
এআই ব্যবহার করে যদি মিয়া ব্যালার্ড এই উপন্যাস লিখেও থাকেন, তাতেও পাঠক-সমাজের এত ক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ কী? পাশ্চাত্য প্রকাশনা জগতে তো ‘ঘোস্ট রাইটার’-এর উপস্থিতি তো নতুন নয়! পাশ্চাত্যে খুব কম লেখকই আছেন, যাঁরা কপি এডিটর, লিটারারি এজেন্ট ব্যবহার করেন না। পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত থেকে শুরু করে পাঠকের হাতে বই আকারে পৌঁছনোর আগে বহু ধাপ থাকে। যাঁরা ঘোস্ট রাইটার ব্যবহার করেন, তাঁদের উদ্দেশে রাবীন্দ্রিক ঢঙে বলা চলে– ‘একাকী লেখকের নহে তো লেখা, লিখিতে হবে দুই জনে’।
সম্প্রতি মিয়া ব্যালার্ডের উপন্যাস ‘সাই গার্ল’-কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া জল্পনা এবং পাঠকের অভিযোগ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উসকে দিয়েছে। রেডিট, গুডরিডস, ইউটিউব এবং অন্যান্য সমাজমাধ্যমে ব্যালার্ডের বইয়ের পাঠকরা অভিযোগ করেছেন যে, ব্যালার্ডের উপন্যাস আদৌ তাঁর নিজের লেখা নয়। বরং, এআই-এর লেখায় যতগুলো ফিঙ্গারপ্রিন্ট থাকতে পারে, সেসব এই উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে। বেশ কিছু বিশেষ ধরনের বাক্যশৈলী, এম ড্যাসের ব্যবহার, নির্ভুল গ্রামার ইত্যাদি এআই সৃজিত লেখার বৈশিষ্ট্য। ইন্টারনেটের জবানিতে এ-ধরনের লেখা বা অন্য যে কোনও সৃজনশীল কাজকে বলা হয় ‘এআই স্লপ’। এআই ব্যবহার করে তৈরি করা সৃজনশীল কাজের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ সম্ভবত এটাই– যে তাতে কোনও প্রাণ থাকে না।

মিয়া ব্যালার্ড নতুন লেখিকা। এর আগে ‘সুগার’ নামে একটা বই লিখেছিলেন। সেটি অবশ্য কোনও বিখ্যাত প্রকাশকের ঘর থেকে বেরয়নি। নিজেই প্রকাশ (সেল্ফ পাবলিশ) করেছিলেন সে-কাজ। সেই কাজেও ছিল ভুরি ভুরি এআই-এর ব্যবহার।
তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘সাই গার্ল’ প্রকাশ করেছেন হ্যাচেটে। প্রকাশনা জগতে যে পাঁচটি প্রকাশককে সবচেয়ে প্রভাবশালী মনে করা হয়, হ্যাচেটে তার মধ্যে গণ্য হয়। অভিযোগের তীব্রতা এতই বেড়ে যায় যে, হ্যাচেটে বাধ্য হয় এই বইয়ের প্রকাশনা বন্ধ করতে। ব্যালার্ডকে এ-বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে তিনি জানিয়েছেন যে, এর কপি এডিট করার জন্য তিনি অন্য একজনকে দিয়েছিলেন, সে কীভাবে কপি এডিট করেছে, তা তিনি জানেন না।

এআই ব্যবহার করে যদি মিয়া ব্যালার্ড এই উপন্যাস লিখেও থাকেন, তাতেও পাঠক-সমাজের এত ক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ কী? পাশ্চাত্য প্রকাশনা জগতে তো ‘ঘোস্ট রাইটার’-এর উপস্থিতি তো নতুন নয়! পাশ্চাত্যে খুব কম লেখকই আছেন, যাঁরা কপি এডিটর, লিটারারি এজেন্ট ব্যবহার করেন না। পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত থেকে শুরু করে পাঠকের হাতে বই আকারে পৌঁছনোর আগে বহু ধাপ থাকে। যাঁরা ঘোস্ট রাইটার ব্যবহার করেন, তাঁদের উদ্দেশে রাবীন্দ্রিক ঢঙে বলা চলে– ‘একাকী লেখকের নহে তো লেখা, লিখিতে হবে দুই জনে’।
বেশিরভাগ সেলিব্রিটির লেখা বইয়ের ওপর লেখক হিসেবে তাঁদের নিজের নাম থাকে বটে, কিন্তু বইকে পাঠযোগ্য করে তোলার জন্য কোনও ঘোস্ট রাইটারের মাধ্যমে সে-বই লেখানো হয়। কখনও কখনও এই নেপথ্যচারী লেখকদের নামটুকু ছোট করে উল্লেখ করা থাকে, বেশিরভাগ সময়ে তাও থাকে না। নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট এবং মোটা অর্থের বিনিময় তাঁরা নেপথ্যে থাকার মুচলেখা স্বাক্ষর করেন।

ইতিহাস বলছে, সেই সূচনালগ্ন থেকেই আসলে লেখক-নামের অস্তিত্ব নিজেই খুব জটিল। প্লেটো আর সক্রেটিসকেই যদি ধরি। সক্রেটিস নিজে নিরক্ষর। প্লেটো সক্রেটিসের নামে তাঁর বিখ্যাত ‘ডায়লগস’ রচনা করছেন। আদৌ সেসব সক্রেটিসের বক্তব্য, নাকি প্লেটোর ‘আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা’– সেকথা আজ বলা মুশকিল। সক্রেটিসের নামের ব্র্যান্ডভ্যালু আজ কে-ই বা অস্বীকার করতে পারে!
একই ঘটনা সিসেরো এবং দাস টিরোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সিসেরোর বেশিরভাগ লেখা টিরো সংশোধন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করেন। দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ করলেও, সামাজিক অবস্থান ও স্বীকৃতির বৈষম্যকে কে-ই বা অগ্রাহ্য করতে পারে। রোমের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাগ্মী ও চিন্তাবিদ হিসেবে আজ সিসেরোর যে জগৎজোড়া খ্যাতি, কে বলতে পারে, তার কতখানি আসলে টিরোর প্রাপ্য ছিল?
প্রাচীন ভারতবর্ষে লেখকের নাম তো আরও-ই সমস্যা-সংকুল। ব্যাসদেব এক না বহু? মহাভারত রচনা করছেন যিনি, তিনি কী একজন ব্যক্তি, নাকি অরণ্যদেবের মতো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মহাভারত রচনা, পরিমার্জন ও সংশোধনে নিয়োজিত থেকেছেন ‘ব্যাস’ নামের পদাধিকারী ঋষিগণ? বিশ শতকের গোড়ার দিকে বেশ কিছু জার্মান গবেষক এই মতের সমর্থক ছিলেন। কিন্তু তারপর এই মতেরও বিপক্ষে বহু যুক্তি উঠে এসেছে। তবে যে কোনও মহাকাব্যের বহু অংশে প্রক্ষেপের যে বিপুল উপস্থিতি, সে-কথা আজ কেউই অস্বীকার করেন না।

কিন্তু প্রশ্ন উঠবে, সেসব তো বহু আগের কথা। মুদ্রণ সংস্কৃতি এবং আধুনিক প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই। সমসাময়িক সময়ে আমরা লেখক বলতে যা বুঝি, তখন তো সেই ধারণা তৈরিই হয়নি। ঠিক কথা। কিন্তু রাষ্ট্রনায়কদের ভাষণ হোক বা উপন্যাসের খসড়া, এখনও কি টিরোর মতো নেপথ্যে কোনও অফিসার প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার ড্রাফট তৈরি করা থেকে শুরু করে, প্রুফ সংশোধন করছে না? জন এফ কেনেডির ‘প্রোফাইলস ইন কারেজ’ ১৯৫৭ সালে পুলিৎজার পুরস্কার পায়। কিন্তু কেনেডির অন্যান্য বহু কাজের নেপথ্যে থাকা আমেরিকান আইনজীবী ও লেখক থিওডোর সোরেনসেন সম্ভবত এই বইয়েরও বেশিরভাগ অংশ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কাগজে এই নিয়ে বহু লেখালেখি হয়। শেষে সোরেনসেন নিজে বলেন যে, তিনি শুধু জরুরি কাগজপত্র ইত্যাদি জোগাড় করে দিয়েছিলেন, লেখার কাজ কেনেডি নিজেই করেন। ক্ষমতার ছায়ায় থাকা অনুগতের এই জবানবন্দি যদিও অনেকেরই এখনও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।

উল্টোদিকে নিরন্তর পরিমার্জনা? সে উদাহরণও আছে প্রচুর। একে গ্রন্থ-সংস্কৃতির পরিভাষায় বলে বাওডলেরাইজেশন (bowdlerization)। ড. টমাস বাওডলার ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ করেন ‘ফ্যামিলি শেক্সপিয়র’। যেসব অংশগুলো নাকি অশ্লীল(!) বা প্রাপ্তবয়স্ক, সেগুলোকে পরিমার্জনা করে শেক্সপিয়রের এই বিশেষ সংকলন কাজ প্রকাশ করা হয়। প্রকাশক যখনই কোনও লেখকের কাজকে যুগোপযোগী করে তুলতে ঝেড়ে-পুঁছে প্রকাশ করেন, তখন তাকে বাওডলেরাইজেশন বলে।

২০২৩ সালে দেখা যায় প্রকাশক পাফিন রোয়াল্ড ডাল-এর বইয়ে প্রচুর সংশোধন করেছে, সেগুলোকে যুগোপযোগী করতে। যেসব অংশে লিঙ্গ বা বর্ণ অসচেতন বিব্রতকারী অংশ ছিল, সেগুলোকে পালটানো হয়। এ-ঘটনা প্রকাশ্যে আসতে বেশ কিছু প্রথম সারির লেখক এর বিরুদ্ধে মুখ খোলেন। সলমন রুশদি বলেন, রোয়াল্ড ডাল মহাত্মা নন যে, তাঁর কাজকে যুগোপযোগী করতে এমন অ্যাবসার্ড সেন্সরশিপের ব্যবস্থা করতে হবে। বিপুল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়ে পেঙ্গুইন ‘রোয়াল্ড ডাল ক্লাসিক কালেকশন’ নাম দিয়ে পুরনো শব্দ ও বাক্য পরিবর্তন না-করে একটা অ-পরিমার্জিত আলাদা সংস্করণ প্রকাশ করে।

এসব উদাহরণের পর ফিরে আসা যাক সেই পুরনো প্রশ্নে। বইয়ের ওপর যে লেখকের নাম, তিনিই কি আসল লেখক? রোলা বার্থ তাঁর বিখ্যাত লেখা ‘দ্য ডেথ অফ দ্য অথর’-এ দেখিয়েছিলেন, কীভাবে পাঠকের জন্ম আসলে লেখকের মৃত্যু ঘটায়। প্রকাশের পর কোনও লেখা যখন পাঠকের হাতে পৌঁছল, তখন আর সে-লেখায় ছোটবেলার স্কুলের বাংলা পরীক্ষার মতো ‘এখানে লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন’– এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে লাভ নেই। বহু পাঠক একই লেখার বহু অর্থ বের করবেন। সেটাই সঙ্গত। কিন্তু লেখক নামের পরিচিতির অন্তরালে যে আরও জটিল ও তাত্ত্বিক দিকটা লুকিয়ে আছে, সেটা আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন ফরাসি তাত্ত্বিক মিশেল ফুকো, তাঁর ‘হোয়াট ইজ অ্যান অথর’ বক্তৃতায়। তিনি সেখানে বলছেন– অথরকে কেন প্রয়োজনীয়? অথর শুধু একটা বইয়ের লেখক নন, তিনি একটা বিশেষ ফাংশন, একটা লেবেল ও।

‘আজ ক্লাসে জীবনানন্দ পড়ানো হবে’– এই বাক্যে জীবনানন্দ আর শুধু ব্যক্তি জীবনানন্দ বা লেখক জীবনানন্দে সীমিত নেই, বরং সেই কবিতা বা উপন্যাস জীবনানন্দের লেখা বিস্তৃত কাজের শৈলীর এক বিশেষ প্রতিনিধি। রবীন্দ্র প্রভাব-মুক্ত কবিরা যখন নিজেদের হাত মকশো করছেন, তখন তাঁরা ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামের এক বিশেষ ডিসকোর্স থেকে বাংলা কবিতাকে মুক্ত করার চেষ্টায় নিয়োজিত। ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ সেখানে উহ্য। ফুকো দেখাচ্ছেন, এই কারণেই বিজ্ঞানের বইয়ের লেখক সাহিত্যের বইয়ের লেখকের থেকে আলাদা। বিজ্ঞানের বইয়ের লেখকের যে উপজীব্য, তাকে গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করা গেল কি গেল না, সেটা সেই লেখার মান নির্ধারণ করে। সেই কাজের সত্যতা, সেই কাজের বিচার্য। কিন্তু সাহিত্যের লেখা অনিবার্যভাবে ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে, কারণ তা এক বিশেষ লেখকের ঘরানা বা বিশেষ ধরনকে নির্দেশ করে, যার ভালো-মন্দের বিচার্য তার বক্তব্যের সত্যতা নয়, বরং লেখার মুনশিয়ানা।
সম্ভবত দু’টি কারণে মিয়া ব্যালার্ডের পাঠকবর্গ তাঁর ওপর খাপ্পা হয়েছেন। এক, তাঁরা এক বিশেষ লেখকের স্বতন্ত্র লেখনভঙ্গি পড়ার জন্য উৎসাহী হয়ে বইটা কিনেছিলেন। কিন্তু পড়তে গিয়ে দেখলেন, সেখানে এআই-এর লিখনশৈলীর দৌরাত্ম। অথচ এআই-এর লিখনশৈলীকে প্রকাশ্যে স্বীকৃতি দিয়েই পুরস্কৃত হয়েছেন, এমন নজিরও সাহিত্যজগতে বিরল নয়।

২০২৪ সালে জাপানি লেখক রি কুদান তাঁদের দেশের অন্যতম সেরা সাহিত্য পুরস্কার ‘আকুতাগাওয়া’ পুরস্কারে ভূষিত হন, তাঁর লেখা ‘টোকিও সিম্প্যাথি টাওয়ার’ উপন্যাসের জন্য। পুরস্কারের মঞ্চেই কুদান জানান, উপন্যাসের ৫ শতাংশ তিনি লিখেছেন এআই-এর সাহায্য নিয়ে। উপন্যাসের কাহিনির পটভূমি ভবিষ্যতের টোকিও শহর। সেখানে চ্যাটবটের রমরমা। কুদান সেই চ্যাটবটের সঙ্গে কথোপকথনকে উপস্থাপন করেছেন এআই-এর দেওয়া উত্তরের ভিত্তিতে কোনও শব্দের পরিবর্তন না করে। প্রাইজ কমিটির সদস্য কিইচিরো হিরানো বলেন, এতে উপন্যাসের পুরস্কার প্রাপ্তিতে কিছু আসে যায় না, কারণ এই উপন্যাসে জেনারেটিভ এআই-এর ব্যবহার উল্লেখ করেই প্রকাশ্যে ঘোষণা করা আছে। সেক্ষেত্রে ব্যালার্ডের উপন্যাস নিয়ে জলঘোলা হওয়ার কারণ সম্ভবত এই নিরুচ্চারিত এআই-এর ব্যবহার।

দুই, মলাটের উপর লেখকের নাম বনাম প্রকৃত লেখক– এই দুইয়ের তারতম্য। আমরা ইতিমধ্যেই ইতিহাস ঘেঁটে দেখেছি, সবসময় যে-লেখকের নামে লেখা প্রকাশ পেয়েছে, সে-ই যে লেখার প্রকৃত রচনাকার, তা বলা যায় না। টি. এস. এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর মতো বিখ্যাত কবিতা-ই ধরা যাক। এজরা পাউন্ড যদি কাটছাঁট করে কবিতার বর্তমান আকার না দিতেন, তাহলে আদৌ সেই কবিতা এমন অমরত্ব পেত কি না, তা অবশ্যই কেউ বলতে পারবে না। তাহলে আসলে কবিতার অমরত্বের জন্য দায়ী কে? এলিয়টের লেখার গুণ, পাউন্ডের সম্পাদনার মুনশিয়ানা, না কি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে বছরের পর বছর এলিয়টের উজ্জ্বল উপস্থিতি? আসলে লেখার অমরত্বের কারণ– ‘কালি কলম মন, লেখে তিন জন’ নয়, বরং লেখক, সম্পাদক ও বাজার (ইন্ডাস্ট্রি)। সেই বর্ধিষ্ণু বাজারের মধ্যেই একবিংশ শতকে আসে প্রমোশন, সোশাল মিডিয়া, বিজ্ঞাপন, পাঠক, লবি, পুরস্কার, সংবর্ধনা, সিলেবাসের রাজনীতি ইত্যাদি নানা জটিল প্রশ্ন।

অনেকেই বিশ্বাস করেন, এআই দিয়ে সৃজনশীল কাজ করা যায় না, কারণ এআই মানুষের মতো অনুভব করে না, ফলে তার অভিজ্ঞতাসঞ্জাত কোনও উপলব্ধি থাকতে পারে না। সাহিত্য বা যে-কোনও সৃষ্টিশীল কাজ যেহেতু গভীরভাবে অভিজ্ঞতাসঞ্জাত এবং বহু বছরের পরিশ্রমের ফলে আয়ত্ত করতে হয়, ফলে সেই শ্রমের প্রশ্নটি এড়িয়ে গেলে শিল্পের মর্যাদাহানি হয়। কেউ শিল্পী বা লেখক হতে গেলে যে শ্রমের প্রয়োজন, সেটুকু না করে যদি শিল্পী বা লেখকের পদমর্যাদায় আসীন হতে চায়, সেটা কি আঘাত করে না? যে পিএইচডি ছাত্র বা ছাত্রীর কাজ তার সুপারভাইজারের নামে প্রকাশ পাচ্ছে, বা স্বীকৃতি না দিয়েই যে কাজ প্রকাশ পাচ্ছে সমাজমাধ্যমে অন্যের নামে?
বিজ্ঞানের জগতে ‘স্রষ্টা’ শব্দটার খুবই জটিল ইতিহাস। যখন ডিএনএ ডাবল হেলিক্স স্ট্রাকচারের জন্য রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনের বদলে ওয়াটসন ও ক্রিক নোবেল পান, ফিজিক্সে জোসেলিন বেল বার্নেলের আবিষ্কারের জন্য যখন তাঁর পিএইচডি সুপারভাইজার আন্তনি হিউইস ও মার্টিন রাইল নোবেল পান, বা যখন অটো হান নোবেল পুরস্কার পান ১৯৪৪ সালে, অথচ লিসে মাইটনার রয়ে যান অন্তরালে, তখন ভাবতে হয় স্বীকৃতির রাজনীতি কতটা গভীরে। বিজ্ঞানের জগতে এই নজির এতটাই বেশি যে, এই লিঙ্গ রাজনীতির বৈষম্য নিয়ে একাধিক কাজ হয়েছে। একে বলা হয় ‘মাতিলডা এফেক্ট’ (Matilda Effect)। যখন কোনও পুরুষ বিজ্ঞানী, কোনও মহিলা বিজ্ঞানীর কাজ নিজের নামে চালিয়ে স্বীকৃতি আদায় করেন। সাহিত্যেও যে এমন উদাহরণ নেই, তা তো বলা যায় না! এ-প্রসঙ্গে মনে পড়ে, মেগ ওয়ালিৎজারের উপন্যাস ‘দ্য ওয়াইফ’ এর মূল চরিত্র– এক স্ত্রী, যাঁর কাজের স্বীকৃতিতে তার স্বামী সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছে। ২০১৭ সালে এই উপন্যাস থেকে সিনেমাও তৈরি হয়।

অতএব, এবার শেষমেশ প্রশ্ন– তাহলে পাঠককে এত বিব্রত লাগছে কেন?
অন্যের কাজ নিজের নামে চালানো হয়েছে যুগে যুগে। এআই আজ সেই কাজটাই করে চলেছে। ইন্টারনেটে যতগুলো শ্যাডো লাইব্রেরি আছে, সেখান থেকে লক্ষ লক্ষ বই ডাউনলোড করে, তা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে তাকে। মানবসভ্যতার রক্ত ঘাম অভিজ্ঞতা সবই শব্দের খাঁচায় তার করায়ত্ত। একটা খারাপ ড্রাফট লিখে ভালো কপি এডিটরের কাছে পাঠালে যে সংশোধন পাওয়া যেত, এআই সেই কাজটাই করছে। খুব ভালো কাজ না করতে পারলেও, অন্তত মাঝারি মানের কাজ করে দিচ্ছে। রইল উপন্যাসের কথা– ফুকোর কথা মনে রাখলে দিব্যি বোঝা যায়, কেন বইয়ের মলাটে লেখা লেখকের নাম বাজারজাত প্রণালীর একটা অংশ মাত্র। তার সঙ্গে প্রকৃত লেখকের কোনও সম্পর্ক নেই। পাশ্চাত্যের যত বড় প্রকাশক, যত বিখ্যাত লেখক, তাঁর নেপথ্যের প্রস্তুতির বহর ততটাই বেশি। এতদিনে বেশ বোঝা গিয়েছে যত বড় বাজার, তার শ্রমের বণ্টন তত বেশি। বাংলায় কোনও গ্রাফিক নভেলিস্ট বা কমিক্স আর্টিস্ট একাই হয়তো ইঙ্কিং, কালারিং, স্টোরি বোর্ডিং, ডায়লগ লেখা ইত্যাদি সব কাজ করবেন, কিন্তু মার্কিন মুলুকে বা জাপানে সেটা ইন্ডাস্ট্রি। সেখানে শ্রমের বণ্টন সুবিধাজনক, কারণ সেখানে পুঁজি বেশি।
সাহিত্যের ক্ষেত্রেও বিষয়টা প্রায় সেরকমই। যে কোনও শিল্প বাজারে প্রবেশের আগে যে অনেকগুলো ধাপ থাকে, সেগুলোয় প্রতি পদক্ষেপে থাকে মেধা এবং শ্রমের অদৃশ্য সংলাপ। এআই-কে প্রতিভার শত্রু হিসেবে না দেখে, সাহিত্যের বাসরঘরে কালসর্প হিসেবে না দেখে, এবার তাকে সহযোগী হিসেবে ভাবার সময় হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ইউটিউবে ‘স্যান্ডার্স বনাম ক্লড’ নামে এক ভিডিও প্রকাশ করেছেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, এআই চ্যাটবট ক্লডকে প্রশ্ন করছেন স্যান্ডার্স, এআই কোম্পানিগুলোর নেপথ্যের পরিকল্পনা, কর্মপদ্ধতি এবং ব্যক্তি-গোপনীয়তা এসব নিয়ে। তাঁর সওয়াল আমেরিকার সাধারণ মানুষের পক্ষে এবং এআই-এর নেপথ্যে থাকা বড় কর্পোরেটের বিপক্ষে।

মজার বিষয়, ভিডিওর শেষে বোঝা যাচ্ছে, এআই এর উত্তরে স্যান্ডার্স বেশ সন্তুষ্ট। অর্থাৎ, ঠিক ঠিক প্রশ্ন করলে (পড়ুন প্রম্পট) এআই ঠিক ঠিক উত্তর দেবে। অবশ্যই তারও নিজস্ব সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু শিল্প-নির্মাণের প্রক্রিয়ায় কতটা গুরুত্ব তাকে দেওয়া হবে, তা নির্ভর করছে শিল্পী হিসেবে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন।
মার্গারেট এ বডেন এআই এবং ক্রিয়েটিভিটি সংক্রান্ত গবেষণায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ নাম। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি বহু লেখায় বারবার বলে এসেছেন যে, প্রযুক্তির মাধ্যমে শিল্প নির্মাণ অবশ্যই সম্ভব। নির্ভর করছে প্রযুক্তির নেপথ্যে থাকা শিল্পীর ‘ভিশন’-এর ওপর। শিল্পী যদি নিজের চাহিদাকে নির্দিষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারেন, তাহলে প্রযুক্তি তা নির্মাণ করে দেবে। শিল্পী হিসেবে আপনি কী চান, তা আপনার কাছে কি স্পষ্ট?
‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতায় এলিয়ট দান্তের অনুসরণে এজরা পাউন্ডকে বলেছিলেন– ‘ইল মিগলিয়র ফ্যাব্রো’– ‘দ্য বেটার ক্রাফটসম্যান’। সৃষ্টিশীল জগতে এআই যতদিন না ‘বেটার ক্রাফটসম্যান’ উঠছে, ততদিন তাকে অন্তত ‘বোকা শাগরেদ’ ভাবতে ক্ষতি কী?
………………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন পৃথু হালদার-এর অন্যান্য লেখা
………………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved