Robbar

প্রতিবাদের ইতিহাস, প্রতিবাদীর ইতিহাস

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 11, 2026 4:31 pm
  • Updated:March 11, 2026 8:05 pm  

দক্ষিণপন্থার উত্থান আর সাম্প্রদায়িকতার বিপদের বিস্তার যে-ফ্যাসিবাদের আগমনেরই পদধ্বনি, তা সম্যকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন পানিক্কার। ২০০২-এর জানুয়ারিতে বেরয় তাঁর বই ‘বিফোর দ্য নাইট ফলস: ফোরবোডিংস অব ফ্যাসিজম ইন ইন্ডিয়া’। বুঝতেই পারছেন, আজকের ভারতে ঐতিহাসিক পানিক্কারের বইপত্র কতটা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিকভাবেই ভারত সরকারের কোনও মন্ত্রী পানিক্কারের মৃত্যুতে শোক জানাননি। 

সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়

দৃশ্যটা মনে পড়ে। ২৭ বছর আগের ঘটনা। ১৯৯৯ সাল। ১৩ দিন আর ১৩ মাসের সরকারের পতনের পর অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে যে মন্ত্রিসভা পাঁচ বছরের পুরো মেয়াদ শেষ করেছিল– সেই শাসন চলছে তখন। পুনর্গঠিত হয়েছে ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব হিস্টোরিকাল রিসার্চ’ বা ‘আইসিএইচআর’ ( ভারতীয় ইতিহাস অনুসন্ধান পরিষদ)। আর সেই নতুন কর্তাদের নির্দেশে বন্ধ হয়ে গিয়েছে ‘টুয়ার্ডস ফ্রিডম’ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত দু’টি খণ্ডের প্রকাশনার কাজ। এর প্রতিক্রিয়ায়, সারা দেশে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চার সঙ্গে যুক্ত মানুষরা প্রতিবাদে শামিল হন। প্রতিবাদী হয় কলকাতাও।

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী ভবনে একটি কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। এই কনভেনশনের ডাক দিয়েছিল এ রাজ্যের ইতিহাসচর্চার সংগঠন ‘পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ’। চটজলদি একটি পুস্তিকাও প্রকাশিত হয়। পুস্তিকার নাম ছিল ‘টুয়ার্ডস ফ্রিডম বিকৃতি ও কুৎসা’। দাম ১০ টাকা। সংসদের উৎসাহী সদস্যরা সভায় আগতদের বিষয়টা সম্বন্ধে বলে পুস্তিকা বিক্রি করছেন। এরকমই আগত একজন ব্যাপারটা শুনছেন। বাংলা যে পুরো বুঝতে পারছেন, তা নয়। তবে ১০ টাকা দিয়ে পুস্তিকাটি কিনে নিয়েছেন। সেই তরুণ কর্মী-বিক্রেতা আন্দাজ করতে পেরেছেন, ক্রেতা ‘বাঙালি‌’ নন, অথচ বাংলা পুস্তিকাটা কিনে নিলেন! নেহাতই কৌতূহলবশত তিনি ক্রেতার নাম জিজ্ঞেস করলেন। আর বিক্রেতাকে অবাক করে ক্রেতা জানালেন তিনি কে এন পানিক্কার। যে দু’জনের বই প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন সুমিত সরকার আর অন্যজন এই কে এন পানিক্কর। 

এই ঘটনাটা এ জন্যই উল্লেখ করলাম যে, পানিক্কার শুধু একজন ইতিহাসবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক দায়বদ্ধ কর্মী-লেখক। তাই মোটেই অবাক হচ্ছি না যে, তাঁর মৃত্যুর পরে যাঁরা যাঁরা প্রেস রিলিজের মাধ্যমে বা এক্স (আগেকার টুইটার) সমাজমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই পানিক্করকে স্মরণ করেছেন এক বিশিষ্ট ‘পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল’ হিসেবে। এই শোকবার্তা প্রেরকের তালিকায় শুধু যে ঐতিহাসিকরা আছেন, তা নয়। আছেন কেরলের মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ন থেকে আরম্ভ করে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী থেকে সিপিএম-এর কেরলের রাজ্য সম্পাদক গোবিন্দন অবধি অনেকেই।

কী বলছেন তাঁরা পানিক্কার সম্পর্কে? মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ন বলেছেন, পানিক্কার ধারাবাহিকভাবে তাঁর লেখায়, বক্তৃতায়, শিক্ষকতায় সমাজকে এটা বোঝানোর চেষ্টা করে গিয়েছেন যে এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ভারতে বহুত্ববাদ গড়ে উঠেছে। তা কোনওভাবে নষ্ট হলে বিনষ্ট হবে দেশের মূল ভিত্তি। রাহুল গান্ধীর প্রতিক্রিয়া খেয়াল করুন। রাহুল লিখেছেন, পানিক্কার যুক্তি, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ইতিহাসের সৎচর্চাকে সব সময় রক্ষা করে গিয়েছেন। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী মন্তব্য করেছেন, খুব কম মানুষই স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্যকে রক্ষা করার লড়াই লড়তে পারেন। ইতিহাসের সত্যরক্ষায় পানিক্কার ছিলেন অকুতোভয়।

ভাবছেন, এক বিশিষ্ট ইতিহাসবিদের প্রয়াণলেখ লিখতে গিয়ে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর প্রতিক্রিয়ার কথা বলছি কেন? বলছি এটা বোঝাতে যে, কীরকম এক দায়বদ্ধ ইতিহাসবিদ ছিলেন তিনি। যখন প্রশ্নটা রাইট বনাম লেফটে বিভক্ত, তিনি তখন লেফটের পক্ষে অর্থাৎ দক্ষিণপন্থী যে ঐতিহাসিক ঘরানায় সাধারণ মানুষের পরিবর্তে সমাজের উপরমহল বেশি গুরুত্ব পান, তিনি তার বিপক্ষে। তিনি আমজনতার সংগ্রাম তুলে ধরার পক্ষে। আবার এই বামপন্থী ধরনকে পক্ষপাত ভাববেন না। প্রশ্ন যখন ‘রাইট’ আর ‘রঙ’ অর্থাৎ সত্যি আর মিথ্যেকে নিয়ে, তিনি সব সময় সত্যের পক্ষে। 

কান্দিউর নারায়ণ পানিক্কারের জন্ম কেরলের গুরুবাউরে ১৯৩৬ সালের ২৩ এপ্রিল। তখন অবশ্য সেটা ত্রিবাঙ্কুর রাজ্য, যা ছিল মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত। কেরলেই তিনি স্কুলশিক্ষা এবং স্নাতক স্তরের পড়াশোনা করেন। পালাক্কাদের সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা শেষ করে পানিক্কর জয়পুরের রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

তাঁর শিক্ষকতা ছিল ব্যাপ্ত। প্রথমে পড়ানো রাজস্থানে। তারপর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হংসরাজ কলেজ এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে। তবে তাঁর শিক্ষকতার প্রধান পরিচয় জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) শিক্ষক হিসেবে। তিনি ১৯৭২ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে  যোগদান করেন। সেখানে তিনি ইতিহাসের অধ্যাপক, ‘সেন্টার ফর হিস্টোরিক্যাল স্টাডিজ’-এর প্রধান এবং পরে ‘স্কুল অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস’-এর ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান চর্চার জন্য জেএনইউ-এর যে খ্যাতি গড়ে উঠেছে, তার নেপথ্যে যে-অধ্যাপকদের অবদান অনস্বীকার্য পানিক্কর তাঁদের একজন। তিনি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর এবং ফেলো হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। উপাচার্য হয়েছিলেন কেরলের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের। শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা কাজ করেছেন। কেরালার ইতিহাস অনুসন্ধান পরিষদের দায়িত্বও পালন করেছেন। 

তাঁর গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনার নাম দেখলেই বুঝতে পারবেন তাঁর চিন্তার ধরন। মালাবারের কৃষক বিদ্রোহ নিয়ে তাঁর বিখ্যাত বই ‘এগেনস্ট লর্ড অ্যান্ড স্টেট: রিলিজিয়ন অ্যান্ড পেজান্ট আপরাইজিংস ইন মালাবার’। আরও দু’টি তাৎপর্যপূর্ণ বই হল ‘‘কালচার অ্যান্ড কনশাসনেস ইন মডার্ন ইন্ডিয়া’’ এবং ‘‘অ্যা কনসার্নড ইন্ডিয়ান’স গাইড টু কমিউনালইজম’’। তাঁর অন্য প্রকাশনার কথাও একটু বলা দরকার। ‘ব্রিটিশ ডিপ্লোম্যাসি ইন নর্থ ইন্ডিয়া’, ‘ন্যাশনাল অ্যান্ড লেফট মুভমেন্টস ইন ইন্ডিয়া, কালচার, ইডিওলজি অ্যান্ড হেজিমনি: ইন্টেলেকচুয়ালস অ্যান্ড সোশ্যাল কনশাসনেস ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া’, ‘কমিউনালিজম ইন ইন্ডিয়া: হিস্ট্রি, পলিটিক্স অ্যান্ড কালচার’, ‘কমিউনাল থ্রেট সেকুলার চ্যালেঞ্জ’, ‘অ্যাজেন্ডা ফর কালচারাল অ্যাকশন অ্যান্ড আদার এসেজেস’, ‘কলোনিয়ালিজম’, ‘কালচার অ্যান্ড রেজিজটেন্স’, ‘হিস্ট্রি আজ অ্যা সাইট অব স্ট্রাগল’, ‘কাস্ট ইন কেরালা’। 

লক্ষ করুন, তাঁর প্রকাশনার বিষয় সব সময়েই ঘোরাফেরা করেছে সমাজ রাজনীতিতে নানা প্রতিবাদ এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধকে ঘিরে। আটের দশকের শেষদিকে যখন বিজেপির উত্থান ঘটছে; শুরু হচ্ছে রামজন্মভূমি আন্দোলন; লালকৃষ্ণ আদবানি রথযাত্রার উদ্যোগ নিচ্ছেন; সেই সময় থেকেই তিনি সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে একের পর এক লিখছেন। চেষ্টা করছেন ভারতে সাম্প্রদায়িকতার উত্থানের ইতিহাস অনুসন্ধানের। সাম্প্রদায়িকতার বিপদের সামনে কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিস্পর্ধা গড়ে তোলা যায়– খুঁজছেন সেই পথ। স্পষ্ট কথা বলছেন। বিশ্বাস আর প্রকৃত ইতিহাসের বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে তাঁর লেখায়। ইতিহাসকে শ্রেণিকক্ষ আর পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। বরং মনে করেছেন ইতিহাসের দায়িত্ব, সংকটের সময়ে দেশ ও জাতিকে পথ দেখানো।

আসলে এই দক্ষিণপন্থার উত্থান আর সাম্প্রদায়িকতার বিপদের বিস্তার যে-ফ্যাসিবাদের আগমনেরই পদধ্বনি, তা সম্যকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন পানিক্কার। ২০০২-এর জানুয়ারিতে বেরয় তাঁর বই ‘বিফোর দ্য নাইট ফলস: ফোরবোডিংস অব ফ্যাসিজম ইন ইন্ডিয়া’ বুঝতেই পারছেন, আজকের ভারতে ঐতিহাসিক পানিক্কারের বইপত্র কতটা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিকভাবেই ভারত সরকারের কোনও মন্ত্রী পানিক্কারের মৃত্যুতে শোক জানাননি। ভারতে বস্তুবাদী ইতিহাসচর্চার শীর্ষ সংগঠন ভারতীয় ইতিহাস কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পানিক্কর। ২০০৮-এ হন এর সভাপতি। যেটা তাৎপর্যপূর্ণ, পানিক্কর যেমন ভারতে ফ্যাসিবাদের আগমনবার্তা দীর্ঘদিন আগে উপলব্ধি করে সকলকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, একইরকমভাবে পানিক্করের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চায় নিজেদের বিপদ আশঙ্কা করতে পেরেছিল হিন্দুত্ববাদী শক্তি। ‘টুয়ার্ডস ফ্রিডম’ প্রকল্প গৃহীত হয়েছিল দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ের শেষ পর্বের নথিপত্রকে সংকলিত করার লক্ষ্যে। এক এক পর্বের নথিপত্র সংকলন ও সম্পাদনার ভার দেওয়া হয়েছিল এক একজন প্রথিতযশা ইতিহাসবিদকে। পানিক্করের দায়িত্ব ছিল ১৯৪০ সালের ইতিহাসের নথি সম্পাদনার। আর তাতেই সিঁদুরে মেঘ দেখেছিলেন সেই সময়ের শাসক; এই প্রকাশনায় যদি প্রকট হয়ে যায় যে, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁদের বিশেষ অবদান নেই! আর সেই প্রমাণের কণ্ঠরোধ করার জন্যই দরকার ছিল এই বই প্রকাশ আটকানো। তবু সত্যকে আটকে রাখা যায় না। 

২০২৬-এর ৯ মার্চ প্রায় ৯০ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন কে এন পানিক্কার। ব্যক্তির মৃত্যু তো অনিবার্য। তবে তাঁর কাজ থেকে যায়। তাঁর লেখাপত্রে যে ‘কণ্ঠ ছাড়ো জোরে’-র কথা বলে গিয়েছেন পানিক্কার, ইতিহাসকে সেই গুরু দায়িত্ব পালনের করানোর ভার তাঁর উত্তরসূরিদের। জয় গোস্বামীর ভাষা ধার করে বলি,
এখনও, এখনও যদি ঘরে বসে নিজেকে বাঁচাই
যদি বাধা নাই দিই, তত্ত্ব করি, কী হল কার দোষে
যদি না আটকাই, আজও না-যদি ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি
আমার সমস্ত শিল্প আজ থেকে গণহত্যাকারী!