


ভারতের জলহাওয়ার প্রকোপে ইংল্যান্ড থেকে আসা নারীটির কোলের সন্তান হারানোর বেদনা কেউই বুঝতে পারেননি। কেরির সেবাধর্মের ব্যস্ততার জেরে ডরোথির ব্যক্তিগত একাকিত্বের গল্প কেউই জানতে চাননি। তাই তাঁর বিরক্ত এবং দুঃখিনী হয়ে পড়া স্বভাবকে নেহাত ‘পাগলিনী’ হিসেবে ধরে নিতে কেউই বাদ দেননি। উইলিয়াম কেরির অবদান যত চিহ্নিত হয়েছে, তার মহত্ত্ব নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, ততটাই প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো ডরোথি কেরির ‘মাথার ব্যামো’ সমালোচিত হয়েছে। এবং এমন এক পাগলিনীকে কেরি সহ্য করার কারণেও তাঁর মহত্ত্বকে বাড়িয়ে দেখা হয়েছে। কিন্তু সেই অন্ধকারের ভিতরের গল্পটা সঠিকভাবে আমরা কেউ জানিই না।
১৭৯৩ সালের মার্চ মাস। ইংল্যান্ডে এক ভোর। আগের দিন জীবনের চতুর্থ সন্তানটি প্রসব করেছে এক যুবতী। কিন্তু সে বিষণ্ণ। তার এর আগেও তিন সন্তান আছে। কিন্তু এবার সে একা। বোন কিটি তার দেখভাল করছে। কিন্তু যে-পুরুষের ঔরসে তার সন্তানরা জন্ম নিয়েছে, সে পাড়ি দিয়েছে দূরদেশে– ইন্ডিয়ার বাংলাদেশে। হিদেনদের মধ্যে ধর্মপ্রচার করতে। মেয়েটি একা এবং অসহায়। সন্তান জন্মের পর দুর্বলও। এতজনকে নিয়ে চলার মতো আর্থিক বলও তার নেই। সে আটকাতে চেয়েছিল তার স্বামীকে। পারেনি। টাকা ধার করেই স্বামী রওনা দিয়েছে তাদের বড় ছেলেকে নিয়ে, এক মহৎ উদ্দেশ্যে। কিন্তু জীবনের তুচ্ছ যা কিছু, ঝঞ্ঝাট-অসুবিধা, সেগুলোও তো তুচ্ছ নয়। হ্যাঁ, স্বামী প্রস্তাব দিয়েছিল তাকে সঙ্গে যেতে। কিন্তু আসন্নপ্রসবা নারী কীভাবে মাসাধিক সময় ধরে জাহাজ-যাত্রা করতে পারে, সে জানে না! এখানে তবু তার জন্মস্থান, সাহায্যে কাউকে পাবে। কিন্তু জাহাজে বা ভারতে সে কাকে পাবে? সে সদ্যোজাত পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো ভাবছিল সেদিন ঈশ্বর কি শুধুই পুরুষদের একা? নারীর মাতৃত্বে কিংবা সংসারের সুখ-দুঃখে তিনি পাশে থাকেন না?
আর ঠিক তখনই ঘটে অভূতপূর্ব এক ঘটনা! প্রভু যিশু সম্ভবত নারীর কথাও শোনেন। বাংলাদেশের জাহাজে উঠে যাওয়া ব্যক্তি না-হলে কীভাবে বাড়িতে ফেরত আসে! উইলিয়াম কেরি নামক খ্রিস্টান যুবকটি পরিকল্পনা করেছিল ইংল্যান্ড থেকে সে রওনা দেবে হিদেনদের দেশে, খ্রিস্টধর্ম প্রচারের অভিপ্রায়ে। তার বড়ছেলে ফেলিক্স ছিল তাঁর সঙ্গে। ঘরে তাঁর বাকি দুই সন্তান এবং আসন্নপ্রসবা স্ত্রী। তাঁর স্বপ্ন ছিল খ্রিস্টান মিশন গড়ার। চামড়ার দোকানে কাজ করা যুবকটির ছিল না কোনও টাকা, যোগাযোগ। তবু স্বপ্নের ডানায় মাঝে মাঝে হাওয়া লাগে। কোনও কোনও সহায়তা এসে জোটে। সেই টাকায় ভরসা করে জাহাজের টিকিট কাটে এবং তার সঙ্গে জুটে যায় টমাস নামের একজন ডাক্তারও। যে আগে বাংলাদেশে ছিল। তারও ছিল ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্য। কেরি এবং টমাস– দু’জনে বাংলাদেশে রওনা দেয় ধর্মপ্রচারের জন্য। কিন্তু যাত্রায় পড়ে বাধা। আগের টাকা মেটানো হয়নি বলে টমাসকে নেমে যেতে হয় মাঝপথে। আর সেখানেই তার সঙ্গে বাধ্যত নেমে যায় সপুত্র কেরি।

টাকা জোগাড়ের জন্য আরও একদিন সময় লাগবে জেনে বাড়িতে দেখা করতে আসে কেরি। হয়তো আর একবার সে দেখে যেতে চেয়েছিল তাঁর স্ত্রীকে। কারণ পুনরায় সে নিজের দেশে ফিরতে পারবে কি না, সে নিজেও জানে না। আর হয়তো কোনও দিন স্ত্রী বা সন্তানদের সঙ্গে দেখাই হবে না। যিশুর নামে ধর্মপ্রচার তাঁর কাছে খুব বড় ব্যাপার হলেও স্বামী হিসেবে, পিতা হিসেবে পিছুটান তো তাঁর থাকবেই! আর এসে জানতে পারে, এই সময়ের মধ্যেই কেরির চতুর্থ পুত্র জন্মলাভ করেছে। প্রাথমিকভাবে কেরির পরিকল্পনা ছিল, এসে একটিবার দেখা করেই, ব্রেকফাস্ট-টেবিল থেকে বিদায় নেবে সে। কিন্তু এই পুত্রের জন্ম, ডরোথির স্বামীকে ছেড়ে একা হয়ে যাওয়ার দ্বিধায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে, ডরোথিও রওনা দেয় তাঁর সঙ্গে। সঙ্গে তিন পুত্র, এক কন্যা এবং তাঁদের সহায়তার জন্যই বোন কেটি।
যাত্রায় বাধা পড়ার দুর্ঘটনা সম্ভবত একটা স্থায়ী দুর্ঘটনার সূচনা করে। কারণ, এই বাংলাদেশে এসে কোনও দিন সুখী হননি কেরির স্ত্রী ডরোথি। নানা দুর্ঘটনায় বিপর্যস্ত নারীটি মানসিক অসুস্থতার শিকার হন, যার কোনও চিকিৎসা সে এদেশে পায়নি। এই আগমনটা সেদিন সহজ ছিল না। কিন্তু সেটা বোঝার মতো কারওর সহানুভূতিও ছিল না ডরোথির জন্য। তাঁকে নিয়ে দু’কথার শুরুতেই রাখলাম তাঁর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বীকৃতিটুকু।
স্যামুয়েল পিয়ার্স কেরি (Samuel pearce carey)– উইলিয়াম কেরি এবং ডরোথি কেরির প্রপৌত্র, তিনি লিখেছেন:
I have most rejoiced to rescue the name of the mother of all his children from the cruel wrongs which have been done to her. Biographers without exception have echoed her dispraise. Now that the facts will be known, feeling will rebound in her favour. She will be unanimously defended in her first felt inability to accompany Carey to Bengal, and will be acclaimed for her eventual going at a single day’s notice, and will then be deeply compassionated for the price she tragically paid. Carey would wish me to lay this wreath upon her grave. (William Carey)

উইলিয়াম কেরি। ভারতের ইতিহাসে তথা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য নাম। শ্রীরামপুর মিশনের প্রতিষ্ঠাতা। বাংলা মুদ্রণের প্রথম সূচক। বাংলা গদ্য সূচনারও তাঁর উদ্যমেই। ব্যাপটিস্ট মিশনের পক্ষ থেকে এসেছিলেন খ্রিস্টধর্ম প্রচারে। কিন্তু ভারত এবং বাংলাদেশকে ভালোবেসে এই দেশের উন্নতিকল্পে নিয়োজিত করেছিলেন নিজেকে। তাঁর সঙ্গী হিসেবে ছিলেন তাঁর স্ত্রী এবং চার সন্তান। তিন ছোট ছেলেমেয়ে এবং সদ্য জন্ম দেওয়া চতুর্থ সন্তানের মা হয়ে মিসেস ডরোথি কেরি এসেছিলেন তাঁর সঙ্গে।
ডরোথিই ভারতের প্রথম নারী মিশনারি হতেই পারতেন। ব্যাপটিস্ট মিশনের পক্ষ থেকে প্রথম আগত মেমসাহেব হয়েও কিন্তু তিনি তা হতে পারেননি। বা বলা ভালো, হতে চানওনি। সম্পূর্ণ অনিচ্ছায়, প্রায় বাধ্য হয়ে তিনি স্বামীর পথ অনুসরণ করে এসে পৌঁছেছিলেন ভারতে। ভারতে সেবা বা খ্রিস্টধর্মের প্রচার– কোনওটাই তাঁর লক্ষ্য ছিল না। অথচ স্বামী-সংসার-সন্তান-ত্যাগ করতে চাননি বলেই স্বামীর অনুগামিনী হয়েছিলেন। মিসেস উইলিয়াম কেরি বা ডরোথি কেরির জীবনী আমাদের আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়েও এই প্রাচীন প্রশ্নটির মুখোমুখি দাঁড় করায়– যোগ্য সহধর্মিনী হতে গেলে স্বামী এবং সন্তানের খেয়াল রাখা বেশি জরুরি, না কি স্বামীর স্বপ্নকে মান্যতা দেওয়া জরুরি? বাস্তব জীবনযাত্রা নাকি আদর্শ– এ-দুইয়ের মধ্যে কোনটা নির্বাচন করা উচিত? যদি এ-দুইয়ের মধ্যে যোজন দূরত্ব থাকে, স্ত্রীর উচিত কোনটা বেছে নেওয়া?
ডরোথিও জানতেন না– এর সঠিক উত্তর। তিনি স্বামীর সঙ্গ ছাড়তে পারেননি। আর সন্তানদের প্রতি যত্নশীল হওয়াও কমাতে পারেননি। আর এ-দুটো রক্ষা করতে গিয়ে ভারতকে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। বরং এদেশের জলহাওয়া এবং নানা অব্যবস্থার শিকার হয়ে বারবার অসুস্থ হয়েছেন তিনি এবং তাঁর সন্তানরা। না, শুধু তাই নয়, সন্তান হারিয়েছেন এদেশের খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না-পেরে। তাই এক ধরনের ‘পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার’ জাতীয় মানসিক রোগের শিকার হয়েছেন। তাই উইলিয়াম কেরির জীবনীকাররা প্রায় প্রত্যেকেই তাঁকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ নামে অভিহিত করেছেন।
ভারতের জলহাওয়ার প্রকোপে ইংল্যান্ড থেকে আসা নারীটির কোলের সন্তান হারানোর বেদনা কেউই বুঝতে পারেননি। কেরির সেবাধর্মের ব্যস্ততার জেরে ডরোথির ব্যক্তিগত একাকিত্বের গল্প কেউই জানতে চাননি। তাই তাঁর বিরক্ত এবং দুঃখিনী হয়ে পড়া স্বভাবকে নেহাত ‘পাগলিনী’ হিসেবে ধরে নিতে কেউই বাদ দেননি। উইলিয়াম কেরির অবদান যত চিহ্নিত হয়েছে, তার মহত্ত্ব নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, ততটাই প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো ডরোথি কেরির ‘মাথার ব্যামো’ সমালোচিত হয়েছে। এবং এমন এক পাগলিনীকে কেরি সহ্য করার কারণেও তাঁর মহত্ত্বকে বাড়িয়ে দেখা হয়েছে। কিন্তু সেই অন্ধকারের ভিতরের গল্পটা সঠিকভাবে আমরা কেউ জানিই না।

ডরোথি প্ল্যাকেট প্রায় পাঁচ বছরের বড় ছিলেন উইলিয়াম কেরির থেকে। তাঁদের বিয়ে যখন হয়েছিল কেরির তখন বয়স মাত্র ১৯ আর ডরোথির ২৪। ডরোথি সেই সময় আদৌ পড়া-লেখা জানতেন কি না, সেই নিয়ে বিতর্ক ছিল জোরদার। কারণ, বিবাহের রেজিস্ট্রেশনের পাতায় ডরোথির টিপছাপ ছিল সইয়ের বদলে। যদিও এই টিপছাপ ব্যাপারটা তখন ইংল্যান্ডে বিয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষিত মেয়েরাও স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করত। তাই ডরোথির স্বাক্ষর হওয়া বা নিরক্ষর হওয়া– দুটোরই সম্ভাবনা ছিল। উইলিয়াম কেরি ডরোথিকে সাদরে গ্রহণ করেছিল প্রভু যিশুর উপহার হিসেবে, আর ডরোথি প্লাকেটের কাছে আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো শুধুই ছিল স্বামী এবং সন্তান নিয়ে সংসার করার স্বপ্ন। অল্প সময়েই পরপর তিনবার মা হন তিনি এবং চতুর্থবার অন্তঃসত্ত্বা থাকার সময় জানতে পারেন উইলিয়াম মিশনের তরফ থেকে হিদেনদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারে ভারতে এবং তার আশপাশের দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। বিয়ের পর থেকেই উইলিয়ামের ব্যাপটিস্ট মিশন নিয়ে আগ্রহ এবং তাদের কাজে ক্রমশ নিজেকে ব্যাপ্ত করে তোলায় ডরোথি যেন দূরে সরে যাচ্ছিল স্বামীর। বস্তুত বিয়ের পর থেকেই ডরোথি এবং উইলিয়ামের মধ্যে মানসিক এবং বৌদ্ধিক দূরত্ব বাড়তেই থাকে। ডরোথি যখন তিন সন্তানকে একা হাতে সামলাচ্ছে এবং চতুর্থ সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছেন, কেরি তখন মিশনের খুঁটিনাটি নিয়ে ব্যস্ত। জীবনের পরম অর্থ আবিষ্কারে এবং ঈশ্বরের সেবাকর্মে নিয়োজিত হওয়ার নানা প্রকল্পের পরিকল্পনায় ব্যস্ত। উইলিয়াম কেরির জীবন তখন যে মহাখাতে বইছে, তা প্রশংসনীয় বটেই, কিন্তু ডরোথি তখন যে বাস্তবতার শিকার, তার জন্য কোনও হাততালি পড়েনি। নারীর চিরাচরিত কর্তব্য, তার মাতৃত্বের প্রতি দায়বদ্ধতা, মাতৃত্বজনিত অসুস্থতা এবং সংকট– পিতৃতান্ত্রিক পৃথিবীর কাছে আলাদা কোনও স্বীকৃতিই দাবি করেনি কোনও দিন।
তাই উইলিয়াম যখন যেতে চেয়েছিলেন দেশ ছেড়ে, ডরোথির প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ছিল না-যাওয়ার। এই না-যাওয়ার ইচ্ছা সম্ভবত চরম বেদনা থেকে জাত। উইলিয়াম এবং তাঁদের বড় ছেলে ফেলিক্স যাবে, বাকিরা থাকবে ডরোথির কাছে– এই সিদ্ধান্তও ডরোথির জন্য খুব আরামদায়ক ছিল না। আসন্নপ্রসবা মেয়েটির স্বামী এতটাই দূরদেশে যাচ্ছে যে, এই জীবনে আর দেখা হবে কি না, তা অবধি নিশ্চিত নয়। সে সন্তানের কথা ভাববে না কি স্বামীর পথ অনুসরণ করবে? ধর্মপ্রচারের জন্য, ঈশ্বরের সেবায় আত্মনিবেদনের জন্য যে-সময় এবং অনুশীলন দরকার, তা কি ডরোথি কেরি পেয়েছিলেন? বরং যাঁর সন্তান-পালনের জন্য তাঁকে গৃহমুখী যাপনে থাকতেই হয়েছিল সেই উইলিয়ামের তাঁকে ফেলে ঈশ্বরের সেবা করতে চলে যাওয়ার মধ্যেই এক তীব্র পুরুষতান্ত্রিক সুবিধাবাদের প্রকাশ নয় কি? ডরোথি তাই যাবেন না– এই সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন! কিছুটা ক্ষোভে, কিছুটা অসহায়তায় আর কিছুটা ভারত সম্পর্কে অজ্ঞতাজনিত ভীতিতে। ‘ট্রপিকাল কান্ট্রি’-তে নিজের ছেলেমেয়েকে সঠিকভাবে মানুষ করার ভয় থেকে। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদল হল।

কেরিকে প্রথম জাহাজ নিয়ে যেতে অস্বীকার করে নামিয়ে দিলে কেরি পরবর্তী জাহাজ ধরবে বলে আরেকবার ডরোথির সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান এবং তখন সদ্য জন্মানো পুত্রকে নিয়ে ডরোথি কেরির সঙ্গে যেতে রাজি হয়ে গেল। সঙ্গে গেল তাঁর অবিবাহিতা বোন কিটি। ডরোথি একা তাঁর চার সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে দূরদেশে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন, সম্ভবত তাই-ই কিটিকে নেওয়া হল। বোঝাই যাচ্ছে, সাংসারিক কাজে ডরোথি উইলিয়ামের কোনও সহযোগিতা আশা করেনি। সেই ভোরে উইলিয়াম ফেলিক্স-কে নিয়ে ডরোথির সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল শুধুই একটা ব্রেকফাস্ট একসঙ্গে করার সুযোগটুকু পেয়ে, কিন্তু সেই মুহূর্তে ডরোথির সিদ্ধান্ত বদল এবং কেরির সঙ্গে যাওয়া– ডরোথি এবং কেরি উভয়ের জীবনেই এক দিকবদল করার মতো ঘটনা।
দীর্ঘ জাহাজ-যাত্রার পর ভারতে আসার পরের অংশ কেরির জীবনীকাররা একাধিকভাবে উল্লেখ করেছেন। রামরাম বসুকে নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’-তেও প্রমথনাথ বিশী রামরাম বসুর মুখ দিয়ে ডরোথি সম্পর্কে ‘বুড়ি’ ‘পাগলী’ জাতীয় যেসব উক্তি করিয়েছেন, তাই সাধারণ বাঙালির মধ্যে তাঁর সম্পর্কে ধারণা হিসেবে প্রচলিত। মহান কেরি এবং তাঁর উন্মাদিনী স্ত্রী এই-ই তাঁদের দাম্পত্য রসায়ন কেরিচর্চায় আলোচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে কেউই প্রায় ডরোথিকে বিচার করেননি। কেরির মহত্ত্বের পাশে একবারও আলোচিত হয়নি চার সন্তানের প্রায় একক দায়িত্ব পালন করা জননী হিসেবে ভিনদেশে তাঁর অসুবিধাগুলি। একজন অসাধারণ মানুষের সাধারণ স্ত্রী হয়ে থাকার যন্ত্রণাগুলোও।

এ-প্রসঙ্গে উপন্যাস বা নাটকের কল্পনা নয়, তাঁর সম্পর্কে অনুভূতিপরায়ণ দু’-একজনের মতামত শোনাই যায়। জন ক্লার্ক মার্শম্যান, যিনি উইলিয়াম কেরির সহযোগী জোশুয়া মার্শম্যানের পুত্র, তিনি লিখছেন: A voyage to India at that period was considered, even in educated circles, a far more formidable undertaking than at the present time. It was regarded in the light of a perpetual banishment from home : and it is scarcely a matter of surprise that Mrs Carey, who had never been beyond the limits of the country in which she was born, should have shrunk from the prospect of accompanying her husband to so distant a country with four children on a project in which she had no sympathy. ( Marshman, life and time)

ভারত এসে প্রথমে মদনাবতীতে এসেছিলেন কেরি, তাঁর পরিবার নিয়ে। বাংলাদেশের অতি গরম জলহাওয়া এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্য, পানীয় দেখে ডরোথি প্রচণ্ড বিরক্ত হন এবং ভয় পেয়ে যান। তাছাড়া সুন্দরবনের কাছে থাকার জন্য শিয়াল জাতীয় পশুদের যখন তখন লোকালয়ে চলে আসা এবং বাঘের ভয় তো ছিলই। এসেই ডরোথি এবং তাঁর চার সন্তান আমাশয় জাতীয় রোগের কবলে পড়েন। ডাক্তার টমাস ওষুধ পাঠান। সকলেই ধীরে ধীরে সেরে উঠলেও পাঁচ বছরের পিটার আর সেরে ওঠে না। ভারত আসায় যেসব আপত্তি এবং অসুবিধা ছিল ডরোথির মনে, তা সন্তান হারিয়ে পল্লবিত হয়। ডরোথি সম্পূর্ণ মানসিক ভারসাম্য হারান। এই শিশুটির মৃত্যুর মতো বেদনার পরেও ছিল আরও ঘটনা, যা মায়ের মনকে অস্থির করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। খ্রিস্টান হওয়ার অপরাধে শিশুটিকে কবরস্থ করার জন্য সারাদিন কোনও লোক পাচ্ছিলেন না কেরি। হিন্দুরা তো নয়ই, মুসলমানরাও খ্রিস্টধর্মের মড়া ছুঁতে চাইছিল না। শেষে অনেক কষ্টে কেরি কয়েকজন তথাকথিত ভ্রষ্ট মুসলমানকে পান। কিন্তু তারা কবরস্থ করে চলে যাওয়ার পর তাদের গ্রামে ঢুকতে দেওয়া হয় না। তখন কেরি পুনরায় গিয়ে লাটসাহেবের ভয় দেখালে এই সমস্যার সমাধান হয়।
এই ঘটনা মা হিসেবে ডরোথিকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঠেলে দেয়, ভারত সম্পর্কে আরও ভীতি এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। আর উইলিয়াম কেরির জীবনী পড়লে জানা যায়– সেই সময় থেকেই কেরির ব্যস্ততা এবং ঔদাসীন্য– দুই-ই বেড়ে চলে, যা নিশ্চিতভাবে ডরোথিকে অনেকটা একা করে দিয়েছিল। পিটারের মৃত্যু মদনাবতীতে হলেও তারপর তাঁরা গঙ্গা-তীরবর্তী শ্রীরামপুর শহরে চলে আসেন। শ্রীরামপুরে মিশন গঠিত হলে কেরি অসম্ভব ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মুদ্রণযন্ত্র এনে প্রথম ছাপাখানা খোলা হয় এবং একে একে বাংলা ছাপা বই প্রকাশ পেতে থাকে, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিপ্লব আনে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের দায়িত্ব পান কেরি। ফলে ডরোথি আরও অবিন্যস্ত হয়ে পড়েন। আরও মানসিক অসুস্থতা বাড়ে। বাকি সন্তানদেরও দেখভাল করতেন না ডরোথি। মিশনের নিজস্ব নিয়মে কিছুটা হানা মার্শম্যানের তদারকিতে তারা বড় হচ্ছিল। ১৮০৬ সালে আমেরিকার ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় যখন কেরিকে ‘ডক্টর অফ ডিভিনিটি’ উপাধিতে ভূষিত করলে উইলিয়াম কেরি আরও সম্মান এবং দায়িত্বের অধিকারী হন। আর তার পরের বছরের শেষের দিকে ১৮০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে মানসিক অসুস্থতাজনিত কারণেই ডরোথি মারা যান কেরি এবং শ্রীরামপুর মিশনের কর্মযজ্ঞের মধ্যপথে।
তার মাত্র ছ’মাসের মধ্যেই উইলিয়াম কেরি বিবাহ করেন এক প্রতিবন্ধী লেডি রুমার শার্লটিকে। ডরোথি মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ পরেই কেরি ঘোষণা করেন এই বিবাহের। যেদিন বিবাহের ঘোষণা করেন কেরি, সেদিন হানা মার্শম্যান এসে কেরিকে সোজাসুজিই আপত্তি জানিয়েছিলেন। হানার যুক্তি ছিল, এতদিন ব্রাদার কেরি একজন মানসিক অসুস্থ মানুষের সঙ্গে দাম্পত্য কাটিয়ে যথেষ্ট কষ্ট পেয়েছিলেন, বাকি জীবন শারীরিক প্রতিবন্ধক কারওর সঙ্গে কাটিয়ে আবারও কষ্ট পাবেন। কিন্তু শোনা যায়, কেরি সেদিন যুক্তি দিয়েছিলেন, শার্লটির অর্থ মিশনের কাজে লাগবে। প্রসঙ্গত বলা যায়, লেডি রুমার শারীরিক প্রতিবন্ধী ছিলেন, কিন্তু ধনী ছিলেন। তিনি অনেক দিন ধরেই মিশনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ডরোথি বেঁচে থাকতেই তিনি শ্রীরামপুর মিশনের একাধিক দায়িত্ব পালন করতেন। হুইল চেয়ারে বসেই বাগান এবং কেরির গাছপালার প্রতি যত্ন দেখভাল করতেন।
আর একটি চিঠি পাওয়া যায় যেখানে উইলিয়াম কেরি তাঁর বাল্যপ্রেমিকা তথা স্ত্রী এবং তাঁর চার সন্তানের মা ডরোথির মৃত্যু সংবাদ জানাচ্ছেন ইংল্যান্ডে নিজেদের বোনেদের, যেখানে ডরোথির চলে যাওয়ার খবরের সঙ্গে একই পত্রে লিখছেন: ‘…I shall inform you that I do intend , after some months , to marry Miss Rumohr. I have proposed the matter to her and she has testified her agreement thereto.’ তাহলে কি ডরোথি চলে যাওয়ার আগেই কেরি এই প্রস্তাব রেখেছিলেন লেডি রুমারকে? উইলিয়াম কেরি কি নিজেই অপেক্ষা করেছিলেন ডরোথি কেরির মৃত্যুর? এই ভারবহ দাম্পত্যে তিনি বেশ ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলেন?

শোনা যায়, রুমারের সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য সুখের হয়েছিল। কিন্তু ডরোথির ভূমিকা প্রায় নিঃশব্দে মুছে গিয়েছিল কেরির জীবনচর্যা থেকে। ডরোথি অসাধারণ হতে চাননি, সাধারণ স্ত্রী এবং মায়ের ভূমিকায় ভালো থাকতে চেয়েছিলেন। স্বামীর সঙ্গের আশাতেই দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। কিন্তু অসম্ভব একাকিত্বে পাশে পাননি স্বামীর সাহচর্য। হয়তো সহানুভূতি ছিল, সহমর্মিতা ছিল, কিন্তু যে মনোযোগ, ভালোবাসা এবং চিকিৎসা ডরোথির দরকার ছিল– তা কি তিনি পেয়েছিলেন?
প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মতো তাঁকে অবজ্ঞা করেছেন ভারতীয় আলোচকেরা। তিনি কোথাও নিজের কথা লিখে যাননি। তাঁর ব্যবহৃত জিনিস বা স্মৃতিজড়িত কিছুই প্রায় রক্ষা করা হয়নি। ভারতীয়রা বা কেরির অনুরাগীরা তাঁকে গুরুত্ব না-দিক, তাঁর স্বদেশীয়রা কিংবা তাঁর উত্তরপ্রজন্ম অনুভব করেছেন তাঁকে। স্বীকৃতি দিয়েছেন তাঁর ত্যাগ এবং বেদনাকে।
H. L. Mcbeth: ‘Somewhere in Missionary history a word of compassion should be written for Dorothy Carey, who paid a high price for Baptist Missions and never knew why.’ (The Baptist Heritage)
তথ্যসূত্র:
বড় সাধ বড় সেবা– সুনীলকুমার চট্টোপাধ্যায়
J. C. Marshman– The life and Times of Carey, Marshman and Ward (2 vol)
Baptist history– Vol 1
Dorothy Carey– The tragic and Untold story of Mrs William Carey– James R. Beck
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved