Robbar

দিশাহীন নীতিই কি আলু-চাষির মৃত্যু পরোয়ানা?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 20, 2026 7:41 pm
  • Updated:April 20, 2026 7:43 pm  

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আলু সংকট আসলে একটি ‘নীতিগত বিপর্যয়’। আলুর রেকর্ড উৎপাদন যেখানে রাজ্যের সাফল্যের মুকুট হওয়ার কথা ছিল, অদূরদর্শী আন্তঃরাজ্য বাণিজ্যনীতি এবং পরিকাঠামোগত উদাসীনতার কারণে, তা আজ এক ‘মানবিক ট্র্যাজেডি’তে রূপান্তরিত হয়েছে। সিঙ্গুর থেকে চন্দ্রকোনা– সর্বত্রই কৃষকের হাহাকার প্রমাণ করছে যে, কেবল ‘কৃষক বন্ধু’র মতো অনুদান দিয়ে কৃষি সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে এই সংকট এড়াতে হলে, সরকারকে কেবল সাময়িক ভর্তুকি দেওয়ার পথে হাঁটলে চলবে না। প্রয়োজন প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সঙ্গে একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য চুক্তি।

দেবাশিস মিথিয়া

​হুগলি জেলার গোঘাটের অসিত বারুই, প্রতি বছরের মতো এবারও ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে চার বিঘা জমিতে আলু-চাষ করেছিলেন। অনুকূল আবহাওয়ায় আলুর ব্যাপক ফলন হওয়ায় এই প্রবীণ চাষির চোখেমুখে আনন্দের জ্যোতি উপচে পড়ছিল। ভেবেছিলেন, এবার হয়তো গত কয়েক বছরের দেনা মিটিয়ে একটু সুখের মুখ দেখবেন। কিন্তু সেই জ্যোতি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি; বাজারের রূঢ় বাস্তবতায় তা নিমেষেই বিষাদে পরিণত হয়! তিনি যখন আলু বিক্রি করতে গেলেন, তখন তাঁর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ব্যবসায়ীরা জমি থেকে আলু কেনার জন্য এক বস্তা (৫০ কেজি) আলুর দাম দিচ্ছিলেন মাত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকা। এতে আলু চাষের খরচ ওঠা তো দূর অস্ত, মাটির নিচ থেকে আলু তুলে বস্তা ভর্তির খরচটুকুও উঠছে না। অসিতবাবুর হিসেব অনুযায়ী, এক বস্তা আলু মাটির নিচ থেকে তুলে বস্তায় ভরে বড় রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে দিতেই খরচ হয় ৭০ টাকার ওপর। তিনি যে-হিসেব দিলেন তা হল– এক বস্তা আলু তোলার জন্য লাঙলের খরচ ৫ টাকা, মজুরি ৩০ টাকা, বস্তা ২৮ টাকা ও পরিবহন খরচ ৮ টাকা। তাঁর দেওয়া এই হিসেবটি বিশ্লেষণ করলে বর্তমান কৃষি ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাটি ফুটে ওঠে। তিনি আরও জানান, ‘এখন আলু তুললে নতুন করে লোকসান, তাই নিরুপায় হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি– মাঠের আলু মাঠেই পড়ে থাক।’

আলু-চাষে ব্যাপক ক্ষতি, কৃষকদের চেনা দুর্দশা

​অসিত বারুইয়ের এই পরিস্থিতি– আজ বাংলার কয়েক লক্ষ আলু চাষিরও। অতিরিক্ত উৎপাদন যখন আশীর্বাদ হওয়ার বদলে বিপদ ডেকে আনে, তখন তাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘প্যারাডক্স অফ প্লেন্টি’ বা ‘প্রাচুর্যের অভিশাপ’। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আলু চাষিদের অবস্থা ঠিক তেমনটাই হয়েছে। রাজ্যের প্রয়োজনের তুলনায় এ-বছর দ্বিগুণ আলু উৎপাদন হয়েছে, অথচ ভিনরাজ্যে অতিরিক্ত আলু পাঠানোর উপায় নেই। ফলে বাজারের ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই সঙ্গিন যে, আলু ফলাতে বিঘা প্রতি যা খরচ হয়েছে, ফসল বিক্রি করে তার এক-তৃতীয়াংশও উঠছে না। অন্যদিকে, হিমঘরের অপ্রতুলতায় চাষি আলু হিমঘরে রাখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলত, হাড়ভাঙা খাটুনি আর চড়া সুদে নেওয়া ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বহু চাষি আজ ফসল মাঠেই ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। কী মর্মান্তিক এক বৈপরীত্য! আলুর এই অতিরিক্ত ফলন আনন্দের বদলে চাষির চোখে জল এনেছে।

​২০২৬ সালের মার্চ মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে রাজ্যে অন্তত পাঁচটি আত্মহত্যার খবর মিলেছে, যার নেপথ্যে আলুর দামের অস্বাভাবিক পতন এবং ঋণের চাপই প্রধান কারণ। মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা ব্লকের রাখাল আরি নামে এক ২৮ বছর বয়সি চাষি স্ত্রীর গয়না বন্ধক রেখে ১.৪ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ফসলের দাম না-পাওয়ায় এবং ঋণের চাপ সহ্য করতে না-পেরে তিনি বিষপান করেন! হুগলির গোঘাটের সহদেব পাল এবং কালনার শৈলেন ঘোষের করুণ মৃত্যুও গ্রামীণ অর্থনীতির এই ভগ্নদশার ছবি তুলে ধরে।

সরকারের দিশাহীন নীতিই কি ডেকে আনছে বিপদ?

​পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড কৃষি, আর সেই কৃষির অন্যতম স্তম্ভ আলু-চাষ। ভারতজুড়ে আলু উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থানে, যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশ! ২০২৫-’২৬ মরসুমে পশ্চিমবঙ্গের আলু উৎপাদন গত ১০ বছরের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ শীতকাল এবং আলু চাষের চূড়ান্ত পর্যায়ে বৃষ্টিহীন পরিষ্কার আকাশ এই ‘অতিরিক্ত ফলন’-এর প্রধান কারণ। রাজ্যের দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলো, বিশেষ করে হুগলি, বর্ধমান এবং পশ্চিম মেদিনীপুর– এই বিশাল উৎপাদনে সিংহভাগ অবদান রেখেছে। কিন্তু এই অতি-উৎপাদনই বাজারের প্রচলিত চাহিদাকে ছাপিয়ে গিয়ে এক নেতিবাচক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ আলুর চাহিদা বছরে মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ লক্ষ মেট্রিক টন। অথচ, এ-বছর উৎপাদন প্রায় ১৪০-১৫০ লক্ষ মেট্রিক টনে পৌঁছে গিয়েছে। এর ফলে রাজ্যে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ লক্ষ মেট্রিক টন আলু উদ্বৃত্ত। উদ্বৃত্ত আলুর সঠিক সংরক্ষণ কিংবা অন্য রাজ্যে চালানই পারত বাজারকে স্থিতিশীল করতে; কিন্তু পর্যাপ্ত হিমঘরের অভাব এবং আন্তঃরাজ্য বাণিজ্যের আইনি বেড়াজালে সেই সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

​পশ্চিমবঙ্গে আলু সংরক্ষণের পরিকাঠামো মূলত ব্রিটিশ আমলের, ফলে বেশিরভাগই সেকেলে রয়ে গিয়েছে। রাজ্যে বর্তমানে ৫৮০টি হিমঘর থাকলেও, সেগুলোর আলু ধারণ-ক্ষমতা মাত্র ৭৫ থেকে ৮০ লক্ষ মেট্রিক টন। তাই এ-বছর, প্রায় ৭০ লক্ষ টন আলু সংরক্ষণের কোনও জায়গাই নেই। পর্যাপ্ত হিমঘরের অভাব, তার ওপরে বন্ড নিয়ে কালোবাজারি– ক্ষুদ্র-চাষিদের অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গের আলু বাণিজ্যে ‘আলু বন্ড’ এক বিচিত্র প্রথা। হিমঘরে আলু রাখার জন্য যে আগাম বুকিং বা রসিদ দেওয়া হয়, তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় এক শক্তিশালী ফাটকা বাজার। অনেক ক্ষেত্রে আলু-চাষ হওয়ার আগেই বড় বড় ব্যবসায়ী ও হিমঘর মালিকরা এই বন্ডের সিংহভাগ নিজেদের কবজায় নিয়ে নেন। ফলে ক্ষুদ্র-চাষিরা সরাসরি জায়গা না-পেয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে নামমাত্র দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হন। যখন আলুর দাম বাড়ে, তখন এই বন্ডের হাতবদল হয়ে লভ্যাংশ চলে যায় ফোড়েদের পকেটে, অথচ চাষি রয়ে যান সেই তিমিরেই।

আধুনিক ‘কোল্ড চেইন’ বা ‘প্রসেসিং ইউনিট’ থাকলে এই শোষণ থেকে কৃষকদের রক্ষা করা সম্ভব হত। চাষিদের সরাসরি মান্ডি বা হিমঘরের গেটে পৌঁছনোর ক্ষমতা না-থাকায় তাঁরা গ্রাম স্তরের ফোড়েদের কাছে ফসল তুলে দিতে বাধ্য হন। পরিসংখ্যান বলছে, কলকাতার খুচরো বাজারে আলু যখন ১৮-২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, তখন চাষি পাচ্ছেন মাত্র ৪-৫ টাকা! এই বিশাল ব্যবধান ফোড়েদের পকেটে যায়, যেখানে চাষি বা উপভোক্তা– কারও-ই কোনও লাভ হয় না।

লাভহীন আলু-চাষ, চাষিদের গলার কাঁটা

​এ-বছর আলু তোলার শুরুতে আলুর দাম বস্তা প্রতি ৬০-৭০ টাকা থাকলেও, পরে আলু-চাষহীন জেলাগুলো থেকে ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বাড়ায় দাম সামান্য বেড়ে কুইন্টাল প্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় পৌঁছয়। কিন্তু এই দামও চাষির উৎপাদন খরচের ধারেকাছে নেই! আলুর দাম এই তলানিতে ঠেকার অন্যতম কারণ, সরকারের অদূরদর্শী বিপণন নীতি। বিশেষ করে, যখনই ঘরের বাজারে আলুর দাম সামান্য বাড়ে, সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে না-পেরে তড়িঘড়ি ভিনরাজ্যে আলু পাঠানো বন্ধ করে দেয়।

​এই অস্থিরতা প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে বড়সড় ফাটল ধরিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মোট আলু উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রথাগতভাবে ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বিহার এবং অসমে পাঠানো হত। কিন্তু গত দুই বছর ধরে আন্তঃরাজ্য বাণিজ্যে হঠাৎ হঠাৎ বিধিনিষেধের ফলে এই রাজ্যগুলো পশ্চিমবঙ্গের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প হিসেবে উত্তরপ্রদেশ ও পঞ্জাবকে বেছে নিয়েছে। ওড়িশার মন্ত্রী কৃষ্ণচন্দ্র পাত্র এই সিদ্ধান্তকে ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরির প্রচেষ্টা বলে সমালোচনা করেছেন। ওড়িশা সরকার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা অন্যান্য সবজি ও পণ্যবাহী ট্রাক আটকে দেয়, যার ফলে এক ধরনের ‘আন্তঃরাজ্য বাণিজ্যিক যুদ্ধ’ শুরু হয়। একবার বাজার অন্য রাজ্যের দখলে চলে গেলে সেখানে পুনরায় প্রবেশ করা অত্যন্ত কঠিন।

​এই বাণিজ্যিক তিক্ততার জেরে এ-বছর ভিনরাজ্যে উদ্বৃত্ত আলু বিক্রির পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সরকারের এই হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে পর্যাপ্ত আন্তঃরাজ্য ক্রেতা না-থাকায় মাঠ পর্যায়ে আলুর দাম আজ তলানিতে; যার গাণিতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে, একজন চাষি প্রতি বিঘায় প্রায় ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা লোকসান করছেন। আলু চাষ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং মূলধননির্ভর প্রক্রিয়া। প্রান্তিক চাষিরা সমবায় ব্যাঙ্ক বা স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে যে ঋণ নেন, আলুর দাম কমে যাওয়ায় তাঁরা তার সুদের টাকা দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন! তবে এই অস্থিরতা নতুন নয়; অতীতে যখনই উৎপাদন বেড়েছে, সরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বা ‘প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি’ তৈরির পরিবর্তে সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করে দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে চাষিদের আর্থিক ভিত দুর্বল করে দিয়েছে।

‘কোল্ড স্টোরেজ’-এ জমছে আলু, অথচ ভাগ্য বদলাচ্ছে না আলু চাষির

​২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গের আলু সংকট একটি প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাসক দল যখন ‘কৃষক বন্ধু’ ও ‘সুফল বাংলা’র মাধ্যমে কৃষকদের পাশে থাকার বার্তা দিচ্ছে, তখন বিরোধী দলগুলো সরকারি ব্যর্থতা ও চাষিদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এই রাজনৈতিক তরজার মধ্যেই রাজ্য সরকার চাষিদের মন পেতে ৯ টাকা ৫০ পয়সা প্রতি কেজি (বা ৪৭৫ টাকা প্রতি বস্তা) দরে আলু কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার আলুর ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করলেও তা পেতে চাষিদের চরম আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

​এই আলু কেনার যে প্রক্রিয়া, তার অন্দরে উঁকি দিলেই স্পষ্ট হয়, কেন সরকারের এই ঘোষিত দাম প্রকৃত চাষির হাতে পৌঁছচ্ছে না।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে মুখ্যসচিবের উপস্থিতিতে আলু কেনা সংক্রান্ত এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। সেখানে কোনও সুনির্দিষ্ট রফাসূত্র মেলেনি। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ১৬ মার্চ ব্লক স্তরে যখন বিডিও, এসডিও ও পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের নিয়ে সভা হল, তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ জায়গা সংরক্ষিত থাকবে। এরমধ্যে প্রথম দফায় ১০ শতাংশ আলু সরকারি নির্ধারিত মূল্যে কেনা হবে। এই অর্থ মেটানোর জন্য হিমঘর মালিকদের সমবায় ব্যাংক থেকে ঋণের আবেদন করতে বলা হয়। লোন অনুমোদিত হলেও ৩১ মার্চ পর্যন্ত কোনও স্টোর মালিক সেই টাকা গ্রহণ করেননি। সরকার সময়সীমা আরও সাতদিন বাড়ালেও পরিস্থিতির কোনও বদল ঘটেনি। হিমঘর মালিকদের মূল আশঙ্কার জায়গা হল– ভবিষ্যতে এই আলু বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকা ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার পর যদি ঘাটতি থাকে, তবে তার দায় সরকার নেবে কি না, সেই বিষয়ে কোনও স্পষ্ট প্রশাসনিক গ্যারান্টি নেই। এই অবিশ্বাসের ‘সিঁদুরে মেঘ’ দেখেই স্টোর মালিকরা হাত গুটিয়ে বসে আছেন।

সরকারি জাঁতাকলে আটকে আলু-চাষের ভবিষ্যৎ

​১৬ মার্চের পর কৃষকদের টোকেন দিয়ে হিমঘরে আলু নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও, কিন্তু সেখানে আলুর গুণমান পরীক্ষার জন্য কোনও সরকারি আধিকারিককে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। সরকারের শর্ত অনুযায়ী, সরকারি দরে কেনা আলু হতে হবে নির্দিষ্ট আকারের ও ‘সুপার গ্রেড’-এর। অথচ অসহায় চাষিরা যখন তাঁদের উৎপাদিত সাধারণ মানের আলু নিয়ে হিমঘরে হাজির হলেন, হিমঘর মালিকরা সেই গুণমানের দায় নিতে অস্বীকার করলেন। তপ্ত রোদে হিমঘরের বাইরে আলুর বস্তা পড়ে থাকতে দেখেও স্থানীয় প্রশাসনের কোনও হেলদোল ছিল না। শেষ পর্যন্ত ওপরমহলের চাপে সেই ‘ইনফিরিয়র কোয়ালিটি’র আলুই হিমঘরে জায়গা পেল বটে, কিন্তু চাষিরা তাঁদের আলুর বিনিময়ে কোনও টাকা পেলেন না। হিমঘর মালিকদের দাবি– সরকার তাঁদের আর্থিক গ্যারান্টির শর্ত মেনে না-নিলে তাঁরা কৃষকদের বকেয়া টাকা মেটাবেন না, প্রয়োজনে বন্ড-সহ আলু ফেরত দিয়ে দেবেন। ফলে গোটা প্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রকৃত সাহায্যের পরিবর্তে ‘ভোট রাজনীতির’ গন্ধ পাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ। রাজনীতির এই জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া চাষিদের এখন একমাত্র দাবি– এমএসপি-র আইনি স্বীকৃতি, যা উৎপাদন খরচের অন্তত দেড়গুণ আয় নিশ্চিত করবে।

​চাষির এই ব্যক্তিগত লোকসান আসলে পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্রামীণ এলাকার ‘কার্যকর চাহিদা’ (Effective Demand) মূলত কৃষি আয়ের ওপর নির্ভরশীল। যখন আলু চাষিরা বিঘা প্রতি ১৫-২০ হাজার টাকা লোকসান করেন, তখন বাজার থেকে তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে যায়। এর ফলে গ্রামীণ বাজারে জামাকাপড়, ইলেকট্রনিক্স বা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা এক ধাক্কায় কমে যায়।

​এছাড়া, এই বিপুল লোকসানের ফলে কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ না-পেয়ে চাষিরা যখন চড়া সুদে মহাজনদের দ্বারস্থ হচ্ছেন, তখন তাঁরা কার্যত একটি ‘ঋণের ফাঁদে’ (Debt Trap) জড়িয়ে পড়ছেন। এর সুদূরপ্রসারী ফল হল– আগামী মরসুমে মূলধনের অভাব, যা শেষ পর্যন্ত উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে এবং ভবিষ্যতে জোগানে টান ফেলে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি (Food Inflation) সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ, আজকের ‘প্রাচুর্যের অভিশাপ’ আগামিদিনের ‘দুর্ভিক্ষের বীজ’ বুনে দিচ্ছে।

দুর্ভিক্ষের বীজ না কি প্রাচুর্যের অভিশাপ?

​তবে এই সংকটের সমাধান শুধু সরকারি হস্তক্ষেপ বা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিলে মিলবে না; প্রয়োজন চাষি ও সরকার– উভয়পক্ষের সদিচ্ছা ও সচেতনতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সরকারি ভাতা বা সাময়িক অনুদান কৃষকদের স্থায়ী মুক্তি দিতে পারে না, বরং অনেকক্ষেত্রে তা তাঁদের বিকল্প চাষাবাদ বা উদ্ভাবনী উদ্যোগের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এই অচলাবস্থা কাটাতে কৃষকদের সংঘবদ্ধ হতে হবে। ‘ফার্মার প্রোডিউসার অর্গানাইজেশন’ (FPO) বা ‘ফার্মার প্রোডিউসার কোম্পানি’ (FPC) গঠনের মাধ্যমে চাষিরা যদি সরাসরি বাজারের সাথে যুক্ত হতে পারেন, তাহলেই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো যাবে। পাশাপাশি, প্রথাগত আলুর বদলে বিকল্প চাষাবাদ এবং নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের বাণিজ্যিক দক্ষতা বৃদ্ধিই হতে পারে এই দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ফাঁদ থেকে বেরনোর বাস্তবসম্মত পথ। একইসঙ্গে, প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকাঠামো নির্মাণ, যা পশ্চিমবঙ্গের আলুর সংকটের স্থায়ী উত্তরণ ঘটাতে সহায়ক হবে। সেই কাজে তিনটি প্রধান জিনিসের ওপর জোর দেওয়া জরুরি: প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ, পরিকাঠামো আধুনিকীকরণ এবং আলুর জাত বৈচিত্র।

​প্রথমত, উৎপাদিত আলুর একটা বড় অংশ যদি স্টার্চ বা পাউডারে রূপান্তরিত করা যায়, তবে তা ওষুধ, বস্ত্র এবং কাগজ শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। একটি ‘স্টার্চ ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট’ স্থাপন করলে তার আনুমানিক আইআরআর (IRR) প্রায় ১৯ শতাংশ এবং ৭ বছরের মধ্যে মূলধন ফেরত পাওয়া সম্ভব। এছাড়া আলুর বর্জ্য থেকে ইথানল উৎপাদনও সম্ভব।

​দ্বিতীয়ত, হিমঘরগুলোকে ‘মাল্টি-পারপাস কোল্ড চেইন’-এ রূপান্তর করতে হবে, যাতে সারা বছর অন্যান্য সবজি ও ফল সংরক্ষণ করা যায়। এই পরিকাঠামো উন্নয়ন চাষিকে ফসল বৈচিত্রের (Crop Diversification) সাহস জোগাবে। এর ফলে চাষি কেবল আলুর ওপর বাজি না লড়ে, সারা বছর অন্যান্য দামি সবজি সংরক্ষণ করে অভাবী বিক্রির (Distress Sale) অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবেন।

​তৃতীয়ত, চাষিদের কেবল ‘জ্যোতি’ বা ‘চন্দ্রমুখী’র আলু চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না-রেখে প্রক্রিয়াজাতকরণ উপযোগী ‘আটলান্টিক’ বা ‘এফসি-৫’ এর মতো আলু চাষে উৎসাহিত করতে হবে।

হুগলি জেলা আলুর প্রাণকেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও সেখানে বড় কোনও কৃষি-ভিত্তিক শিল্প গড়ে না-ওঠাই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। সিঙ্গুর বা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যদি আলুর স্টার্চ বা চিপস তৈরির কারখানা গড়ে উঠত, তবে চাষিদের প্রতিবেশী রাজ্যের মুখাপেক্ষী হতে হত না।

পশ্চিমবঙ্গের আলু চাষ যখন সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন উত্তরপ্রদেশ এবং পঞ্জাবের নীতিগুলো অনেক বেশি আধুনিক ও ব্যবসায়িক সুদূরপ্রসারী বলে প্রতীয়মান হয়। উত্তরপ্রদেশ সরকার ২০২৩ সালের ‘ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি পলিসি’র মাধ্যমে হিমঘরগুলোকে মাল্টি-কমোডিটি কোল্ড স্টোরেজে রূপান্তর করার জন্য ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত মূলধন ভর্তুকি প্রদান করছে। অন্যদিকে, পঞ্জাব নিজেদের ভারতের ‘বীজ আলুর আধার’ (Seed Bowl) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মহারাষ্ট্রের নাসিক বা লাসালগাঁও অঞ্চলের পেঁয়াজ চাষিরা যে সংকটের মুখোমুখি হন, তার সঙ্গেও পশ্চিমবঙ্গের এই সংকটের গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। মহারাষ্ট্রের এই সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের ‘প্রাইস স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’ (PSF) একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করে, যা বাজারে দামের স্থায়িত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করে। পশ্চিমবঙ্গের জন্য এই ধরনের স্থায়ী ফান্ডের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। ‘অপারেশন গ্রিনস’-এর মতো প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দের হতাশাজনক হার প্রমাণ করে যে, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

মাত্রাতিরিক্ত ফলনই অশনিসংকেত?

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আলু সংকট আসলে একটি ‘নীতিগত বিপর্যয়’। আলুর রেকর্ড উৎপাদন যেখানে রাজ্যের সাফল্যের মুকুট হওয়ার কথা ছিল, অদূরদর্শী আন্তঃরাজ্য বাণিজ্যনীতি এবং পরিকাঠামোগত উদাসীনতার কারণে, তা আজ এক ‘মানবিক ট্র্যাজেডি’তে রূপান্তরিত হয়েছে। সিঙ্গুর থেকে চন্দ্রকোনা– সর্বত্রই কৃষকের হাহাকার প্রমাণ করছে যে, কেবল ‘কৃষক বন্ধু’র মতো অনুদান দিয়ে কৃষি সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে এই সংকট এড়াতে হলে, সরকারকে কেবল সাময়িক ভর্তুকি দেওয়ার পথে হাঁটলে চলবে না। প্রয়োজন প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সঙ্গে একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য চুক্তি, যাতে রাজনৈতিক ইগোর লড়াইয়ে চাষির কপাল না-পোড়ে। পাশাপাশি, পঞ্জাবের উন্নত বীজ নীতি এবং মহারাষ্ট্রের ‘মূল্য স্থিতিশীলতা ফান্ড’-এর মতো সফল মডেলগুলো বাংলায় প্রয়োগ করা, এখন সময়ের দাবি।

​মাটির তলার ‘সাদা সোনা’ যেন চাষির গলার ফাঁস না হয়ে ওঠে, সেই দায়বদ্ধতা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়কেই নিতে হবে। আধুনিক কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং স্বচ্ছ বিপণন ব্যবস্থাপনাই পারে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতিকে এই করুণ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে। অন্যথায়, যে বছর আলুর অতিরিক্ত ফলন হবে, সেই বছর আলু চাষিদের আত্মহত্যার মিছিল চলতেই থাকবে।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন দেবাশিস মিথিয়া-র অন্যান্য লেখা

………………………