
গোটা ঠাকুরমার ঝুলিতে পুরুষেরা প্রায় একরঙা। কিন্তু নারীদের স্পষ্টত কয়েকটা ভাগ দেখা যায়। একদিকে ঘুমন্ত পুরীর রাজকন্যারা। ড্যামসেল ইন ডিস্ট্রেস। আক্ষরিক অর্থেই স্বরহীন আর ঘরবন্দি। রাজপুত্তুরেরা উদ্ধার না করলে এ জীবনের সব রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ যাদের অধরাই থেকে যেত। আর-একদিকে ঘুঁটেকুড়ুনি ছোটোরানি, কুঁড়েঘরে থাকা দুয়োরানিরা। এরাও একরকমের ড্যামসেল ইন ডিস্ট্রেস বটে, তবে সুন্দরী, দুঃখিনী, প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি এরা আদর্শ সন্তানের মা।
ঠাকুরমার ঝুলিতে মেয়েরা ঠিক কেমন ছিল? ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল এক ঠাকুমার কথাই। গল্প ছিল তাঁর ঝুলিতেও। ধনী গৃহের ঘরনি তিনি। সাতমহলা বাড়ির রানি হয়ে একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া সেই ঠাকুমা যখন গল্পে দেখা দিলেন, তখন তিনি একাকিনী। গল্পের শুরুতেই নিহত হয়েছেন বাড়ির কর্তা। কিন্তু শোকের মধ্যেও সেই খুনের গল্প থেকে ভেতরের সত্যিকে খুঁজে বের করে এনেছিলেন ঠাকুমা। যাঁকে আমরা, পাঠকেরা চিনেছিলাম সৌদামিনী বা সদু ঠাকুমা নামে। মেয়ে গোয়েন্দার স্পর্শবিমুখ বাংলা গোয়েন্দাসাহিত্যের জগতে ঠাকুমার এই ঘরোয়া গোয়েন্দাগিরি মনে করিয়ে দিয়েছিল, পুরুষের অভিযানের বর্ণনামুখর পরিসরে ঘরবন্দি মেয়েদের অস্তিত্বও অস্বীকারের নয়। কিন্তু প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত এই ঠাকুমাকে নিয়ে এরপরে আরও খানতিনেক কাহিনি লিখলেও, দ্বিতীয় গল্প থেকেই দেখা যায় নামকরণে ঠাকুমাকে সরিয়ে দিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে প্রথম গল্পে থাকা তাঁর পুরুষ সহকারীটি। রহস্যভেদের চাবিও উঠে আসছে তারই হাতে। আর এভাবেই গল্প থেকে ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকেন ঠাকুমা। আসলে হারাতে থাকেন নিজের সেই অস্তিত্বকেই, অন্দরমহলের ছকবাঁধা দুনিয়া পেরিয়ে যাকে তিনি চিনতে পেরেছিলেন।

মেয়েদের নিজের ঘর, নিজের স্বর খুঁজে পাওয়া না-পাওয়ার গল্পটা বাস্তবে এমনই টালমাটাল। সেখানে রূপকথার ইচ্ছেপূরণ নেই। কিন্তু যে রূপকথার শেষে সবসময় বাধাবিপত্তির নটেগাছ মুড়িয়ে গিয়ে সব ভালো হয়, সক্কলে তার প্রাপ্যটুকু হাসিল করতে পারে, সেই দুনিয়াতেও মেয়েদের পায়ের তলায় জমি ঠিক কতখানি? ঠাকুরমার ঝুলির মেয়েদের কথা ভাবতে গিয়েই যে সদুঠাকুমার কথা মনে এল খানিক অপ্রাসঙ্গিকভাবেই, তার সুতো আসলে জুড়ে আছে ওই প্রশ্নেই। ঠাকুরমার ঝুলি থেকে যে গল্প উঠে আসছে, যে গল্পে রানি-রাজকন্যা-দাসী-মালিনীর মতো অনেক অনেক মেয়ে হাজির, সে গল্প আসলে বলছেন কে? কথক বদলে গেলে বদলে যায় গল্পও, একথা মনে করতেন দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার। তাঁর বইয়ের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “তিনি ঠাকুরমা’র মুখের কথাকে ছাপার অক্ষরে তুলিয়া পুঁতিয়াছেন”। ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ থেকে যে গল্পগুলি দক্ষিণারঞ্জন বাঙালি পাঠকের সামনে উজাড় করে দিয়েছিলেন, সেখানে কথক হিসেবে ঠাকুরমার স্বর আমরা পাই কি? না কি সে স্বর আসলে সংকলক পুরুষেরই, ঠাকুরমার বকলমে দক্ষিণারঞ্জনের? আর তাই যদি হয়, কথকভেদে সেখানে মেয়েদের দেখার চোখ পালটে যাবে না কি?

এই প্রশ্ন খুঁড়ে দেখার আগে একটা কথা বলে নেওয়া ভালো। সেকালের পূর্ববঙ্গ ঢুঁড়ে দক্ষিণারঞ্জন যেসব লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্যের উপাদান জড়ো করেছিলেন, সংকলক হিসাবে তাকে চারটি বইয়ে সাজিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ‘ঠাকুরমার ঝুলি’-ই (১৯০৭) একমাত্র রূপকথার তকমা পেয়েছে। দক্ষিণারঞ্জনের কথামতো ‘ঠাকুরদাদার ঝুলি’ (১৯০৮) হল গীতিকথা ও ‘দাদামশায়ের থলে’ (১৯১৩) রসকথা। ‘ঠাণদিদির থলে’ (১৯০৯) ব্রতকথা, যা নিয়ে পরবর্তীকালের সমালোচক বলছেন, “ঠানদি দক্ষিণারঞ্জনের ভূমিকা যেন ঠাকুরমার ভূমিকার থেকে আর-এক ধাপ এগিয়ে গেছে। পুরুষ দক্ষিণারঞ্জন আর কেবল ঠাকুরমা নারী সেজে গল্পই শোনাচ্ছেন না; নিজে একেবারে ঠানদির জায়গায় দাঁড়িয়ে কুলবধূদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন তাঁদের কর্তব্যকর্মের কথা।… যে-কাজ প্রবীণাদের করার কথা, যে কাজ না করা হলে গৃহবধূ, সুভাষণে গৃহলক্ষ্মীদের কর্তব্যচ্যুতি পরিবারের পরম্পরার ধারাকে টলিয়ে দিতে পারে– সেই কাজ যাতে যথাযথ সম্পন্ন হয়, সেই দায়িত্বই কি দক্ষিণারঞ্জন নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন?” (‘ঠাকুরমার ভূমিকায় দক্ষিণারঞ্জন’, সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, উজ্জ্বল পাণ্ডুলিপি, দক্ষিণারঞ্জন সংখ্যা বিশেষ ক্রোড়পত্র, ২০০৭, পৃ. ১৭০) সমাজের বেঁধে দেওয়া ‘আদর্শ’ নারীর মডেল ব্রতকথার মধ্যে দিয়ে কীভাবে লোকমানসে সঞ্চারিত হয়, সেকথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। অবন ঠাকুরের ‘বাংলার ব্রত’-এর মতো মেয়েলি ব্রতের আড়ালে মেয়েদের চাওয়া-পাওয়ার ছবির দিকে ঠানদির বিশেষ চোখ পড়েনি, ব্রতনিয়মের রীতিপ্রণালী যথাযথ লিপিবদ্ধ করার কাজটিই তিনি করতে চেয়েছেন কেবল। ‘ঠাকুরদাদার ঝুলি’-র ভূমিকাতেও বলছেন ‘গৃহলক্ষ্মীদের প্রাণটিকে অতি কোমলভাবে গৃহকর্ম্মে তন্ময়’ করার কথা। ঠাকুরদাদা ও দাদামশায়ের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারীকে দেখার কথা আপাতত সরিয়ে রেখে এই আলোচনায় নারীর নামাঙ্কিত বইটিতে মেয়েদের অবস্থানের দিকেই তাকানো যাক।

ঠাকুরমার ঝুলির ভূমিকা লিখতে গিয়েই রবীন্দ্রনাথ খুঁজতে চাইলেন ‘দেশলক্ষ্মীর বুকের কথা’কে। দক্ষিণারঞ্জন যখন পুববাংলার এ গাঁ সে গাঁ ঘুরে ঘুরে সেকালের হাওয়ায় ভাসা আর লোকমুখে শোনা ছেলেভুলোনো কাহিনি থেকে ছেনে নিচ্ছেন সেই বুকের কথাকে, ততদিনে ঘুমন্ত পুরীর মতো শান্ত বাংলার বাইরে জেগে উঠছে কোলাহল। রাক্ষসে ছেয়ে সাহেব রাজার রাজত্ব, পথে পথে হাড়ের জাঙ্গাল, একচোখো রাজার অবহেলায় দুয়োরানি জন্মভূমিকে বাঁচাতে তরোয়াল হাতে প্রহরায় এসে দাঁড়াচ্ছে লালকমল-নীলকমলেরা। এই সময়কালেই, ১৯০৫ সালে সেই রাজার অবিমৃষ্যকারিতা ডেকে এনেছে বঙ্গভঙ্গ। বাংলায় তখন দিন দিন বাড়ছে ‘সাত যুগের ধন্য বীর’ দামাল ছেলেদের সংখ্যা। পরের পর খুলে যাচ্ছে গুপ্তসমিতি। রাক্ষসের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ার শপথ নিয়ে সেখানে জোট বাঁধছে দুয়োরানির সাহসী সন্তানেরা। এই আবহে ১৯০৭ সালে যখন প্রকাশ পেল ‘ঠাকুরমার ঝুলি’, অমোঘ এক ঐতিহাসিক যোগাযোগে তা হয়ে উঠল সমান্তরালে বয়ে চলা স্বদেশী আন্দোলনের এক রূপক ভাষ্য। রবীন্দ্রনাথের ভূমিকার গোড়াতেই ‘স্বদেশী জিনিস’ আর ‘ম্যাঞ্চেস্টারের কল’ থেকে আমদানি বিলিতি দ্রব্যের উল্লেখে তা স্পষ্ট হয়ে গেল। আর তার সঙ্গেই জুড়ে রইল একথা যে, এই বিলিতি মাল বয়কট করে ছেলেদের মধ্যে দেশের কথা, দেশলক্ষ্মীর বুকের কথা জারিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব ‘স্নেহময়ীদের’; কেন-না সমস্ত বিপ্লব, রাজ্য পরিবর্তন সত্ত্বেও ‘বাঙ্গালী বালকদের চিত্তক্ষেত্রে’ যে রূপকথা বয়ে চলতে পেরেছে তার উৎস ‘সমস্ত বাংলাদেশের মাতৃস্নেহের মধ্যে’। গোড়ায় বাংলা গোয়েন্দা-সাহিত্যের প্রসঙ্গ এসেছিল, এইখানে সেই ধারার কথা টেনেই মনে করিয়ে দেওয়া যাক বাংলা গোয়েন্দা-সাহিত্যের প্রথম মেয়ে-গোয়েন্দার কথা। স্বাধীনতার অব্যবহিত আগে থেকে তার যাত্রা শুরু। প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর লেখা সেই গোয়েন্দা, কৃষ্ণাকে, শক্তি-সাহস-বুদ্ধিতে নিজেকে বারবার পুরুষের সমকক্ষ বলে প্রমাণ করে যেতে হয়। আর তারপরেও তার কাহিনিতে রয়ে যায় এই আশা– ‘বাংলার সকল মেয়ের বুকেই যেন এইরকম শক্তি ও সাহস জাগে, বাংলা যেন আবার বীর জননীতে ভরে ওঠে’। বীরাঙ্গনা নয়, বীরমাতার প্রয়োজনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল সদ্যস্বাধীন দেশ।

‘গোপাল-রাখাল দ্বন্দ্বসমাসে’ বাংলা প্রাইমারের গোড়ার কথা খুঁজতে গিয়ে শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ও দেখাবেন, কীভাবে ভালো স্ত্রী আর ভালো মা হয়ে ওঠাই মেয়েদের পাঠ্যক্রমের পাখির চোখ। ঔপনিবেশিক দেশে গোপালের মতো সুবোধ বালকদের গড়ে তোলার দায়িত্ব ভাবী মায়েদের বুঝিয়ে দিতে সেই সিলেবাস তৈরি করছিলেন পুরুষেরাই। ঠাকুরমার ঝুলি-র সময়ে অবশ্য শিষ্ট গোপালদের চেয়েও বেশি প্রয়োজন ছিল বিদ্রোহী রাখালদের, কিন্তু তাই বলে তাদের দুর্বিনীত প্রশ্ন করতে দিলেও তো মুশকিল! তাই সেখানেও ভরসা দুয়োরানিরাই। রাজার অনাচারে অবিচারে যাদের সব সুখ ঘুচে যায় লহমায়, তবুও স্বামীর বিরুদ্ধে যারা কোনওদিন মুখ খোলে না, প্রশ্ন করতে শেখায় না সন্তানদেরও। আপৎকালে প্রাণ হাতে করে সেই রাজার মান রাখে, রাজ্য বাঁচায় মার-খাওয়া রাজপুত্তুরেরা। তারপর সুয়োরানিকে ‘হেঁটে কাঁটা উপরে কাঁটা’-য় পুঁতে দিলেই রাজার ঘোর কেটে যায়, ফের রামরাজ্য ফিরে আসে। রাজা-রাজপুত্রের সুখে দিন কাটাবার স্বস্তিবাচনে যে মঙ্গলশাঁখ বেজে ওঠে, তাতে চাপা পড়ে যায় পুরুষের নারীলোলুপতা, স্ত্রীকে সম্মান করতে না জানা, স্বামী কিংবা পিতার কর্তব্যে চ্যুতি, সবকিছুই। যে অন্ধ ভক্তিকে জিইয়ে রেখেই পিতৃতন্ত্রের আজন্ম বোলবোলাও, সেই প্রশ্নহীন নিঃশর্ত আনুগত্যের পরীক্ষায় ঠাকুরমার ঝুলি সসম্মানে পাশ করিয়ে দেয় তার ‘ভালো মেয়ে’-দের। যে কলাবতী রাজকন্যা দেশবিদেশ ঘুরে স্বয়ংবরা হওয়ার কথা ভাবতে পারে, তারও শেষমেশ পরম গতি বীর্যশুল্কে বিক্রিত হয়ে উপযুক্ত বরের ‘বাঁদি’ হওয়াতেই। আসলে, আধুনিকতার হাওয়া গায়ে লেগে পুরুষের যে স্খলন, তা থেকে তাদের রক্ষা করার ভার ঘরের কোণে নিজেকে লুপ্ত করে দেওয়া সর্বংসহা ‘গৃহলক্ষ্মী’দেরই– উনিশ শতকের প্রৌঢ়ত্বে উদ্ভূত স্বাদেশিকতার বোধ, বিশেষত হিন্দু পুনরভ্যুত্থানবাদের যুগ্ম চর্চা এই বাঁধা বুলিতে ক্রমেই সারজল জুগিয়ে চলেছিল। বাংলার প্রথম উপন্যাস বলে চিহ্নিত ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ থেকেই দেখা যাবে মদ্যপ অসভ্য স্বামীকে শ্রদ্ধা না করায় স্ত্রীকে নিন্দিত ভর্ৎসিত হতে। সে নিন্দাও আসে আর-এক নারীর থেকেই। আসলে পিতৃতন্ত্রের ফুট সোলজার হিসেবে ব্যবহৃত হতে হতে বহু মেয়েরাই যে প্রকৃত দোষীকে চিনতে পারে না বা চায় না, সেকথা তো জানাই। রূপকথায় তাই রাক্ষসী কিংবা ডাইনি রানির ছড়াছড়ি, কিন্তু রাজা কখনওই খলনায়ক নন। ঠাকুরমার ঝুলি যদি বাস্তবিক মেয়েদের নিজস্ব মৌখিক সাহিত্য হত, তাতেও এই মনোভাবের ছাপ থাকা অস্বাভাবিক ছিল না। উপরন্তু এই সংকলন পুরুষের, শিষ্ট ভাষায় সংস্কৃত মার্জিত শিষ্ট সাহিত্য। অতএব সেখানে কাহিনির ফিমেল গেজ-কে তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনা কতদূর ছাপিয়ে যাবে তাও বিচার্য। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে, দক্ষিণারঞ্জনের নাতনি সুদীপ্তা ঘোষ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমার মা ভালো গাইতেন। কিন্তু দাদু চাননি মা গানকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করুন। গান রেকর্ডিং করাতে দেননি। খুব কনজারভেটিভ ছিলেন। মেয়েদের রাস্তাঘাটে একা ঘোরাঘুরিতেও নিষেধাজ্ঞা ছিল তাঁর।” (সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা)

গোটা ঠাকুরমার ঝুলিতে পুরুষেরা প্রায় একরঙা। কিন্তু নারীদের স্পষ্টত কয়েকটা ভাগ দেখা যায়। একদিকে ঘুমন্ত পুরীর রাজকন্যারা। ড্যামসেল ইন ডিস্ট্রেস। আক্ষরিক অর্থেই স্বরহীন আর ঘরবন্দি। রাজপুত্তুরেরা উদ্ধার না করলে এ জীবনের সব রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ যাদের অধরাই থেকে যেত। আর-একদিকে ঘুঁটেকুড়ুনি ছোটোরানি, কুঁড়েঘরে থাকা দুয়োরানিরা। এরাও একরকমের ড্যামসেল ইন ডিস্ট্রেস বটে, তবে সুন্দরী, দুঃখিনী, প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি এরা আদর্শ সন্তানের মা। অপরদিকে আর-এক দল মেয়ে, যারা লোভী, চতুর, স্বার্থান্বেষী, কখনও কখনও অসুন্দরী, সন্তানহীন কিংবা কুসন্তানের মাতা। কিন্তু একইসঙ্গে এরা সক্রিয়, নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ এরা কারও হাতে ছাড়তে নারাজ (আর কে না জানে, নারীর সিদ্ধান্ত নিতে পারার ক্ষমতা পিতৃতন্ত্রের সামনে সবচেয়ে বড় রেড ফ্ল্যাগ)।

তারপরেও অবশ্য, কিরণমালার মতো কেউ কেউ থেকেই যায়। ছকভাঙা। মুক্তির জন্য পুরুষের অপেক্ষায় বসে থাকা নয়, পুরুষকে মুক্তি দিতে পারে যে মেয়ে। বীরপুরুষের মা হওয়ার আদর্শ এড়িয়ে, যাকে দেখে ভাবী দিনের কোনও মেয়ে ভাবতে পারে একলা বাঁচার সাহসের কথা। সমাজের সংসারের বেঁধে দেওয়া ডোর যদি সে সাহসে লাগাম পরায়ও, তবুও তার শরীরে লেগে থাকে সেই উন্মুক্ত মায়াকাননের জল, যা সে দিয়ে যাবে উত্তরকন্যাকে–
“মেয়েটি ফিরে এসে শিশুর পাশে বসে, তক্তপোশটিতে মগ্ন হয়
রাজার ছেলে নয়, রাজার মেয়ে আর কোটালকন্যার বর্ণনায়।”
ঘরবন্দি, স্বরবন্দি মেয়েদের গল্পেও যে মেয়েদের কথা ভুঁইচাঁপা ফুল হয়ে জেগে ওঠে, ঠাকুরমার ঝুলি থেকেই আমরা সে কথা জেনেছিলাম।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved