spring in nandalal bose's art inspired by rabindranath | Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

রবীন্দ্র-নন্দলালের চিরন্তন বসন্তরূপ

যেভাবেই হোক শান্তিনিকেতনের মাটি যে একবার ছুঁয়েছে, তার আর নিস্তার নেই। সেখানের প্রকৃতি তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরবেই। ঋতুতে ঋতুতে সাজবদল ঘটে যায়। তালপাতার গুটি কেমন অজন্তার নারীর কর্ণভূষণ হয়ে ওঠে, তা গুরুদেব নিজেই উপলব্ধি করলেন জাভার নৃত্যরতা মেয়েদের দেখে, ততদিনে তাঁর ছাত্রীরাও গাছের ফুলপাতা দিয়ে সাজতে শিখে গিয়েছে।

Published by: Robbar Digital

Posted:March 5, 2026 6:00 pm | Updated:March 5, 2026 6:00 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

ছেলেবেলায় স্কুলের রচনা লেখায় ‘বসন্ত’ ছিল ছয় ঋতুর একটি ঋতু মাত্র– ফাল্গুন ও চৈত্র– এই দুই মাস লইয়া বসন্তকাল। মফসসল শহরে বসন্তের আগমন ঘোষিত হত নিমবেগুন আর সজনে ফুল ভাজায়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকত ‘বসন্ত’ রোগের ভয়। দু’-একটা জলফোসকা, আর তারপরেই জ্বর। এসবের ফাঁক দিয়ে কোনও দিন পলাশ বা শিমুলগাছে ফুল দেখে মুগ্ধ হয়েছি বলে আজ আর মনে পড়ে না।

zoom
নন্দলাল বসুর আঁকা বসন্তের ছবি

সত্যিকারের ‘বসন্ত’কে একদিন চিনতে পারলাম বোলপুরে গিয়ে ভুবনডাঙার জলা মাঠটা পেরিয়ে। শান্তিনিকেতন ফার্স্ট গেট পেরিয়ে বাঁদিকে গেলে অথবা সোজা সেন্ট্রাল অফিসের মোড় পেরিয়ে যেতে যেতে দু’-দিকে ছাতার মতো শিরীষ গাছের বিশালত্ব দেখে মুগ্ধ হতে হতে এদিক-ওদিক তাকালে পলাশ চোখ টানবেই। রিকশা করে কলাভবন পেরিয়ে হোস্টেলের পিছন দিকে সেই বিখ্যাত হলুদ পলাশের গাছ, যার উল্টোদিকেই শান্তিদেব ঘোষের বাড়ির মাঝে তখনও ছিল না কোনও দুর্ভেদ্য প্রাচীর।

হ্যাঁ, শান্তিনিকেতনে ‘বসন্ত’ রোগের প্রকোপ আরও তীব্র। তাকে ‘মনের ব্যারাম’ না ‘মনের আরাম’– কোনটা বলব, জানি না। শীতের সোয়েটারের বর্ম আর মাফলারের ঘোমটা ছেড়ে ওপর দিকে তাকাতেই ‘আকাশ আমার ভরল আলোয়’। সকালে সামান্য ঠান্ডা আর বেলা বাড়লেই উষ্ণতার ছোঁয়া। এ উষ্ণতা মাপা থার্মোমিটারের কর্ম নয়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধের মুখে সারা শান্তিনিকেতন জুড়ে আমের বউলের নেশা-ধরানো গন্ধ। ‘মন ভালো’ আর ‘মনখারাপের’ এ এক অদ্ভুত কম্বিনেশন। সংগীত ভবনের রাস্তা দিয়ে ওই দূরে সাইকেল নিয়ে হেঁটে চলে যায় ঢলঢলে পাজামা পরে দাড়িওলা ছেলে– পাশে পাশে ‘তন্বী শ্যামা শিখরদশনা’, পরনে তার ঢাকাই শাড়ি না-থাকলেও, মাথায় বুনোফুল। সেই বসন্তে যে ফাঁদ পাতাই থাক, তাতে তারা ধরা পড়েছিল কি না, আজও জানি না, তবে পাশাপাশি সেই দু’জনের চলে যাওয়ার ছবি আজও অমলিন– যেন ‘অনন্তের বাণী’, ‘বসন্তের মাধুরী’।

যেভাবেই হোক শান্তিনিকেতনের মাটি যে একবার ছুঁয়েছে, তার আর নিস্তার নেই। সেখানের প্রকৃতি তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরবেই। ঋতুতে ঋতুতে সাজবদল ঘটে যায়। তালপাতার গুটি কেমন অজন্তার নারীর কর্ণভূষণ হয়ে ওঠে, তা গুরুদেব নিজেই উপলব্ধি করলেন জাভার নৃত্যরতা মেয়েদের দেখে, ততদিনে তাঁর ছাত্রীরাও গাছের ফুলপাতা দিয়ে সাজতে শিখে গিয়েছে।

zoom
বসন্তোৎসব। শিল্পী: সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়

একদিন এক বসন্তের সকালে উজ্জ্বল হলুদ আলোর মতো বসনে ‘বসন্তিকা’রা ভিড় করে এল। জড়ো হল আম্রকুঞ্জের আশপাশে। গলায় হাতে রূপদস্তার রূপোলি গয়না। কণ্ঠে পলাশকুঁড়ির কণ্ঠী আর পলাশের মালা।

মৃদঙ্গের তালের সঙ্গে আমগাছের গুঁড়ি ঘিরে ঘুরে ঘুরে এগিয়ে চলে হলুদের শোভাযাত্রা– যেন কোনও এক অদৃশ্য শিল্পীর হাতে বাসন্তী রঙের আলপনা। আকাশের গায়ে মন্দিরা ধরা দু’টি হাত ওঠে আর নামে। হাতে আবিরের ডোঙা নৌকার মতো ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলে আর বেড়ার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকের ‘চক্ষে ঘনায় ঘোর’।

zoom
পলাশ। শিল্পী: সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়

এ তো ৫০ বছর আগের ছবি। পিছিয়ে যাই সেই ১৯৩০ থেকে ৩৪-এ। এক শিল্পী ও এক গায়ক-নর্তকের পরিকল্পনায় বসন্তের শোভাযাত্রার এক সংঘবদ্ধ রূপ ধাপে ধাপে রচিত হয়েছিল। তার আগে ১৯২৭-এ বালিদ্বীপে গিয়ে কবি নৃত্যগীতময় শোভাযাত্রা দেখে বিস্মিত হয়ে লিখলেন– ‘কী শোভা, কী সজ্জা, কী আভিজাত্যের বিনয়সৌন্দর্য! এমনি করে নানা পথ বেয়ে বেয়ে বহুবর্ণবিচিত্র তরঙ্গিত উৎসবের অবিরাম প্রবাহ।’ নন্দলালকে বালির নৃত্যগীত ও সাজসজ্জার সেই সৌন্দর্য দেখাতে পারলেন না-বলে যথেষ্ট আক্ষেপ করে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখলেন। ১৯১৪-তে সেই শিল্পী কবির ডাকেই প্রথম শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। আর তারপরেই কবি প্রশ্ন রাখলেন তাঁর ‘শান্তিনিকেতন’ প্রবন্ধে ‘‘শিল্পী কী করে? সে কেন শিল্প রচনা করে? বিধাতা বলেছেন, ‘আমি এই-যে উৎসবের লণ্ঠন সব আকাশে ঝুলিয়ে দিয়েছি, তুমি কি আলপনা আঁকবে না?’’

zoom
বসন্ত নৃত্যনাট্যের মঞ্চসজ্জা। শিল্পী: সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়

শান্তিনিকেতনে আসা নতুন শিল্পী ঋতুতে ঋতুতে প্রকৃতির পাগলামির সঙ্গে পাগল হলেন আর সবাইকে পাগল করে তুললেন তাঁর ছবি আর আলপনার রেখায় রেখায়। কবির লেখার ১৭ বছর পর শিল্পী শান্তিনিকেতনে সেই আদি বসন্তোৎসবের রূপটি রচনা করলেন ‘আপন মনের মাধুরী মিশায়ে।’ কবির প্রশ্নের উত্তরে তিনি বিধাতার অপরিমেয় ঋণ শোধ করার দায় তুলে নিলেন। বসন্তের অনুষ্ঠানের এমন অভাবনীয় রূপ আর কেউ কী কোনও দিন ভাবতে পেরেছে? কোন শিল্পী পেরেছে গুরুদেবের ‘সাধের সাধনা’ এভাবে রূপে বর্ণে সজ্জিত করে সফল করে তুলতে?

এই ছবিতে কী দেখি আমরা? আম্রকুঞ্জে গুরুদেবকে তিনি বসিয়েছেন বহুবর্ণরঞ্জিত এপ্লিকের চাদর পাতা বেদির উপর। এক বিশাল অর্ধবৃত্তের পরিধি রচনা করেছেন তাঁকে ঘিরে। মাঝখানে বিশাল শ্বেতশুভ্র আলপনা। বাইরের অর্ধবৃত্ত সীমারেখা ধরে পরপর সাজানো রয়েছে আলপনা আঁকা মাটির সরা। তারই মাঝে মাঝে রাখা হয়েছে পিতলের কলসি, নকশাশোভিত মাটির হাঁড়ি, নানা তৈজসপত্র– এগুলিতে ফুল পাতা রেখে সাজানো। সবথেকে চোখ টানে সামনে একটি স্থাপত্যরচনা, যা কিনা বসন্তেরই প্রতীক, যদিও এটির গড়ন চারচালা মন্দিরের মতো। ঠিক তুলসীমঞ্চ নয় এবং সেই মন্দিরের ওপরে প্রোথিত করা হয়েছে ফুল-সহ একটি পলাশগাছের ডাল। সব মিলিয়ে বসন্তবন্দনার একটি সার্থক নান্দনিক রূপ।

zoom
বসন্তের উৎসবে আম্রকুঞ্জে গুরুদেব

আমাদের আদি ব্রত-আলপনার মধ্যে যে পূজা এবং আত্মনিবেদনের ভাব প্রকাশ পেয়েছিল একদিন, তারও কয়েকশো বছর পর শান্তিনিকেতনে প্রকৃতিদেবতার কাছে– বসন্তের প্রতি এ এক অভূতপূর্ব নান্দনিক নিবেদন। এক মহান কবি ও এক মহান শিল্পীর যুগল নৈবেদ্য। চিরন্তন চিরনবীন বসন্তের মৃত্যুঞ্জয়ী রূপ কবি দেখিয়েছিলেন ‘ফাল্গুনী’ নাটকে। আর শিল্পী বসন্তোৎসবের এই শৈল্পিক উপস্থাপনায় বসন্তের চিরনূতন সুরটি বেঁধে দিয়ে গেলেন। যতবার এই ছবি দেখি, ততবারই মনে হয় সে যেন বারেবারেই প্রথম ফিরেফিরেই প্রথম ।

Alpana Basanta Utsav Design Nandalal Bose Palash Rabindra Sangeet Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sudhiranjan Mukherjee

Share this article on