Alberto Giacometti: Love, Dreams and Surrealist Sculpture। Robbar
Robbar
  • ৩১ আশ্বিন ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ক্ষণস্থায়ী ভাস্কর্যের আনন্দ

পাথরের যে চিরস্থায়ী চরিত্র, সেই চরিত্রে বিশ্বাসী ছিলেন না জিয়াকোমেত্তি। সার্ত্রে খুশি হয়েছিলেন বন্ধুর সেই দার্শনিকতায়, যেদিন নিজের করা খান কয়েক মূর্তি ভেঙে ফেলে জিয়াকোমেত্তি বলেছিলেন, ‘আমি এগুলো নিয়ে খুশি হলেও, কয়েক ঘণ্টার জন্য বানিয়েছিলাম।’ ক্ষণস্থায়ী, যেন ভোরবেলা বা দুঃখের মতো। এই তাৎক্ষণিকতাই সার্ত্রেকে মুগ্ধ করেছিল। ভঙ্গুর, ক্ষয়িষ্ণু। মানুষের সমস্ত জীবন-চরিত্র-গুণ তার মধ্য দিয়ে দেয় ধরা। 

শেষ আপডেট: অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ১৭:৪৩   
Facebook WhatsApp Messenger

যে বছর ভারত স্বাধীন হল, সে বছরই বিশ শতকের বিশিষ্ট সুইস ভাস্কর, চিত্রশিল্পী এবং ছাপাইশিল্পী আলবের্তো জিয়াকোমেত্তি বানালেন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ভাস্কর্য– ‘ওয়াকিং ম্যান’। সে বছর স্বাধীন হল আরও একাধিক দেশ। তার আগে পরেও হল আরও একাধিক। দক্ষিণ আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরপর স্বাধীন হতে থাকল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশ, ফিলিপিন্স (১৯৪৬); ব্রিটেনের অধীনে থাকা আরও দুই দেশ, বর্মা হয়ে উঠল স্বাধীন প্রজাতন্ত্র এবং শ্রীলঙ্কা পরিণত হল ডমিনিয়ন অফ সিলন-এ (১৯৪৮); নেদারল্যান্ডস থেকে স্বাধীন হয় ইন্দোনেশিয়া (১৯৪৯)। 

zoom
সিক বয় ইন বেড। শিল্পী: জিয়াকোমেত্তি

মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়– ফ্রান্স থেকে লেবানন (১৯৪৩) আর সিরিয়া (১৯৪৬); ব্রিটিশ ম্যান্ডেট থেকে পৃথক হয় জর্ডান (১৯৪৬) এবং ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ফর প্যালেস্টাইনের মেয়াদের সমাপ্তি ঘোষণা করে স্বাধীনতার স্বাদ নেয় ‘দ্য স্টেট অব ইজরায়েল’ (১৯৪৮)। 

গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডসের মতো ঔপনিবেশিক ক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলোকে প্রবলভাবে দুর্বল করে দিয়ে ১৯৪০-এর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিউপনিবেশায়নের স্রোত আর স্বাধীনতার স্বপ্ন ভাসিয়ে নিয়ে চলল দুনিয়াকে। শুধু যে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের পতন হল, তা-ই নয়, ইউরোপের মানচিত্র আমূল পাল্টে গেল সারা দুনিয়ার মানচিত্রের সঙ্গে। মানচিত্র পাল্টালে মানুষের বাসস্থান পাল্টায়। আর পাল্টায় স্বপ্ন। ভাঙা আয়নার কাচের মতো। 

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ– এই দুই মহাযুদ্ধের অভিঘাতে যুদ্ধ, সীমান্তের পুনর্নির্ধারণ এবং জাতিগত শুদ্ধিকরণের (racial purification) মতো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইউরোপে ৭ কোটিরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। 

zoom
বিশ্বযুদ্ধে বাস্তুহারা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-’১৮) এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠনে মধ্য, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ জুড়ে প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ অসামরিক মানুষ তাঁদের ভিটে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। যুদ্ধ, সামরিক দখল, সীমান্তের পরিবর্তন এবং জাতিগত সংঘাত এই ব্যাপক জনবিচ্ছিন্নতার প্রধান কারণগুলির মধ্যে অন্যতম। সাম্রাজ্যের পতন ও রাষ্ট্রহীনতার কথা ধরলে রুশ, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় এবং অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের কথা বলতে হয়। যার ফলে ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল পরিবর্তিত হয়। নতুন রাষ্ট্র ও নতুন সীমান্তের উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁদের পূর্বতন নাগরিকত্ব হারিয়ে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েন। অর্থাৎ, তাঁরা শুধু ভৌগোলিকভাবে বাস্তুচ্যুত হননি; তাঁদের রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিচয়ের ভিত্তিও ভেঙে পড়েছিল।

এছাড়া ছিল জনবিনিময়। যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপে জনসংখ্যাকে জাতিগতভাবে পুনর্বিন্যস্ত করার এক গুরুত্বপূর্ণ নজির, ১৯২৩ সালের লসান চুক্তি (Treaty of Lausanne)। যার কারণে আনুমানিক ১৫ লক্ষ গ্রিক ও তুর্কির মধ্যে বাধ্যতামূলক জনবিনিময় সংঘটিত হয়। তা স্বেচ্ছা-অভিবাসন নয়। তা রাষ্ট্রনির্ধারিত। একটি ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর অন্য ভূখণ্ডে বাধ্যতামূলক স্থানান্তর।

zoom

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বহিষ্কার সাক্ষী ছিল নজিরবিহীন জনবিপর্যয়ের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে প্রায় চার থেকে ছ’-কোটি মানুষ তাঁদের বাসস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন। নাৎসি জার্মানির সম্প্রসারণবাদী ও জাতিগত পুনর্গঠনের পরিকল্পনা– যার অন্যতম ছিল জেনারালপ্লান ওস্ট (Generalplan Ost)– এবং পরবর্তী সোভিয়েত সামরিক বিস্তার এই বিপুল বাস্তুচ্যুতির অন্যতম প্রধান কারণ। যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জনসংখ্যারও এক অভূতপূর্ব স্থানচ্যুতি ঘটে। যুদ্ধের পরে লক্ষ লক্ষ দাসশ্রমিক, যুদ্ধবন্দি এবং কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষ তাঁদের নিজের দেশে ফিরে যেতে পারেননি তখনই। তাঁদের এক বৃহদাংশ অস্থায়ী বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে বসবাস করতে বাধ্য হন। এই শিবিরের দেখভালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল যুক্তরাষ্টের ত্রাণ এবং পুনর্বাসন কর্তৃপক্ষ (UNRRA)। ‘ডিসপ্লেসড পার্সন’ শব্দবন্ধটি তাই কেবল শরণার্থীকে বোঝায় না; যুদ্ধের ফলে নিজের স্বাভাবিক বাসস্থান ও সামাজিক পরিসর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এক বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকেও বোঝায়। 

zoom
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও অভূতপূর্ব স্থানচ্যুতি

১৯৪৪ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনুমানিক ১ কোটি ৪০ লক্ষ জাতিগত জার্মানকে বহিষ্কার করা হয়। এটি ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপে জনসংখ্যার বৃহৎ আকারের জোরপূর্বক পুনর্বিন্যাসের অন্যতম দৃষ্টান্ত। ‘বাস্তুচ্যুতি’ হয়ে দাঁড়ায় এক নতুন ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা। 

দুই মহাযুদ্ধের ফলে ইউরোপে ‘বাড়ি’, ‘ভূখণ্ড’ এবং ‘পরিচয়’-এর ধারণা আমূল পাল্টে যায়। মানুষ শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হননি; বহু ক্ষেত্রে তাঁদের নাগরিকত্ব, সামাজিক পরিচয়, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিসর এবং একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সঙ্গে তাঁদের ঐতিহাসিক সম্পর্কও ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে বিশ শতকের ইউরোপীয় আধুনিকতার ইতিহাসকে কেবল যুদ্ধ ও রাষ্ট্রের ইতিহাস হিসেবে নয়, বাস্তুচ্যুতি, রাষ্ট্রহীনতা, নির্বাসন এবং হারিয়ে যাওয়া ভূখণ্ডের স্মৃতির ইতিহাস হিসেবেও পাঠ করা যায়।

ইউরোপের ভেতরে রাজনৈতিক মানচিত্রের পরিচিত ছবি ঝাপসা হয়ে এল। পুরনো জার্মানি যেন হারিয়েই গেল ছোট হতে হতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিধি বাড়তে লাগল পশ্চিমের দিকে। সীমান্তের আদল কুঁকড়ে, মুড়ে, দলা পাকিয়ে একাকার হল; একাধিক সার্বভৌম রাষ্ট্র জুড়ে গেল একে অপরের সঙ্গে তার জায়গায়– এস্টোনিয়া, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া– আরও কতশত। মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে পরিচয়টুকু সম্বল করে হেঁটে চলল অনির্দিষ্টের দিকে। 

আমাদের আলোচ্য শিল্পী ওই ভিটেহারাদের দলে জুড়ে গেলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তাঁকেও বাস্তুচ্যুত করল। ১৯৪১-এ প্যারিস ছেড়ে বাধ্য হলেন সুইৎজারল্যান্ডে নির্বাসনে যেতে। যুদ্ধ শেষে, চার বছর পর ফেরত এলেন প্যারিসে। জিয়াকোমেত্তির প্লাস্টারে নির্মিত ‘উওম্যান উইথ চ্যারিয়ট’ (১৯৪৩-’৪৫) সুইৎজারল্যান্ডে নির্বাসনের ফসল। ‘ফন্ডেশন জিয়াকোমিত্তি’র সূত্র অনুযায়ী এই ছিল যুদ্ধোত্তর ‘স্ট্যান্ডিং ম্যান’-এর আদিরূপ। 

zoom
উওম্যান উইথ চ্যারিয়ট

‘স্ট্যান্ডিং ম্যান’ সিরিজের কথা বিশদে বলার আগে অবশ্য ১৯৩০ সালের কথা বলা আবশ্যক। কারণ, তাঁর যুদ্ধোত্তর শিল্প নির্মাণের প্রায় এক দশক আগেই ব্রোঞ্জে ‘ওয়াকিং উওম্যান’ (১৯৩২) নির্মাণ করেন জিয়াকোমেত্তি। রোমান বা রিলিফ গ্রাভিদা-র চলার ছন্দে উদ্বুদ্ধ হয়ে, অথবা আদিম ইজিপসীয় ভাস্কর্যের নির্যাসে মেতে। প্রত্নতত্ত্ব, পুরাণকাহিনি এবং সাররিয়ালিস্ট স্মৃতির প্রতিফলন হিসেবে। 

zoom
ওয়াকিং উওম্যান (বাঁদিকে)। গ্রাভিদা রিলিফ

আলবার্তো জিয়াকোমেত্তির জন্ম ১৯০১ সালের ১০ অক্টোবর, সুইজারল্যান্ডের বোরগোনোভোতে। মৃত্যু, ১৯৬৬ সালের ১১ জানুয়ারি চুর-এ। মৃত্যুর ৬০ বছর অতিক্রম করে এখনও কেন প্রাসঙ্গিক তিনি, একথা আলোচনার আগে একবার ভেবে দেখা যাক, গোড়ায় কিউবিজম, ওশেনিক আর্ট, সাররিয়ালিজমের প্রতি ঝুঁকলেও, জিয়াকোমেত্তি এমন কী খুঁজে চলেছিলেন যা বিদ্যমান কোনও কিছুই তাঁকে জোগাতে সক্ষম হল না? তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ– ‘শৈল্পিক উত্তরণ’ বলতে যা বোঝায়, সেই পর্যায়গুলির জটিল বিন্যাস তাঁর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হওয়ার ধারাটি কেমন? কী তিনি গ্রহণ করছেন; কাকেই বা বর্জন করছেন নির্মাণের পথে– জটিল সেই চিন্তন ফিরে দেখা আবশ্যক। 

সংকট মানসিক উত্তরণ ঘটায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলস্বরূপ শিল্পীরা নতুন করে ফিরে তাকালেন মানবদেহ ও মুখের দিকে। নায়ক, বিজয়ী, নায়কোচিত ভঙ্গীর জায়গায় যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক আঘাত, উদ্বেগ ও গভীরভাবে ভেঙে পড়া মানুষের পরিস্থিতি হয়ে উঠল সত্যনিষ্ঠ শিল্পের প্রকাশভঙ্গিমা। ১৯৩০-এর দশকে বিশিষ্ট সাররিয়ালিস্ট শিল্পী থেকে যুদ্ধোত্তর এগজিস্টেনশিয়াল ফিগারেশনের রূপায়ণের পথিকৃৎ হিসেবে আলবার্তো জিয়াকোমিত্তি বিশ শতকের অন্যতম আমূল শৈল্পিক পরিবর্তনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই উত্তরণ ঘটেছিল এক অভূতপূর্ব পদ্ধতিতে। উপলব্ধিমূলক সত্যের (perceptual truth) প্রতি এক অবসেশনে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন জিয়াকোমেত্তি– মানুষ কীভাবে দূরত্ব অনুভব করে? দৃষ্টিকেই বা অনুভব করে কী করে? আর শূন্যে শারীরিক উপস্থিতি, সে-ই বা তার কাছে কী– যুদ্ধ তাঁকে এই মানসিক উত্তরণ এবং বাস্তবের সামনে এনে ফেলেছিল। তা নিয়ে চলল প্রবল পরীক্ষানিরীক্ষা।

১৯৩০ থেকে ১৯৩৫, জিয়াকোমেত্তির পরাবাস্তববাদী পর্যায়। বস্তু ও অবচেতন নিয়ে মশগুল তিনি।

zoom
সাসপেন্ডেড বল‌‌

‘সাসপেন্ডেড বল‌‌’ (১৯৩০)-এর মতো কাজের সাফল্যের পর জিয়াকোমেত্তি ১৯৩০ সালে অঁদ্রে ব্রেতঁর সাররিয়ালিস্ট দলে যোগ দেন। এই পর্যায়ে, তিনি জীবন্ত মডেল ব্যবহার করে প্রথাগত মূর্তি, অর্থাৎ, স্ট্যাচু নির্মাণ থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসেন। এবং ঘোষণা করেন যে, তিনি কেবল এমন ভাস্কর্যই তৈরি করবেন যার শেকড় তাঁর স্বপ্ন ও অবচেতন আকাঙ্ক্ষায়। তাঁর মনে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ গঠিত হয়ে তবে সে ব্যক্ত করবে নিজেকে। 

zoom
অঁদ্রে ব্রেতঁর ম্যানিফেস্টো অফ সাররিয়ালিম (১৯২৪)

প্রথাগত স্ট্যাচু থেকে সরে এসে জিয়াকোমেত্তি ‘স্কাল্পচারাল অবজেক্ট’-এর পথ দেখালেন। সাররিয়ালিস্ট স্কাল্পচারাল অবজেক্টের মধ্যে ‘দ্য প্যালেস অ্যাট ফোর এ.এম.’ (১৯৩২) অন্যতম। সাররিয়ালিস্ট ভাস্কর্যের এই ছিল মাহেন্দ্রক্ষণ। এর আগে ‘ভাস্কর্য’ বললে লোকে বুঝত পাথর কুঁদে বা ভারী ব্রোঞ্জে গড়া ভর-ভার-নিরেট আয়তন বিশিষ্ট, পাহাড়প্রমাণ এক একক। ভোর চারটের প্রাসাদ সেই প্রথা ভেঙে গুঁড়িয়ে একাকার করে নির্মাণ করল স্পেসের মধ্যে অবস্থিত এক ত্রিমাত্রিক রেখাচিত্র, যা স্থানিক খণ্ডন (spatial fragmentation) ও কাঠামোগত শূন্যতার (structural emptiness) তীব্র প্রয়োগের ওপর ভিত্তি করে গড়া। প্রথাগত সলিড মাসের বদলে জিয়াকোমেত্তি ভঙ্গুর কাঠ তার দিয়ে জুড়ে ঘেরাটোপ বানালেন এক প্রাসাদের কঙ্কাল। সে কঙ্কালসার ঘেরাটোপের পক্ষে স্থানকে ধারণ করা সম্ভব নয়। বরং ভাস্কর্যের গণ্ডি ভেঙে তা হয়ে উঠল পুরোমাত্রায় সচ্ছিদ্র (porous)। হাওয়া খেলতে লাগল তার ভেতর দিয়ে অবাধে, ফলে, সেই নির্মাণ একটি এককের বদলে হয়ে দাঁড়াল খণ্ডিত। স্বপ্নময় সে জগৎ, চরম বিচ্ছিন্নতা ও স্থানচ্যুতির প্রতীক।

zoom
দ্য প্যালেস অ্যাট ফোর এ.এম

শূন্য এবং নেতিবাচক ক্ষেত্র (void, negative space) হয়ে উঠল জিয়াকোমেত্তির প্রাথমিক উপাদান। 

নাটকের মঞ্চসজ্জার মতো বিন্যস্ত করে জিয়াকোমেত্তি দর্শকের দৃষ্টিকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বিচরণ করতে বাধ্য করলেন। সুতরাং, এক স্থির ত্রিমাত্রিক মাধ্যমের মধ্যে আখ্যানমূলক কালক্রমকে (narrative timeline) যোগ করলেন ভাস্কর্যে। মূর্তি থেকে ভাস্কর্য হয়ে উঠল ‘object of symbolic function’। 

ফ্রয়েডীয় ব্যাখ্যাও আছে এ কাজের। ফ্রয়েডের স্থানচ্যুতি, মানসিক আঘাত ও আকাঙ্ক্ষার ধারণার স্পষ্ট ইঙ্গিত। সেই উন্মুক্ত খাঁচা এবং তার ভেতর বিভাজিত ক্ষেত্র, দূরত্ব, প্রতীকী বস্তুর সমাহারে (শিরদাঁড়া; পাখির কঙ্কাল; নারীমূর্তি) ভাস্কর্য হয়ে উঠল মনস্তাত্ত্বিক এক মঞ্চ।

জিয়াকোমেত্তি নিজেই এই ভাস্কর্যকে সম্পৃক্ত করেন জনৈক ‘ডেনিজ’-এর সঙ্গে ছ’-মাসের উন্মত্ত প্রণয়পর্বের সঙ্গে। ‘দ্য লাভার’ (মেরুদণ্ড) বা ডানদিকের খাঁচায় ঝুলন্ত অবস্থায় খোদাই-করা সুনিপুণ মেরুদণ্ডকে সম্ভবত জিয়াকোমেত্তি ‘ডেনিজ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তার অবয়বকে একেবারে কঙ্কালসার কাঠামোয় নামিয়ে এনে শিল্পী তাকে একাধারে যৌন উন্মাদনা, ভঙ্গুরতা ও চরম অসহায়ত্বের প্রতীকে রূপান্তরিত করেন। প্রাসাদের ওপর ভেসে বেড়ানো প্রাগৈতিহাসিক টেরোড্যাকটাইল (কঙ্কালসার পাখি) আদতে সময়ের ক্ষণস্থায়ী ও আশঙ্কাজনক গতিপথ এবং সেই প্রণয়ের অনিবার্য, ধ্বংসাত্মক সমাপ্তির প্রতীক। খাঁচার বাঁদিকের মূর্তি– জিয়াকোমিত্তির মায়ের প্রতিচ্ছবি– শিল্পীর শৈশবের একেবারে শুরুর দিকের স্মৃতিতে যেমন ধরা ছিলেন। তাঁর অনমনীয় ভঙ্গি এবং কাঠামোর প্রান্তে অবস্থান দূরত্ব, মাতৃসুলভ নজরদারি ও অবদমিত স্বস্তির অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

zoom
উওম্যান উইথ হার থ্রোট কাট

আলবের্তো জিয়াকোমেত্তির সাররিয়ালিস্ট পর্বে তৈরি ‘উওম্যান উইথ হার থ্রোট কাট’ (Femme égorgée) (১৯৩২), অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য। সাররিয়ালিস্ট আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অন্ধকার, আক্রমণাত্মক এবং ফেটিসিস্টিক বিষয়বস্তুর প্রকাশ ছাড়াও তাতে সহিংসতা, যৌনাবেদন এবং পতঙ্গের ব্যবচ্ছেদবিদ্যার সংমিশ্রণ ঘটেছে। পেডেস্টাল ছাড়া সরাসরি মেঝের ওপর রাখার জন্য ভাস্কর্যটি দর্শককে ওপর থেকে নিচের দিকে তাকাতে বাধ্য করে– যেন সে এক অপরাধের দৃশ্য বা কোনও পতিত প্রাণীকে আবিষ্কার করছে। এই নির্মাণ এক বায়োমেকানিক্যাল হাইব্রিড বা সংকর– নগ্ন নারী-প্রেয়িং ম্যান্টিস (praying mantis), মারাত্মক এক অস্ত্র– তিনের মিশেলে এক মরণফাঁদ যেন। ধনুকের মতো বাঁকা; প্রাচীন ভারতীয় ভাস্কর্য, লজ্জা-গৌরীর মতো দু’-ধারে বিস্তৃত, উন্মুক্ত পা; এক পাঁজরের ধাঁচের খাঁচা এবং একটি খাঁজকাটা গলা, যা কাটা শ্বাসনালী বা ভাঙা ভায়োলিনের গর্ভের কথা মনে করিয়ে দেয়। অরক্ষিত যৌনতার পাশাপাশি বিদ্যমান প্রাণঘাতী হুমকি। এই ভঙ্গি যেমন একদিকে মৃত্যুযন্ত্রণা বা যৌন আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দেয়, তার ধারালো অস্ত্রের মতো প্রত্যঙ্গ পুরুষসঙ্গীকে মারণফাঁদে আহ্বান করে। শিকার ধরার আগে ‘প্রেয়িং ম্যান্টিস’ যেমন।

zoom
প্রার্থনারত পতঙ্গ

‘উওম্যান উইথ হার থ্রোট কাট’ সাররিয়ালিস্ট অবজেক্ট আর্টের অন্যতম বিতর্কিত এবং আলোড়ন সৃষ্টিকারী মাস্টারপিস, যা ১৯৩০-এর দশকের গোড়ার দিকে ইউরোপীয় আভাঁ-গার্দ সংস্কৃতির যৌনতা, মৃত্যু এবং নশ্বরতা নিয়ে উন্মাদনার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। 

zoom
ওয়াকিং ম্যান

তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আধুনিক ভাস্কর্যের অন্যতম প্রধান প্রতীক ১৯৪০-এর দশকে আলবের্তো জিয়াকোমেত্তির ‘ওয়াকিং ম্যান’ (L’Homme qui marche) সিরিজে মানবদেহে আসে আমূল পরিবর্তন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর ইউরোপীয় অস্তিত্ববাদের (Existentialism) প্রভাব এড়ানো দায়। তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জিয়াকোমেত্তি মূর্তির শারীরিক গঠনকে ক্ষয়প্রাপ্ত ও সরু রেখায় পরিণত করেন। যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে একে একে তৈরি হতে থাকা ‘থ্রি মেন ওয়াকিং’ (১৯৪৮), ‘দ্য সিটি স্কোয়ার’ (১৯৪৮), ‘ম্যান ক্রসিং আ স্কোয়ার’ (১৯৪৯)-এ ধরা পড়ে এক কঠিন বাস্তব– দূরত্ব। দীর্ঘাঙ্গ, সামনে ঝুঁকে এগিয়ে থাকা মুখ, উদ্দেশ্যহীন হাত আর জমে থাকা পা নিয়ে সে কোথায় এগতে চায়? চারদিকে তার অসীম শূন্যতা বিরাজ করে। তবু, প্লাস্টার এবং ব্রোঞ্জে নির্মিত এই সুউচ্চ, কৃশকায়, কর্কশ, কঙ্কালসার মূর্তিরা মানুষের একাকিত্ব, ভঙ্গুরতা এবং অদম্য এগিয়ে চলার সংকল্পের প্রতীক। বিস্তৃত, ভারী বেদির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই পদযাত্রীরা একইসঙ্গে নিঃসঙ্গ ও দৃঢ়চেতার রূপক।

১৯৪৭-’৪৮ সালের প্রাথমিক ছোট সংস্করণগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় ছিল ১৯৬০ সাল অবধি। তার ভিত্তিতে বিশালাকার হয় নির্মাণ। ১৯৬০ সালের বিখ্যাত ‘ওয়াকিং ম্যান ওয়ান’ এবং ‘ওয়াকিং ম্যান ওয়ান টু’ প্রায় ৬ ফুট লম্বা। এই সিরিজ আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে এক অনন্য ভাস্কর্য হিসেবে পরিচিত।

zoom
আলবের্তো জিয়াকোমেত্তি

আলবের্তো জিয়াকোমেত্তির ভাস্কর্য নির্মাণের প্রক্রিয়া তীব্র সংযোজন ও বিয়োজনের সংমিশ্রণ– মানুষের বাস্তব-প্রত্যক্ষকে ফুটিয়ে তোলার প্রচেষ্টায়। প্রথমে তারের কাঠামোর ওপর নরম প্লাস্টার, হাত ও ছোট ছুরি দিয়ে মূর্তি খোদাই করে পরে ব্রোঞ্জে কাস্ট (cast) করতেন। কাদামাটির চেয়ে প্লাস্টার অব প্যারিস (Plaster of Paris) দ্রুত শুকিয়ে যায় বলে জিয়াকোমেত্তির অতি প্রিয় মাধ্যম ছিল তা। ছোট বাটিতে প্লাস্টার গুলিয়ে ভেজা অবস্থায় তা তারের কাঠামোর ওপর আঙুল ও ছোট স্প্যাচুলা দিয়ে লেপে দিতেন। মূর্তিকে একবারে গড়ে তোলার বদলে পরতে পরতে প্লাস্টার যোগ করতেন; শুকিয়ে গেলে ছুরি, রেজার, বাটালি দিয়ে তা কেটে, চেঁছে, আঁচড়ে ছোট করতেন। একটি মূর্তির আয়তন বাড়িয়ে আবার তা ছাঁটতে ছাঁটতে কাঠির মতো সরু করে ফেলা হত এক-একবারেই। এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটত। ফলে তাঁর মূর্তির গায়ে খসখসে, ক্ষয়প্রাপ্ত ও আশ্চর্য টেক্সচার তৈরি হত। 

zoom
সিমোন দ্য বোভোয়া। শিল্পী: আলবের্তো জিয়াকোমেত্তি

তাঁর সমসাময়িক ভাস্কররা প্লাস্টারকে নিতান্ত ব্রোঞ্জ কাস্টিংয়ের ছাঁচ তৈরির একটি মাধ্যম হিসেবে দেখলেও, জিয়াকোমেত্তি প্লাস্টারকেই তাঁর কাজের প্রাথমিক ও প্রধান শিল্পমাধ্যম হিসেবে গণ্য করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মূর্তিগুলো কৃশ, দীর্ঘ ও ওপরের দিকে ভারী হওয়ায় অভ্যন্তরীণ কাঠামো ছাড়া নিজের ভারে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব ছিল না। সুতরাং, তামা বা লোহার মোটা তার পেঁচিয়ে মূর্তির কাঠামো বা আর্মেচার (armature) তৈরি করা শুরু হল। বড় বা দীর্ঘ মূর্তির ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি শক্ত রাখতে তারের সঙ্গে ধাতুর রড, কাঠের কাঠি বা ধাতব খণ্ড যোগ করা হল। 

​প্লাস্টার জমে শুকিয়ে যাওয়ার পর তিনি কালো রং, কালি, গুয়াশ বা পেনসিল দিয়ে প্লাস্টারের ওপর সরাসরি মুখের আদল, চোখের আকৃতি ও পেশির রেখা ফুটিয়ে তুলতেন। সাদা প্লাস্টারের ওপর গাঢ় রঙের ছোঁয়া ও খোদাই করা গর্তরা তৈরি করত আলো-ছায়ার (chiaroscuro) অনুপম নাটকীয়তা। কোনও প্লাস্টারের কাজ সমাপ্ত মনে হলে (অথবা তাঁর ভাই দিয়েগো জিয়াকোমেত্তি সেটিকে পুরোপুরি ছেঁচে ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে ফেলতে পারলে) তা ফাউন্ড্রিতে পাঠানো হত ব্রোঞ্জে কাস্ট করার জন্য। শিল্পীর মূল প্লাস্টারের ভাস্কর্য থেকেই সরাসরি মোল্ড বা ছাঁচ (direct casting to bronze) তৈরি করা হত বলে ব্রোঞ্জে রূপান্তরিত চূড়ান্ত পর্বে তাঁর আঙুলের ছাপ, বাটালির দাগ, পেনসিলের আঁচড় ও ভিতরের তারের গঠন হুবহু সংরক্ষিত থেকে যেত। 

zoom
জিয়াকোমেত্তির করা সার্ত্রের পেনসিল স্কেচ

জিয়াকোমেত্তির ‘ভয়েড’ আর ‘নেগেটিভ স্পেস’ নির্মাণ করেছিল দূরত্বের। যুদ্ধের পর দূরত্বের গুরুত্ব অসীম। দার্শনিক বন্ধু জঁ-পল সার্ত্রে, তাঁর ‘দ্য কোয়েস্ট ফর দ্য অ্যাবসলিউট’ (১৯৪৮) এবং ‘দ্য পেইন্টিংস অব জিয়াকোমেত্তি’ (১৯৫৪)– এই দুই প্রবন্ধে জিয়াকোমেত্তির গভীর দার্শনিক দিকটি তুলে ধরেন। 

‘দ্য পেইন্টিংস অব জিয়াকোমেত্তি’-তে সার্ত্রে শিল্পীর আঁকা গণিকাদের দেখতে দেখতে লিখছেন:

‘জিয়াকোমেত্তি দূর থেকে যেভাবে তাঁদের দেখেছিলেন, ঠিক সেভাবেই তাঁদের এঁকেছিলেন। তা সত্ত্বেও, এই চার নারীর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত নজরকাড়া।… দূরত্ব– যা কোনও দুর্ঘটনাবশত তৈরি হওয়া পরিস্থিতি নয়– তাঁর চোখে প্রতিটি বস্তুরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কুড়ি কদম দূরে থাকা, অসম্ভব কুড়ি কদম দূরে অবস্থিত এই নারীমূর্তিরা তাঁর নিরাশ কামনার আলোয় চিরকালের জন্য চিহ্নিত হয়ে আছে। তাঁর স্টুডিওটি একটি দ্বীপপুঞ্জ, অনিয়মিত সব দূরত্বের এক পুঞ্জীভূত সমষ্টি।… এই দূরত্ব অতিক্রম করার নয়। এই নির্জনতা কোনও ঘর, সবুজ মাঠ বা বনের খোলা প্রান্তরের সমস্ত অলঙ্ঘনীয় দৈর্ঘ্য নিয়ে দর্শনার্থীকে দূরে সরিয়ে দেয়– যে দৈর্ঘ্য অতিক্রম করার সাহস কেউ পাবে না। জিয়াকোমেত্তি নিজের সমান সমকক্ষ কাউকে দেখলে যে স্থবিরতায় বা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন, এগুলো তারই প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।…’ (পৃ. ৪৬)

এই গভীর বোধ হয়তো সার্ত্রের মধ্যে জাগ্রত হত না যদি না অ্যাগোরাফোবিয়ায় (খোলা বা জনাকীর্ণ স্থানের প্রতি ভীতি) আক্রান্ত হতেন তিনি। 

zoom
জঁ পল সাত্রে

“দূরত্ব কাকে বলে, তা প্রথম বুঝেছিলাম ১৯৪১ সালের এপ্রিলের এক সন্ধ্যায়। তখন আমি দু’মাস একটানা বন্দিশিবিরে। একদম সার্ডিন মাছের কৌটোর মতো– যেখানে একেবারে গা-ঘেঁষা সান্নিধ্যের অভিজ্ঞতা হয়েছিল। থাকার জায়গার সীমানা বলতে কেবল আমার নিজের চামড়াটুকু। দিন-রাত শরীরের সঙ্গে লেগে থাকা অন্য কারও কাঁধ বা বুকের ওম অনুভব করতাম। অস্বস্তির রেশমাত্র ছিল না। কারণ অন্য মানুষগুলো হয়ে উঠেছিল আমারই অংশ।’’ (পৃ. ৪৭) 

এই অবস্থা কাটিয়ে সার্ত্রে যখন মধ্যবিত্ত সমাজে ফিরছেন, তখন আবারও সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রেখে বাঁচা শিখতে হচ্ছে। একই প্রবন্ধে তিনি জানাচ্ছেন: ‘‘আমার অ্যাগোরাফোবিয়া প্রকৃতপক্ষে সেই যৌথ বা সমষ্টিগত জীবনের প্রতি এক অস্পষ্ট অনুশোচনার ভাবকে প্রকাশ করে ফেলেছিল, যা থেকে আমি চিরকালের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। জিয়াকোমেত্তির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাঁর কাছে দূরত্ব কোনও স্বেচ্ছাকৃত বিচ্ছিন্নতা কিংবা গুটিয়ে নেওয়া নয়। এটি পরিস্থিতিজনিত এক আবশ্যিক শর্ত, একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও কাঠামোর স্বীকৃতি, আর প্রতিকূলতাগুলোর প্রতি একধরনের মেনে নেওয়া।’’ (পৃ. ৪৮) 

১৯৫০-এ মাতিসকে লেখা এক চিঠিতে এই বিষয়ে জিয়াকোমেত্তি নিজে বলছেন: ‘এটি আকর্ষণ ও বিকর্ষণ শক্তিরই এক যৌথ পরিণতি।’ তিনি সেই মসৃণ মেঝে পেরিয়ে নগ্ন নারীমূর্তিদের দিকে এগিয়ে যেতে পারেন না, কারণ সংকোচ কিংবা দীনতা তাঁকে নিজের চেয়ারে পেরেক ঠুকে আটকে রেখেছে। ঠিক এই মুহূর্তেই জিয়াকোমেত্তি উপলব্ধি করেন– এই দূরত্ব অলঙ্ঘনীয়, কারণ তিনি তাদের নিবিড় স্পর্শ পেতে ব্যাকুল। তিনি চরম ঘনিষ্ঠতার ফলে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা ও অবাধ মেলামেশাকে প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তিনি চেয়েছিলেন বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা। কাউকে নিজের করে নেওয়ার সাহস পান না, এই ভয়ে– পাছে তিনি নিজেও কারও দ্বারা বন্দি হয়ে যান। (পৃ. ৪৮)

zoom
জিয়াকোমেত্তি ও অ্যানেট আর্ম

যে জিয়াকোমেত্তি বারবার প্রেমে পড়ছেন; শরীর ও মনের জটিল সমীকরণে জড়াচ্ছেন তুতো বোনের সঙ্গে (বিয়াংকা), কখনও স্ত্রীর (অ্যানেট আর্ম) সঙ্গে, কখনও বা গণিকার (ক্যারোলাইন) সঙ্গে; এবং মোহগ্রস্ত হয়ে এঁদের শরীর ভিত্তি করে অ্যানাটমি, ভাস্কর্য, আকার, গার্হস্থ্য স্থায়িত্ব, অশান্তি, জীবন আর বিপদকে উপলব্ধি করছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নৈকট্যকেই ভীতিতে পরিণত করছে সেই জিয়াকোমেত্তির কাছে। 

সার্ত্রের ‘দ্য কোয়েস্ট ফর দি অ্যাবসলিউট’ (১৯৪৮) থেকে দু’-একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তাঁর কাছে জিয়াকোমেত্তি এবং তাঁর সমসাময়িক শিল্পীরা অসীম গুরুত্বপূর্ণ খোদাই বা তক্ষণশিল্পের জন্য (সম্ভবত পাথরের কথাই বলতে চেয়েছেন তিনি)। সার্ত্রের মতে, তিন হাজার বছর ধরে খোদাই করে যে ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে তা নিতান্ত শবদেহ। কখনও স্মৃতিসৌধে, কখনও কুর্শিতে, কখনও বা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে। সুতরাং, আবার নতুন করে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। জিয়াকোমেত্তি এবং তাঁর সমসাময়িক শিল্পীদের দায়িত্ব শুধু নতুন কাজ দিয়ে গ্যালারিকে তুষ্ট করা নয়। তাঁদের কাজ একথা প্রমাণ করা– খোদাই করেই ভাস্কর্য হয় (পৃ. ৮৪)। তার অসীম সম্ভাবনাকে নতুন উদ্যোগে অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয়েছিল।

অথচ পাথরের যে চিরস্থায়ী চরিত্র, সেই চরিত্রে বিশ্বাসী ছিলেন না জিয়াকোমেত্তি। সার্ত্রে খুশি হয়েছিলেন বন্ধুর সেই দার্শনিকতায়, যেদিন নিজের করা খানকয়েক মূর্তি ভেঙে ফেলে জিয়াকোমেত্তি বলেছিলেন, ‘আমি এগুলো নিয়ে খুশি হলেও, কয়েক ঘণ্টার জন্য বানিয়েছিলাম।’ (পৃ. ৮৫) ক্ষণস্থায়ী, যেন ভোরবেলা বা দুঃখের মতো। এই তাৎক্ষণিকতাই সার্ত্রেকে মুগ্ধ করেছিল। ভঙ্গুর, ক্ষয়িষ্ণু। মানুষের সমস্ত জীবন-চরিত্র-গুণ তার মধ্য দিয়ে দেয় ধরা। 

zoom
জিয়াকোমেত্তির স্টুডিও

যুদ্ধোত্তর কালে জিয়াকোমেত্তির প্রভাব গভীরভাবে ছাপ ফেলে আধুনিক শিল্পে। তাঁর ভাষ্কর্যের অমসৃণ কর্কশ পৃষ্ঠতল (surface), দৃশ্যমান হাতের ছাপ রেখে যাওয়ার আঙ্গিকে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন ফ্রান্সিস বেকন, উইলেম ডি কুনিংয়ের মতো উত্তরসূরি। তাঁদের কাজে ওই gestural mark-making প্রায় সিগনেচার স্টাইল হয়ে দাঁড়ায়।

ভাস্কর্য পেনসিলের মতো সরু এবং দীর্ঘ নির্মাণের ফলে তাদের চারদিকে বিশালাকৃতি শূন্যতা সৃষ্টি হয়। এই spatial void-এর গুরুত্ব আবিষ্কারের ফলে জিয়াকোমেত্তি কঠিন বস্তু থেকে মনোযোগ সরিয়ে ভাস্কর্যের চারদিকে থাকা ক্ষেত্রটির দিকে দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এক নীরব বিপ্লব ঘটে দৃশ্যশিল্পের ইতিহাসে। আধুনিক মিনিম্যালিস্ট শিল্পীরা স্পেসের সঙ্গে আদানপ্রদানের এই অনবদ্য আবিষ্কারকে সাদরে গ্রহণ করলেন। 

অ্যান্টনি গর্মলি, লুই বুর্জোয়া এবং জর্জ সেগালের মতো শিল্পীরা ভৌত পরিসরে (physical space) নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন অবয়বের মাধ্যমে আবেগীয় অবস্থা ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে জিয়াকোমেত্তির দক্ষতাকে প্রবলভাবে গ্রহণ করেন।

zoom
১৯৪৭। বাস্তুহারা

মাইথোলোজি, সাহিত্য, ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, যা বারবার উত্থাপিত হয়, রূপক হয়ে ফিরে ফিরে আসে, তা গুরুত্বপূর্ণ, অর্থপূর্ণ বলেই ফিরে আসে। জিয়াকোমেত্তির মৃত্যুর ৬০ বছর পার করেও, তাঁর হেঁটে চলা মানুষ বিশ শতকের শেষার্ধে এবং একুশ শতকের স্থানচ্যুত মানুষের প্রতিবিম্ব হয়ে রয়ে যায়। 

জিয়াকোমেত্তির যুদ্ধোত্তর মানুষকে স্থানচ্যুতির ইতিহাসের ভেতর দিয়ে পড়া যায়– কিন্তু স্থানচ্যুতি তো শুধুমাত্র ভিটেমাটি হারানো নয়; দৃষ্টিভঙ্গি, নৈকট্য, শারীরিক উপস্থিতি এবং অন্য মানুষের কাছে পৌঁছতে না-পারার এক অস্তিত্বগত দূরত্বও।

zoom
১৯৭১। বাস্তুহারা

তাছাড়া, ‘displacement’-কে শুধু ঘরছাড়া হওয়া হিসেবে দেখা চলে না। নিজের পরিচয়, নাগরিকত্ব, স্মৃতি, শরীর, প্রতিবেশ, ভাষা এবং রাষ্ট্রের কাছে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়াও তো তার আওতায় পড়ে। কোভিড-১৯, detention camp এবং SIR-এর প্রসঙ্গও কেমন এক কাব্যিক সেতুতে জুড়ে যায় তার সঙ্গে। 

উচ্ছেদ শুধু ঘর থেকে হয় না, উচ্ছেদ হয় মানুষ তার ঠিকানা থেকে, তার স্মৃতি থেকে। এমনকী, নিজের নামের ভেতর থেকেও উচ্ছেদ হয় মানুষ। 

রাষ্ট্র বলেছিল মহামারীর সময় ঘরের দুয়ার এঁটে রাখতে। সেই রাষ্ট্রই পরে পৃথক ঘর নির্মাণ করল। উন্মুক্ত দরজা। প্রমাণ দাখিল না-করতে পারলে এই হবে বাসস্থান। আমার আর অতীত বলে কিছু নেই এখন থেকে। ভবিষ্যতও নয়। আছে শুধু প্রমাণ দেওয়ার অপেক্ষা: তুমি কে? উদয় হলে কোথা থেকে থেকে? এখানে থাকার অধিকার তোমার আছে কি আদৌ? এই মাটি, এই আকাশ, এই বনভূমির আমি আর কেউ নই। 

zoom
কোভিড-১৯। বাস্তুহারা

নাগরিক অস্তিত্বের অনিশ্চয়তাও উচ্ছেদ। তালিকা থেকে কাটা পড়া নাম আর তালিকাভুক্ত মানুষের পরিচয় কি একই রয়ে যায় কখনও? তার বাড়ি, তার স্মৃতি, তার নাগরিকত্বের চারপাশে গজিয়ে ওঠা বেড়া? উচ্ছেদের নানা রূপ। 

জিয়াকোমেত্তি দেখে যেতে পারেননি, হয়ত কল্পনাও করতে পারেননি প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্থানচ্যুত প্যালেস্তিনিয়দের কথা; দেশভাগের পর রিফিউজিদের কথা; বলকানদের অন্যত্র সরে যাওয়ার কথা (Balkan displacement); আফ্রিকান আর এশীয় পরিযায়ীদের কথা; সিরিয়ার শরণার্থীদের কথা; জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভিটেমাটিহারাদের কথা; বেঁচে থাকার সব সামগ্রী অক্ষত, নিরাপদে সঙ্গে নিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার কথা; পরিযায়ী শ্রমিকের কথা; নির্বাসিতের কথা; আর ভুক্তিকরণ হয়নি যার, তালিকার বাইরে থাকা সেই মানুষের কথা। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিরকালে ইতিহাসে মোড়া এক বিশ্বে তাঁর নির্মাণ– অনির্দিষ্টের পথে হেঁটে চলা একাকী মানুষ– বারবার ফিরে পায় হেঁটে চলার নতুন ইতিহাস। 

সূত্র: এসেস ইন এসথেটিক্স। জঁ-পল সার্ত্রে। ফিলোসফিক্যাল লাইব্রেরি, নিউ ইয়র্ক। ১৯৬৩। 

Alberto Giacometti Art and Memory Jean-Paul Sartre Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Surrealism Surrealist Sculpture The Palace at 4 A.M.

Share this article on