
এসআইআর আমাদের কাছে হয়তো কাগজ, পরিচয়, হাজিরা দেওয়া, বারবার ওয়েবসাইট চেক করা, বিডিও-র অতিরিক্ত দায়িত্বের দুশ্চিন্তা। কিন্তু মানুষের মন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে উঠে আসে একেবারে ভিন্ন কিছু ছবি। এসআইআর-সক্রিয় দেশে আজকের দিনে এই আঘাতের সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছেন অনেকে। তারই কয়েকটি দৃশ্যের কোলাজ।
‘ফিলিং অ্যাট হোম’– ইংরেজিতে বহুল ব্যবহৃত একটি কথা। এর সঙ্গে ‘বাড়িঘর’-এর কোনও সম্বন্ধ নেই। এর অর্থ: স্বচ্ছন্দ বোধ করা, নিরাপদ বোধ করা।
মনস্তত্ত্বের ভাষায় আমরা একটি শব্দ ব্যবহার করি– ‘সিকিওর বেস’, অর্থাৎ নিরাপদ ভিত্তি। এই ধারণাটি আসে বিশিষ্ট ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জন বোলবি-র ‘অ্যাটাচমেনট থিওরি’ থেকে, যা বলে, মানুষের মানসিক বিকাশের জন্য একটি নিরাপদ ভিত্তি প্রয়োজন– যেখানে সে জানবে, সে নিঃশর্তভাবে গ্রহণযোগ্য, নিরাপদ এবং সে এই পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আমরা প্রায়ই বলি, বাড়ি মানে তো আর ‘চার দেওয়াল’ নয়। কিন্তু বাড়ি যে চার দেওয়াল, যার ভিত্তি সত্যিই প্রাথমিকভাবে একটি ‘ফিজিক্যাল স্পেস’, খানিকটা ভৌত জমি– সেটা আমরা বুঝি তখনই, যখন সেই দেওয়াল ভাঙার শব্দ শোনা যায়।

পেশার কারণে মানুষের মনের খুব কাছে আসার সুযোগ হয় আমাদের। রঙিন মোড়কের আড়ালের নিপাট মানুষটিকে দেখতে পাই। দেখি, মহীরুহের মতো ব্যক্তিত্বও কীভাবে শিশুর মতো ভেঙে পড়ে, কান্নায়, অসহায়তায়। ব্যক্তিত্বের আড়ালের ব্যক্তিকে দেখতে পাই।
এসআইআর আমাদের কাছে হয়তো কাগজ, পরিচয়, হাজিরা দেওয়া, বারবার ওয়েবসাইট চেক করা, বিডিও-র অতিরিক্ত দায়িত্বের দুশ্চিন্তা। কিন্তু মানুষের মন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এর বাইরের একেবারে ভিন্ন ছবি ধরা পড়েছে আমার চোখে। তারই কয়েকটি দৃশ্য ভাগ করে নিই।
দৃশ্য: ১
দেশে পরিত্যক্ত সন্তানের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ভারত সরকারের নারী ও শিশুশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-’২১-এ ভারতে ৪৫২১ জন অনাথ, পরিত্যক্ত শিশু অভিভাবকতা-অনুসন্ধান/ অ্যাডপশন পোর্টালে লিপিবদ্ধ ছিল। এই সংখ্যা ২০২২-’২৩-এ ৫৬৬৩-এ উঠেছে, যা প্রায় ২৫% বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
কোনও শিশু জন্মের পরই পরিত্যক্ত, কেউ খানিক বড় হওয়ার পর। বাবা-মা রেখে যান দাদু-ঠাকুরমার কাছে। কেউ বিবাহবিচ্ছেদের পর অথবা স্বামী বা স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সন্তানকে ফেলে রেখে নতুন করে সংসার গড়েন। তেমনই গল্প কল্যাণীর পৃথার।
পৃথা সিক্সে আর পৃথার দাদা তখন উচ্চমাধ্যমিক দেবে। সেই সময়ে তাদের মা দুরারোগ্য ব্যাধিতে মারা যান। বাবা দুই ভাইবোনকে সরকারি হোস্টেলে ভর্তি করে দিয়ে আসেন। কিন্তু, বছরের পর বছর যায়, বাবা আর ফিরে আসেননি। হোস্টেল থেকে বাড়ি গিয়ে দেখা গিয়েছে, বাড়ির গেটে তালা। আত্মীয়স্বজনও দায়িত্বের ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সেই থেকে সংগ্রাম শুরু দুই ভাইবোনের।
টিউশনি করে, শিক্ষকদের সাহায্য নিয়ে নিজের এবং বোনের পড়াশোনা চালায় দাদা। নিজে কোনওরকমে গ্র্যাজুয়েশন করেই চাকরি শুরু করে আর বোনকে পড়ায়– সে যতদিন পড়তে চায়। আজ দাদা বড় কর্পোরেট অফিসের সেলস ম্যানেজার, বোন সরকারি চাকরি করেন। তাঁরা দু’জনেই আজ জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত– কোনও অভিভাবক বা আত্মীয়ের সাহায্য ছাড়াই।

কিন্তু তারপর আসে এসআইআর। নথির প্রয়োজনে সেই বাবার সন্ধানেই আবার ফিরতে হয় তাঁদের। সন্ধান পেয়ে জানতে পারেন, বাবা নতুন করে সংসার পেতেছেন। তাঁর আছে দুই সন্তান– যারা তাঁকেই ‘বাবা’ বলে ডাকে, যাদের মাথার ওপর আছে পরিবারের ছায়া।
এতদিন বুকে কষ্ট চেপে, সংসারের গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীতে কাঁধে-কাঁধ রেখে লড়াই করেছে দুই ভাই-বোন। রাগ-কষ্ট-অভাব– কোনও কিছুকেই তোয়াক্কা করেনি, ভেঙে পড়েনি। কিন্তু, এতদিন পর সেই জন্মদাতা বাবার মুখোমুখি হয়ে যেন বাঁধ ভেঙে যায় দু’জনের। জানতে ইচ্ছে হয়, কী দোষ ছিল তাদের, যে-কারণে তাঁদের ফেলে রেখে চলে গেলেন তাঁদের বাবা; কোনও নিরাপত্তা ছাড়া, কারও স্নেহচ্ছায়া ছাড়া এমন সংগ্রাম করে অনাথের মতো বড় হতে হল তাঁদের!
পৃথাদের কাছে এসআইআর কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়– খুঁচিয়ে তোলা এক হৃদয়বিদীর্ণ করা ক্ষত, যা কোনওরকমে ঢেকে পথ চলছিল তাঁরা, যা নিয়ে আসে ভয়ংকর মানসিক ঝড়। মনোবিদরা বলবেন, ‘রি-অ্যাকটিভেশন অফ অ্যাটাচমেন্ট ইনজিওরি’, সম্বন্ধজনিত আঘাতের পুনঃসক্রিয়তা। এসআইআর-সক্রিয় দেশে আজকের দিনে এই আঘাতের সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছেন অনেক পৃথারা।
দৃশ্য: ২
সোদপুরের কল্যাণী দেবীর বয়স ৬৭। ছেলে, বউমা, নাতনি থাকে টেক্সাসে। এখানে তিনি থাকেন আয়া আর গৃহরক্ষকদের তত্ত্বাবধানে। ভিডিও কলে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। কিন্তু, নাতনি সারার সঙ্গে তাঁর আলাপ খুব একটা জমে না। কারণ তাঁর কথায় চাটগাঁইয়া টান। টেক্সাসে বড় হওয়া সারা বাংলাই ভালো বোঝে না– ঠাম্মির ভাষা শুনে সে হাসে।
কল্যাণী দেবী যখন সারার বয়সি, তখন থেকেই তার এক সমস্যা ছিল। ট্রেনের হুইসেল শুনলে তিনি ভয় পেতেন। হাত-পা কাঁপত, বমি বমি লাগত। এর আছে শৈশবের এক স্মৃতি। খুব ছেলেবেলায় ওপার বাংলা থেকে তাঁকে নিয়ে চলে আসছিলেন বাবা। আসার সময় ট্রেনের ভিড়ে হারিয়ে যান তাঁর বাবা। তিন বছরের কল্যাণী স্টেশনে প্রায় ২৪ ঘণ্টা একা বসে কেঁদেছিলেন, যতক্ষণ না এক প্রতিবেশী কাকা তাঁকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করেন। সেই কাকার কাছেই বড় হন কল্যাণী দেবী।
কিন্তু সেই ২৪ ঘণ্টার আতঙ্কে একটি শব্দ গেঁথে গিয়েছিল তাঁর স্নায়ুতন্ত্রে– ট্রেনের হুইসেল। ট্রেনের হুইসেল শুনলেই আতঙ্কের অনুভব হওয়া, অর্থাৎ, ট্রমা-ইনডিউসড-প্যানিক অ্যাটাক। এ সমস্যা তাঁর ছিল বহুদিন– যৌবনের গোড়ার দিক অবধি। তারপর তিনি পড়াশোনা করেছেন, বিয়ে করেছেন, স্বামীর কর্মসূত্রে থেকেছেন দেশের নানা প্রান্তে, আজ তাঁর প্রতিষ্ঠিত সন্তান, নাতনি। সমস্যা ধীরে ধীরে মিলিয়েও গিয়েছিল।
কিন্তু এসআইআর প্রসঙ্গ শুরু হওয়ার পর সেই পুরনো আতঙ্ক আবার ফিরে এসেছে। বর্তমানে টিভিতে ট্রেনের হুইসল শুনলেও আতঙ্ক হচ্ছে তাঁর। বয়সের চাপ, একাকিত্বের ভারে সে আতঙ্ক আরও ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। প্রথম দিন ঘটনাটা হয় একটি সিরিয়াল দেখতে দেখতে। পরিচারিকা বুঝতেই পারেননি হঠাৎ এমন কেন ছটফট করছেন কল্যাণীদেবী।
ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। যার একবার ঘর ভেঙেছে, সেই জানে ঘর ছেড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা। একে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়, ‘ট্রমা রি-অ্যাকটিভেশন’– অর্থাৎ, পুরনো নিরাপত্তাহীনতার স্মৃতি নতুন প্রেক্ষাপটে জেগে ওঠা।
কল্যাণী দেবী প্রায়ই ছেলেকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আমারে কি ফের তাইড়ে দিবে, বাপ?’
ভিডিও কলের ওপারে অস্থির হয়ে ওঠেন ছেলে। বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মানুষের মন যুক্তির চেয়ে স্মৃতিকে বিশ্বাস করে বেশি। কল্যাণী দেবী এখন মনোচিকিৎসকের চিকিৎসাধীন।

মনের চোখ দিয়ে দেখলে পুরো পৃথিবীটাই একেবারে অন্যরকম। মানুষ তো রোজ লড়াই করছে। ঘরের ভেতরে-বাইরে, নিজের সঙ্গে, অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভভাবে, অসাম্যের সঙ্গে, দুর্নীতির সঙ্গে, ভাগ্যের সঙ্গে, নিজের লোকেদের সঙ্গে, নিজের সঙ্গে।
কিন্তু, সান্ত্বনা যে একটাই, সব লড়াই শেষে, ঘরে ফেরা যায়।
সে ৪০ তলার হাইরাইজ হোক কি দশফুট বাই দশফুট। সেইটেই নিরাপত্তার আস্তানা। সেখানে স্বপ্নরা বড় হয়। স্মৃতিরা আদুরে রোদ মেখে থাকে। বাড়ি-ইট-কাঠ-পাথরই নয়, আমাদের ‘সিকিওর বেস’। যখন সেই নিরাপত্তার ভিত নড়ে যায়, ভিটে প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন এক প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও অস্তিত্ব-সংকটের আতঙ্কে পরিণত হয়।
প্রশাসন তো নিজের কাজ করবেই। তবু, নাগরিক সুবিচার যেন রক্ষিত হয়।
দিনশেষে এটুকুই চাওয়া: দিনশেষে সবার যেন ফেরার মতো একটি ঘর থাকে, থাকে নিঃশর্ত আশ্রয়।
[সমস্ত চরিত্রের নাম পরিবর্তিত। লেখায় ব্যবহৃত ছবিগুলি প্রতীকী]
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved