Robbar

মব চরিত্র কাল্পনিক

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 21, 2026 7:59 pm
  • Updated:June 21, 2026 7:59 pm  

সমাজতাত্ত্বিকভাবে মব আবার ক্ষমতারও একটি রূপ। রাষ্ট্রের বাইরে দাঁড়িয়ে ভিড় অনেক সময় নিজের হাতে বিচার করার অধিকার কুক্ষিগত করতে চায়। আইন, আদালত, তদন্ত– এসবের উপর আস্থা হারালে মানুষ কখনও কখনও ‘তাৎক্ষণিক বিচার’-এর দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু সেই বিচার আসলে বিচার নয়, সেটি প্রতিশোধের সামাজিক অভিনয়।

হিন্দোল ভট্টাচার্য

প্রত্যেক জনসমাবেশ মব নয়। ‘মব’ একটি বিশেষ সামাজিক ও মানসিক অবস্থার নাম। একটি ভিড় তখনই ‘মব’-এ পরিণত হয়, যখন সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা নিজেদের স্বতন্ত্র নৈতিক বিচারবোধ, আত্মপরিচয় এবং দায়বদ্ধতা আংশিক বা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে একটি সম্মিলিত আবেগের অধীন হয়ে পড়ে। সেই আবেগ হতে পারে ক্রোধ, ভয়, ঘৃণা, প্রতিশোধস্পৃহা, উন্মাদনা কিংবা উল্লাস। তখন মানুষ ব্যক্তি হিসেবে নয়, ভিড়ের অংশ হিসেবে আচরণ করতে শুরু করে। আর এই রূপান্তরের মুহূর্তটিই সবচেয়ে ভয়ংকর। ফরাসি সমাজ-মনস্তত্ত্ববিদ গুস্তাভ লে বন উনিশ শতকের শেষদিকে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ক্রাউড’-এ লিখেছিলেন, ভিড়ের মধ্যে মানুষ এমন সব কাজ করতে পারে, যা সে একা থাকলে কখনও করত না। কারণ ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তির আত্মসচেতনতা কমে যায়, আর আবেগ ও অনুকরণের প্রবণতা বেড়ে যায়। ভিড়ের মধ্যে একজন মানুষ অনুভব করতে থাকে যে সে আর একা নয়; তার দায়ও যেন সবার মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে। ফলে অপরাধবোধ কমে যায়।

আধুনিক মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী একে বলা হয় ব্যক্তিসত্তার অবলুপ্তি। যখন কোনও মানুষ ভিড়ের মধ্যে নিজেকে একটি নামহীন, মুখহীন অংশ হিসেবে অনুভব করে, তখন তার ব্যক্তিগত নৈতিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, একজন সাধারণ মানুষ হয়তো একা কোনও অপরিচিত ব্যক্তিকে চড় মারতে পারবেন না। কিন্তু যদি তিনি দেখেন, আরও ৫০ জন সেই মানুষটিকে মারছে, তখন তাঁর নিজের হাতও উঠতে পারে। কারণ তখন তিনি ভাবেন না– ‘আমি কী করছি?’, বরং ভাবেন– ‘আমরা কী করছি’। ব্যক্তির যে নিজস্ব নীতিবোধ সামান্য হলেও থাকে, তা সমষ্টিগত ভাবে সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়ে যায়। কয়েকদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রাম, দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলি এলাকার সাঁকিজাহানে কেরালার এক যুবককে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হল। অভিযোগ, তিনি পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন। খবর অনুযায়ী, ৯ জুন তিনি বাজারে যাওয়ার পথে পথ হারিয়ে ফেলেন। স্থানীয় লোকজন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি বাংলা (এবং অনেক ক্ষেত্রে হিন্দিও) ঠিকমতো বলতে বা বুঝতে পারেননি। ভাষাগত সমস্যার কারণে সন্দেহ আরও বাড়ে। পরে তাঁকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এই লোকটির অপরাধ হল তিনি হিন্দি বা বাংলা না-জেনে এই রাজ্যে বেড়াতে এসেছিলেন, ঠিক যেমনভাবে তামিল বা তেলেগু বা মলয়লম না জেনে বাঙালিরা দক্ষিণ ভারত বেড়াতে যান। ভাষা-সংক্রান্ত বিভ্রান্তি সেখানেও তৈরি হয়। কিন্তু তার জন্য কাউকে রোহিঙ্গা বা চোর জাতীয় সন্দেহের বশবর্তী হতে হয় না। মার খেয়ে মরতেও হয় না। স্থানীয় মানুষের ভাষা তিনি বুঝতে পারছিলেন না, তাঁর ভাষাও স্থানীয়রা বুঝতে পারছিল না। এই না-বোঝার মধ্যে, এই ভাষাগত দূরত্বের মধ্যে, এই সামান্য বিভ্রান্তির মধ্যে কোনও মানুষ এগিয়ে এসে তাঁর হাত ধরে জিজ্ঞেস করেনি– ‘আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন? আপনার কোনও সাহায্য লাগবে?’ বরং ভিড় এগিয়ে এল। সন্দেহ এগিয়ে এল। গুজব এগিয়ে এল। আর তার পরে এগিয়ে এল লাথি, ঘুষি, লাঠি। গণপিটুনি। একজন মানুষ মারা গেলেন। একজন মানুষ, যিনি হয়তো শুধু পথ হারিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের সমাজ কি শুধুই একজন পথ হারিয়ে ফেলা মানুষকে হত্যা করেছে? না কি নিজের ভেতরে বহুদিন ধরে লালন করা মানবিকতার শেষ অবশিষ্টটুকুকেও হত্যা করেছে? এই অসহিষ্ণুতা কেন? সন্দেহ, অসহিষ্ণুতার যে পরিবেশ গড়ে উঠেছে আমাদের এই বাংলায় একটু একটু করে, আজ তা এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে, যে আমরা সহনশীলতাকে জীবন থেকে মুছে ফেলেছি। ভারতে যে বিবিধের মাঝে মিলন সত্য, একত্ববাদ সত্য নয়, এই ধারণাটিই তো হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে, মানুষের মনের মধ্যে ঢুকে পড়ছে সেই উগ্রতা, যে উগ্রতাকে আমরা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছি সংবাদে, টিভিতে, সোশাল মিডিয়ায়। প্রকাশ্যে প্রতিশোধস্পৃহার বিজ্ঞাপন মানুষের ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে একধরনের হিংসার ভাইরাস, যা মানুষকে আর সহনশীল থাকতে দিচ্ছে না। তলিয়ে ভাবার সুযোগও দিচ্ছে না। আর যখন এই ক্রোধ সমষ্টিগত ভাবে তৈরি হচ্ছে, তখন তা পরিণত হচ্ছে হৃদয়হীন সন্ত্রাসে। যেমন যে কোনও দাঙ্গা হয় সমষ্টিগত ভাবেই। গণপিটুনি, তারই এক ক্ষুদ্র রূপ। 

এই ঘটনাটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি আমাদের সময়ের একটি ভয়ংকর লক্ষণ। এমন একটি সময়, যখন মানুষ ক্রমশ মানুষকে নয়, মানুষ সম্পর্কে তৈরি হওয়া সন্দেহকে বেশি বিশ্বাস করছে। যখন পরিচয়ের আগে এসে দাঁড়াচ্ছে জাতি, ধর্ম, ভাষা, অঞ্চল, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা সামাজিক পরিচিতি। যখন একজন অপরিচিত মানুষ আর সাহায্যের আবেদন নয়, বরং সম্ভাব্য বিপদের সংকেত হয়ে উঠছে। যখন মানুষের চোখে মানুষ নয়, বরং ‘অন্য’ মানুষ দৃশ্যমান হচ্ছে। জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন– ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়।’ কিন্তু আমাদের সময় যেন সেই বিশ্বাসকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আরও আগে তিনি ভিড় সম্পর্কে এক গভীর সত্য উচ্চারণ করেছিলেন– ভিড়ের হৃদয় নেই। সত্যিই নেই। ভিড়ের কোনও বিবেক নেই, কোনও দায়বদ্ধতা নেই, কোনও ব্যক্তিগত নৈতিকতা নেই। একজন মানুষ একা থাকলে যে কাজটি করতে লজ্জা পাবে, যে কাজটি করতে তার বিবেক বাধা দেবে, সেই মানুষই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে অবলীলায় নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে। ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তির পরিচয় বিলীন হয়ে যায়। দায় বিলীন হয়ে যায়। আর সেই শূন্যস্থানে জন্ম নেয় এক ধরনের উন্মত্ততা। সেখানে আর যুক্তি কাজ করে না, কাজ করে প্রবৃত্তি। সেখানে আর সহমর্মিতা কাজ করে না, কাজ করে হিংসা। সেখানে আর মানুষ থাকে না, থাকে উত্তেজিত জনতা।

গণপিটুনি বা মব লিঞ্চিং আসলে সাধারণ একটি অপরাধ নয়, এটি সভ্যতার বিরুদ্ধে অপরাধ। কারণ এটি আইনকে অস্বীকার করে, বিচার-ব্যবস্থাকে অস্বীকার করে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের মানবিক মর্যাদাকে অস্বীকার করে। যে মুহূর্তে কয়েকজন মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা কাউকে বিচার করবে, শাস্তি দেবে, এমনকী হত্যা করবে, সেই মুহূর্তে তারা কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, গোটা সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। কারণ সভ্যতার মূল ভিত্তিই হল– কেউ অপরাধী হলেও তার বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, জনতার রোষের মাধ্যমে নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই সংস্কৃতি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে কেন? কেন আমরা এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে সন্দেহের শাস্তি মৃত্যু হতে পারে? কেন মানুষ ক্রমশ এত অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে?

এর একটি কারণ হল ভয়। আধুনিক সমাজে মানুষ ক্রমশ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, বেকারত্ব, প্রতিযোগিতা– সব মিলিয়ে মানুষের ভেতরে জমে উঠছে এক ধরনের অদৃশ্য উদ্বেগ। এই উদ্বেগ প্রায়শই কোনও নির্দিষ্ট শত্রুকে খুঁজে নিতে চায়। আর তখনই অপরিচিত মানুষ, সংখ্যালঘু মানুষ, ভিন্ন ভাষার মানুষ, ভিন্ন ধর্মের মানুষ সহজ লক্ষ্য হয়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই দেখিয়েছেন যে সংকটের সময় মানুষ প্রায়শই বলির পাঁঠা খোঁজে। নিজের ব্যর্থতা, নিজের হতাশা, নিজের ভয়– এসবের দায় সে অন্য কারও উপর চাপাতে চায়। আর সেই প্রক্রিয়াতেই জন্ম নেয় ঘৃণা। হান্না আরেন্ট নাৎসি জার্মানির অভিজ্ঞতা থেকে বলেছিলেন, অশুভ সবসময় ভয়ংকর মুখ নিয়ে আসে না; অনেক সময় তা আসে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক আচরণের মধ্যে। তিনি একে বলেছিলেন ‘banality of evil’– অশুভের সাধারণত্ব। অর্থাৎ মানুষ যখন না ভেবে, না প্রশ্ন করে, ভিড়ের সঙ্গে মিশে অন্যায়ের অংশ হয়ে ওঠে, তখন অশুভ স্বাভাবিক হয়ে যায়। আজকের গণপিটুনির ঘটনাগুলির দিকে তাকালে এই কথাটি বারবার মনে পড়ে। যারা মারছে, তারা সবাই কি পেশাদার খুনি? না। তারা আমাদেরই মতো সাধারণ মানুষ। কিন্তু কোনও এক মুহূর্তে তারা নিজেদের মানবিক সত্তাকে স্থগিত রেখে ভিড়ের উন্মাদনায় আত্মসমর্পণ করেছে। সমাজতাত্ত্বিকভাবে মব কেবল মানুষের সমাবেশ নয়; এটি একটি সামাজিক আবেগের ঘনীভূত রূপ। সেখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ দ্রুত সংক্রমিত হয়। একজন চিৎকার করে বলল, ‘চোর!’, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই চিৎকার বহু মানুষের বিশ্বাসে পরিণত হতে পারে। কেউ প্রমাণ চাইবে না। কারণ মবের মধ্যে তথ্যের চেয়ে আবেগের গতি বেশি। এই কারণেই মব প্রায়শই গুজবের উপর নির্ভরশীল। সমাজবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, যেখানে সামাজিক উদ্বেগ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা রাজনৈতিক মেরুকরণ বেশি, সেখানে গুজবও বেশি শক্তিশালী হয়। গুজব মানুষের ভয়ের ওপর ভর করে বেঁচে থাকে। আর ভয় থেকে জন্ম নেয় সন্দেহ। সন্দেহ থেকে জন্ম নেয় শত্রুতাবোধ। তারপর শুরু হয় আক্রমণ।

মজার বিষয় হল, তাঁরা কেউই সাধারণত সমাজের বাইরের কোনও দানব নয়। তাঁরা আমাদেরই পরিচিত মানুষ– পড়শি, দোকানদার, ছাত্র, কর্মচারী, কৃষক, শিক্ষক, এমনকী শিক্ষিত মধ্যবিত্তও। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যাগুলির গবেষণা বারবার দেখিয়েছে যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা কোনও বিশেষ বিকৃত মানসিকতার মানুষ ছিল না। তারা ছিল ‘স্বাভাবিক’ মানুষ। কিন্তু বিশেষ সামাজিক পরিস্থিতিতে তারা অসাধারণ নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছিল। অসহিষ্ণুতার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাভাবিকীকরণ হয়েছে এখন। আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে ভিন্নমতকে প্রায়শই শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিপক্ষ নয়, শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ধর্মীয় ভিন্নতাকে সহাবস্থানের ভিত্তি নয়, সংঘাতের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ভাষাগত ও আঞ্চলিক পরিচয়কে বৈচিত্রের সম্পদ নয়, বিভেদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলত সমাজের মধ্যে একটি স্থায়ী বিভাজন তৈরি হচ্ছে– ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’। এই বিভাজন যত গভীর হয়, সহমর্মিতা তত কমে যায়। কারণ মানুষ সাধারণত তাদের প্রতিই সহানুভূতিশীল হয়, যাদের সে নিজের মতো মনে করে। যাদের ‘অন্য’ মনে হয়, তাদের প্রতি নিষ্ঠুর হওয়া সহজ হয়ে ওঠে। এই অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি শুধু ধর্মীয় মৌলবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাজনৈতিক মৌলবাদেও আছে, সাংস্কৃতিক মৌলবাদেও আছে, ভাষাগত মৌলবাদেও আছে। যে কোনও বিশ্বাস যখন নিজেকে একমাত্র সত্য বলে ঘোষণা করে এবং অন্য সব মতকে অবৈধ বলে মনে করে, তখনই মৌলবাদের জন্ম হয়। আর মৌলবাদের প্রকৃতি হল অসহিষ্ণুতা। সেখানে প্রশ্নের জায়গা নেই, সংলাপের জায়গা নেই, ভিন্নতার জায়গা নেই। সেখানে আছে কেবল আনুগত্য এবং ঘৃণা।

বাংলার ইতিহাস কিন্তু অন্য কথা বলে। এই বাংলাই চৈতন্যের করুণা দেখেছে, লালনের মানবধর্ম দেখেছে, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতার স্বপ্ন দেখেছে, নজরুলের সাম্যের গান শুনেছে। এই বাংলাই শিখেছিল– মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই। ধর্মের চেয়ে মানুষ বড়, জাতির চেয়ে মানুষ বড়, রাষ্ট্রের চেয়ে মানুষ বড়। কিন্তু আজ সেই বাংলাতেই যদি কোনও মানুষ ভাষা না-বোঝার কারণে সন্দেহভাজন হয়ে ওঠে, তবে আমাদের আত্মসমালোচনা করতেই হবে।

আমরা কি সত্যিই মানবিকতা হারিয়ে ফেলছি? হয়তো পুরোপুরি নয়। এখনও বহু মানুষ বিপদের সময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এখনও বন্যা, দুর্ঘটনা, মহামারির সময়ে অসংখ্য সাধারণ মানুষ নিঃস্বার্থভাবে অন্যের পাশে দাঁড়ান। এখনও ডাক্তার, শিক্ষক, সমাজকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, সাধারণ নাগরিক প্রতিদিন মানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করেন। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্য যে নিষ্ঠুরতা যেন ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। সহমর্মিতার চর্চা কমছে, আর ক্রোধের প্রকাশ বাড়ছে। আমরা শুনতে কম শিখছি, চিৎকার করতে বেশি শিখছি। আমরা বুঝতে কম চাইছি, বিচার করতে বেশি চাইছি। আমরা প্রশ্ন করতে কম চাইছি, দোষী সাব্যস্ত করতে বেশি চাইছি। মবের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল নৈতিক দায়ের বিস্তার । যদি একজন মানুষ একা একটি অপরাধ করে, সে জানে দায় তার নিজের। কিন্তু ১০০ জন মিলে করলে প্রত্যেকে মনে করে দায় অন্যেরও। ফলে ব্যক্তিগত অপরাধবোধ কমে যায়। গণপিটুনির পরে প্রায়ই দেখা যায় অভিযুক্তরা বলেন– ‘আমিও ছিলাম, কিন্তু আমি তো একা মারিনি।’ এই বাক্যটির মধ্যেই মব মনস্তত্ত্বের ভয়াবহতা লুকিয়ে আছে।

সমাজতাত্ত্বিকভাবে মব আবার ক্ষমতারও একটি রূপ। রাষ্ট্রের বাইরে দাঁড়িয়ে ভিড় অনেক সময় নিজের হাতে বিচার করার অধিকার কুক্ষিগত করতে চায়। আইন, আদালত, তদন্ত– এসবের উপর আস্থা হারালে মানুষ কখনও কখনও ‘তাৎক্ষণিক বিচার’-এর দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু সেই বিচার আসলে বিচার নয়, সেটি প্রতিশোধের সামাজিক অভিনয়। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মবের চরিত্রকে আরও জটিল করেছে। আগে মব তৈরি হত কোনও নির্দিষ্ট স্থানে। এখন ডিজিটাল মব তৈরি হয়। হাজার হাজার মানুষ কাউকে না চিনেই তার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে পারে, তাকে অপমান করতে পারে, তার সামাজিক মৃত্যুর আয়োজন করতে পারে। অর্থাৎ মব কেবল শারীরিক নয়; ভার্চুয়ালও হতে পারে। অন্যের কষ্টও অনেক সময় একটি স্ক্রলযোগ্য কনটেন্টে পরিণত হয়। ফলে সংবেদনশীলতা ধীরে ধীরে ভোঁতা হয়ে যায়। মৃত্যু আর বিস্মিত করে না, রক্ত আর চমকে দেয় না, হিংসা আর আতঙ্কিত করে না। আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাই। আর সভ্যতার জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক কিছু নেই।

কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু একজন নিহত মানুষের নয়। প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের। আজ যদি একজন অপরিচিত মানুষ ভাষা না-বোঝার কারণে মারা যায়, কাল অন্য কোনও কারণে অন্য কেউ মরবে। আর একদিন আমরা এমন এক সমাজে পৌঁছে যাব, যেখানে কেউ কারও উপর ভরসা করতে পারবে না। যেখানে মানুষ মানুষকে নয়, শুধু সম্ভাব্য শত্রুকে দেখবে। সেই সমাজ সভ্য হতে পারে না। সেই সমাজ উন্নত হতে পারে না। সেই সমাজে প্রযুক্তি থাকতে পারে, অট্টালিকা থাকতে পারে, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি থাকতে পারে, ধর্ম থাকতে পারে, উন্নয়ন থাকতে পারে, কিন্তু মানবতা থাকবে না।

এই কারণেই আজ সেই নিহত যুবকের মৃত্যু কেবল একটি সংবাদ নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের আয়না দেখায়। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? একজন মৃত মানুষকে, না আমাদের নিজেদের ক্রমশ মৃত হয়ে যাওয়া বিবেককে?

জীবনানন্দ দাশের কথাই আবার মনে পড়ে– ভিড়ের হৃদয় নেই। কিন্তু সমাজ কি কেবল ভিড়ের সমষ্টি? যদি তা-ই হয়, তবে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কিন্তু যদি এখনও কোথাও কিছু মানুষ থেকে থাকেন, যারা অন্য মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে তাকে মানুষ হিসেবে চিনতে পারেন, তবে আশা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। সেই আশাকে বাঁচিয়ে রাখাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কারণ মানবিকতা হারিয়ে গেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না, তখন সে কেবল ভিড় হয়ে যায়। আর ভিড়ের হৃদয় নেই। ভিড়ের স্মৃতি নেই। ভিড়ের অনুশোচনা নেই। ভিড় শুধু ধ্বংস করতে জানে। মানবসভ্যতার সমস্ত ইতিহাস আসলে সেই হৃদয়হীন ভিড়ের বিরুদ্ধে মানুষের হৃদয়কে বাঁচিয়ে রাখার ইতিহাস। আজ আবার সেই ইতিহাসের এক কঠিন সন্ধিক্ষণে আমরা দাঁড়িয়ে আছি।