নবনীতা’ (২০২০) ফিরে পড়তে গিয়ে সংকলিত ছোটগল্পগুলি আবার মনে করিয়ে দিল– তাঁর কাহিনির বুননে কীভাবে মিলে থাকছে তাঁর ব্যক্তিগত অনুভব, এমপ্যাথি আর প্রবল রসবোধ, কখনও বিষাদও লীন এমনকী।

সাপ্তাহিক ‘রোববার’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর শেষ লেখাটিতে নবনীতা এই সংকলন-সহ তাঁর আরও কিছু বইয়ের আসন্ন প্রকাশের কথা জানাচ্ছেন, ‘মাঝে মাঝে কখনও হাওয়াবাতাস পালটে যায়। মেঘ ছেঁড়া আলো এসে পড়ে জীবনে… এই যেমন হঠাৎ জানতে পেরেছি আমার একগুচ্ছ বই বেরচ্ছে খুবই শিগগির!’ (২৭ অক্টোবর, ২০১৯) প্রচ্ছদে তাঁর সহাস্য মুখের ছবিটি নিয়ে এই সংকলন যেন আজও আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় তাঁর চিরকালের ভালোবাসার বারান্দায়। তিনি স্বয়ং উপস্থিত থাকছেন তাঁর অধিকাংশ গল্পে চরিত্র হিসেবেই, তবে এখানে সাতটির মধ্যে তুলনায় বড় যে দু’টি গল্প নিয়ে আপাতত ভাবছি, ‘বাপ রে বাপ!’ (‘শারদীয়া যুগান্তর’, ১৯৮১) আর ‘ঠাকুমার গল্প’ (‘দেশ’, ২০০২), সেখানে তিনি আপাত-নিরপেক্ষ তৃতীয়-পুরুষ কথক, আর কথনে সেই তাঁর স্বভাবসিদ্ধ রমণীয় ভঙ্গী পাঠক-ঘনিষ্ঠ। দুই গল্পই আবার মনে করিয়ে দেয়, গভীর, স্পর্শকাতর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়েরও সরস পরিবেশনে নবনীতার সিদ্ধি; তাঁর স্টাইল সহজ, বৈঠকি কৌতুক দিয়ে মোড়া, আবার ধারালোও। লক্ষ করছি, দুই কাহিনিতেই অন্তর্লীন থাকছে চরিত্রের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, স্ব-পরিচয়ের একটা অন্বেষণ, যা অন্তর্ভুবনে কাজ করে যায় অবিরত, সমকালের কলকাতার একেবারে আলাদা দুই সামাজিক শ্রেণির প্রসঙ্গে যদিও।

‘বাপ রে বাপ!’ গল্পটি ‘জেন্ডার ট্রানজিশন’ ঘিরে, আর এই সূত্রে বাংলা ছোটগল্পে তুলনায় কম চর্চিত এই বিষয় আটের দশকে নবনীতা এখানে কেবল প্রাসঙ্গিক করে তুললেন, তাই নয়, নারী-পুরুষের ‘নির্দিষ্ট’ ভূমিকা-বিভাজন নিয়ে রইল কটাক্ষও। কোনও বিজ্ঞাপন সংস্থার সিনিয়র একজিকিউটিভ সোমেশ চৌধুরী হঠাৎ নিরুদ্দেশ হন, তিন মাস পরে ফিরে আসেন রূপান্তরিত ‘সোমা চৌধুরী’ হয়ে, তাঁর অনেকদিনের ইচ্ছা পূর্ণ করে। এখন ঘরে-বাইরে এর যে তীব্র প্রতিক্রিয়া, তার মধ্যেই থেকে যাচ্ছে ‘জেন্ডার আইডেন্টিটি’ নিয়ে নাগরিক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের পূর্ব-ধারণা। লেখক যেন নতুন করে পড়ে নিচ্ছেন পিতৃতান্ত্রিক ন্যারেটিভ, দেখছেন কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করছে জীবনের সদর-অন্দরের সমীকরণগুলি। ‘হাতে সিগারেট আর গায়ে কমলাডুরের আঁচল’, এই রূপান্তরিত সোমেশের উপলক্ষে তিনি হাসতে হাসতে ভাঙছেন ‘মেয়েলিপনা’ নামের মিথও।

‘চিরদিনকার মেয়েলি সোমেশ’-কে ‘পরমাসুন্দরী’ করে দিয়েছেন ডক্টর ‘চেঞ্জিংকর’! রঙিন টিপ, শকিং পিংক লিপস্টিক, ম্যাচিং নেল পলিশ আর সর্বাঙ্গে ‘লাস্য’ নিয়ে তিনি স্ত্রী ইন্দ্রাণীকে বলছেন, ‘তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কিছুই বদলাবে না…’, কেবল আইনত আগের সার্টিফিকেট বদল করা ইত্যাদি… ‘চল্লিশ বছরের আইডেন্টিটি হঠাৎ বদল করা কি সহজ? উঃ মা গো!’ তাঁর নতুন ‘রূপ যৌবনে’ ইন্দ্রাণীর কেবল ঈর্ষাই হয় না, তাঁর যেন অস্তিত্বের সংকট, ‘আমি কি এখন তবে মিসেস সোমা চৌধুরী?’ অফিসেও ‘ম্যাডাম চৌধুরী’ গুলিয়ে দেন সব চেনা হিসেব– মহিলা রিসেপশনিস্ট নিরাশ, লিফ্টম্যান বাক্যহারা, এক জুনিয়র প্রায় প্রেমে পড়ে যায়! বন্ধু ঘনশ্যাম সম্পর্ক অস্বীকার করে, বাড়িতে হরিদাসী এখন থেকে তাঁকে ‘মেমসাহেব’ বলবে! কমেডির মোড়কেই, পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটা সাবভার্সন পড়ে নিচ্ছি আমরা।

জন মরিস-এর জ্যান মরিসে ‘রূপান্তর’ সোমেশ ভোলেন না, কিন্তু তাঁর নিজের পরিমণ্ডলে এই নতুন ‘আইডেন্টিটি’ প্রতিষ্ঠার পথে এসে পড়ে নারী-পুরুষ ভূমিকার প্রচলিত বাইনারি। আবার তিনি যে এখন মিস্টার, মিসেস বা মিস নন, তিনি ‘Ms Soma Choudhury’, এর মধ্যেও যেন ইচ্ছা আর সংস্কারের মধ্যপন্থা খুঁজে নিতে হচ্ছে তাঁকে। তবে শিরোনামের ঠাট্টা অব্যর্থ হয়ে ওঠে যখন গল্পের শেষে প্রতিরোধ আসে তাঁর তিন সন্তানের পক্ষ থেকেই, আর স্নেহ-বৎসল বাবা তিনি তার জন্য প্রস্তুত নন, এইখানে তিনি নিরস্ত্র। শেষে কন্যা মিন্টু এই জটিলতার সমাধান করে দেয় তাঁকে ‘বাপিয়া’ ডেকে, বেঁচে যান সোমেশ, শেষরক্ষা হয়! পিতৃতন্ত্রের বাঁধা-গতের বিপরীতে যেন একটা ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’ তৈরি হয়। তবে লিঙ্গনিরপেক্ষ ভাবেও, আমাদের চেতনায় থেকে যায় স্বাধীন সত্তার জন্য অমোঘ আকাঙ্ক্ষা, আর সমাজের প্রত্যাশার মুখে, বাধ্যতায় তার অবদমন, এই বৃহত্তর সত্যিও সহমর্মী লেখক ছুঁয়ে গেলেন গল্পে; ‘রূপান্তর’ সেই অর্থে বহুমাত্রিক।

এক নবতিপর মানুষের অনর্গল অতীতচারণ নিয়ে ‘ঠাকুমার গল্প’, আর সেভাবেই যেন তাঁর নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দুর্মর চেষ্টা। যৌথ পরিবার, ভিটেমাটির গ্রাম এখন ইতিহাসের অংশ, বয়স্ক মানুষ শহুরে জীবনের ধাঁচায় বাঁচেন কেবল স্মৃতিকাতরতায়, আমূল নিরালম্বতা নিয়ে। এর মধ্যে কমেডি কোথায়? গল্প শুরুই হচ্ছে ঠাকুমার এক (প্রিয়) নাতি রঞ্জনের রিপোর্টিং দিয়ে, ‘ঠাকুমার ভীমরতি এখন ভয়াল পরিণতির দিকে!’ লেখক এখানে রঞ্জনের শ্রোতা, আবার কাহিনির কথকও, যদিও রঞ্জনও ‘সত্যি বলছে না গুল মারছে’ বোঝা যায় না! ঠাকুমাকে নিয়েও তাঁর সপাট মন্তব্য, ‘ঠাকুমার কীর্তিকাহিনী কি অল্প? খুব বিশিষ্ট মহিলা।’ কমেডি আর সিরিয়াসনেস-এর নবনীতা-সুলভ মিশেল এইখানে– ঠাকুমার ‘নানারকম উদ্ভট খেয়াল’-এর মধ্যেই নিহিত থাকছে ছিন্নমূল মানুষের অস্তিত্ব-সংকট, তার অনুষঙ্গের প্রচ্ছন্ন বেদনা নিয়ে।

‘ও মনু তোমরা করো কী? সাড়ে তিনটের অ্যারোপ্পেলেন উইড়া গেল, অহন তরা চা খাইবি না?’ সাড়ে তিনটের হিসেব কিন্তু নির্ভুল ছিল ঠাকুমার। অথবা, নীল আর্মস্ট্রং ‘চাঁদে নেমেছিলেন’ শুনে তাঁকে বলতে হয়, ‘নামসে কও ক্যান? ওঠসে কইতে হয়।’ ‘তা অহন না যাইয়া শুখা সিজনে যায় নাই ক্যান?’ সেই ঠাকুমারই একবার জেদ হল তাঁকে নিয়ে যেতে হবে ‘গঙ্গাচ্ছানে’। বাধ্য হয়ে নাতিরা তাঁকে উঠোনে নামিয়ে এনে বলে, ‘এইতো গঙ্গা… স্নানটা তবে সেরে নাও চটপট।’ ঠাকুমা চোখ বুজে, নাক টিপে ধরে, ‘অবগাহন’ করে উঠলেন– ‘আহ! কী আরাম! শরীলখান য্যান জুড়াইয়া গেল! গঙ্গাচ্ছান বলিয়া কথা’। ফেলে-আসা ভূখণ্ড, হারানো স্বজনের স্মৃতি জড়িয়ে নিয়ে তাঁর এই যে মায়া-বিভ্রম, তা আমাদের বিচ্ছিন্ন, সংযোগহীন সমকালের সাপেক্ষে একরকম ‘অবাস্তব’।

রঞ্জনের মুখেই শুনি, ‘আমার অমূল্যাডা আর নাই!’ বলে সকাল থেকে শোকগ্রস্ত ঠাকুমা! ‘বাড়িসুদ্দু লোকে তাঁকে বোঝাচ্ছি জ্যাঠা দিব্যি আছেন’, কিন্তু তিনি অনড়। বড় ছেলে অমূল্যকে কোন্নগর থেকে গড়িয়ার এই বাড়ি আনাও হয়েছে, এর পরে মাতা-পুত্রের দীর্ঘ দ্বিরালাপ– ‘স্বর্গে’ ‘টেকশি’ চলে কি না, ‘ওপারে রান্ধিয়া দেয় কে’ থেকে শুরু করে, ‘তুমিই পরনাম নিবা’ বলে ঠাকুমার পুত্রকে প্রণাম করতে যাওয়া, আর অমূল্যের বিড়ম্বনা, সবটা মিলিয়ে তুখোড় কৌতুক। এর পরেও তিন সন্তানের মা তিনি ভুলবেন ছেলেদের নাম, অথচ তাঁর মুখে শিশুকালে মৃত পাঁচ ভাইয়ের নাম নির্ভুল! প্রায় ডার্ক হিউমার তৈরি হয় যখন তিনি বলে ওঠেন, ‘আমারে পুড়াউ…আমি তো মরসি!’ শেষে ৮২ বছর আগের বন্যায় ভেসে-যাওয়া নয়াপাড়ায় তাঁর বাপের বাড়ির খবর নিতে পাঠাচ্ছেন রঞ্জনকে! এই অতীত-লগ্নতা যেন স্মৃতির ভিতরে একটা হারানো সময়, অস্তিত্বের পুনর্নির্মাণ।

আমাদের নগর-যাপনের বহুমুখ নবনীতা দেব সেনের গল্পে, অচর্চিত অস্বস্তিকর অনেক সত্যি মিলিয়ে নিয়ে; নাগরিক জীবনের অ্যানাটমির দিকে যেন তাঁর চোখ। সংকলনের বাকি গল্পগুলি, ‘জয় জয়ন্তী’, ‘আমার আধার কার্ড নেই’, ‘মেঘদীপের গার্লফ্রেন্ডরা’, ‘নেশাড়ু অ্যান্ড কোং’ আর ‘আরে, পেহলে হমে তো জীনে দো?’, খুব ছোট আয়তনের পরিসরেও ছুঁয়ে থাকে সাধারণ মধ্যবিত্তের প্রতিদিনের ভুলে, ভণ্ডুলে ভরা জীবন, আর সেই তাঁর বিশিষ্ট রম্য কথন, যেখানে ক্ষণে ক্ষণে ‘মেঘ ছেঁড়া আলো’ আসে যায়। তিনি আমাদের যুক্তিহীন, অনুভবহীন কিন্তু বদ্ধমূল পূর্ব-সংস্কার, প্রথা, তন্ত্র আয়নার মতো ধরেন, আর আমরা আত্মদর্শনে কেঁপে উঠি প্রায়! প্রখর তবু তিক্ত নয়, বরং তাঁর গল্পের গভীরে রইল করুণা, আর জীবনের অনিঃশেষ লাবণ্যে অনাহত বিশ্বাস।

zoom
মেয়ে নন্দনার সঙ্গে, নবনীতা দেবসেন

তাঁর অগণিত ছোটগল্পের মধ্য থেকে এই সংকলনের জন্য নির্বাচিত মাত্র সাতটি গল্পেও আমরা সেই নবনীতা দেবসেনকে পেয়ে যাই, যিনি সজীব কৌতুকে আছেন, কটাক্ষে আছেন, করুণায় আছেন, আবার ভালোবাসায় আছেন নিরন্তর; গল্পগুলি হয়ে ওঠে আমাদের সেই জরুরি ক্লাসরুম, যেখানে ঘুরে ঘুরে ফিরে আসতে হয়।

…………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন উমা চট্টোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা

…………………..

Gender Identity Gender Transition Nabaneeta Dev Sen Patriarchy Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar short story

Share this article on