Robbar

স্বেচ্ছামৃত্যু হৃদয়বিদারক, তবু সম্মানজনক

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 18, 2026 5:44 pm
  • Updated:March 18, 2026 7:42 pm  
importance of Harish Rana Euthanasia case and its verdict। Robbar

অরুণা থেকে হরিশ– দীর্ঘ পাঁচ দশক পেরিয়েও ভারত সরকার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে এই সংক্রান্ত কোনও বিধি তৈরি করার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নিষ্ক্রিয়। হরিশ রানার স্বেচ্ছামৃত্যু সংক্রান্ত রায় দিতে গিয়েও শীর্ষ আদালতের বিচারপতিরা ভারত সরকারকে আবার নতুন করে দ্রুত স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে নির্দিষ্ট নীতি তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। ভারতীয়দের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় অর্থ বা সেবা-যত্নের অভাবে বহু অক্ষম বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আত্মহত্যা করছেন যখন-তখন।

শ্যামল চক্রবর্তী

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ গাজিয়াবাদের তরুণ হরিশ রানার বৃদ্ধ বাবার আবেদনে সাড়া দিয়ে ‘পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যু’ নিয়ে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছে।

শীর্ষ আদালতে বিচারপতি জে. বি. পাদরিওয়ালা ও কে. ভি. বিশ্বনাথনের বেঞ্চের এই রায় অসংখ্য বয়স্ক মানুষের পক্ষে আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। চূড়ান্ত রায় দিতে গিয়ে দুই বিচারপতি জানিয়েছেন, ‘পরমেশ্বর চান না শরীর-মনে অক্ষম কৃত্রিমভাবে বেঁচে থাকা একজন মানুষের অসম্মানজনক জীবন প্রলম্বিত হোক।’ বিচারপতিদের এই কথাগুলো ১০০ বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক মেধাবী মন্ত্রীর মানুষকে স্বেচ্ছামৃত্যু দেওয়ার অধিকার নিয়ে বলা গভীর সত্য থেকে তুলে আনা। উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর ‘টু বি অর নট টু বি’, জীবন অথবা মৃত্যুর দর্শন নিয়ে অতি পরিচিত কথাটিও দুই বিচারপতির রায়তে উল্লেখ করা হয়েছে।

হরিশ রানার সঙ্গে তাঁর বাবা

২০ বছর বয়সে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে হরিশ রানা চণ্ডীগড়ের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার পর আকস্মিকভাবে, ২০১৩ সালে, পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। ডাক্তারদের সবরকম চেষ্টা ব্যর্থ হয়। হাত-পা নড়াচাড়া করার ক্ষমতা চলে যায়। ডাক্তারি পরিভাষায় এরকম অক্ষমতা– ‘প্যারাপ্লেজিয়া’। শ্বাসনালীতে নল ঢুকিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা আর খাদ্যনালীতে নল ঢুকিয়ে তরল খাবার খাওয়ানো হলেও মেধাবী ছাত্র হরিশ রানার চেতনা লোপ পেতে পেতে কয়েক মাস বাদেই সে কোমায় চলে যায়! রবিন কুকের ‘কোমা’ বয়স্ক পাঠকদের কেউ কেউ পড়েছেন, কেউ-বা দেখেছেন ‘কোমা’ নামের বিখ্যাত সিনেমাটি।

কোমায় চলে যাওয়া একজন মানুষের খাবার বা পানীয় খাওয়া, জেগে ওঠা, দেখা-শোনা-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শের মতো শরীর ও মনের স্বাভাবিক কাজকর্মগুলো পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়। বহুকাল ধরে নাকে নল গুঁজে তরল খাবার খাওয়ানো আর শিরায় স্যালাইন দেওয়া ছাড়া আর কোনও চিকিৎসা ছিল না কোমার। ভেন্টিলেটর আবিষ্কৃত হওয়ার পর এরকম রোগীদের বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় কৃত্রিম ও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে। যান্ত্রিক সাহায্যে বেঁচে থাকা হরিশ রানাকে জটিল এক পদ্ধতিতে অন্ত্রের দ্বিতীয় অংশ ‘জেজুনাম’-এ তরল খাবার দেওয়া হত। বছরের পর বছর ধরে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হরিশ ‘স্থবির উদ্ভিদ’ হয়ে নামেই বেঁচে ছিলেন। চিকিৎসা-শাস্ত্রে এরকম বেঁচে থাকা ‘ভেজিটেটিভ এক্সিসট্যান্স’। মৃত্যু আর জীবনের মাঝামাঝি এভাবে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা হরিশ বুঝতে না-পারলেও ওঁর মা-বাবাকে দিনের পর দিন বিষণ্ণ ও বিপর্যস্ত করে তুলছিল।

হরিশের সঙ্গে জীবনযুদ্ধের যে লড়াই লড়তে হয়েছে তাঁর বাবা-মাকে

রবীন্দ্রনাথের ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’ শুধু নয়, ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সিনেমায় অনিল চট্টোপাধ্যায়ের বোনের চরিত্রে সুপ্রিয়া দেবীর, তখনও কোনও চিকিৎসা নেই– এমন দুরারোগ্য যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে– ‘দাদা, আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম’ আর্তনাদ কার্শিয়াং পাহাড়ের পাইন-বনের গাছের গায়ে ধাক্কা খেতে খেতে কাঁদিয়ে ছেড়েছিল দর্শকদের।

মানবজীবন পদ্মপত্রে জলবিন্দুর সমান। তবু বাঁচা আর মরা, জীবন আর মৃত্যু নিয়ে, ‘আত্মহত্যার অধিকার’ নিয়ে বিতর্ক দেশ-বিদেশের সাহিত্য সংস্কৃতিতে চলে আসছে বহুকাল ধরে। যে রবীন্দ্রনাথ ‘মানবের মাঝে আমি বাচিবারে চাই’ বলতে আকুল তাঁর কবিতায়, সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ অবস্থানে গিয়ে তাঁর কলমই লিখে ফেলছে– ‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান’-এর মতো কালজয়ী গান। প্রিয়তম শ্যাম অথবা বংশীবাদন কৃষ্ণ রবি ঠাকুরের রাধা-চেতনায় মৃত্যুর মতো প্রিয়! জীবন-মৃত্যুর অধিকার নিয়ে চর্চার ইতিহাস থেমে নেই বাংলায় অথবা অখণ্ড ভারতে। ‘যেতে নাহি দিব’ আর ‘হায়! তবু যেতে দিতে হয়’-এর দ্বন্দ্ব ফিরে ফিরে এসেছে সারা বিশ্বের দেশে দেশে, নাটকে-গানে-সাহিত্যে-চলচ্চিত্রে, চিত্রকলায় ও সংস্কৃতির অন্য মাধ্যমে।

‘মেঘে ঢাকা তারা’র দৃশ্যে

প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত দার্শনিক অ্যারিস্টটল ও প্লেটো, ‘আর বাঁচতে চাইছেন না’– এমন মানুষের স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকারকে গ্রিকদের মৌলিক অধিকার বলে মনে করতেন। গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস মানুষের স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকারকে সরাসরি অস্বীকার করেছেন। ভারতীয় চিকিৎসকরা এথেন্সের এই বিখ্যাত চিকিৎসক হিপোক্রেটিসের নামেই শপথ নিয়ে ডাক্তারি পাশ করে চিকিৎসার অধিকার বা রেজিস্ট্রেশন পান। চরম বিষণ্ণ বা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের ‘এ জীবন লইয়া কী করিব’-র উত্তর মানুষের আত্মহত্যার অধিকার বা ‘অ্যাক্টিভ ইউথেনাসিয়া’ হতে পারে না। এর একমাত্র উত্তর– মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এমপ্যাথি। সমানুভূতি।

পৃথিবীর কোনও দেশে আত্মহত্যার অধিকার স্বীকৃতি পায়নি। ‘চরক সংহিতা’য় চিকিৎসায় আরোগ্য অসম্ভব এমন রোগীদের ক্ষেত্রে ‘প্যাসিভ ইউথেনাসিয়া’-র পক্ষে সমর্থন খুঁজে পাওয়া যায়। কৃত্রিমভাবে ‘আরোগ্য অসম্ভব’ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা নিয়ে কল্পনা-বিলাসিতার সময়, অসুস্থ রোগীর আরোগ্য নিয়ে অতিব্যস্ত ভারতীয় চিকিৎসকদের ছিল না। চরক সংহিতা-য় এরকম রোগীদের চিকিৎসার নামে অকারণ যন্ত্রণাময় জীবন কাটানোর জন্য চিকিৎসকদের চিকিৎসা করতে সরাসরি বারণ করা হয়েছে। প্রাচীন গ্রিসের হিপোক্রেটিসের মতোই প্রাচীন ভারতের চিকিৎসকরাও হাজার চিকিৎসাতেও ‘সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকা অসম্ভব’– এমন রোগীর ক্ষেত্রে পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যুকে সমর্থন করতেন।

নেদারল্যান্ডসে বহুকাল ধরে পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যু বা ‘মার্সি কিলিং’ আইনসিদ্ধ। কানাডাতেও সম্মানজনকভাবে বাঁচা অসম্ভব, এমন মানুষের জন্য এরকম ‘করুণা-মৃত্যু’ আইনসম্মত। ২০২৫ সালে লাতিন আমেরিকার উরুগুয়ে ‘মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী’– এমন বয়স্ক রোগীদের যন্ত্রণার্ত বেঁচে থাকা থেকে মুক্তি দিতে নিষ্ক্রিয় ইচ্ছামৃত্যুকে আইনের আওতায় এনেছে। ভারতে ১৯৭১ ও পরবর্তী সময়ে সরকার পরপর দু’বার এরকম মৃত্যুতে সম্মতি দিতে অস্বীকার করে।

মায়ের পরশ, মায়ের স্নেহ

২০১১ সালে অরুণা শানবাগ নামের একজন নার্স, দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে কোমায় থাকার পর, বিচারে চার বছর কেটে যাওয়ার পর, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কৃত্রিমভাবে বেঁচে থাকার হাত থেকে ‘প্যাসিভ ইউথেনাসিয়া’র মাধ্যমে অনর্থক জীবনের হাত থেকে মুক্তি পান ২০১৫ সালে। গণধর্ষণের শিকার হয়ে হাসপাতালের নার্স অরুণাকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অ্যাকটিভ লাইফ সাপোর্টে রেখে দেওয়া হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে লাইভ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার পর পুরুষের লালসার বলি অরুণার মৃত্যু নিয়ে সেই সময় যথেষ্ট হইচই হয়েছিল। ওঁর নিকট আত্মীয়রা রাজ্যের হাইকোর্টে হেরে, শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে মামলা জিতে যান। একই ঘটনা ঘটেছিল পঞ্জাবের পরমজিৎ কৌর নামের এক গৃহবধূর বেলাতেও।

অরুণা শানবাগ

২০২৩ সালে এরকম একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট অকারণ অসম্মানজনক বেঁচে থাকার হাত থেকে কোমায় চলে যাওয়া বা দীর্ঘকাল দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভোগা মানুষকে বিনা যন্ত্রণায় সম্মানজনকভাবে মৃত্যুর অধিকারে স্বীকৃতি দেয়। শীর্ষ আদালত পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যু বিষয়ে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত তৈরি করেন। প্রথম শর্তটি হল, পরপর দু’টি মেডিকেল বোর্ডের সদর্থক রিপোর্ট। ভারতীয় সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে যথেষ্ট কারণ থাকলে স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার স্বীকৃত। অথচ ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় অসুস্থ মানুষের এরকম মৃত্যুর ঘটনা ফৌজদারি আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য!

অরুণা থেকে হরিশ– দীর্ঘ পাঁচ দশক পেরিয়েও ভারত সরকার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে এই সংক্রান্ত কোনও বিধি তৈরি করার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নিষ্ক্রিয়। হরিশ রানার স্বেচ্ছামৃত্যু সংক্রান্ত রায় দিতে গিয়েও শীর্ষ আদালতের বিচারপতিরা ভারত সরকারকে আবার নতুন করে দ্রুত স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে নির্দিষ্ট নীতি তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। ভারতীয়দের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় অর্থ বা সেবা-যত্নের অভাবে বহু অক্ষম বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আত্মহত্যা করছেন যখন-তখন। কৃত্রিমভাবে ভেন্টিলেটরি সাপোর্টে বেঁচে ওঠা অসম্ভব এমন রোগীদের ক্ষেত্রে এ রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলোর ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিটে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে লাইফ সাপোর্ট একটু একটু করে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। বেসরকারি হাসপাতালগুলো সম্পর্কে দীর্ঘকাল অকারণে ভেন্টিলেটরে রেখে, রোগীর চিকিৎসার খরচ জোগানো আত্মীয়দের অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করে দেওয়ার অভিযোগ প্রায়শই শোনা যায়।

জীবন-যুদ্ধ

একটি বড় বেসরকারি হাসপাতালে একটি বেদনাদায়ক মৃত্যুর পর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে ‘হেলথ রেগুলেটরি কমিশন’ গঠন করেন। অভিযোগ পেলে কমিশন সক্রিয় হয়ে, অকারণে ভেন্টিলেটরে রাখার অপরাধে মোটা অঙ্কের জরিমানা চিকিৎসার খরচ চালানো আত্মীয়র হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দিতে পারে। বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে স্বল্পবিত্ত মানুষের দীর্ঘকালের হয়রানি, অমানবিকতা, গলাকাটা চিকিৎসার ক্ষতিপূরণ শুধুমাত্র থোক টাকা হতে পারে কি না, অনুচ্চারিত প্রশ্নটা তবু থেকে যায়।