


আমার প্রথমেই মনে পড়ে রঘু রাইয়ের তোলা ইন্দিরা গান্ধী এবং মাদার টেরিজার ছবি। মাদারের হাত নমস্কারের ভঙ্গিতে জড়ো করা, চোখে অদ্ভুত প্রশান্তি। তাছাড়া বেনারসের ছবি তো বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য। একেকটা ফ্রেমে যেন লক্ষ অনুভূতি মিশে আছে আলোয়-ছায়ায়। কলকাতায় শহীদ মিনারের সামনে তোলা ছবি ছাড়াও, অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি উনি তুলেছিলেন ভোপালের গ্যাস দুর্ঘটনার সময়। একটি মৃত শিশুকে কবর দেওয়া হচ্ছে, বিষের বাষ্পে তার নিষ্পলক চোখদু’টি ঘোলা, বাচ্চাটির বাবার হাত মৃত শিশুটির মাথার উপর। এক মর্মান্তিক ফ্রেম। ভয়ংকর সুন্দর। এত ইমোশন, অথচ কোনও ওভারল্যাপ নেই। এককথায় আশ্চর্য ক্ষমতা।
ছোটবেলায় আমি বেশ ছবি আঁকতাম। মূলত স্কেচ। ছবির প্রতি গোড়া থেকেই আমার ইন্টারেস্ট। বাঙালি মানেই দুর্গাপুজোয় ভ্রমণ। তেমনই এক পুজোয় কাকাকে অনুরোধ করায়, কাকা আমাকে তাঁর আগফা ক্লিক-থ্রি মডেলের ক্যামেরাখানা দিয়েছিলেন। ১২০ ফরম্যাট, ১২-টা ছবি হত। ফোটোগ্রাফিতে আমার হাতেখড়ি শুরু কাকার ক্যামেরা দিয়ে। তখন ফিল্মের যুগ, সাল ১৯৮৪। ক্লাস সিক্সে পড়ি। সেই বয়সেই ছবি তোলা শুরু। ফিরে এসে ফিল্ম প্রসেস করার পর নেগেটিভ দেখে মন খারাপ! যা তুললাম, সেসব ছবি কিছুই হয়নি। তখন ছবি তোলার কায়দাকানুন কিছু জানতাম না, ফলে মনে একটা প্রশ্ন থেকে গেল– আমার ছবিগুলো কেন ভালো হল না? মাধ্যমিক পাশ করার পর আমি প্রথম ক্যামেরা কিনি– হটশট, এইম অ্যান্ড শুট ক্যামেরা। সেই পর্ব চলেছিল যদ্দিন না আমি আরও পরে নিজের এসএলআর কিনি– জেনিথ ১২ এক্সপি। নিজের ছবি ‘আমার ভালো লাগছে না’ থেকে ‘ভালো লাগছে’ অবধি পৌঁছলাম একটা সময়।

গ্র্যাজুয়েশনের পরে, ২০০০-’০১ নাগাদ রঘু রাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। উনি তখন নিয়মিত কলকাতায় আসতেন ছবি তুলতে। উনি ততদিনে বিখ্যাত। একদিন দেখি ময়দানে উনিও ছবি তুলছেন, আমিও তুলছি। আমি নিজেই গিয়ে ওঁর সঙ্গে পরিচয় করলাম। আগে কখনও আলাপ হয়নি, অথচ সেদিনের পর থেকে রঘু রাইয়ের সঙ্গে অদ্ভুত যোগাযোগ তৈরি হল। এরপর থেকে যখনই উনি কলকাতায় আসতেন, ওঁর সঙ্গে দেখা করে আমার ছবি দেখিয়ে ওঁর মতামত নিতাম। এমনই একদিন উনি হঠাৎ আমায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোন ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলো?’ আমি বললাম, ‘জেনিথ ১২ এক্সপি। রাশিয়ান ক্যামেরা।’ উনি অবাক হয়ে বললেন, ‘তুমি এই ক্যামেরা দিয়ে এইসব ছবি তুলেছ?’ বুঝলাম আমার ফোটোগ্রাফি ওঁর ভালো লেগেছে। আমি ওঁকে সত্যি কথাই বললাম যে, ইচ্ছে থাকলেও ভালো ক্যামেরা কেনার মতো অর্থ আমার নেই। আজ ভাবলে অবিশ্বাস্য লাগে, পরেরবার কলকাতায় এসে উনি আমায় একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড নিকন এফ-থ্রি গিফট করে বললেন, ‘এবার থেকে এটা দিয়ে ছবি তুলো, তুমি পারছ ভালো ছবি তুলতে। আরও ভালো করো।’

বলা যায়, সঠিকভাবে এই আমার ফোটোগ্রাফার হয়ে ওঠার শুরু। তখন গুরুত্বপূর্ণ ইংরেজি কাগজগুলোয় নিয়মিত ছবি পাঠাতাম। ছবি ছাপাও হত। টেলিগ্রাফে তখন অলোক মিত্র, চিফ ফোটোগ্রাফার আর শ্যামলবাবু ছিলেন দ্য স্টেটসম্যানে। এরকম বিভিন্ন জায়গায় ছবি দেওয়া, নানা কম্পিটিশনে যোগ দিতে দিতে প্রথম চাকরিতে জয়েন করি। টাইমস অফ ইন্ডিয়া, বোম্বেতে (অধুনা মুম্বই)।
ইতিমধ্যে ডিজিটাল যুগ এসে গিয়েছে। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও রঘু রাইয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ অটুট থেকেছে। যখনই দিল্লি যেতাম, ওঁর স্টুডিওতে আড্ডা দিতে যাওয়াটা ছিল অবধারিত। ছবি নিয়ে আলোচনা হত। উনি আমায় ডাকতেন ‘মুন্না’ বলে। ছবি দেখে পছন্দ-অপছন্দ সরাসরি বলতেন, ‘মুন্না, দেখ ইয়াঁহাপে অ্যায়সা হোনা চাহিয়ে!’ বা ‘ইয়ে তসবির বহোত আচ্ছা আয়া হ্যায়।’ এরকম মন্তব্য হামেশাই জুটে যেত।

গোড়ায় ওঁর স্টুডিও ছিল দিল্লিতেই, পরে অবশ্য শিফ্ট করে যান কুতুবমিনারের দিকটায়। এগজিবিশন সংক্রান্ত কাজে উনি প্রায়শই আসতেন মুম্বইয়ে। আমিও ফোন করে চলে যেতাম। ওঁর সঙ্গে থেকে সবসময় বুঝতে চেষ্টা করতাম। একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে কখনওই বেশি কথা বলতাম না, বরং নিঃশব্দে অবজার্ভ করতাম– একজন এক্সপার্ট ফোটোগ্রাফার কীভাবে কাজ করেন, সাবজেক্টকে কীভাবে ফ্রেমে ধরেন। যে অ্যাঙ্গেল থেকে উনি একটা ফ্রেমকে স্থির করছেন, তার থেকেই বোঝা যায় ওঁর মুনশিয়ানা। মেরিন ড্রাইভের ধার বরাবর আগে অনেকটা অবধি যাওয়া যেত। টুরিস্টরাও যেতেন। ওখান থেকেই একদিন রঘু রাই ফ্রেম করা শুরু করলেন, তারপর আমরা এগিয়ে চললাম চার্চগেট অবধি। ছবি তুলতে তুলতে যাওয়া হয়েছিল গোটা পথ।

ওঁর তোলা ছবি সম্বন্ধে নতুন কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার প্রথমেই মনে পড়ে রঘু রাইয়ের তোলা ইন্দিরা গান্ধী এবং মাদার টেরিসা ছবি। মাদারের হাত নমস্কারের ভঙ্গিতে জড়ো করা, চোখে অদ্ভুত প্রশান্তি। ইন্দিরা গান্ধীর একটি ছবি, আমার মনে পড়ে, পিছন দিক থেকে তোলা, সামনে নেতারা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধীর মুখ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ছবির গুণে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ওঁর চরিত্রটা।

তাছাড়া বেনারসের ছবি তো বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য। একেকটা ফ্রেমে যেন লক্ষ অনুভূতি মিশে আছে আলোয়-ছায়ায়। কলকাতায় শহিদ মিনারের সামনে তোলা ছবি ছাড়াও, অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি উনি তুলেছিলেন ভোপালের গ্যাস দুর্ঘটনার সময়। একটি মৃত শিশুকে কবর দেওয়া হচ্ছে, বিষের বাষ্পে তার নিষ্পলক চোখদু’টি ঘোলা, বাচ্চাটির বাবার হাত মৃত শিশুটির মাথার উপর। এক মর্মান্তিক ফ্রেম। ভয়ংকর সুন্দর। এত ইমোশন, অথচ কোনও ওভারল্যাপ নেই। এককথায় আশ্চর্য ক্ষমতা।

এক্সপ্রেশন ধরার ক্ষেত্রে ওঁর প্রয়োগটা ছিল আরও অদ্ভুত। পোর্ট্রেট তুলতেন কম, অধিকাংশই ওয়াইড ফ্রেমের ক্যানডিড। ২৪-৭০ বা ২৮-৭০ এই লেন্সই উনি ব্যবহার করতেন। বেশিরভাগ ছবিই ওয়াইড ফ্রেম, লং লেন্স নিয়ে ঘুরতেনই না। সবসময় একটাই লেন্স দিয়ে সব কাজ করে সময় সাশ্রয় করতেন। আমরা যারা প্রেস ফোটোগ্রাফার, তাদের জন্যও এটা খুবই জরুরি শিক্ষা– একটা মুহূর্তকে যত দ্রুত ক্যাপচার করা, সেটা ঘনঘন লেন্স বদলে করা খুব মুশকিল। জুম লেন্স নিয়ে খুঁটিনাটি করার সুযোগটা সেখানে কম, মুহূর্ত ফসকে যেতে পারে!

রঘু রাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা বছর দু’-তিন আগে, এনসিপিএ-র পিরামাল আর্ট গ্যালারিতে। উনি নিজের ছবির একটা শো এবং ওয়ার্কশপ করেছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, ‘মুন্না, যব তু ফোটো লেগা না, হামেশা অ্যাটমসফিয়ার কো ভি লেনা সাথ মে।’ পারিপার্শ্বিকের উপর জোর দিতেন সবসময়। শুধু ক্লোজ-আপ বা মিডশট যে সব নয়, ওঁর এই অ্যাডভাইস আমার কাজে লেগেছে সবসময়। ছবির মধ্যে গল্পটা বলতে গেলে কিছুটা অ্যাটমসফিয়ার রাখতেই হয়, সেটা রঘু রাই-ই প্রথম আমায় বলেছিলেন।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved