Robbar

মশারির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন সুন্দরী ক্লিওপেট্রা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 3, 2026 8:19 pm
  • Updated:April 3, 2026 8:24 pm  

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য হিস্ট্রিস’-এ নীলনদের অববাহিকায় থাকা মানুষজনের জীবনযাত্রা বর্ণনা করতে গিয়ে মিশরীয়দের এই ধরনের জাল ব্যবহারের কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘মিশরের ফারাওরা মশা থেকে বাঁচতে সূক্ষ্ম লিনেন কাপড়ের তৈরি পর্দা ব্যবহার করতেন।’ প্রাচীন মিশরের শেষ সক্রিয় ফেরাউন ক্লিওপেট্রাকেও তিনি মশার পর্দার নিচে শুয়ে থাকতে দেখেছিলেন। ক্লিওপেট্রা যখন মিশর থেকে রোমে যান, তখন তাঁর এই পর্দার ব্যবহার দেখে রোমানরা এটিকে একটি চরম বিলাসিতার প্রতীক হিসেবেই দেখেছিলেন। সেই সময়ে রোমে মশারির ব্যবহারকে বিলাসিতা বা ভীরুতা বলেই মনে করা হত।

পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী

‘মশারি টাঙাইবা মশারে আটকাইবার লাইগ্যা না, বরং মশার লগে ডাইনিং টেবিলে বইয়া এক লগে ডিনার সারবার লাইগ্যা!’ মশা এমন এক অবাধ্য প্রাণী, যাকে কোনও কিছু দিয়ে আটকে রাখা সত্যিই সম্ভব নয়। তাই মশারির ভেতরে মশা ঢুকে পড়লে বিরক্ত না হয়ে, বরং তাকে ‘ডিনার পার্টনার’ ভেবে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে করতেন বাংলা চলচ্চিত্রের কৌতুক সম্রাট ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। ভানুবাবু কৌতুকচ্ছলে যাই বলে থাকুন, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু কিংবা ফাইলেরিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগের বাহক মশার বিরুদ্ধে আজও কিন্তু মানুষের সবচেয়ে কার্যকরী অস্ত্র হল এই মশারিই। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি সত্ত্বেও, মশার কামড় থেকে সুরক্ষা পেতে মশারির আজও কোনও জুড়ি নেই। 

মানুষের সঙ্গে মশার সম্পর্ক কিন্ত আজকের নয়, আদিম যুগ থেকেই মানুষ ও মশার সহাবস্থান চলে আসছে। প্রাচীনকালে মানুষ মশাকে দুর্ভোগের প্রতীক হিসেবে দেখত। তাদের কাছে মশা ছিল অশুভ। মশা তাড়াতে আদিম মানুষ আগুনের সাহায্য নিত। গুহাবাসী মানুষ রাতের বেলা আগুন জ্বালিয়ে রাখত যাতে মশা ও অন্যান্য কীটপতঙ্গ কাছে না আসে। মশার হাত থেকে বাঁচতে মশারির ব্যবহার শুরু হয়েছিল অনেক পরে, আধুনিক মানুষের হাত ধরে।

অনুমান, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে মানুষ প্রথম মশারির ব্যবহার শুরু করে। ইতিহাস অনুসারে, মশারির ব্যবহার শুরু হয়েছিল প্রথমে মিশরে। নীলনদের অববাহিকায় থাকা মশাদের হাত থেকে নিজেদের সুরক্ষা দিতে সূক্ষ্ম জালের পর্দা ব্যবহার করতেন প্রাচীন মিশরের লোকজন। উড়ে বেড়ানো মশা ও পোকামাকড় তাড়ানোর জন্য মিহি শন দিয়ে বোনা জালের নিচে ঘুমতেন তাঁরা। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য হিস্ট্রিস’-এ নীলনদের অববাহিকায় থাকা মানুষজনের জীবনযাত্রা বর্ণনা করতে গিয়ে মিশরীয়দের এই ধরনের জাল ব্যবহারের কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘মিশরের ফারাওরা মশা থেকে বাঁচতে সূক্ষ্ম লিনেন কাপড়ের তৈরি পর্দা ব্যবহার করতেন।’ প্রাচীন মিশরের শেষ সক্রিয় ফেরাউন ক্লিওপেট্রাকেও তিনি মশার পর্দার নিচে শুয়ে থাকতে দেখেছিলেন। ক্লিওপেট্রা যখন মিশর থেকে রোমে যান, তখন তাঁর এই পর্দার ব্যবহার দেখে রোমানরা এটিকে একটি চরম বিলাসিতার প্রতীক হিসেবেই দেখেছিলেন। সেই সময়ে রোমে মশারির ব্যবহারকে বিলাসিতা বা ভীরুতা বলেই মনে করা হত। রোমান পুরুষরা মশারির ভেতরে থাকাকে কিছুটা ‘মেয়েলি’ বা আরামপ্রিয়তা মনে করে অবজ্ঞার চোখেই দেখতেন। রোমান কবি হোরাসও ক্লিওপেট্রার মশারি ব্যবহার নিয়ে সেই সময়ে ব্যঙ্গ বা উপহাস করতে ছাড়েননি। মশারির ইতিহাসের সঙ্গে টলেমীয় সাম্রাজ্যের শেষ রানি এবং হেলেনীয় যুগের সর্বশেষ সক্রিয় ফারাও ক্লিওপেট্রার নাম জুড়ে গিয়েছিল হোরাসের হাত ধরেই। 

হোরাস মন্দির গাত্রে ক্লিওপেট্রা

ইতিহাসবিদদের মতে, শুরুতে মশার পর্দা বা মশারি ঠিক আজকের মশারির মতো ছিল না। সেই সময়ে বেডরুমকে রাজকীয় রূপ দিতে ছাদ থেকে ঝোলানো বৃত্তাকার বা চারকোনা ‘ক্যানোপি’ মশারি ব্যবহার করা হত। এগুলো সাধারণত নেটের সঙ্গে লেস বা নকশা করা কাপড় দিয়ে তৈরি করা হত। মিশর ও রোমের মতো প্রাচীন সভ্যতায় মশারির আদি রূপগুলো শুধুমাত্র রাজপরিবারের সদস্যরাই ব্যবহার করতেন। রোমান কবি হোরাস এবং জুভেনাল তাঁদের লেখায় মিশরের এই ‘মশার পর্দা’ বা ক্যানোপিয়ামের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো সেই সময়ের উচ্চবিত্তদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। 

মশারির ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘মসকুইটো নেট’ হলেও এর আসল আভিজাত্য প্রকাশ পায় ‘ক্যানোপি’ শব্দটিতেই। ‘ক্যানোপি’ শব্দটি এসেছিল গ্রিক শব্দ ‘kōnōps’ থেকে, যার অর্থ হলো ‘মশা’। অনুমান, প্রাচীনকালে গ্রিক ও রোমানরা মশা থেকে বাঁচতে বিছানার ওপর যে ঢাকা ব্যবহার করত, তা থেকেই এসেছিল আধুনিক ক্যানোপি বেড বা মশারির ধারণা।

জাপানেও প্রাচীনকাল থেকেই বিশালাকার মশারি বা ‘কায়া’ ব্যবহারের ঐতিহ্য রয়েছে। তবে এগুলো মূলত ঘর সাজানোর উপকরণ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। থাই, মুঘল এবং জাপানি দরবার-সহ এশিয়া জুড়ে থাকা রাজপরিবারগুলোও শিল্প ও প্রয়োজনীয়তার মিশেলে এমন জাল তৈরি করত। জালগুলো রেশম, লেস বা মসলিন দিয়ে বানানো হত এবং অলংকৃত ফ্রেমে ঝোলানো থাকত।

আঠেরো শতকের জাপানি স্ক্রোলে মশারি

প্রাচীন চিন ও ভারতেও সিল্ক বা সুতির মশারির ব্যবহার ছিল অনেকটাই আভিজাত্যের প্রতীক। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসে মশার হাত থেকে বাঁচতে পাতলা কাপড়ের ব্যবহারের কথা জানা যায়। প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় একে ‘মশকহরী’ (মশক + হরী = মশা দূরকারী) বলা হত। এই ‘মশকহরী’ শব্দটি থেকেই আধুনিক হিন্দি ‘মসহারি’ এবং বাংলা ‘মশারি’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর পালি গ্রন্থ ‘বিনয় পিটক’-এ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য ‘মকসকুটিকা’ (Makasakuṭikā) বা মশা নিরোধক এক ধরনের কুটির বা পর্দার ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার উল্লেখ রয়েছে। মধ্যযুগে ভারতের রাজপরিবারগুলোতে রেশম, মসলিন বা সূক্ষ্ম তুলার কাপড়ের তৈরি নকশা করা মশারি আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হত। মুঘল আমল ও অন্যান্য আঞ্চলিক রাজদরবারগুলোতে কারুকার্যময় মশারি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।

মধ্যযুগের শেষদিকের ভারতীয় সাহিত্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে মশার জাল বা মশারির ব্যবহারের উল্লেখ আছে। এই সময়ে ভারতে সুতির পাতলা কাপড়ের মশারি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এটি বাতাস চলাচলের জন্যও যথেষ্ট আরামদায়কও ছিল।

আলোকচিত্র: ব্রেট কোল

পঞ্চদশ শতাব্দীর তেলুগু কবি আন্নামাইয়ার কবিতাতেও মশারির উল্লেখ আছে, যদিও এর ব্যবহার আরও পুরনো সময়ের। সম্ভবত ভারতে উপনিবেশ স্থাপনের প্রাথমিক পর্যায়েই ব্রিটিশরা মশারির বহুল ব্যবহার শুরু করে। কীটপতঙ্গবাহিত রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মশারিগুলো বাড়ির অপরিহার্য সামগ্রীতে পরিণত হয়ে ওঠে। বয়ন ও বস্ত্র উৎপাদনের উন্নতির ফলে মশারিতে আরও সূক্ষ্ম জাল, উন্নত বায়ুপ্রবাহ এবং আরামের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।

১৮৯৭ সালে কলকাতায় থাকাকালীন স্যর রোনাল্ড রস যখন প্রমাণ করলেন যে অ্যানোফিলিস মশা থেকেই ম্যালেরিয়া ছড়ায়, তখন মশারির গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে গেল। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তাদের সৈন্যদের জন্য সেই সময় থেকেই বাধ্যতামূলকভাবে মশারি ব্যবহারের নিয়ম চালু করে।

তবে, মশারি ব্যবহারের প্রকৃত বিপ্লবটি শুরু হয় ১৯৮৩ সালে এসে পশ্চিম আফ্রিকার বুরকিনা ফাসোর বোবো-দিউলাসোতে। তখন ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই চলছিল পুরোদমে। ফরাসি-আফ্রিকান চিকিৎসা কীটতত্ত্ববিদদের একটি দল জলে, পাইরেথ্রয়েড কীটনাশক মিশিয়ে সেই জলে মশারি ডুবিয়ে দেখলেন– মশারির ভেতরে থাকা মানুষকে রক্ষা করার পাশাপাশি, তা ম্যালেরিয়ার সংক্রমণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। একই সময়ে সুমিতোমো কেমিক্যাল নামের একটি জাপানি কোম্পানি প্রথম ‘ওলিসেট’ (Olyset) নেট তৈরি করে, যা ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে বিশ্বজুড়ে বিপ্লব নিয়ে আসে।

১৯৯০-এর দশক থেকেই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশকযুক্ত মশারি উৎপাদন শুরু করে, যেগুলোর উৎপাদনকালেই মশারির তন্তুর মধ্যে কীটনাশক মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। এর ফলে, পুনরায় কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়াই এগুলো বেশ কয়েক বছর কার্যকর থাকত। মশারিতে যে কীটনাশকগুলোর ব্যবহার করা হচ্ছিল সেগুলো মশার জন্য বিষাক্ত ছিল, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য ছিল নিরাপদ। ম্যালেরিয়া-আক্রান্ত দেশগুলোতে এই মশারি বিনামূল্যে বিতরণ শুরু হয়। একইসঙ্গে, সাধারণ মশারিও সহজলভ্য ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, বিশেষ করে সেইসব এলাকায়, যেগুলো মশা-উপদ্রুত কিন্তু তুলনামূলকভাবে ম্যালেরিয়ামুক্ত।

মশারি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে এলেও মশা কিন্ত ডাইনোসরের সমসাময়িক। আজ থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি বছর আগে জুরাসিক যুগেই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিল মশা। প্রথমে কিন্তু মশা মানুষের রক্ত খেত না। এমনকী মশা মানুষের ধারেকাছেও আসত না। আদি মশা মূলত বনের প্রাণীদের রক্ত খেত বা শুধু ফুলের মধু খেয়ে বেঁচে থাকত। এখনও সব মশা মানুষকে কামড়ায় না, বা মানুষের রক্ত খায় না। ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহনকারী অ্যানোফিলিস লিউকোসফাইরাস গোষ্ঠীর মশা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিশেষভাবে পরিচিত। এই গোষ্ঠীর প্রায় ২০টি প্রজাতি রয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কিছু মশা জঙ্গলের উঁচু গাছের ডালে থাকা প্রাণী– যেমন বানর, গিবন বা ওরাংওটাং-এর রক্ত খায়। আবার কিছু প্রজাতি মানুষ বা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর রক্ত পান করে। কিছু মশা আবার দুই ধরনের প্রাণীকেই কামড়ায়। পৃথিবীতে তিন হাজারেরও বেশি প্রজাতির মশা আছে। এদের মধ্যে একশোরও কম প্রজাতির মশা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। কিউলেক্স, অ্যানোফিলিস আর এডিস ইজিপ্টি প্রজাতির মশা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। তবে এদের মধ্যে এডিস ইজিপ্টি নামের মশার প্রজাতিটি, যারা ডেঙ্গু, জিকা এবং পীতজ্বরের মতো রোগ ছড়ায়, তারাই মানুষের রক্তের প্রতি বিশেষভাবে আসক্ত।

বিজ্ঞানীদের মতে, তাদের এই আসক্তি কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি টিকে থাকার লড়াই বা বিবর্তনের কৌশল। কয়েক হাজার বছর আগের মশারা মূলত বনজঙ্গলে থাকত এবং তারা অন্যান্য বন্য প্রাণীর রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকত। মজার বিষয় হল, পুরুষ মশা কখনওই রক্ত খায় না, তারা আজও কেবল ফুলের মধু খেয়েই বেঁচে থাকে। কেবল স্ত্রী মশারাই ডিম পাড়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংগ্রহের তাগিদে রক্তের ওপর নির্ভর করে। আদিম সময়ে মানুষের বসতি ছিল খুবই কম, তাই, মশারা মূলত জঙ্গল ও জলাশয়ের আশেপাশেই সীমাবদ্ধ ছিল। প্লাইওসিন যুগের শেষদিকে ঘন জঙ্গল যখন ধীরে ধীরে তৃণভূমির রূপ ধারণ করতে শুরু করে, তখন অনেক প্রাণীকেই নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। মাটিতে বসবাসকারী প্রাণীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই পরিবর্তনের ফলে মশারাও তাদের শিকার খোঁজার কৌশল বদলাতে শুরু করে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই অভিযোজনই মানুষের রক্তের দিকে মশাকে আকৃষ্ট করার পথ খুলে দেয়।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আজ থেকে প্রায় ১৮ লক্ষ বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মানুষের পূর্বপুরুষদের শরীরে মশা প্রথম কামড় বসাতে শুরু করে। প্রাচীন মানব প্রজাতি হোমো ইরেক্টাস এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার পরেই সম্ভবত মশারা মানুষের রক্ত খেতে শুরু করেছিল।

৪৬ মিলিয়ন বছর আগের মশার জীবাশ্ম

১৯৯২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে একদল গবেষক মালয় উপদ্বীপ, সুমাত্রা, জাভা এবং বোর্নিওর গভীর অরণ্যে গবেষণা করতে গিয়ে ১১টি প্রজাতির মশার লার্ভা সংগ্রহ করেন। তাঁদের গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল এটাই বোঝার চেষ্টা করা যে, কীভাবে মশার মানুষের প্রতি ঝোঁক বা অ্যানথ্রোপোফিলি (Anthropophily) তৈরি হয়েছিল। তাদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ পত্রিকায়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর আগমনই মশার খাদ্যাভ্যাসের বিবর্তনে বড় ভূমিকা নিয়েছিল।

মানুষ যেহেতু জল ধরে রাখার জন্য পাত্র, কুয়ো বা ড্রাম ব্যবহার করত, তাই মশারা সেখানে ডিম পাড়ার আদর্শ জায়গা খুঁজে পায়। জলের সন্ধানে মানুষের কাছে আসার ফলে তারা মানুষের রক্তের স্বাদ পায়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শুষ্ক এলাকায় বসবাসকারী মশাগুলোর মধ্যে মানুষের রক্তের প্রতি আকর্ষণ, আর্দ্র বা জঙ্গল এলাকায় থাকা মশার তুলনায় অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, মানুষের শরীরের ঘাম এবং নিঃশ্বাসের সঙ্গে নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের একটি বিশেষ ‘গন্ধ’ মশার মস্তিষ্ককে উদ্দীপ্ত করে। বিবর্তনের ধারায় মশার ঘ্রাণেন্দ্রিয় এমনভাবে বিকশিত হয়েছে যে, তারা অনেক দূর থেকেও মানুষের উপস্থিতি টের পায়। বিশেষ করে যেখানে জলের অভাব বেশি, সেখানকার মশারা মানুষের গন্ধকে তাদের বেঁচে থাকার সংকেত হিসেবে গ্রহণ করেছে।

মশার হাত থেকে বাঁচতেই মানুষ মশারির আশ্রয় নেয়।

তবে, পৃথিবীতে এমন জায়গাও আছে যেখানে একেবারেই মশা নেই। তার মধ্যে আইসল্যান্ড অন্যতম। এর মূল কারণ সেখানকার জলবায়ু ও পরিবেশগত অবস্থা। মশা বিভিন্ন কারণেই আইসল্যান্ডে ঘাঁটি গাড়তে সক্ষম হয়নি। প্রথমত, এই অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে অন্য অঞ্চল থেকে মশা আসতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, এই অঞ্চলের পরিবেশ মশার টিকে থাকার জন্য একেবারেই অনুকূল ছিল না। মশার বংশবিস্তারের জন্য উষ্ণ ও বদ্ধ জলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আইসল্যান্ডে এমন জলের উৎস খুবই সীমিত। যদি আইসল্যান্ডে কোনওভাবে মশা চলেও আসে, তাহলেও ঠান্ডা আবহাওয়া ও বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশের অভাবে নিজেদের পূর্ণাঙ্গ জীবনচক্র সম্পন্ন করার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করতে হবে। 

পৃথিবীর মশাবিহীন অঞ্চলগুলোর মধ্যে আন্টার্কটিকাও রয়েছে। আন্টার্কটিকার চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার কারণেই মশা সেখানে থাকতে পারেনি। তীব্র ঠান্ডায় মশা টিকে থাকতে পারে না। যেসব অঞ্চলের তাপমাত্রা শূন্যের নিচে, সেখানে মশার বংশবৃদ্ধি ঘটা সম্ভব নয়। সেখানে মশা টিকে থাকতেও পারে না। আন্টার্কটিকা শুষ্ক, বাতাসপূর্ণ আর ঠান্ডা এক মহাদেশ। সেখানকার কঠোর পরিবেশে খুব অল্পসংখ্যক প্রাণীই টিকে থাকতে পারে।

ভারতে মশারি জনপ্রিয় হলেও, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় মশারির পরিবর্তে কয়েল, ভেপোরাইজার, ক্রিম এবং আগরবাতিরও ব্যবহার শুরু হয়, যেগুলিতে প্রায়শই পাইরেথ্রয়েড থাকে। ডিডিটির চেয়ে নিরাপদ বলে মনে করা হলেও, ভালোভাবে বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় এর ব্যবহারের পরামর্শ খুব কমই মানা হয়। একসময় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ডিডিটি ১৯৭২ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। বিকল্প এই বস্তুগুলির ব্যবহারে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাই নতুন রূপে আসা সাধারণ মশারি আবার ফ্যাশনে ফিরে আসছে বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ মশারি শুধু মশা থেকেই নয়, বিছে এবং সাপ থেকেও সুরক্ষা দেয়।

মশা, লেখক: প্রেমেন্দ্র মিত্র

আধুনিক মশারির ফ্রেমের সঙ্গে ছোট ছোট আল্ট্রাভায়োলেট লাইট লাগিয়ে তৈরি হয়েছে ‘ইউভি লাইট ট্র্যাপ’ মশারি । ইউভি লাইটের আলো মশাকে আকর্ষণ করে জালের কাছে নিয়ে আসে এবং জালের বাইরের স্তরে থাকা হালকা বৈদ্যুতিক শক বা আঠালো স্তরে আটকে মশা মারা যায়।

এখন তো বাজারে ফোল্ডেবল বা পপ-আপ মশারিও পাওয়া যাচ্ছে। এটি অনেকটা তাঁবুর মতো এবং কোনও বাঁশ বা ফ্রেমের ঝামেলা ছাড়াই কয়েক সেকেন্ডে বিছানায় বসানো যায়। এগুলো সহজেই ভাঁজ করে ছোট ব্যাগেও রাখা যায়। এতে জিপার বা চেইন থাকে, ফলে মশা ঢোকার কোনও সুযোগ থাকে না।

আজকাল মশারি শুধু শোবার ঘরেই সীমাবদ্ধ নেই। এগুলো ক্যাম্পিং ও ভ্রমণের এক অপরিহার্য সরঞ্জাম হয়ে উঠেছে, যা হ্যামক, তাঁবু এবং এমনকী শিশুদের স্ট্রলারেও ব্যবহৃত হয়।

সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই মানুষ প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম শত্রু মশার সঙ্গে লড়াই করে আসছে। নীলনদের তীরের ফারাওদের লিনেন পর্দা থেকে শুরু করে আজকের অত্যাধুনিক কীটনাশকযুক্ত জাল, এই সবই আসলে মশারির ইতিহাসে মানব সভ্যতার টিকে থাকার লড়াইয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মশারির উপাদান ও ধরনে পরিবর্তন এলেও, রোগমুক্ত পৃথিবী গড়ার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আজও অনন্য।