


সমাজ ও রাষ্ট্র সবসময়ই চায় ধর্ষণের মতো ঘটনাকে এক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে। আর ধর্ষণের দায় সম্পূর্ণ ধর্ষকের ওপর চাপিয়ে সমাজ তার দায় থেকে মুক্ত হতে চায়। ধর্ষকের ফাঁসি দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র সমাজের সামগ্রিক রাগকে চাপা দিতে সক্ষম হয়। আড়ালেই থেকে যায় একটি ধর্ষকের ‘ধর্ষক’ তৈরি হওয়ার নেপথ্যে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা।
“আপকো লাগতা হ্যায় আপকে ফাদার নে রেপ কিয়া হ্যায়? আপকে পাস সবুদ হ্যায় কি আপকে ফাদার রেপ কর সাকতে হ্যায় অর উস দিন রেপ করকে আয়ে থে?”
আদালতে ঘরভর্তি লোকের সামনে এক ১২ বছরের মেয়ে উঠেছে উইটনেস বক্সে, তাঁর বাবার বিরুদ্ধে ধর্ষণের সাক্ষী দিতে। অভিযুক্তদের উকিলের বারবার এই প্রশ্নের জবাবে মেয়েটি ঘাবড়ে না-গিয়ে শেষে দৃঢ় স্বরে বলল, আমি ঠিক নিশ্চিত নই সেদিন বাবা ধর্ষণ করেছিল কি না, কিন্তু আমি জানি এর আগে আমার বাবা ধর্ষণ করেছে। আমার বাবা আমার মাকে ধর্ষণ করেছে। মেয়েটির কথা শুনে অভিযুক্তের উকিলেরও আর কিছু বলার ছিল না। পুরো কোর্টরুম চুপ করে যায়। নিজের বীভৎস মুখ হঠাৎ সামনে এলে বোধহয় এমনই চুপ করে যায় সমাজ।
উপরের ঘটনাটি অনুভব সিনহার লেখা ও নির্দেশনায় নির্মিত ‘আশি’ (‘Assi’) সিনেমাটির একটি দৃশ্য।

পাঠক, সিনেমার ঘটনা বলে কি একটু রিলিফ পেলেন? ভাবলেন ধুর এসব বাস্তবে হয় না, এই ভেবে উড়িয়ে দিলেন সব?
না দেবেন না।
‘আশি’ সিনেমায় তবুও নির্যাতিতা নারী বেঁচে ফিরেছেন (যদিও কিছু বাঁচা মৃত্যুর থেকেও বেশি যন্ত্রণাদায়ক)। কিন্তু বাস্তবে বারুইপুরের ১১ বছরের মেয়েটি জলে ভেসে উঠেছে। জীবন্ত অবস্থায় নয়। মৃত অবস্থায়। রাজা আসে রাজা যায়। চেয়ারের লোক পালটায়। ক্ষমতার রং পালটায় কিন্তু নারীদের উপর অত্যাচার একই থাকে। ইতোমধ্যে জানা গিয়েছে– ধর্ষক সন্দেহে একজনকে পিটিয়ে মারা হয়েছে।
ন্যাশনাল ক্রাইম রিপোর্টস ব্যুরো-র (NCRB) তথ্য (২০২১) অনুযায়ী ভারতে গড়ে দিনে ৮৬ জন মহিলা ধর্ষিতা হন, যা ১৮-২০ মিনিটে একজন। এই সংখ্যাটা হল নথিভুক্ত ধর্ষণের সংখ্যা। ভারতের মতো একটি চরম পিতৃতান্ত্রিক দেশে– যেখানে আর্থিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক বৈষম্য রোজকার যাপিত বাস্তবতা, সেখানে সব ধর্ষণের খবর থানা অবধি পৌঁছয় না। অনেক সময় মিটমাট করে নেওয়া হয় খাপ পঞ্চায়েতে, সালিশি সভায়। যেমন ‘আশি’ সিনেমায় উইটনেস বক্সে সাক্ষী দিতে আসা মেয়েটির মা পরিবারের সম্মান রক্ষায় বিয়ে করে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন নিজের ধর্ষককেই। ভারতের মতন দেশে– যেখানে সমস্ত লজ্জা, সম্মানের দায় নির্যাতিতার উপরেই বর্তায়– তখন ধর্ষককে বিয়ে করে নেওয়ার বিধান আসে সমাজ, পরিবার এমনকী বিচারকদের কাছ থেকেও। যে সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীদের জন্য বিয়ে একমাত্র গন্তব্যস্থল হিসেবে ধরা হয়, তখন বিয়ের বিধান আসবে– এটা আর আশ্চর্য করে না।

১৬ জুন ২০২০ সালে ধর্ষণে অভিযুক্ত রবিন ভাদাক্কানচেরিল দু’ মাসের বেইল চান কেরালা হাইকোর্ট থেকে, যাকে তিনি রেপ করেছেন তাকে বিয়ে করার জন্য! তিনি ওই মেয়েটিকে রেপ করেছিলেন যখন মেয়েটির বয়স ছিল ১৬ বছর। মেয়েটি সেই ধর্ষণে গর্ভবতী হয়ে যায় ও একটি সন্তানের জন্ম দেয়। আদালতে ফাদার রবিন বেইলের আবেদন করতে গিয়ে জানান যে, মেয়েটির বয়স এখন ২০ বছর ও মেয়েটি এখন (বেইল আবেদন করার সময়) সাবালিকা ও সন্তান লালন পালনের উপযুক্ত তাই তিনি বিয়ে করে স্বামী হতে চান ও সন্তান লালন-পালন করতে চান!
আসলে এই ‘স্বামী’ হলে আমাদের দেশে বৈবাহিক ধর্ষণ থেকে শুরু করে যে কোনও গার্হস্থ্য হিংসা করেও রেহাই পাওয়া যায়। পুরুষ, স্বামী হলে সব অর্থেই সব কিছুর মালিক হয়ে যায়। তাই ধর্ষক রবিন স্বামী হওয়াটাই বেছে নেন। আর নির্যাতিতা? রবিনের ক্ষেত্রে নির্যাতিতার মা-বাবা বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন বলে জানা যায়। মেয়ে মানেই বোঝা, আর সেখানে যদি ধর্ষিতা মেয়ে হয় আর আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া মা-বাবা– তবে রেপিস্ট স্বামীই নারীদের ভবিতব্য বোধহয়?
বিলকিস বানো, আশিফা, নির্ভয়া, অভয়া, বারুইপুরের নির্যাতিত মেয়েটি ও অসংখ্য নাম না জানা নির্যাতিতা– নারীদের মুক্তি কবে? নারীদের মুক্তি কোথায়?

বারুইপুরের ধর্ষণ কাণ্ডের পর পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে এক অভিযুক্তকে। আর পশ্চিমবঙ্গে বাড়তে থাকা মব সংস্কৃতির আবহে একদল অতি উৎসাহী মানুষ বাহবা দিচ্ছেন সেই পিটিয়ে মারার ঘটনাকে। এরপর নিশ্চিতভাবেই আসবে অভিযুক্তদের ফাঁসি দেওয়ার বিধান। যে কোনও ধর্ষণের পর অভিযুক্তের ফাঁসি দেওয়ার দাবিতে সোচ্চার হয় এক বিশাল অংশের লোক। কিন্তু এই দাবির সমস্যাজনক বিষয় হল, সমাজ ও রাষ্ট্র সবসময়ই চায় ধর্ষণের মতো ঘটনাকে এক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে। আর ধর্ষণের দায় সম্পূর্ণ ধর্ষকের ওপর চাপিয়ে সমাজ তার দায় থেকে মুক্ত হতে চায়। ধর্ষকের ফাঁসি দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র সমাজের সামগ্রিক রাগকে চাপা দিতে সক্ষম হয়। আড়ালেই থেকে যায় একটি ধর্ষকের ‘ধর্ষক’ তৈরি হওয়ার নেপথ্যে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা। তাই একজন ধর্ষককে পিটিয়ে মারলে বা ফাঁসি দিলেও ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যায় না, যাবে না, যতদিন না ধর্ষক তৈরি হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটাকে আমরা পালটাতে পারি। কেউ ধর্ষক হয়ে জন্মায় না। সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার ধর্ষক তৈরি করে।
আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ভাষা থেকে রোজকার যাপন– সবই ভীষণভাবে পিতৃতান্ত্রিক ও নারীবিদ্বেষে ভরা। খিস্তিতে ব্যস্ত বাঙালিদের চালু খিস্তিগুলো খেয়াল করলে দেখা যাবে– সেগুলো সবই নারীবিদ্বেষী। নারীকে নিয়ে চালু খিস্তি থেকে মিম এতটাই জনপ্রিয় যে, একজন সংবেদনশীল নারীর সেই গালগুলো ভুলতেই (unlearn) হয়তো পুরো জীবন লেগে যাবে। গালগুলো শুধুই নারীবিদ্বেষী নয়, অধিকাংশ গালি ধর্ষণকে বাহবা দেয়। একজনকে নারীবিদ্বেষী গালি বাদ দিয়ে খিস্তি খুঁজতে হলে সে ধন্দে পড়ে যাবে।

আমরা পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসেবে এখনও অভয়ার সঙ্গে হওয়া অত্যাচারের বিচার পাইনি। আরেকটা না পাওয়া বিচারের সঙ্গে বারুইপুরের ছোট্ট শিশুটির নামও জুড়বে কি না সেটা সময়ই বলবে। আর বিচার মানেই বা কী? পিটিয়ে হত্যা? যে মব পিটিয়ে মারল– তার ভাষা ও ধরন বড্ড পিতৃতান্ত্রিক। বিচার মানে কী? ফাঁসি? আর পুরো ধর্ষক তৈরি হওয়ার সম্পূর্ণ মেকানিজম? যে রাষ্ট্র, যে সমাজ, যে পরিবার প্রতিনিয়ত একজন পুরুষকে বোঝায়, তুমি পুরুষ তুমি অদম্য পেনিসের অধিকারী– অতএব তুমি যা চাইবে তাই পাবে, যেমন সিনেমায় নায়ক নায়িকাকে চড় মারছে আর হল ভর্তি তালি পড়ছে। সিনেমার নাম কবীর সিং। বক্স অফিসে চূড়ান্ত সাফল্য পাওয়া সেই সিনেমার ডিরেক্টর সন্দীপ ভাঙ্গা সেই চড়ের দৃশ্যকে জাস্টিফাই করার জন্য বলছেন– “If you can’t slap, if you can’t touch your woman wherever you want, if you can’t kiss, I don’t see emotion there.” অর্থাৎ ‘তুমি যদি তোমার মহিলাকে চড়ই না মারতে পারো, ইচ্ছেমতো যেখানে ইচ্ছে সেখানে চুমু খেতেই না পারো তবে আমি কোনও আবেগ দেখতেই পাই না।’ সমস্ত কনসেন্টের ধারণাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে সন্দীপ ভাঙ্গা এই দাবি করছেন অবলীলায়।
মনে পড়ে যায় কর্ণাটক বিধানসভায় একজন সাংসদ এর উক্তি– ‘When rape is inevitable lie down and enjoy.’ (যখন ধর্ষণ অবশ্যম্ভাবী তখন শুয়ে থাকো আর মজা নাও!) আর তাঁর এই মন্তব্যের পরেই হাসির রোল ওঠে বিধানসভায়।
এই হাসি, প্রতিনিয়ত নারী-শরীরকে ভোগ্যপণ্য ভাবা মানসিকতাই ধর্ষক তৈরি করে। এটা না-ভাঙতে পারলে নারীদের নিস্তার নেই। হয়তো এর পরেই শুরু হবে নির্যাতিতার ওপর দোষ চাপানো, যেমনটি প্রতিটি ধর্ষণ কাণ্ডের পর হয়– ভিক্টিম ব্লেমিং। যেমন একজন কবি বলেছেন–
আগামীকাল কেউ তোমায় ধর্ষণ করবে
আর তারপর তোমারই উপর দোষ চাপাবে।
বলবে–
দোষ তোমার ছোট কাপড়ের
দোষ তোমার ঊরুর
দোষ তোমার স্তনের
দোষ তোমার ঘাড়ের
দোষ তোমার হাসির
দোষ তোমার কোমরের
দোষ তোমার হাতের
দোষ তোমার পায়ের
বা
দোষ তোমার জুতোরও হতে পারে…
[‘Tomorrow someone will Rape you’ কবিতাটির একটি অংশের ভাবানুবাদ]
সবশেষে প্রশ্নটা থেকেই যায়– তবে কি এই ধর্ষণ উপত্যকায় নারীদের কোনও নিস্তার নেই?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved