memoirs of indira devi and rabindranath tagore | Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

স্মৃতিসম্পুট: রবীন্দ্রনাথ ও ইন্দিরা দেবী

ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর বিবিধ গুণের মধ্যে রন্ধন বিষয়ে তাঁর আগ্রহ এবং অনুসন্ধিৎসার কথা অনেকেরই হয়তো জানা নেই। পূর্ণিমা ঠাকুরের লেখা ‘ঠাকুরবাড়ির রান্না’ গ্রন্থে তিনি জানিয়েছেন, ইন্দিরা নিজে রান্না করতে না-জানলেও যে কোনও ভালো রান্নার শুধু যে সমঝদার ছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের ভোজনরসিক এবং গুণগ্রাহী। যে কোনও নিমন্ত্রণ-বাড়ি কিংবা বন্ধুর হাতের রান্না ভালো লাগলে, তিনি সেই রান্নার প্রণালী ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে রন্ধনকারীর কাছ থেকে জেনে নিয়ে একটি খাতায় তা সুন্দর করে লিখে রাখতেন।

Published by: Robbar Digital

Posted:June 2, 2026 8:38 pm | Updated:August 12, 2026 5:04 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

এ গান বাঁচিয়া থাকে যেন তোর মাঝে,
আঁখিতারা হয়ে তোর আঁখিতে বিরাজে।
এ যেন রে করে দান
সতত নূতন প্রাণ,
এ যেন জীবন পায় জীবনের মাঝে।

‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ এই কবিতাটি উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর সাহিত্যচর্চায় সরস্বতী, অসামান্যা সুন্দরী বিদুষী ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাকে। ১৮৮৬ সালে যখন গ্রন্থটি প্রকাশ পায়, তখন ইন্দিরার বয়স ১৩ আর রবীন্দ্রনাথ ২৬ বছরের বিবাহিত তরুণ এবং এক কন্যার পিতা।

zoom
ইন্দিরা দেবী চৌধুরানি

ইন্দিরা ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যম পুত্র, ব্রিটিশ ভারতবর্ষের প্রথম সিবিলিয়ান, লেখক, সংগীত-স্রষ্টা ও ভাষাবিদ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্যা ভ্রাতুষ্পুত্রী। ব্রিটিশ ভারতের নারীমুক্তি আন্দোলনে সত্যেন্দ্রনাথের ভূমিকা ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৮৭৩ সালে মহারাষ্ট্রের কালাদগি শহরে ইন্দিরার জন্ম হয়েছিল। চিত্রা দেব তাঁর ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’ গ্রন্থে জন্মসময়ে জাতিকার এক অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছেন। ‘…কালাদগি শহরে ভূমিষ্ঠ হল ঠাকুরবাড়ির একটি মেয়ে, আকাশ থেকে যেন নেমে এল একটা তারা। কাটা কাটা ধারালো মুখশ্রী, সুন্দর গায়ের রং, বড় বড় দুটি উজ্জ্বল চোখ, রজনীগন্ধার মতো সতেজ সুন্দর দেহের অধিকারিণীর নাম রাখা হল ইন্দিরা।’ মা জ্ঞানদানন্দিনী ছিলেন উনিশ শতকের একজন প্রগতিশীল সমাজসংস্কারক, যিনি বাংলার নারীদের ক্ষমতায়ন ও বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্বের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর সপরিবারে বিলেতে থাকাকালীন, ১৮৭৮ সালে ১৭ বছরের তরুণ রবীন্দ্রনাথ উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে সেখানে পৌঁছলে, তিনি তাঁর মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথের পরিবারের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। বউঠান জ্ঞানদানন্দিনী, ভাইপো সুরেন ও পাঁচ বছর বয়সি ভাইঝি ইন্দিরার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের গোড়াপত্তন ঘটেছিল সেই সময়েই। এ-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’তে লিখেছিলেন, ‘শিশুদের কাছে হৃদয় দান করিবার অবকাশ সেই আমার জীবনে প্রথম ঘটিয়াছিল। দানের আয়োজন তাই বিচিত্রভাবে পূর্ণ হইয়া প্রকাশ পাইয়াছিল।’ এইভাবে অচিরেই রবিকাকা তাঁর ভাইপো-ভাইঝির খেলার সঙ্গী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। শিশুদের আনন্দ দিতে তিনি না কি নানাবিধ ফন্দি বের করতেন এবং মজার সুরে গান গাইতেন। সুরেন ও বিবির ইংরেজি উচ্চারণ ও বিলেতি আদবকায়দা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। বড়দিনের ছুটির পরে অবশ্য তিনি লন্ডনে চলে যান ও ইউনিভার্সিটি কলেজে ভর্তি হন।

zoom
বাল্মীকিপ্রতিভা অভিনয়ের পরে ইন্দিরা দেবী ও রবীন্দ্রনাথ

ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে, ভারতে, সিমলার অকল্যান্ড হাউস ও কলকাতার লোরেটো কনভেন্টে ইন্দিরা তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন। খোদ ঠাকুর পরিবারে ইন্দিরা প্রথম মহিলা যিনি স্নাতক হয়েছিলেন। তিনি লোরেটো থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে ফরাসি ও ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে বাড়ি বসে বিএ পড়েছিলেন। ১৮৯২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করে লাভ করেন পদ্মাবতী স্বর্ণপদক। ইন্দিরার আগে অবশ্য ১২ জন মহিলা স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। সেই অর্থে ইন্দিরা ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩তম স্নাতক, তবে তাঁরা কেউই ফরাসি ভাষা নিয়ে পরীক্ষা দেননি।

ইন্দিরা ফরাসি ভাষা চমৎকার আয়ত্ব করেছিলেন। তাঁর স্বামী প্রমথ চৌধুরীও ছিলেন ফরাসি ভাষায় সুপণ্ডিত। বিবাহের আগে ইন্দিরাকে লেখা তাঁর চিঠিতে তাঁর ‘প্রিয়’ সম্ভাষণটি ছিল ফরাসি ‘Mon ami’। ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সৌন্দর্য ও মেধা সম্বন্ধে প্রমথ চৌধুরী অবহিত ছিলেন সেই তরুণ বয়স থেকে, যখন তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র। একদিন কলেজের মাঠে দেখা হল বন্ধু নারায়ণচন্দ্র শীলের সঙ্গে। তিনি প্রমথকে জানালেন, রবীন্দ্রনাথ আলবার্ট হলে বক্তৃতা দিতে আসছেন। সঙ্গে থাকছেন তাঁর এক সুন্দরী ভ্রাতুষ্পুত্রী। নারায়ণের ইচ্ছে বক্তৃতা শুনতে যাওয়ার। প্রমথ কিন্তু এই প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন। নিরুপায় নারায়ণ তখন বললেন, ‘বক্তৃতা শুনতে না যাও, ক্ষতি নেই। শুনেছি ভ্রাতুষ্পুত্রীটি অতীব সুন্দরী। তাকে অন্তত দেখে আসি চল’। এই কথায় কিঞ্চিৎ বিরক্ত প্রমথ বলেছিলেন, পরের বাড়ির খুকি দেখার লোভ তাঁর নেই। উল্লিখিত সেই সুন্দরী ভ্রাতুষ্পুত্রীটি ছিলেন ইন্দিরা। পরবর্তীকালে প্রমথ এই ঘটনার কথা তাঁর ‘আত্মকথা’য় উল্লেখ করেছিলেন। ইন্দিরা ও প্রমথ চৌধুরীর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের মধ্যস্থতায়। সেই অর্থে ঠাকুরবাড়িতে এই যুগলের বিবাহ ছিল সেই পরিবারের প্রথম প্রেমের বিবাহ। প্রাচীন কলকাতার দুই সাবেক পরিবারভুক্ত দুই তরুণ-তরুণী। দু’জনেই ফরাসি ভাষায় অতি প্রাজ্ঞ।

সেই যুগে জন্ম হয়েও তাঁরা উভয়েই জীবনচর্চায় অর্থাৎ লেখাপড়া, ভাবনাচিন্তায় এমনকী প্রেম নিবেদনেও ছিলেন অতি আধুনিক। প্রমথ চৌধুরী বি.এ-তে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স, প্রথম বিভাগে প্রথম। পাশাপাশি নিয়মিত ফরাসি ও সংস্কৃত চর্চাতে মগ্ন ছিলেন তিনি। ‘বীরবল’ ছদ্মনামে তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। প্রাবন্ধিক, সুসাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী ছিলেন সেই যুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।

zoom
প্রমথ চৌধুরী ও ইন্দিরা দেবী

বাল্যবয়স থেকেই ইন্দিরা তাঁর সাহিত্য প্রতিভার পরিচয় দিয়ে এসেছেন। তাঁর এই প্রতিভা সম্বন্ধে সম্পূর্ণভাবে অবহিত ছিলেন তাঁর পিতৃব্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই কৈশোর থেকে ইন্দিরা হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথের মানসসঙ্গিনী। বালিকা ইন্দিরাকে উদ্দেশ্য করে তাই কবি রচনা করেছেন একাধিক কবিতা। উৎসর্গ করেছেন ‘প্রভাত সঙ্গীত’ কাব্যগ্রন্থ, ‘শ্রীমতী ইন্দিরা প্রাণাধিকাসুকে’। এই কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতাতে কবি লিখেছেন, ‘গেঁথেছিরে গানের মালা, ভোরের বেলা বনে এসে/ মনে বড় সাধ হয়েছে পরাব তোর এলো কেশে’। ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যগ্রন্থের একাধিক কবিতাও ‘ইন্দিরা প্রাণাধিকাসু’কেই উদ্দেশ্য করে লেখা। ততদিনে কবি বিবাহিত। স্ত্রী মৃণালিনী ইন্দিরার প্রায় সমবয়সি। কিন্তু সেই সময়ে কবির হৃদয়জুড়ে বিলেত প্রত্যাগতা অসামান্যা সুন্দরী বিদুষী ইন্দিরা, যাঁর সঙ্গে গ্রামের মেয়ে কবি-পত্নী ভবতারিণীর কোনও তুলনাই চলত না।

ইন্দিরাদেবীর ‘ভ্রমণস্মৃতি’ থেকে একথা পরিস্ফুট যে রবিকাকার সঙ্গে মুসৌরি, গাজিপুর, দার্জিলিং প্রভৃতি নানা জায়গায় নানা সময়ে ইন্দিরা ভ্রমণ করেছেন শুধু নয়, তাঁদের পারস্পরিক বোঝাপড়া, তাঁদের সম্পর্কের ভিত গড়ে উঠেছিল সেই ছোটবেলা থেকেই। একবার ইন্দিরার জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথ একটি দোয়াতদানি উপহার দিয়ে তার সঙ্গে কয়েক ছত্র লিখে দিয়েছিলেন, ‘স্নেহ যদি কাছে কাছে রেখে দেওয়া যেত/ চোখে যদি দেখা যেত রে,/ বাজারে জিনিস কিনে নিয়ে এসে/ বল দেখি দিত কে তোরে’।

কলকাতায় থাকাকালীন ইন্দিরা তাঁর রবিকাকার সঙ্গে ব্রাহ্মসমাজের নানা অনুষ্ঠানে পিয়ানো বাজানোর জন্য যেতেন। রবিকাকার গানের সঙ্গে তাঁর সঙ্গত করার প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন যে, “সেই সময়ে ব্রাহ্মসমাজে দুই ধাপের একটি সুন্দর অর্গান যন্ত্র ছিল আর সেই যন্ত্রে বসে আমি রবিকা’র গানের সঙ্গে বাজাতাম”। 

ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সৌন্দর্যের খ্যাতি ছিল সর্বজনবিদিত। ইন্দিরা অবশ্যই তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। জনশ্রুতি এই যে, ইন্দিরা যখন ইশকুলে যেতেন, ফটকের উল্টোদিকের মাঠে এক দর্শনপ্রার্থী যুবক দাঁড়িয়ে থাকত কোনও আলাপ-পরিচয় ছাড়াই– একদিন নয়, দিনের পর দিন। এ-ঘটনা নিয়ে পরিবারের মধ্যে বেশ হাসি-কৌতুক শুরু হয়েছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নাকি রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন একটি গান, ‘সখি প্রতিদিন হায় এসে ফিরে যায় কে’।

সুন্দরী ইন্দিরার পাণিপ্রার্থীর অভাব ছিল না। তার মধ্যে ছিলেন প্রমথ চৌধুরীও। ইন্দিরাও ভালোবেসে ফেলেছিলেন তাঁকে। তবে বিয়ের প্রস্তাব প্রথমে এসেছিল প্রমথর দিক থেকে, আর তাতে সম্মতি ছিল ইন্দিরার। রবীন্দ্রনাথ ভাষাবিদ, পণ্ডিত এবং সুসাহিত্যিক প্রমথকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। 

ইন্দিরা বিদেশি ও ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের ওপর তালিম নেওয়া শুরু করেছিলেন সেই কিশোরকাল থেকে। রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গানের স্বরলিপি লিখেছেন তিনি। এই স্বরলিপি রচনাও তাঁর এক মহৎ কীর্তি। শুধু সুর এবং স্বরলিপি রক্ষা করা নয়, ইন্দিরা রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ক তথ্য ও তত্ত্ব দু’টিকেই সমৃদ্ধ করেছিলেন। ইন্দিরার লেখা রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ক প্রবন্ধের সংখ্যাও কিছু কম নয়। এগুলির মধ্যে ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য’, ‘হারমনি বা স্বরসংযোগ’, ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতে তানের স্থান’, ‘বিশুদ্ধ রবীন্দ্রসঙ্গীত’, ‘দ্য মিউজিক অব রবীন্দ্রনাথ টেগোর’ প্রভৃতি রচনা, সংগীতে ইন্দিরার অগাধ জ্ঞানের পরিচয় বহন করে। এ বাদ দিয়ে তিনি নিজে কিছু ব্রহ্মসংগীত রচনা করেছিলেন। পিয়ানো, বেহালা, সেতার বাদনে পারদর্শী ছিলেন তিনি। ছিলেন একাধারে সুরকার ও গীতিকার। তাঁর আরোপিত সুরে রবীন্দ্রনাথ অনেক সংগীত রচনা করেছিলেন। নারীদের সংগীত-সংঘের মুখপত্র ‘আনন্দ সঙ্গীত’ পত্রিকার যুগ্ম-সম্পাদিকা ছিলেন তিনি। 

অনুবাদক হিসেবে ইন্দিরা দেবীর পরিচিতিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেই সময়ে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে নানা পত্রপত্রিকা প্রকাশ পেত। মাতা জ্ঞানদানন্দিনী সম্পাদিত ‘বালক’ পত্রিকায় ইন্দিরা সেই প্রথম রাসকিনের রচনার বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর যে চারটি অনুবাদ অসাধারণত্বের স্বীকৃতি পেয়েছে, তা হল– রেনে গ্রুসে-র ‘ভারতবর্ষ’, পিয়ের লোতির ‘কমল কুমারিকাশ্রম’, মাদাম লেভির ‘ভারত-ভ্রমণ কাহিনি’ (কলম্বো থেকে শান্তিনিকেতন) এবং আঁদ্রে জিদের ‘ফরাসি গীতাঞ্জলির ভূমিকা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত বহু কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ এবং ‘জাপান-যাত্রীর ডায়েরী’ তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ইন্দিরা। অনুবাদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কবিতা অনুবাদের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত ভরসার স্থল ছিলেন তিনি। সে-কথা বারবার কবি তাঁর চিঠিপত্রে স্বীকারও করেছেন। এরকমই একটি চিঠিতে তিনি ইন্দিরাকে লিখছেন, ‘তোর সব তর্জমাগুলিই খুব ভাল হয়েছে।… এইমাত্র তোর তর্জমাগুলি অপূর্বকে দেখালুম– সে বললে আমার কবিতার এত ভাল তর্জমা সে আগে আর দেখেনি।’

রবীন্দ্র-রচনার অনুবাদ ছাড়াও ইন্দিরা ফরাসি ও ইংরেজি ভাষা থেকে বাংলায়, আবার বাংলা থেকে ইংরেজিতে অসাধারণ সব অনুবাদ করেছেন! একথা অনস্বীকার্য যে, অনুবাদের ক্ষেত্রে ভাষাবিদ স্বামীর সান্নিধ্য ইন্দিরাকে অনেকাংশে ঋদ্ধ করেছিল। ইন্দিরা, প্রমথ চৌধুরীর ‘চার ইয়ারী কথা’রও অনুবাদ করেছিলেন। ‘টেলস অব ফোর ফ্রেন্ডস’– অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর আরেক অসামান্য কীর্তি। এছাড়া পিতা সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে যুগ্মভাবে অনুবাদ করেছিলেন মহর্ষির আত্মজীবনী ‘দ্য অটোবায়োগ্রাফি অব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর’। 

রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন সময়ে ইন্দিরাকে বহু চিঠি লিখেছেন। সেই কৈশোর থেকে ইন্দিরা সেইসব অসামান্য চিঠির প্রাপক। পরবর্তীকালে এইসব চিঠির সংকলন ‘ছিন্নপত্র’ ও ‘ছিন্নপত্রাবলী’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। ছিন্নপত্রে প্রায় ১৫১টি চিঠি আর ছিন্নপত্রাবলীতে অবশিষ্ট চিঠি স্থান পেয়েছে। ১৮৮৭ থেকে ১৮৯৫ সালের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাকে ২৫২টি চিঠি লিখেছিলেন। একটি চিঠিতে কবি লিখছেন, ‘তোকে আমি যে সব চিঠি লিখেছি তাতে আমার মনের সমস্ত বিচিত্র ভাব যে রকম ব্যক্ত হয়েছে এমন আর কোনো লেখায় হয়নি।… তোকে আমি যখন লিখি, তখন আমার একথা কখনো মনে উদয় হয় না যে, তুই আমার কোন কথা বুঝবিনে, কিম্বা ভুল বুঝবি, কিম্বা বিশ্বাস করবিনে, কিম্বা যেগুলো আমার পক্ষে গভীরতম সত্য কথা সেগুলোকে তুই কেবলমাত্র সুরচিত কাব্যকথা বলে মনে করবি। সেই জন্য আমি যেমনটি ভাবি সেই রকমটি অনায়াসে বলে যেতে পারি।’ এই চিঠির ভাষা আমাদের বলে দেয় যে, রবীন্দ্রনাথ এখানে যা বলছেন, তার মধ্যে আছে শুধু নিজেকে ব্যক্ত করার এক আন্তরিক প্রয়াস। চিন্তাভাবনা, এমনকী ভাব-আদর্শের দিক দিয়ে দু’জনের মধ্যে এতটাই মিল ছিল যে, ইন্দিরা কবির মানস-সঙ্গিনী শুধু নয়, তিনি হয়ে উঠেছিলেন একান্তভাবে কবির ভাবশিষ্যা।

zoom
বাল্মীকিপ্রতিভা নৃত্যনাট্য অভিনয়ে ইন্দিরা দেবী ও রবীন্দ্রনাথ

লেখক, অনুবাদক, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ– এসব কিছুর পাশাপাশি সমাজ সংস্কার এবং সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর অবদানও কিছু কম ছিল না। বাংলার নারী জাগরণ আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম নেত্রী। পিতা সত্যেন্দ্রনাথের আদর্শকে অবলম্বন করে তিনি মহিলা শিক্ষা লিগ, সর্বভারতীয় মহিলা সম্মেলন, সঙ্গীত সংঘ প্রভৃতি আরও বিবিধ কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিলেন। শান্তিনিকেতনে চলে আসার পরে তিনি ‘আলাপনী মহিলা সমিতি’ ও তার মুখপত্র ‘ঘরোয়া’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মহিলা কল্যাণে গঠিত ‘অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্স’, ‘হিরন্ময়ী বিধবা আশ্রম’ ইত্যাদি সংগঠনের ইন্দিরা সভানেত্রী ছিলেন।

ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর বিবিধ গুণের মধ্যে রন্ধন বিষয়ে তাঁর আগ্রহ এবং অনুসন্ধিৎসার কথা অনেকেরই হয়তো জানা নেই। এই তথ্যটি আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন পূর্ণিমা ঠাকুর, যিনি সম্পর্কে ইন্দিরা দেবীর দাদা সুরেন ঠাকুরের পুত্রবধূ ছিলেন। বয়সের ফারাক সত্ত্বেও দু’জনের মধ্যে নানা ব্যাপারে মিল ছিল এবং গড়ে উঠেছিল একটা আত্মিক সম্পর্ক। পূর্ণিমার লেখা ‘ঠাকুরবাড়ির রান্না’ গ্রন্থে তিনি জানিয়েছেন, ইন্দিরা নিজে রান্না করতে না-জানলেও যে-কোনও ভালো রান্নার শুধু যে সমঝদার ছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের ভোজনরসিক এবং গুণগ্রাহী। যে-কোনও নিমন্ত্রণ-বাড়ি কিংবা বন্ধুর হাতের রান্না ভালো লাগলে, তিনি সেই রান্নার প্রণালী ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে রন্ধনকারীর কাছ থেকে জেনে নিয়ে একটি খাতায় তা সুন্দর করে লিখে রাখতেন। সেই মূল্যবান খাতাটি পূর্ণিমার ন’মা ইন্দিরা তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ঠাকুরবাড়ির বেশ কিছু হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন রন্ধন প্রণালীও ছিল, যা পূর্ণিমার ‘ঠাকুরবাড়ির রান্না’ গ্রন্থে সংযোজিত হয়েছে।

১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণে তাঁর মানসসঙ্গী ইন্দিরা অত্যন্ত শোকাহত হয়েছিলেন। আজীবন সাহিত্য, সংগীত এবং চিত্রকলা ইত্যাদির ক্ষেত্রে তাঁর অবলম্বন ও প্রেরণার উৎস রবিকা-কে হারিয়ে তিনি শোকে একান্তভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও মনোবলের অধিকারিণী ইন্দিরা নিজেকে সামলে নেন এবং তাঁর রবিকা-র আরব্ধ কাজকে তাঁর জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। এই সময়ে তিনি শান্তিনিকেতনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং আমৃত্যু সেখানে রবীন্দ্র-সংস্কৃতি, রবীন্দ্রস্মৃতি সংরক্ষণ এবং রবীন্দ্রসংগীতের প্রসারে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন। শুধু তাই নয়, এই সময়ে তিনি দীর্ঘদিন শান্তিনিকেতনের সঙ্গীত ভবনে রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষাদান করতেন। আশ্চর্য লাগে, যখন দেখি ইন্দিরা নিজে এক জায়গায় লিখেছেন, ‘আমি রবিকাকার কাছে আলাদা করে বসে কখনো গান শিখেছি বলে মনে পড়ে না। কেবল বাড়িময় হাওয়ায় হাওয়ায় যে গান ভেসে বেড়াত তাই শুনে শুনে শিখেছি।’ ১৯৫৬ সালে ইন্দিরা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৫৭ সালে বিশ্বভারতী তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে।

ইন্দিরার স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনীমূলক রচনার অন্যতম সংকলন ‘স্মৃতিসম্পুট’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে। এই গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে সেই বিশেষ যুগের এক অন্তরঙ্গ দলিল। ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর ব্যতিক্রমী জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে উনিশ ও বিশ শতাব্দীর শিক্ষিত অভিজাত বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতি। রবির আলোয় উজ্জ্বল এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক অনন্য নিজস্ব পরিচিতি। ঠাকুরবাড়ির জীবনধারা, পরিবেশ, ‘রবিকা’র সঙ্গে তাঁর সান্নিধ্য, ফরাসি সাহিত্যপ্রীতি, তাঁর সৃষ্টিশীল গবেষণা, রবীন্দ্রসংগীত ও সাহিত্য সম্বন্ধে অগাধ জ্ঞানের কথা বারবার উঠে এসেছে এই অসাধারণ গ্রন্থে। ইন্দিরার লিখনশৈলীতে রয়েছে এমন এক স্বচ্ছতা ও সারল্য, যা পাঠককে সহজেই আকর্ষিত করে। রবীন্দ্রনাথের মতে, ইন্দিরার ভাষা ছিল ‘সমুজ্জ্বল’।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইন্দিরা তাঁর রবিকা-র সাহিত্য-সংগীতের অনন্ত সায়রে অরূপরতনের খোঁজ করে গিয়েছেন। ১৯৬০ সালের ১২ আগস্ট তাঁর জীবনাবসান হয়। ৮৭ বছর বয়সে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর প্রয়াণে বাংলা সংস্কৃতির এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তবে রবীন্দ্র-সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারক হিসেবে তিনি আজও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

তথ্যসূত্র:

১. ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
২. ছিন্নপত্রে ইন্দিরা দেবী, মনোজিৎকুমার দাস
৩. রবীন্দ্রস্মৃতি, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী

ChinnaPatra Indira Devi Chaudhurani Pramatha Chaudhuri Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar জীবনস্মৃতি রবীন্দ্রস্মৃতি স্মৃতিসম্পুট

Share this article on