


সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ‘এল নিনো’র শক্তি নয়, বরং এটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন পৃথিবী ইতোমধ্যেই রেকর্ড মাত্রার উষ্ণতার মধ্যে রয়েছে। ২০২৭ সালকে ইতিহাসের উষ্ণতম বছরগুলোর অন্যতম হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক ঋণসংকট, যুদ্ধজনিত জ্বালানি ও সার সরবরাহের সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় বহু দরিদ্র দেশ আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচতে রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে বসেছিলাম। কয়লার উনুনের গরমে অতিষ্ট হয়ে কিছু পরেই উঠলাম, কিন্তু কোনও রকমে ঘুরতে থাকা ফ্যানের হালকা হওয়ার সামান্য শান্তিটা ছেড়ে প্রখর রোদে বেরতে সাহস পেলাম না। বাঙালি হয়ে গরমে চা না খাওয়াটা অন্যায় মনে করে, এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে একটু ছড়িয়ে বসেছি, অমনি একজন এই গরমের মধ্যে টিভি চালিয়ে বসল। হাইলাইটে ‘এল নিনো’র খবর দেখে বলল, ‘এই এক হয়েছে, কী একটা এল লিলো না কি ছাতার মাথা, বলছে বৃষ্টি হবে না, চাষ নষ্ট হবে, খেতে পাবে না মানুষ। তা এমনিই তো মানুষ পাচ্ছে না খেতে, চাষ হয়েই বা কী হচ্ছে, টাকা তো ঘরে আসার আগেই শেষ হয়ে যায়, এত দেনা! দূর যতসব ফালতু খবর!’ বলে দুম করে বন্ধও করে দিল টিভি। একটু বসে থাকার পরেই– ‘উফ কী গরম, একটু কি বৃষ্টি হবে না ভগবান!’ বলে আমার দিকে তাকাল। আমি বুঝলাম এবারে আমার উদ্দেশে কিছু প্রশ্ন আসতে চলেছে। যা ভাবলাম তাই, পরপর কতগুলো প্রশ্ন আমার দিকে ছুটে এল দুমদাম করে। এত ভালো কিছু প্রশ্ন এল যে, উত্তর না দিয়ে পারলাম না। চায়ের আড্ডাটা জমে উঠল।
‘আচ্ছা, দাদা আমাকে বলতে পারেন, এই এল নিনো কী? কী হয় এল নিনো হলে? সত্যিই কি এরকম কিছু হবে? আমাদের তো আর বাঁচার উপায় থাকবে না এরকম হলে। এমনিতেই তো সব দিক থেকে দেউলিয়া হয়ে উঠেছি!’ আমি কিছুক্ষণ ভেবে সহজ করে বললাম, জল গরম হয়ে গেলে যেমন আমাদের খুব সমস্যা হয়, সেরকমই পৃথিবীতে সমুদ্রগুলো গরম হয়ে গেলে আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়। তবে ভয় পাওয়ার কিছু হয়নি এখনই, ‘এল নিনো’ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, এর আগেও হয়েছে বহুবার।

এবারের ‘এল নিনো’ নিয়ে এত চিন্তার কারণ হল– ১৮৫০ সালের পর এত বড় করে এল নিনোর সম্ভাবনা কখনওই তৈরি হয়নি। খবরে যেমন বলল, অতটাও ভয় পাওয়ার এখনই কিছু হয়নি, তবে সতর্ক থাকতে তো ক্ষতি নেই, তাই আমাদের সব কিছু জানা এবং সেই অনুযায়ী সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এই বলে আমি উঠলাম। লোকটার মুখে একটু স্বস্তির ছায়া দেখলেও বুঝলাম, এখনও বেশ কিছু প্রশ্ন ওর মাথায় ঘুরছে, যার উত্তর আমার কাছে এখন থাকলেও হাতে সময় নেই।
সেদিনের কথাটা মাথায় ঘুরছিল ক’দিন ধরেই, অনেক খবরের ভিড়ে মানুষ কোনটাকে বিশ্বাস করবে, এই বিড়ম্বনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। চলুন এই প্রতিবেদনে কিছুটা সহজ করে পৃথিবীর বিজ্ঞানীমহলে কী ঘটছে, তা আলোচনা করি।
বিশ্ব জলবায়ু সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের শেষভাগে বিশ্বের সামনে দেখা দিতে পারে এক বিরল ও সম্ভাব্য শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’। যদিও ‘সুপার এল নিনো’ কথাটার আন্তর্জাতিক কোনও স্বীকৃতি দিতে তারা রাজি নয়, কারণ আন্তর্জাতিকভাবে ‘এল নিনো’র শক্তি সাধারণত দুর্বল, মাঝারি, শক্তিশালী এবং অতি শক্তিশালী– এই চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ুগত সূচক এমনভাবে একসঙ্গে সক্রিয় হচ্ছে, যা ১৮৭৭-’৭৮ সালের ঐতিহাসিক ‘সুপার এল নিনো’র সঙ্গে বিস্ময়কর মিল তৈরি করছে। যদিও এই পরিস্থিতি এখনও নিশ্চিত নয়, তবে বর্তমান পূর্বাভাস বিশ্ব কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বীজ শিল্পের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা বহন করছে। জলবায়ু বিশ্লেষক শন হ্যাকেটের মতে, ইতিহাসের হুবহু পুনরাবৃত্তি না হলেও প্রায়ই একই ধরনের ছন্দ অনুসরণ করে। অতীতের জলবায়ুগত ঘটনাগুলি বিশ্লেষণ করলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আবহাওয়া, কৃষি উৎপাদন, খাদ্যদ্রব্যের মূল্য, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, যখন নিরক্ষীয় মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কমপক্ষে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকে, তখন তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়। ১৮৫০ সালের পর এ-ধরনের মাত্র ছ’টি ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন পূর্বাভাস মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ২০২৬ সালের শেষের দিকে সমুদ্রের তাপমাত্রা সেই সীমায় পৌঁছতে পারে। ১৮৭৭-’৭৮ সালের ‘সুপার এল নিনো’কে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জলবায়ুগত বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ সেই সময় এশিয়ার বহু অঞ্চলে শতাব্দীর অন্যতম মারাত্মক খরা হয়েছিল। ভারত, চিন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং ইতিহাসের অন্যতম বড় দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তী পাঁচটি ‘সুপার এল নিনো’ ঘটলেও ১৮৭৭-’৭৮ সালের মতো বিস্তৃত ও তীব্র খরা আর দেখা যায়নি সেভাবে। গবেষকদের মতে, সেই ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল (Indian Ocean Dipole বা IOD)-এর অস্বাভাবিক অবস্থা। সাধারণত শক্তিশালী ‘এল নিনো’র সময় ইতিবাচক ‘IOD’ পশ্চিম ভারত মহাসাগরে বেশি আর্দ্রতা তৈরি করে, যা ভারতের মতো অঞ্চলে খরার প্রভাব কিছুটা কমায়। কিন্তু ১৮৭৭-’৭৮ সালে ‘IOD’ ছিল নিরপেক্ষ থেকে ঋণাত্মক অবস্থায়, ফলে গোটা এশিয়া-জুড়ে খরা আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে। উদ্বেগের বিষয় হল, বর্তমানে ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোলও ঋণাত্মক পর্যায়ে রয়েছে এবং অন্তত গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত এই অবস্থা বজায় থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ১৮৭৭-’৭৮ সালের সুপার এল নিনোতে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জলরাশি প্রায় ছয় মাস ধরে স্থায়ী ছিল। অথচ পরবর্তী সব ‘সুপার এল নিনো’তে এই সময়কাল সাধারণত এক থেকে দুই মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে সেই সময় খরা ও তাপপ্রবাহ অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। ২০২৬ সালেও এমন দীর্ঘস্থায়ী পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে বিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। এছাড়াও গবেষকেরা আরও কয়েকটি সতর্কবার্তা চিহ্নিত করেছেন, আরব উপদ্বীপ থেকে উৎপন্ন ধূলিকণার ঘনত্ব এশিয়ার মৌসুমী বায়ুকে দুর্বল করার ক্ষমতা তৈরি করছে, একইসঙ্গে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম স্বাভাবিকের তুলনায় আগেভাগে এবং অধিক সক্রিয়ভাবে চলাচল শুরু করেছে। এর ফলে এশিয়ায় বর্ষাকালে আর্দ্রতার প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে এবং বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই সব জলবায়ুগত উপাদান একইসঙ্গে সক্রিয় থাকে, তাহলে ভারত-সহ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তীব্র খরা দেখা দিতে পারে, যার তীব্রতা ১৮৭৭ সালের ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে। তবে এটি এখনও একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি; নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।

এর প্রভাব শুধু এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মধ্য ও উত্তর ব্রাজিলেও দীর্ঘস্থায়ী খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে, যা বিশ্বের অন্যতম প্রধান সয়াবিন ও ভুট্টা উৎপাদন অঞ্চল। একইসঙ্গে ধান, ভুট্টা, সয়াবিন, আখ এবং পাম তেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে ব্যাপক। অন্যদিকে, উত্তর আমেরিকায় তুলনামূলকভাবে অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সেখানে কৃষি উৎপাদন ভালো হলে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং কৃষকেরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বীজ শিল্প, কৃষি উপকরণ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং কৃষকদের এখন থেকেই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। কারণ আগামী এক বছরে জলবায়ুগত পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা কৃষি অর্থনীতিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও দিয়েছেন। বর্তমানে ২০২৬ সালের সম্ভাব্য ‘সুপার এল নিনো’ নিয়ে আলোচনা হলেও, এটি ১৮৭৭-’৭৮ সালের মতোই হবে, এমন কোনও নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও নেই। বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল দেখালেও, এর প্রকৃত তীব্রতা নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসে সমুদ্রের তাপমাত্রা, ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল (IOD), মৌসুমী বায়ু এবং অন্যান্য জলবায়ুগত উপাদানের বিকাশের ওপর।
ভারত যেহেতু তিনটি বিশাল জলরাশি দিয়ে বেষ্টিত, তাই তার নিজস্ব একটা বিপদ মোকাবিলা করার পদ্ধতি আছে, যার নাম ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল, ভারতীয় জলবায়ুতে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল (IOD)। এখন বড় প্রশ্ন হল– এই ‘ডাইপোল’ কী? এর গুরুত্বই বা কী? ‘এল নিনো’র সঙ্গে এর সম্পর্ক কেমন? ধাপে ধাপে সেই সব প্রশ্নের জট ছাড়ানো যাক।

১৯৯৯ সাল নাগাদ ভারতীয় জলবায়ু বিভাগ প্রথম এই অসঙ্গতির চিহ্ন খুঁজে পান। এটি আসলে এনসো-র (ENSO) এর মতোই, ভারত মহাসাগরের পশ্চিম ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পার্থক্যের ওপর এর প্রভাব নির্ভর করে। পরবর্তীকালে নাসার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘IOD’-কে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়, ধনাত্মক (Positive), ঋণাত্মক (Negative) এবং নিরপেক্ষ (Neutral)। ‘ধনাত্মক IOD’-এর সময় আফ্রিকার উপকূলবর্তী পশ্চিম ভারত মহাসাগরের জল তুলনামূলক বেশি উষ্ণ থাকে এবং ইন্দোনেশিয়ার নিকটবর্তী পূর্ব অংশের জল অপেক্ষাকৃত শীতল হয়ে পড়ে। এর ফলে ভারতমুখী আর্দ্রতার প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়। অন্যদিকে ‘ঋণাত্মক IOD’-এ পরিস্থিতি উল্টো হয় এবং ভারতের বর্ষার জন্য অনুকূল পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, ডাইপোল শুধু ‘এল নিনো’ নয়, ভারতীয় মৌসুমী বায়ুর চলনকেও প্রভাবিত করে। এছাড়া ‘ধনাত্মক IOD’ পূর্ব আফ্রিকায় অতিবৃষ্টি এবং অস্ট্রেলিয়ায় শুষ্ক আবহাওয়ার সৃষ্টি করতে পারে। কিছু উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
‘এল নিনো’র প্রভাব কি IOD কমাতে পারে? হ্যাঁ, পারে। বর্তমানে ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল নিরপেক্ষ অবস্থায় রয়েছে। তবে জাপান আবহাওয়া সংস্থা (JMA) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, চলতি বছরের শেষভাগে এটি ধনাত্মক পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। তবে জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন কখন ঘটবে এবং কতটা শক্তিশালী হবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ‘IOD’ যদি সময়মতো শক্তিশালী ধনাত্মক পর্যায়ে প্রবেশ করে, তাহলে তা ভারতের বর্ষার ওপর ‘এল নিনো’র বিরূপ প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ১৯৯৭ সাল। ওই বছর ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ‘এল নিনো’ সত্ত্বেও একই সময়ে একটি শক্তিশালী ‘ধনাত্মক IOD’ গড়ে ওঠায় ভারতের বর্ষায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যায়নি। অর্থাৎ, ভারত মহাসাগরের অনুকূল অবস্থা ‘এল নিনো’র বিরূপ প্রভাবকে অনেকাংশে প্রশমিত করেছিল।

আগামিদিনে কী হতে পারে? আবহাওয়াবিদদের মতে, ‘ধনাত্মক IOD’ গঠনের সম্ভাবনা কিছুটা আশার আলো দেখালও, এটিকে স্বাভাবিক বর্ষার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা একেবারেই উচিত নয়। কারণ, ‘IOD’-এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে এর সৃষ্টির সময়, স্থায়িত্ব এবং শক্তির ওপর। একইসঙ্গে ‘এল নিনো’র তীব্রতা এবং দুই জলবায়ুগত ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত ভারতের বৃষ্টিপাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এই কারণে আগামী কয়েক মাসের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় আবহাওয়া দফতর, জাপান আবহাওয়া সংস্থা এবং বিশ্বের অন্যান্য জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এল নিনো’ ও ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল– উভয় ব্যবস্থাকেই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই জলবায়ুগত ব্যবস্থার পারস্পরিক ক্রিয়াই নির্ধারণ করবে– ২০২৬ সালের বর্ষা কতটা স্বাভাবিক হবে এবং দেশের কৃষি ও জলসম্পদের ওপর তার প্রভাব কতটা গভীর হবে।
ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD)-এর জুন, ২০২৬ সালের ‘ENSO’ ও ‘Indian Ocean Dipole’ (IOD) বুলেটিন অনুযায়ী, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে ‘এল নিনো’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং চলতি দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বৃষ্টির মরশুমে এটি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বায়ুমণ্ডলও ইতিমধ্যে ‘এল নিনো’র অনুকূল প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে, ফলে সমুদ্র-বায়ুমণ্ডলীয় যুগ্ম ব্যবস্থা এখন সম্পূর্ণরূপে ‘এল নিনো’ অবস্থায় প্রবেশ করেছে। বুলেটিনে জানানো হয়েছে, মে, ২০২৬-এ নিরক্ষীয় মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে সমুদ্রের ভূ-পৃষ্ঠের নিচেও শক্তিশালী উষ্ণ জলের স্তর তৈরি হয়েছে, যা আগামী কয়েক মাসে ‘এল নিনো’র তীব্রতা বৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক হতে পারে।

‘Monsoon Mission Coupled Forecast System’ (MMCFS)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্ষাকালে মাঝারি থেকে শক্তিশালী ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি বিরাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল (IOD) বর্তমানে নিরপেক্ষ অবস্থায় রয়েছে এবং বর্ষার শেষ পর্যন্ত এই পরিস্থিতি বজায় থাকার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে ‘Positive IOD’ গড়ে উঠে ‘এল নিনো’র বিরূপ প্রভাব প্রশমিত করার সম্ভাবনা আপাতত কম বলেই মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘এল নিনো’র ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং ‘নিরপেক্ষ IOD’-এর সমন্বয় ভারতের মৌসুমী বৃষ্টিপাতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর নজর রেখে ভারতীয় আবহাওয়া দফতর আগামী মাসগুলিতে ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ পূর্বাভাস প্রকাশ করবে বলেও জানিয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘বিজ্ঞান স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই প্রায় ৯০ শতাংশ নিশ্চিতভাবে এল নিনো ফিরে আসছে। এটিকে একটি গুরুতর বৈশ্বিক জলবায়ু সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের আগুনে এটি আরও জ্বালানি যোগ করবে। এর প্রভাব হবে আরও তীব্র, আরও বিস্তৃত এবং সীমান্ত অতিক্রম করে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। জীবাশ্ম-জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং সর্বজনীন আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই একমাত্র কার্যকর সমাধান।’ এছাড়াও ‘WMO’-এর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, “আমাদের সম্ভাব্য একটি শক্তিশালী এল নিনোর জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। এটি খরা, অতিবৃষ্টি, স্থলভাগ ও সমুদ্রে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। ২০২৩-’২৪ সালের এল নিনো ছিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এবং ২০২৪ সালের রেকর্ড বৈশ্বিক উষ্ণতার নেপথ্যেও এর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।” তিনি আরও জানান, আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, যাতে সরকার, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলি আগাম সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মৌসুমি পূর্বাভাস এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৭২-’৭৩ সালের ‘এল নিনো’ পেরুর উপকূলে বিশ্বের বৃহত্তম অ্যাঙ্কোভি মৎস্যসম্পদ ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং দক্ষিণ এশিয়া, সাহেল ও পূর্ব আফ্রিকায় তীব্র খরার সৃষ্টি করেছিল। খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক খাদ্য সংকট আরও গভীরে পৌঁছেছিল সেই সময়। একইভাবে ১৯৮২-’৮৩ সালের শক্তিশালী ‘এল নিনো’ ইথিওপিয়া-সহ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল। গবেষকদের মতে, অতীতের বহু দুর্ভিক্ষ, সামাজিক অস্থিরতা এমনকী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গেও ‘এল নিনো’র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ভারতে উনিশ শতকের দুর্ভিক্ষ, চিনের খাদ্য সংকট এবং ব্রাজিলের দীর্ঘস্থায়ী খরায় লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল। যদিও এসব ঘটনার জন্য শুধুমাত্র ‘এল নিনো’কে দায়ী করা যায় না, তবে এই জলবায়ুগত অবস্থা পরিস্থিতিকে বহুগুণ জটিল করে তুলেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (NOAA)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ‘এল নিনো’ বছরের শেষভাগে অত্যন্ত শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছনোর সম্ভাবনা। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া ব্যুরো ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে যে, দেশটিতে তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তবে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, বিভিন্ন পূর্বাভাস মডেলের মধ্যে এখনও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকায় একে এখনই ‘গডজিলা এল নিনো’ বা ‘সুপার এল নিনো’ হিসেবে ঘোষণা করা বৈজ্ঞানিকভাবে সমীচীন নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ‘এল নিনো’র শক্তি নয়, বরং এটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন পৃথিবী ইতোমধ্যেই রেকর্ড মাত্রার উষ্ণতার মধ্যে রয়েছে। ২০২৭ সালকে ইতিহাসের উষ্ণতম বছরগুলোর অন্যতম হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক ঋণসংকট, যুদ্ধজনিত জ্বালানি ও সার সরবরাহের সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় বহু দরিদ্র দেশ আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) প্রথমবারের মতো যৌথভাবে আগাম অর্থ সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এখনই খরা-সহনশীল বীজ, বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা, জল সংরক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে নগদ সহায়তা দেওয়া গেলে ভবিষ্যতের মানবিক বিপর্যয় অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সংস্থাগুলোর মতে, আগাম প্রস্তুতিতে ব্যয় করা প্রতি ১ ডলার ভবিষ্যতে প্রায় ৭ ডলার ত্রাণজনিত ব্যয় সাশ্রয় করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বে মোট খাদ্য উৎপাদন হয়তো খুব বেশি কমবে না, কারণ এক অঞ্চলের ক্ষতি অন্য অঞ্চলের উৎপাদন দ্বারা কিছুটা পূরণ হতে পারে। কিন্তু আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু দরিদ্র দেশ, যেগুলো খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং ঋণসংকটে জর্জরিত, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এসব দেশের কোটি কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের ‘এল নিনো’র প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এর তীব্রতায় নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংকট এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে এর সম্মিলিত প্রভাবে। তাই এখনই বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস, আগাম পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করাই একমাত্র হাতিয়ার।
……………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন দীপাঞ্জন মিশ্র-র অন্যান্য লেখা
……………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved