

নবি পিল্লাইয়ের আইনি প্রজ্ঞা কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার সীমানায় আবদ্ধ থাকেনি; তা বিশ্বজনীন আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপুঞ্জের রুয়ান্ডা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি ও পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী রায়টি প্রদান করেন।
২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর দুপুরে জার্মানির নুরেমবার্গ শহরের প্যালেস অফ জাস্টিসের ৬০০ নম্বর এজলাসে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন চলছিল। ৮০ বছর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ঘরেই নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মধ্য দিয়ে আধুনিক আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের জন্ম হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক কক্ষে বসেই ৮৫ বছর বয়সি দক্ষিণ আফ্রিকান বিচারপতি নবানেথাম নবি পিল্লাই খবর পেলেন, এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁকেই দেওয়া হয়েছে। উপস্থিত আইনজ্ঞ ও নির্যাতিত মানুষেরা যখন উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানালেন, তখন যেন ইতিহাসের এক সুদীর্ঘ বৃত্ত পূর্ণতা পেল। কারণ, নুরেমবার্গের ওই এজলাসে দাঁড়িয়ে থাকা তামিল বংশোদ্ভূত এই নারীর জীবনযাত্রার শিকড়টি প্রোথিত হয়ে আছে কয়েক হাজার মাইল দূরের দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে। ১৮৯৩ সালের ৭ জুন, পিটারমারিটজবার্গ স্টেশনে ট্রেনের প্রথম শ্রেণির কামরা থেকে তরুণ ব্যারিস্টার মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার যে অপমান একদিন সত্যাগ্রহের জন্ম দিয়েছিল, ১৩৩ বছর পেরিয়ে সেই দক্ষিণ আফ্রিকারই আর এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী আইনজীবীর হাত ধরে তা আজ বিশ্বজনীন আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার শীর্ষচূড়ায় গিয়ে পৌঁছল।

দক্ষিণ আফ্রিকার রক্তাক্ত ও বৈষম্যদীর্ণ মাটি কীভাবে তিন শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে তিনজন আইনজ্ঞের হাত ধরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের তিনটি ভিন্ন ভাষা নির্মাণ করল, সেই প্রশ্নটি আধুনিক রাজনীতির ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই ঐতিহাসিক চতুর্ভুজের প্রথম বিন্দুতে রয়েছেন মহাত্মা গান্ধী। ১৮৯৩ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২১ বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানকালে গান্ধী দেখেছিলেন, ব্রিটিশ উপনিবেশে ভারতীয় বণিক এবং ইক্ষু খামারের চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক বা গিরমিটিয়ারা কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবৈষম্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন। প্রথমদিকে তাঁর লড়াই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অনুগত প্রজা হিসেবে, কেবল সাংবিধানিক আবেদনের গণ্ডিতে আবদ্ধ। ১৮৯৪ সালে নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা এবং ১৯০৩ সালে ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি প্রবাসী ভারতীয়দের সংঘবদ্ধ করেন। কিন্তু ১৯০৬ সালে ট্রান্সভাল সরকারের এশিয়াটিক রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তিনি জন্ম দিলেন সত্যাগ্রহের, যেখানে অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছায় কারাবরণই হয়ে উঠল আত্মমর্যাদার অস্ত্র। ১৯১৩ সালের ঐতিহাসিক মহামিছিলে ভারতীয় খনিশ্রমিক ও নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রমাণ করল, আদালতের চার দেওয়াল ছাড়িয়ে গান্ধীর অহিংস প্রতিরোধ এক গণআন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছে।

কিন্তু ইতিহাসচর্চার নির্মোহ দৃষ্টিতে দক্ষিণ আফ্রিকার গান্ধীকে নিছক এক ত্রুটিহীন কিংবদন্তিতে পরিণত করলে সত্যের অপলাপ হবে। ইতিহাসবিদ অশ্বিন দেশাই এবং গুলাম ভাহেদ তাঁদের গবেষণায় সমকালীন নথিপত্র ঘেঁটে দেখিয়েছেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধীর সংগ্রাম মূলত ভারতীয় সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের ওপর চলতে থাকা ঔপনিবেশিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনও যৌথ ফ্রন্ট গড়ে তোলার ভাবনা তাঁর প্রাথমিক রাজনীতিতে ছিল না। বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নাগরিকত্বের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি ১৮৯৯ সালের বোয়ার যুদ্ধ এবং ১৯০৬ সালের জুলুদের বামবাথা বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ বাহিনীর সহায়তায় অ্যাম্বুলেন্স কোর গঠন করেছিলেন। এমনকী তাঁর প্রথম জীবনের লেখালিখিতে কৃষ্ণাঙ্গদের থেকে ভারতীয়দের সাংস্কৃতিকভাবে আলাদা করে দেখানোর প্রবণতাও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চিন্তার বিবর্তন ঘটেছে। এই ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অত্যাচারী রাষ্ট্রশক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নৈতিক অসহযোগের যে রাজনৈতিক ব্যাকরণ গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকার পরীক্ষাগারে তৈরি করেছিলেন, পরবর্তী কয়েক দশকে তা দেশকালের গণ্ডি পেরিয়ে গোটা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল।

গান্ধী ভারতে ফিরে আসার পরের কয়েক দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যায়। ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব উপলব্ধি করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত না হলে, খণ্ডিত সম্প্রদায়গত অধিকারের কোনও স্থায়ী মূল্য নেই। এই উপলব্ধিরই ঐতিহাসিক দলিল হল, ১৯৪৭ সালের ৯ মার্চ স্বাক্ষরিত থ্রি ডক্টরস প্যাক্ট। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সভাপতি ডাক্তার এ বি জুমা, নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেসের ডাক্তার মন্টি নাইকার এবং ট্রান্সভাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেসের ডাক্তার ইউসুফ দাদুর মধ্যে স্বাক্ষরিত এই যৌথ ঘোষণাপত্র কৃষ্ণাঙ্গ ও ভারতীয়দের বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামকে এক মোহনায় মিলিয়ে দেয়। ঠিক তার পরের বছরই, ১৯৪৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অ্যাপারথেইড বা প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে কায়েম হয়। এই অন্ধকার সময়েই আমাদের ঐতিহাসিক চতুর্ভুজের দ্বিতীয় প্রান্তে উঠে আসেন তরুণ আইনজীবী নেলসন ম্যান্ডেলা। ১৯৫২ সালে অলিভার টাম্বোর সঙ্গে জোহানেসবার্গে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ল ফার্ম গড়ে তোলার পাশাপাশি ম্যান্ডেলা ঝাঁপিয়ে পড়েন ‘ডিফায়ান্স ক্যাম্পেইন’ বা অন্যায় আইন অমান্য আন্দোলনে, যার প্রত্যক্ষ প্রেরণা এসেছিল গান্ধীর সত্যাগ্রহের ঐতিহ্য এবং ভারতীয় কর্মীদের অহিংস প্রতিরোধ থেকে।

গান্ধীর সঙ্গে ম্যান্ডেলার সম্পর্ককে সরলরৈখিক উত্তরাধিকার হিসেবে দেখলে ইতিহাসের জটিলতাকে অস্বীকার করা হয়। ১৯৯৯ সালে টাইম পত্রিকায় প্রকাশিত ‘দ্য সেক্রেড ওয়ারিয়র’ নিবন্ধে ম্যান্ডেলা গান্ধীকে ‘উপনিবেশবিরোধী বিপ্লবের আদিপুরুষ’ বলে শ্রদ্ধা জানালেও তাঁদের দু’জনের পথের একটি মৌলিক প্রভেদ ছিল। গান্ধীর কাছে অহিংসা ছিল অলঙ্ঘনীয় নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনাদর্শ; কিন্তু ম্যান্ডেলার কাছে তা ছিল পরিস্থিতি-নির্ভর রাজনৈতিক রণকৌশল। ১৯৬০ সালের ২১ মার্চ শার্পভিল গণহত্যায় দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৬৯ জনকে হত্যা করার পর শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সমস্ত গণতান্ত্রিক পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। তখন ম্যান্ডেলা উপলব্ধি করেন, নিষ্ঠুর রাষ্ট্রযন্ত্রের সশস্ত্র সন্ত্রাসের সামনে কেবল অহিংস আবেদন আত্মসমর্পণেরই নামান্তর। ১৯৬১ সালে গঠিত হয় সশস্ত্র শাখা উমখোন্তো উই সিজওয়ে। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৪ সালের রিভোনিয়া মামলার পর দীর্ঘ ২৭ বছরের কারাবাস পেরিয়ে ম্যান্ডেলা যখন মুক্ত হন, তখন তিনি আবার সশস্ত্র সংঘাতের পথ ছেড়ে সংলাপ, জাতীয় পুনর্মিলন এবং সর্বজনীন সাংবিধানিক গণতন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রূপান্তর ঘটান, যা গান্ধীজির নৈতিক দর্শনকে বাস্তব রাজনীতির জমিতে প্রতিষ্ঠা দেয়।
এই দুই যুগনায়কের সংগ্রামের পাশে নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসটিকে রাখলে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তনশীল মানদণ্ডটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ শতকের অহিংস আন্দোলনের প্রধানতম প্রতীক হওয়া সত্ত্বেও মহাত্মা গান্ধী কখনও এই পুরস্কার পাননি। ১৯৩৭, ১৯৩৮, ১৯৩৯, ১৯৪৭ এবং ১৯৪৮ সালে মোট পাঁচবার তিনি মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু নোবেল কমিটির মহাফেজখানার নথি জানাচ্ছে– ১৯৩৭ সালে কমিটির উপদেষ্টা জেকব ওয়ার্মমুলার ইউরোপ-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গান্ধীকে একাধারে সন্ত ও সাধারণ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক বলে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের দাঙ্গা এবং কাশ্মীর সংঘাতের আবহে তাঁর অহিংস নীতির ধারাবাহিকতা নিয়েও কমিটি প্রশ্ন তোলে। আর ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধী নিহত হওয়ার পর কোনও উপযুক্ত জীবিত প্রার্থী নেই জানিয়ে সে বছর পুরস্কারই দেওয়া হয়নি, যাকে ২০০৬ সালে নোবেল কমিটির সচিব গেইর লুন্ডেস্টাড তাঁদের ইতিহাসের বৃহত্তম ভ্রান্তি বলে স্বীকার করেন। এরই বিপরীতে, ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর ১৯৯৩ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ককে যৌথভাবে পুরস্কৃত করে নোবেল কমিটি দক্ষিণ আফ্রিকার রক্তপাতহীন গণতান্ত্রিক উত্তরণকে বিশ্বমঞ্চে ঐতিহাসিক স্বীকৃতি দেয়।

গান্ধীর নৈতিক প্রতিরোধ এবং ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক মুক্তিসংগ্রামের এই জমিতেই গড়ে উঠেছে আমাদের চতুর্ভুজের তৃতীয় স্তম্ভ, নবি পিল্লাইয়ের আইনি জীবন। ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ডারবানের দরিদ্র ভারতীয় বসতি ক্লেয়ারউডে তামিল গিরমিটিয়া বংশোদ্ভূত এক বাসচালকের ঘরে তাঁর জন্ম। স্থানীয় ভারতীয় সমাজের চাঁদায় নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়লেও, বর্ণবাদী ব্যবস্থায় কোনও শ্বেতাঙ্গ ল ফার্মে তিনি কাজ পাননি। ফলে ১৯৬৭ সালে নাটাল প্রদেশের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে তিনি নিজস্ব আইনি সংস্থা খোলেন। অনেকেই ভুলবশত তাঁকে রিভোনিয়া মামলায় ম্যান্ডেলার আইনজীবী মনে করলেও প্রামাণ্য ইতিহাস বলছে, ম্যান্ডেলার কারাবাসের সঙ্গে তাঁর প্রকৃত যোগসূত্র তৈরি হয় ১৯৭৩ সালে। ওই বছর রবেন আইল্যান্ড কারাগারের কমান্ডিং অফিসারের বিরুদ্ধে মামলা জিতে পিল্লাই ম্যান্ডেলা-সহ রাজবন্দিদের আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি টেররিজম অ্যাক্টে আটক কর্মীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের মুখোশও তিনি খুলে দেন। ১৯৮৮ সালে হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান হিসেবে ডক্টরেট অর্জনের পর ১৯৯৫ সালে রাষ্ট্রপতি ম্যান্ডেলাই তাঁকে মুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারপতি পদে সসম্মানে নিযুক্ত করেন।

কিন্তু নবি পিল্লাইয়ের আইনি প্রজ্ঞা কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার সীমানায় আবদ্ধ থাকেনি; তা বিশ্বজনীন আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপুঞ্জের রুয়ান্ডা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি ও পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী রায়টি প্রদান করেন। ১৯৯৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউটর বনাম জঁপল আকায়েসু মামলায় পিল্লাই ও তাঁর সহবিচারপতিরা রায় দেন যে, রুয়ান্ডার তাবা অঞ্চলে তুতসি নারীদের ওপর সংঘটিত, পরিকল্পিত ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা যুদ্ধের নিছক উপজাত বা লুণ্ঠনের ঘটনা নয়। একটি জনগোষ্ঠীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকলেও, ধর্ষণ নিজেই গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে নারীর শরীরকে বিজয়ীর ট্রফি মনে করার যে পুরুষতান্ত্রিক দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতি চলে আসছিল, পিল্লাইয়ের এই রায় তাকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। একইভাবে গণমাধ্যমে ঘৃণা ছড়িয়ে গণহত্যায় প্ররোচনা দেওয়াকেও তিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরে ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারপতি হিসেবে এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করেন।

আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয় তখনই, যখন পরাক্রমশালী রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্য উচ্চারণ করতে হয়। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার হাইকমিশনার থাকাকালে পিল্লাই প্রমাণ করেছিলেন, তাঁর নৈতিক কম্পাস কোনও কূটনৈতিক সুবিধাবাদের ধার ধারে না। নিজের ভারতীয় শিকড়ের প্রতি আবেগ সত্ত্বেও তিনি জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যকে কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মেনে নেননি, বরং তাকে বিশ্বজনীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেন। ২০১৯ সাল থেকে তিনি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে গাম্বিয়া বনাম মায়ানমার মামলায় রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারে অ্যাড হক বিচারপতি হিসেবে কর্মরত। আবার ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অধিকৃত প্যালেস্তাইন ভূখণ্ড বিষয়ক রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের চেয়ারপারসন হিসেবে গাজায় ইজরায়েলি সামরিক অভিযানে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার প্রামাণ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করে তিনি পরাশক্তিগুলির প্রবল রোষের মুখে পড়েন। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি উপেক্ষা করে পিল্লাই দেখিয়ে দিয়েছেন, অপরাধী ও আক্রান্তের পরিচয় দেখে আইনের পাল্লা যদি ঝুঁকে পড়ে, তবে বিশ্বজনীন আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা চিরতরে তার নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে।

এখানেই মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা এবং নবি পিল্লাইয়ের ঐতিহাসিক সংলাপটি ভারতীয় অহিংসবোধের চতুর্থ বিন্দুটির সঙ্গে মিলিত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চতুর্ভুজ রচনা করে। এই সংযোগ কেবল রক্তসূত্রের উত্তরাধিকার নয়, কিংবা একই মতাদর্শের যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তিও নয়; এটি হল অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানবমর্যাদা রক্ষার তিনটি পর্যায়ের নৈতিক অনুরণন। গান্ধী শিখিয়েছিলেন, আইন যখন অমানবিক হয়, তখন বিবেকের ডাকে অহিংস অসহযোগই মানুষের ধর্ম। ম্যান্ডেলা দেখিয়েছিলেন, গণসংগ্রাম ও রাজনৈতিক বাস্তবতাবোধের সমন্বয়ে কীভাবে বর্ণবাদী রাষ্ট্রকে ভেঙে সকলের জন্য সাংবিধানিক গণতন্ত্র গড়ে তুলতে হয়। আর নবি পিল্লাই সেই অহিংস ন্যায়বোধকে প্রতিস্থাপিত করেছেন আন্তর্জাতিক আইনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয়– যার মূল কথা হল, অস্ত্রের বদলে আদালতের এজলাসেই বিশ্বশান্তির ভিত্তি নির্মিত হতে পারে। ২০২৬ সালে যখন ইউক্রেন থেকে গাজা কিংবা সুদান থেকে মায়ানমার পর্যন্ত পেশিশক্তির আস্ফালনে আন্তর্জাতিক আদালতগুলিই আক্রান্ত হচ্ছে, তখন পিল্লাইয়ের এই নোবেল জয় বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয় যে, শান্তি মানে কেবল যুদ্ধবিরতি নয়; ক্ষমতাবানকে জবাবদিহির আওতায় এনে ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করলে মানবসভ্যতার কোনও শান্তিই কোনওদিন স্থায়ী পূর্ণতা পায় না।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved