Robbar

নিছক ‘খেলনা’ নয়

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 26, 2026 3:01 pm
  • Updated:February 26, 2026 3:02 pm  

বাঁদর ছানার ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তার আঁকড়ে থাকা ওরাংওটাং আকৃতির নরম পুতুলটির চাহিদা হঠাৎ করেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছে। সুইডেনের সংস্থা আইকিয়ার তৈরি এই পুতুলটি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, আমেরিকা-সহ বিভিন্ন দেশে অল্প সময়ের মধ্যেই দোকান থেকে শেষ হয়ে গিয়েছে। বহু মানুষ এই একই ধরনের পুতুল খুঁজতে শুরু করেছেন, ফলে অনেক জায়গায় নতুন করে সরবরাহের প্রয়োজন পড়ছে। মানুষ সেই পুতুলটির মধ্যে খুঁজে পাচ্ছে তার একমাত্র সান্ত্বনা ও নিরাপত্তার আশ্রয়।

আদিত্য ঘোষ

‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি…’– জীবনের শুরু থেকেই তো আমাদের শেখানো হয়েছিল বেঁধে বেঁধে থাকতে। একসঙ্গে বাঁচতে। পাশপাশি হাঁটতে। এইভাবেই তো আমরা পেরিয়ে এসেছি কতটা পথ। একসময় মনে হয়েছে একা থাকা বড় ভালো। কিন্তু তারপরে বুঝেছি, একা থাকা আদতে বিলাসিতা। ছোটবেলায় কোলবালিশ জড়িয়ে ঘুমোতে যাওয়া এই মধ্যবিত্ত মনে একা থাকার ভয় ছিল। কিন্তু সেই ভয়ের কথা কাউকে বলতে পারিনি। কোলবালিশ জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি কতরাত। দুরুদুরু বুকে তারা গুনেছি অপেক্ষায়, তোমার ফোন আসেনি। আবার কোলবালিশ জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। সদ্য কৈশোর ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে উপরে এসে এসেছি, কোলবালিশ জড়িয়ে ভেবেছি, প্রেমিকারা কি এমনই হয়? জীবনে তখনও বুঝিনি কোনও জড় পদার্থ আমাকে কতটা শান্তি দিতে পারে। সেদিন সমাজমাধ্যমে পাঞ্চের ভিডিও দেখে বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠল। একটা বাঁদর ছানা একটি পুতুলকে জড়িয়ে আছে। চোখ ছলছল করছে ছোট্ট বাঁদর ছানার। একবার সে পুতুলটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত, আবার তাকে জড়িয়ে ধরছে। কখনও পুতুলের হাত ধরে আছে। প্রতিটা দৃশ্য অন্য একটা দৃশ্যের জন্ম দিচ্ছে। প্রতিটা মুহূর্ত, একটা বেঁচে থাকার গল্প বলছে। মনে পড়ে গেল আমার কোলবালিশ জড়িয়ে ঘুমানোর কথা। হাওয়া বয়ে এল অবিরাম, ভাসিয়ে নিয়ে গেল জীবনের মরুশহরে।

ঘটনাটি জাপানের একটি চিড়িয়াখানার। জাপানের ইচিকাওয়া সিটি জু-তে জন্ম হয়েছিল একটি ছোট বাঁদরছানার। চিড়িয়াখানার কর্মীরা তার নাম রাখেন ‘পাঞ্চ’। কিন্তু জন্মের পর থেকেই ছোট বাঁদরছানার জীবনে শুরু হয় এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা। সাধারণত বাঁদরছানা জন্মের পর মায়ের শরীর আঁকড়ে ধরে থাকে। মায়ের উষ্ণতা, দুধ এবং স্পর্শই তার বেঁচে থাকার প্রধান ভরসা। কিন্তু এক্ষেত্রে সেই স্বাভাবিক দৃশ্যটি ঘটেনি। তার মা অজানা কারণে তাকে গ্রহণ করেনি। তাকে দূরে সরিয়ে রাখে। প্রাণীজগতে এই ধরনের ঘটনা বিরল নয়। এমন ঘটনা কুকুর, বিড়ালদের মধ্যে হামেশাই দেখা যায়। তবে সেই সদ্যোজাত ছানাটি বিপদে পড়ে যায়। তখন ছানাটির বেঁচে থাকা এবং মানসিক বিকাশ– দুটোই প্রশ্নচিহ্নের সামনে এসে দাঁড়ায়। সেই সময় চিড়িয়াখানার কর্মীরা বুঝতে পারেন, পাঞ্চের শারীরিক এবং মানসিক আশ্রয় প্রয়োজন। কারণ বাঁদরছানারা শুধু খাবারের জন্য নয়, মানসিক নিরাপত্তার জন্যও মায়ের শরীর আঁকড়ে থাকে। তাই তারা তাকে একটি নরম পুতুল দেয়। আশ্চর্যজনকভাবে, পাঞ্চ সেই পুতুলটিকে সঙ্গে সঙ্গে নিজের সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। সে পুতুলটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, তাকে নিয়ে ঘুময়, তাকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকে, ঠিক যেমন একটি স্বাভাবিক ছানা তার মায়ের সঙ্গে থাকে। পুতুলটি তার কাছে নিছক ‘খেলনা’ ছিল না। ছিল তার নিরাপত্তা, তার একমাত্র সঙ্গী। এই দৃশ্য ধীরে ধীরে নেটিজেনদের নজরে আসে। পরে যখন এই ভিডিও প্রকাশ্যে আসে, তখন তা সারা পৃথিবীতে ভাইরাল হয়ে যায়। নেটিজেনরা পাঞ্চের মধ্যে শুধু একটি বাঁদরছানাকে দেখেনি, তারা দেখেছিল এক পরিত্যক্ত শিশুর নিঃসঙ্গতা। তার পুতুল আঁকড়ে থাকার দৃশ্য মানুষের নিজের জীবনের একাকিত্ব, হারিয়ে ফেলা সম্পর্ক এবং মানসিক আশ্রয়ের প্রয়োজনের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিড়িয়াখানার কর্মীরা পাঞ্চকে অন্য বাঁদরদের সঙ্গে মেশানোর চেষ্টা করছেন, যাতে সে স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফিরে যেতে পারে।

জড় বস্তুর সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্কের বিষয়টি নিছক আবেগের দুর্বলতা নয়, বরং মানুষের মনস্তত্ত্বের এক স্বাভাবিক দিক। মনোবিজ্ঞান বলছে, মানুষ তার অনুভূতি, স্মৃতি এবং নিরাপত্তাবোধকে অনেক সময় কোনও নির্দিষ্ট বস্তুর মধ্যে প্রতিস্থাপন করে। শৈশবের একটি খেলনা, পোশাক, পুতুল ইত্যাদি শিশুর কাছে যেমন মায়ের বিকল্প হয়ে ওঠে, তেমনই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাছেও একটি পুরনো চিঠি, একটি ঘড়ি বা একটি বই হয়ে উঠতে পারে প্রিয় মানুষের প্রতীক। এই বস্তুগুলো তখন আর নিছক ব্যবহারিক জিনিস থাকে না, তারা হয়ে ওঠে স্মৃতির ধারক এবং মানসিক আশ্রয়। বিশেষ করে একাকিত্ব, শোক বা অনিশ্চয়তার সময় মানুষ জড় বস্তুর মধ্যে স্থায়িত্ব খুঁজে পায়। মানুষ বদলে যায়, সম্পর্ক ভেঙে যায়, কিন্তু বস্তু একই রকম থাকে। এই স্থায়িত্বই তাকে মানসিক নিরাপত্তা দেয়। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সম্পর্কের একটি অর্থ আছে। আধুনিক সমাজে মানুষের জীবন যত দ্রুতগতির এবং অনিশ্চিত হয়েছে, ততই মানুষ নিজের অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা খুঁজতে চেয়েছে কোনও স্থায়ী কিছুর মধ্যে। একটি পুরনো কলম, ডায়েরি বা একটি ব্যবহৃত আসবাব তখন হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত ইতিহাসের অংশ। বস্তুটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবনের নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট অনুভূতি এবং নির্দিষ্ট মানুষ। ফলে বস্তুটি হারিয়ে গেলে মানুষ শুধু একটি জিনিস হারায় না, সে তার নিজের জীবনের একটি অংশ হারানোর অনুভূতি পায়। এই কারণেই দেখা যায়, আর্থিক দিক থেকে মূল্যহীন কোনও বস্তু মানুষের কাছে আবেগগত দিক থেকে অমূল্য হয়ে ওঠে। এই প্রবণতা মানুষের অস্তিত্বগত একাকিত্বের সঙ্গেও যুক্ত। মানুষ একমাত্র প্রাণী, যে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন এবং নিজের ক্ষয় সম্পর্কে জানে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ জড় বস্তুর মাধ্যমে এক ধরনের স্থায়িত্ব তৈরি করতে চায়। জড় বস্তু তখন মানুষের অনুভূতির বাহক হয়ে ওঠে, মানুষের জীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে ওঠে। তাই জড় বস্তুর সঙ্গে মানুষের এই আত্মিক সম্পর্ক আসলে জড়ের সঙ্গে নয়, নিজের স্মৃতি, পরিচয় এবং অস্তিত্বের সঙ্গেই জুড়ে রয়েছে।

১৯৫০-এর দশকে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী হ্যারি হার্লো মা-হারা বাঁদরছানাদের নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করেছিলেন। তাদের সামনে রাখা হয়েছিল দু’টি কৃত্রিম বানর। একটি ছিল শক্ত লোহার তৈরি, যার সঙ্গে খাবারের ব্যবস্থা ছিল।অন্যটি ছিল নরম কাপড়ের তৈরি, যার কাছে কোনও খাবার ছিল না। বাস্তবে দেখা গিয়েছিল, ক্ষুধা মেটানোর পর তারা বারবার ফিরে যাচ্ছে সেই কাপড়ের তৈরি নরম মায়ের কাছেই। তারা তাকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকছে, যেন তার মধ্যেই খুঁজে পাচ্ছে নিরাপত্তা এবং আশ্রয়। হার্লোর এই পরীক্ষা দেখিয়ে দিয়েছিল, বেঁচে থাকার জন্য শুধু খাদ্য নয়, স্পর্শ, সান্নিধ্য এবং মানসিক নিরাপত্তাও সমান প্রয়োজনীয়। ছোটবেলার ফেলে আসা কোনও পোশাকে এখনও যদি গায়ের গন্ধ পাই, মনের ভিতরটা কেমন আঁকুপাঁকু করে ওঠে। তোমার দেওয়া বইয়ের পাতায় যদি তোমার হাতের লেখা দেখি, বুকের ভিতরে অজস্র জলরাশি হামাগুড়ি দিতে থাকে। মনে হয়, বইটাকে সঙ্গে রাখি সবসময়। ভালো হবে তাহলে সবকিছু। প্রচণ্ড মনখারাপের দিনে যখন চোখের জল মুছি চুপিসারে, তখন তো আঁকড়ে ধরি সঙ্গে থাকা কোলবালিশকেই। আমাদের জীবনে এমন জড় বস্তুগুলো কখন যে সজীবতাকেও অতিক্রম করে যায়, আমরা বুঝতে পারি না। আমাদের অজান্তেই জড় বস্তু তখন ভীষণ প্রানবন্ত হয়ে ওঠে। যতবার ভিডিওটা চোখের সামনে এসেছে,ততবার বুকে ঢেউ উঠেছে। মনে হয়েছে আঁকড়ে ধরি জীবনের না পাওয়াগুলোকে। বাঁদর ছানার ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তার আঁকড়ে থাকা ওরাংওটাং আকৃতির নরম পুতুলটির চাহিদা হঠাৎ করেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছে। সুইডেনের সংস্থা আইকিয়ার তৈরি এই পুতুলটি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, আমেরিকা-সহ বিভিন্ন দেশে অল্প সময়ের মধ্যেই দোকান থেকে শেষ হয়ে গিয়েছে। বহু মানুষ এই একই ধরনের পুতুল খুঁজতে শুরু করেছেন, ফলে অনেক জায়গায় নতুন করে সরবরাহের প্রয়োজন পড়ছে। মানুষ পাঞ্চের মধ্যে দেখেছে এক পরিত্যক্ত সন্তানের অসহায় নিঃসঙ্গতা এবং সেই পুতুলটির মধ্যে খুঁজে পাচ্ছে তার একমাত্র সান্ত্বনা ও নিরাপত্তার আশ্রয়।এই কারণেই পুতুলটি ধীরে ধীরে একটি সাধারণ খেলনার সীমা ছাড়িয়ে এক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

অনেকেই এই পুতুল কিনেছেন সহানুভূতির প্রকাশ হিসেবে, আবার অনেকেই কিনেছেন নিজের অজানা একাকিত্বের নীরব সঙ্গী হিসেবে। এই প্রবণতা প্রমাণ করে, মানুষ অনেক সময় কোনও জড় বস্তুর মধ্যেই খুঁজে নেয় মানসিক স্থিরতা এবং সম্পর্কের অনুভূতি। যখন কোনও বস্তু একটি জীবন্ত আবেগের বাহক হয়ে ওঠে, তখন তার ব্যবহারিক প্রয়োজনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার মানসিক মূল্য। হয়তো সেই কারণেই পাঞ্চের ভিডিও আমাদের এত অস্থির করে দিয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই কোনও না কোনও সময় একটি জড় বস্তুকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থেকেছি।কখনও একটি কোলবালিশ, কখনও একটি পুরনো বই, কখনও একটি গন্ধ, কখনও একটি স্মৃতি। বাস্তব আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও, এই জড় আশ্রয়গুলো আমাদের ছেড়ে যায় না। তারা নীরবে আমাদের একাকিত্বের সাক্ষী হয়ে থাকে। হয়তো সেই কারণেই, পৃথিবী যতই আমাদের একা করে দিক না কেন, আমরা পুরোপুরি একা হয়ে যাই না। কোথাও না কোথাও, কোনও না কোনও পুতুলকে আমরা এখনও আঁকড়ে ধরে আছি।