Robbar

আমিনা করের ছবি যেন জীবনানন্দের কবিতা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 5, 2026 12:01 pm
  • Updated:May 5, 2026 12:01 pm  

ভাস্কর ভবনে একটি গ্যালারি রয়েছে, আমিনা আহমেদ কর গ্যালারি। বছরে একবার, চিন্তামণি করের জন্মদিনে, সেই গ্যালারিতে সাজানো হয় তাঁর ছবিগুলি। ছবিগুলির বিপন্ন দশা অস্বীকার করে, মুখ আর চোখের মিছিলের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে অনুভব করা যায়– রং এবং ফর্মের ওপর কতটা দক্ষতা থাকলে এই ধরনের সাহসী বিমূর্ততার সৃষ্টি করা যায়! কত বিচিত্র আকার এবং বুনটের মাধ্যমে প্রচলিত শিল্পের ধারণাকে খানিক রেখে, ভেঙে তৈরি করছেন নিজস্ব শিল্পের সনদ। তার ফিগারগুলো অনায়াসে মিলে যাচ্ছে বিমূর্ত ভঙ্গুর উপাদানগুলোর সঙ্গে। আবেগী স্বতঃস্ফূর্ত গভীর রেখা, আর কখনও উজ্জ্বল কখনও ম্লান রঙে আঁকা মানুষ-মানুষীরা যেন সবাই এই গভীর আন্তঃযাত্রার নীরব সাক্ষী; অথবা স্বেচ্ছায় তারা আত্মসমর্পণ করেছে এই দক্ষ শিল্পীর কাছে।

স্বাতী ভট্টাচার্য

২.

‘আলো-অন্ধকারে যাই– মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন্‌ এক বোধ কাজ করে;

আমি তারে পারি না এড়াতে,…’

চৈত্রের হাওয়া বয় এলোমেলো। ঝরা পাতার সঙ্গে উঁকি দেয় পুরনো স্মৃতি। বৃষ্টিভেজা কাচের ওপর পাতলা ছায়ার মতো ভেসে ওঠে একজোড়া গভীর আনমনা চোখ। পড়ন্ত বিকেলের করুণ সূর্যের আলো যেন ছায়া ফেলেছে তাঁর শঙ্খের মতো শুভ্র মুখে। তিনি আমিনা কর, বসে রয়েছেন স্থির, শান্ত, সুন্দর। অথচ সেই চোখে যেন এক ভুলে যাওয়া কিংবা পুরোপুরি ভুলে না-যাওয়া ভাবনার বিমর্ষ কারুকৃতি। 

আমিনা আহমেদ কর

আর্ট কলেজের দোতলার করিডরের শেষে অধ্যক্ষের আবাস। উঁচু সিলিং, বড় বড় ঘর, মেঝের থেকে উঠেছে লম্বা জানলা। করিডরের প্রান্তের দরজা খুলে যায় ঠিক দশটায়। পোশাক-পরিচ্ছদ, চেহারায় আদ্যন্ত সাহেব অধ্যক্ষ চিন্তামণি কর বেরিয়ে আসেন। অটুট তাঁর গাম্ভীর্য, প্রবল তাঁর ব্যক্তিত্ব। বন্ধ হয়ে যায় দরজা, কিন্তু সেই দরজার আড়ালে লেখা হয় আরেকজন শিল্পীর নীরব গভীর চিত্রচর্চার ইতিহাস। আমিনা আহমেদ কর। ভাস্কর চিন্তামণি করের পত্নী। কিন্তু সে তো তাঁর স্বেচ্ছাবৃত সামাজিক পরিচয়। তাঁর ব্যক্তিপরিচয়? তাঁর শিল্পীজীবন? তাঁর মেধা ও মনন? দীর্ঘ সাধনায় যা তিনি কর্ষণ করেছিলেন সযত্নে– সেই পরিচয় অজানা অনেকেরই। আমিনার ছবি, যত দিন গড়িয়েছে, হয়ে উঠেছে এক গভীর বোধ ও বোধির স্বাক্ষরলিপি। তাঁর ছবি দেখলে মনে পড়ে জীবনানন্দের কবিতা, বহু চেনা ‘রূপসী বাংলা’র কবিতা নয়, শহর জীবনের জটিল বিবমিষার কবিতা। কোনও এক অদৃশ্য জটিল মননসূত্রে যেন তাঁরা বড় কাছাকাছি। 

শিল্পী: আমিনা কর

অমৃতা শেরগিলের মতো আমিনার শিল্পশিক্ষাও ইউরোপে। যদিও তার সূচনা হয়েছিল কলকাতাতে। বাবা ছিলেন বিখ্যাত দন্ত-চিকিৎসক আর. আহমেদ (যার নামে আর. আহমেদ ডেন্টাল কলেজ) এবং রাজনীতিবিদও বটে। এরকম একটি পরিবারে আমিনার জন্ম, ১৯৩০ সালে। নানা লোকের আনাগোনায়, নানা বৌদ্ধিক আলোচনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব তাঁর মননকে ঋদ্ধ করেছিল। পড়াশুনায় তাঁর আগ্রহ ও মেধা কোনওটাই কম ছিল না। মাত্র ১৪ বছর বয়েসে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে, দিল্লি গিয়েছিলেন লেডি আর্মিন কলেজে পড়তে। কিন্তু তাঁর প্রথম ভালোবাসা ছিল ছবি। খুব অল্পবয়স থেকেই ছবির সঙ্গে এক নিবিড় সখ্য তৈরি হয়েছিল। কলেজের পড়ার পাশাপাশি চিত্রচর্চা চলত। মাঝেমধ্যে উঁকি দিতেন দিল্লির নানা চিত্রকরদের স্টুডিওতে। মজার কথা এই যে, এই শিল্পীদের একজন ছিলেন চিন্তামণি কর। তখন যা ছিল নিতান্তই এক প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর কাজের প্রতি মুগ্ধতা, তা-ই পরবর্তীকালে বিদেশের মাটিতে প্রেম এবং পরবর্তীকালে পরিণয়ে পরিণতি পেল।

ভাস্কর চিন্তামণি কর

মাত্র ১৬ বছর বয়সে একাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ এক প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ ছাত্রী-শিল্পী হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। তৎকালীন প্রথিতযশা শিল্পী অতুল বসু, রথীন মৈত্র, গোবর্ধন আশ প্রমুখের ছবির পাশাপাশি টাঙানো হয়েছিল কিশোরী আমিনার আঁকা ছবিও।

১৯৪৯ সাল। ১৯ বছর বয়সে পাড়ি জমালেন বিদেশে। ভারতের স্বাধীনতার বয়স তখন মাত্র দু’ বছর। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়ায় তখনও অনেকটাই আচ্ছন্ন ভারতীয় মনন। কিন্তু নিজের শিকড়ের প্রতি টান, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ– যা তাঁর মনের পরতে পরতে জড়িয়ে ছিল, আর সেইসব নিবিড় একান্ত অনুভূতি জন্ম দিয়েছিল যে ভালোবাসার, তা-ই তাঁকে প্রাণিত করল সংস্কৃত ভাষাতত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনো করতে। ফিলিপে স্টার্ন, জর্জ কোয়েদেস, জে আউবয়ের প্রমুখ সুখ্যাত ফরাসি ভারততত্ত্ববিদের কাছে পাঠ শুরু হল তাঁর। শিল্প-ইতিহাস নিয়ে গভীর চর্চার সূচনাও হল প্রায় একই সময়ে। Académie Julian-এ শিখতে লাগলেন তেলরঙের কাজ আর পরবর্তীতে Hayter’s Studio-তে শিখলেন গ্রাফিক্স। প্যারিসের সর্বন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরকিওলজি ও ভারতবর্ষের শিল্পধারা নিয়ে গবেষণাও করেন তিনি। তাছাড়া আকাদেমি দ্য লা গ্রন্দ শমিয়ের-এ ফিগার ড্রয়িং অভ্যাস করতে যেতেন। এই উৎসাহ তাঁর বজায় ছিল আজীবন। তবে তাঁর শিল্পী-জীবনে যে মানুষটির প্রভাব সর্বাধিক বলে মনে করা হয়, তিনি ছিলেন ‘দ্য স্টিল’ আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ এম সেজার দোমেলা। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল শিল্পের মাধ্যমে জীবনের একটি নতুন, ভারসাম্যপূর্ণ ও সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা। এই শিল্পভাবনার আদর্শ অনুসরণকারী শিল্পীরা তাঁদের কাজে মূলত আনুভূমিক (horizontal) এবং উলম্ব (vertical) রেখা এবং আয়তক্ষেত্রাকার আকৃতি ব্যবহার করতেন। তাদের প্যালেটও প্রধানত মৌলিক রং (লাল, হলুদ, নীল) এবং সাদা, কালো ও ধূসর রঙেই সীমাবদ্ধ ছিল। এটুকু জানা দরকার এইজন্যেই যে, সেজারের সংস্পর্শে এসে বদলে গেল আমিনার চিত্রশৈলী। এক অন্তরঙ্গ অনুসন্ধানে তাঁর শৈলী ক্রমশ বিমূর্ততার অভিমুখী হয়ে উঠল। রেখার গতিময় স্বাচ্ছন্দ্য, বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা– তাঁর এই সময়ের চিত্রশৈলীতে এক বহুমাত্রিক উদ্বেলতার সঞ্চার করেছিল।

শিল্পী: আমিনা কর

আমিনার ছবিতে মানবদেহ বারেবারেই ঘুরেফিরে আসে। কখনও শুধুই মুখের ওপর নানা রেখার বিন্যাস, আলতো রঙের ভাঙাগড়া। বিদেশে থাকাকালীন মনের সুখে ছবি এঁকেছেন তরুণী আমিনা। সেসময় তিনি যেন তাঁর ফর্মের মধ্যে দিয়ে গড়ে তুলতে চাইছিলেন একজন নারীর, একজন আধুনিক মননের মানুষের বহুবিচিত্র অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিক প্রতিভাস। তাঁর নিজস্ব শৈলীতে তৈরি হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের বুনট, এক আত্মকেন্দ্রিক অথচ সামগ্রিক উৎকেন্দ্রিকতার বয়ান– যার কেন্দ্রে রয়েছে গভীর নিঃসঙ্গতার এক শীতল ঢেউ।

শিল্পী: আমিনা কর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপকে কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। আবার সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতবর্ষের ঐতিহ্যের শিকড়, কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লিপি সভ্যতা আবিষ্কারেও মেতে উঠেছেন। ‘The Angkorian Records’ (১৯৭৭) তাঁর আজীবন গবেষণা ও সাধনার ফল।‌ একইসঙ্গে বৈদগ্ধ্য ও সৃজনশীলতার এমন উদাহরণ অমিল না হলেও বিরল বইকি!

দোমেলার ছবিতে দেখা‌ যায় একাধারে চিত্র ও ভাস্কর্যের এক অদ্ভুত মিলন। বর্ণময় পটভূমিতে কাঠের বা ধাতব অবয়বের সংযোগ করে নানা ছন্দোময় রূপকের সৃষ্টি করতেন দোমেলা।

শিল্পী: সেজার দোমেলা

আমিনা করের‌ কাজে দোমেলার এই অভিনব রচনাশৈলির এক বিশেষ অভিঘাত পড়েছিল বলে মনে করেন কিছু শিল্প-সমালোচক। তবে বর্তমানে তাঁর যে ছবিগুলি দেখা যায়, সেখানে তেমন কোনও প্রভাব দেখা যায় না। তাঁর ছবির মধ্যে এক ধরনের ত্রিমাত্রিকতা অনেক সময় উঠে আসে, সেটা হয়তো খানিকটা তাঁর কৌণিক ফর্মের জন্য। 

শিল্পী: আমিনা কর

জীবন, তাঁর উপলব্ধিতে এক অবিচ্ছিন্ন কালস্রোত– সেখানে অনায়াসে অতীত, বর্তমানের মধ্যে প্রবাহিত হয় এবং বর্তমান মিলে যায় ভবিষ্যতের সঙ্গে। তাঁর ছবি চেতনার প্রবহমানতার এক দৃশ্য দলিল। বাস্তব পিছলে যায় পরাবাস্তবে, রং আর রেখার এক অদ্ভুত স্তরবিন্যাস সৃষ্টি করে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ। যা কখনও মনে করায় কোনও ধূসর অভিজ্ঞতাকে, কখনও তা স্মৃতির ছায়ামাত্র‌। পরক্ষণেই তা শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতির যে তীব্রতা সৃষ্টি করে– যা তীক্ষ্ণ-বিদ্বেষে ভেঙে দেয়, অস্বীকার করতে চায় কালপ্রবাহের প্রতিটি মাত্রা-চিহ্নকে। ঘষে‌-ঘষে চেপে-চেপে রং লাগিয়ে যেন খুব সচেতনভাবে সৃষ্টি করা এই বিচ্ছেদ।

শিল্পী: আমিনা কর

এই বহুমাত্রিক উপস্থাপনা এবং নানা দৃষ্টিকোণের ব্যবহার– এটাই বোধহয় তাঁর ছবির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। আমিনার ছবি তাই আমাদের ভাবায়। ভাবতে বাধ্য করে। বুদ্ধির কাছে, যুক্তির কাছে, এবং সামগ্রিক অচেতনতা– যা দিয়ে অনেক সময় আমরা পারিপার্শ্বিক অসাম্যগুলোকে ঢেকে রাখি– তার কাছে আবেদন করে। খোঁচা দিয়ে জাগিয়ে দেওয়ার মতো।

খুব উজ্জ্বল হলুদ, কদাচিৎ লাল‌ এবং নীল। এ বাদে যে রং তাঁর ছবি জুড়ে প্রধান হয়ে ওঠে, তা কালো। মনে পড়ে গুস্তাভ কার্ল ইউং-এর কথা– ‘One does not become enlightened by imagining figures of light, but by making the darkness conscious’। এই‌ যে শব্দবন্ধ, ‘অন্ধকারকে সপ্রাণ করে তোলা’, তা হয়তো তাঁর প্রতিটি ছবির ক্ষেত্রেই সত্যি। একটার পর একটা স্তরবিন্যাস করে তিনি তৈরি করেন ছবির বয়ান, সেখানে খানিকটা গল্প থাকে, খানিকটা থাকে না, যেন আছে কি না বোঝার আগেই অদৃশ্য হয়ে যায় ন্যারেটিভ। মানুষের দেহের আকার, বিশেষত নারীমুখের আকার বারবার ফিরে আসে তাঁর ছবিতে। কখনও সেই মুখে তীক্ষ্ণ বিকৃত এক হাসি, কখনও তীব্র ঘৃণা, কখনোও রিরংসা, কখনও ব্যথা– আর সেই মুখের ওপর দিয়ে বারবার চলে যায় অসংখ্য কালো, মোটা, জোরালো, ভাঙা রেখা। যেন প্রত্যেকটা স্তরেই তিনি ভিন্ন ভিন্ন ভাবে মুছে দিতে চাইছেন আগের স্তরে বিন্যস্ত ন্যারেটিভটিকে। অর্থাৎ একইসঙ্গে একটা সমান্তরাল ন্যারেটিভ তৈরি হচ্ছে, যেখানে ঘটনা এবং ঘটনার প্রতিক্রিয়াগুলোর সম্মিলিত একটা চেহারা ছবির মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। যেন তাদের একটা যুগপৎ সংযোগ খুব সচেতনভাবে ঘটানো হচ্ছে।

শিল্পী: আমিনা কর

এরকম কিছু বয়ান কিউবিক শিল্পীদের কাজে আমরা দেখতে পাই। কারণ একই বস্তুকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাটাই ছিল তাঁদের শিল্প দর্শনের মূল কথা। সেখানে ফর্মকে ভেঙে একটা বিমূর্ত ছন্দে বেঁধে ফেলা হত। কিন্তু আমিনা করের ছবিগুলো ঠিক যেন সেইরকমও নয়। এখানে আকারগুলো ভেঙে যাচ্ছে, বিমূর্ত হয়ে যাচ্ছে, আবার যেন সেগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযোজিত হয়ে যাচ্ছে এক গুমোট ঠাস বুননে। নিচের ছবিদু’টি দেখলে বিষয়টা খানিকটা স্পষ্ট হবে।

শিল্পী: আমিনা কর
শিল্পী: আমিনা কর

অর্থাৎ বিভিন্ন মোটিফকে একটি একক কাল-কাঠামোর মধ্যে সংঘটিত হিসেবে স্তরে স্তরে সাজিয়ে, এক যুগপৎ সংঘাত, ধারণায় গেঁথে দিচ্ছেন‌ শিল্পী। আমিনার ছবিতে বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণ করা হয় নির্মমভাবে, ভেঙে ফেলা হয় এবং একটি বিমূর্ত রূপে পুনরায় একত্রিত করা হয়। একটি একক দৃষ্টিকোণ থেকে বস্তুকে চিত্রিত করার পরিবর্তে, শিল্পী বিষয়টিকে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিত্রিত করেন; এবং খুব অদ্ভুতভাবে নানা চোখ সাজিয়ে দেন ছবিতে, যাতে নানা দৃষ্টিকোণের ধারাবাহিক বিন্যাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‌সার্বিক বিমূর্ততা দু’-একটি ছবি ছাড়া তাঁর ছবিতে সেভাবে ধরা দেয়নি। বরং বেশিরভাগ ছবিতে এক ধরনের গাঠনিক কাঠামো থেকেই যায়, এবং ছবির মধ্যে এক ভিন্নতর ছন্দের সৃষ্টি হয়। এর কারণ সম্ভবত ভারতীয় এবং প্রাচীন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ছবির সঙ্গে তাঁর পূর্বপরিচিতি। ছবির স্টাইলের চেয়ে, হয়তো ছবির এই আন্তঃছন্দ বা স্পিরিটই তাঁর কাছে বেশি জরুরি ছিল। তাঁর ছবি হয়তো গল্প বলে না, কিন্তু সরাসরি আবেদন রাখে মানুষের বোধের কাছে। প্রায় প্রতিটি ছবিই দর্শককে এক তীব্র বোধ-সচেতনতায় আহত ও আচ্ছন্ন করে। তাই রেখাভিত্তিক স্কেচগুলো হোক বা বিভিন্ন বয়সে করা স্টাডি–সবের মধ্যেই এক আশ্চর্য ধারাবাহিক গাঠনিক ঐক্য ও গতিশীলতা লক্ষ করা যায়।

শিল্পী: আমিনা কর

১৯৫৩ সালে আমিনা ভারতে ফিরলেন। পরের বছর দিল্লিতে তাঁর একক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হল। সেই প্রদর্শনীর সাফল্যক্রমে পরপর চার বছর চারটি একক প্রদর্শনী। তাঁর কাজের শৈলী ও অভিনবত্ব মুগ্ধ করল শিল্পরসিক দর্শকদের। অনেকেরই হয়তো জানা নেই, এই চার বছর দিল্লিতে থাকাকালীন তিনি দিল্লি ইন্টারন্যাশনাল ফেয়ারের প্রাচীরচিত্র এবং অলংকরণের কাজও সুষ্ঠুভাবে সমাধা করেন।

আমিনার অদম্য প্রাণশক্তি, উৎসাহ এবং নতুনকে জানার জন্য সদা আগ্রহী একটি মন ছিল। তাই ১৯৫৭ সালে আবার তিনি পৌঁছলেন প্যারিসে। এবার লক্ষ্য– একোল দ্য ল্যুভর থেকে মিউজিয়ামোলজি-র তিন বছরের ডিপ্লোমা। কারণ শিল্প-সংক্রান্ত চর্চা ও গবেষণা তাঁর কাছে ছবি আঁকার মতোই জরুরি ছিল। সেজন্যই নিজেকে সর্বতোভাবে প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন। ১৯০৭-এ মিউজিয়ামোলজি-তে ডিপ্লোমা লাভ করার পরে, ইউরোপের আরও কিছু দেশ ভ্রমণ করেন আমিনা, সেখানকার মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন এবং শিল্প আন্দোলন সম্বন্ধে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। ১৯৬১-তে ফিরে আসেন দেশে এবং শিল্পচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যে নিউইয়র্ক বিশ্বমেলায় আমিনা করের আঁকা ৩৪ ফুট বাই ১০ ফুট একটি মিউরাল পাঠানো হয়েছিল, এ খবর অনেকেই জানেন না। 

শিল্পী: আমিনা কর

আমিনা ছিলেন অনুভূতিপ্রবণ, সমাজ-সচেতন শিল্পী। তবে শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি যেহেতু সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেকটাই আলাদা, তাই শিল্পীর চোখ অনেক গভীর সত্যকেই অনায়াসে আবিষ্কার করতে পারে– একথা তিনি বিশ্বাস করতেন। আবেগী স্রষ্টা, তাই মনে করতেন, শিল্পীর ‘হৃদয়াবেগ প্রকৃতির সুপ্ত সত্যকে অন্তরনিষ্ঠা দিয়ে অনুধাবন করে’।

‌‌এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল– ‘আজকাল শিল্পজগতে দুই ভিন্ন মতাবলম্বী দলের সন্ধান পাওয়া যায়। এক দল ইউরোপীয় শিল্পধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন কিছু করতে চান, অন্য দল ভারতের অতীত শিল্পকে পুনরজ্জীবিত করার প্রয়াসে ব্রতী হয়েছেন। এ বিষয়ে আপনার মত কী?’ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘অতীতের শিল্প ঐতিহ্য আমাদের মনেপ্রাণে যখন প্রবহমান, তখন তাকে আলাদা করে দর্শনের চেষ্টা বা চর্বিতচর্বন করতে যাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। তাকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রেখে এগিয়ে যাওয়াই শিল্পীর পক্ষে সঙ্গত।’

শিল্পী: আমিনা কর

এই উক্তিটি দু’টি কারণে প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, ওরিয়েন্টাল আর্ট স্কুলের একদা শিক্ষার্থী চিন্তামণি কর সারাজীবন ছবি এঁকেছেন কিন্তু বেঙ্গল স্কুল স্টাইলে। যদিও তাঁর যে ভাস্কর্য– তা একেবারেই পাশ্চাত্য ধারায় রচিত। কিন্তু এ ধরনের কোন‌ ভেদ ছিল না আমিনা করের কাজে। তাই নারী চরিত্রদের মধ্যে দেশি, বিদেশি দু’ ধরনের নারীরই চিত্রায়ন দেখা যায় তাঁর কাজে। যদিও নয়ের দশকে করা তাঁর একাধিক ছবি দেখে মনে হয়, বিশেষভাবে ভারতীয় মেয়েদের অন্তর্লীন বেদনার কথাই বলছে। সেইসব মেয়েরা– যারা পাছে লোকে কিছু বলে, সেই ভয়ে নিজেকে নানাভাবে উপস্থাপিত করে। যাদের মনে হয়, সবসময়ই নানা চোখ তাদের দেখছে। তাই তাদের চোখে ভয় থাকলেও, ভয় লুকিয়ে, তারা নরম করে তাকায়। কখনও নরম দৃষ্টির পেছনে লুকিয়ে থাকে আগুন।

শিল্পী: আমিনা কর

একটি মুখ, না কি অনেকগুলি মুখ? একটি মুখেরই অভিব্যক্তি, একটি মানুষেরই বিভিন্ন সময়ের চেহারা– না কি অন্য অনেক মুখ, অন্য অনেক মানুষ? কেউ নিকৃষ্ট, কেউবা হতাশ, আবার হয়তো বাইরের মুখখানা খানিকটা হলেও হাফ প্রোফাইলে দেখা যাচ্ছে, ঘোমটা টানা। এখানে ’৯৩ সালে আঁকা দু’টি মুখের কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়। দু’টি ছবির মুখের গড়ন একইরকম। একটি জোরালো লাইন দিয়ে ভুরুর ওপরে আঁকা। একটি সরু। চোখদুটোর একটি আনত, অন্যটি ব্যঙ্গ-কঠিন। উপরের চোখটি দুর্বিনীত।

শিল্পী: আমিনা কর

আমিনা করের ছবিতে চোখ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নানা ভাবে নানা ছবিতে চোখের ব্যবহার করেছেন তিনি। একই ছবিতে বিভিন্ন চোখের ফর্ম যেমন এসেছে, তেমনই হঠাৎ করে রং ও রেখার মাঝখানে একটা চোখের অবয়ব ভেসে ওঠে, উঠে আসে ছবির বিচিত্র স্তরবিন্যাসের একবারে আদিস্তর থেকে। কেন্দ্র থেকে এক অসম্ভব দ্যোতনা নিয়ে সে তাকায় পৃথিবীর দিকে। অথচ সেভাবে কিন্তু রেখা দিয়ে আঁকা হয়নি কোনও চোখের আকৃতি, নিজে নিজেই তৈরি হয়েছে, তাকিয়েছে তীব্র গভীর প্রশ্ন নিয়ে– দর্শকের দিকে।

শিল্পী: আমিনা কর

আমিনার ছবি কথা বলে। ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়। সুস্পষ্ট সাজানো কথা। কতগুলো কম্পোজিশন বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো, যেখানে মনে হয়, প্রতিটি লাইনই খুব গোছানো-সাজানো, ভেবেচিন্তে দেওয়া। আবার কখনও তা জলের মতো বহমান, চলিষ্ণু, গভীর নিঃসঙ্গ। পুনরায় জীবনানন্দীয়‌ উচ্চারণের কাছে টেনে নিয়ে গিয়ে ফেলে– 

‘আড়ষ্ট– অভিভূত হয়ে গেছি আমি,
কাল রাতের প্রবল নীল অত্যাচার আমাকে ছিঁড়ে ফেলেছে যেন;
আকাশের বিরামহীন বিস্তীর্ণ ডানার ভিতর
পৃথিবী কীটের মতো মুছে গিয়েছে কাল!’

শিল্পী: আমিনা কর

সবসময়ই একটা অস্থিরতা। যেন কোনও কিছুতেই তৃপ্ত হতে পারছেন না। তাই আঙ্গিকগত পারদর্শিতা কিংবা আধুনিক চিত্রকলার সঙ্গে তাঁর গভীর পরিচয় সত্ত্বেও বারবার শৈলী বদলেন ফেলছেন। বদলাচ্ছেন শিল্পমাধ্যম। পেনসিল, কালি, ক্রেয়ন, জলরং, তেলরং, অ্যাক্রলিক, লিথোগ্রাফ, এচিং… এবং তা বিভিন্ন সারফেসের ওপর, কাগজ কিংবা ক্যানভাস। রেখার ঠাস বুনট এখানেও সৃষ্টি করছে অন্য এক প্রেক্ষাপট। গভীর নীলে ভাসমান পৃথিবীর আদর, না কি এক বিরাট জলবন্দি মানুষের পৃথিবী!

শিল্পী: আমিনা কর

এই বহুমুখীনতা তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য। শিল্পের আঙ্গিক বদলেছেন। আঙ্গিকে ক্রমপরিবর্তন লক্ষ করা গেলেও, যা বদলায় না তা হল মানুষের মুখ, শরীরী আদল। প্রায় অতি ব্যবহৃত উপাদানের‌ মতো ঘুরেফিরে আসে মানুষের মুখ। উঠে আসে জটিল রেখার বন্ধন ও ঘনত্বের মধ্যে থেকে। যেন‌ এভাবেই তিনি জানতে চান মানুষকে, নিজেকে, চারপাশকে। সে মুখ মানুষীর। কিংবা লক্ষ্মীর ঘটের গায়ে আঁকা দেবীমূর্তির। বিস্ফারিত দেবীচক্ষু। এ যাবৎ দেখা তাঁর মানবী-চোখের মতো।

শিল্পী: আমিনা কর

তাঁর ছবি অন্তরঙ্গ, অন্তর্মুখী। হয়তো খানিকটা আত্মজৈবনিক। তাঁর ছবি মেয়েদের কথা বলে। মেয়েদের সমস্যা তুলে ধরে। মেয়েদের যাপন নানা স্তরে বিন্যস্ত; অনেকসময় এক স্তরের সঙ্গে অন্য স্তরের মিল পাওয়া যায় না। কেবল আভাসটুকু পাওয়া যায়। এই অন্তর্গত খননের গভীর স্পর্শকাতর সংবেদনশীল এক ছবি উঠে আসে তাঁর প্রতিটি কাজের মধ্যে।

১৯৫৩-তে ফিরে আসার পর থেকে, ২০০১-এ তাঁর মরণোত্তর প্রদর্শনীটি পর্যন্ত একাধিক প্রদর্শনীতে আমিনা করের ছবি প্রদর্শিত হয়েছে, লোককে ভাবিয়েছে। পুরস্কৃতও হয়েছে। তবু তাঁর সম্বন্ধে তেমন কোনও খবর আজও জানি না আমরা। ভাস্কর ভবনে একটি গ্যালারি রয়েছে, আমিনা আহমেদ কর গ্যালারি। বছরে একবার, চিন্তামণি করের জন্মদিনে, সেই গ্যালারিতে সাজানো হয় তাঁর ছবিগুলি। ছবিগুলির বিপন্ন দশা অস্বীকার করে, মুখ আর চোখের মিছিলের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে অনুভব করা যায়– রং এবং ফর্মের ওপর কতটা দক্ষতা থাকলে এই ধরনের সাহসী বিমূর্ততার সৃষ্টি করা যায়! কত বিচিত্র আকার এবং বুনটের মাধ্যমে প্রচলিত শিল্পের ধারণাকে খানিক রেখে, ভেঙে তৈরি করছেন নিজস্ব শিল্পের সনদ। তার ফিগারগুলো অনায়াসে মিলে যাচ্ছে বিমূর্ত ভঙ্গুর উপাদানগুলোর সঙ্গে। আবেগী স্বতঃস্ফূর্ত গভীর রেখা, আর কখনও উজ্জ্বল কখনও ম্লান রঙে আঁকা মানুষ-মানুষীরা যেন সবাই এই গভীর আন্তঃযাত্রার নীরব সাক্ষী; অথবা স্বেচ্ছায় তারা আত্মসমর্পণ করেছে এই দক্ষ শিল্পীর কাছে।

শিল্পী: আমিনা কর

আমিনা করের মৃত্যুর পর গ্যালারি ৮৮-এ তাঁর একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল, ২০০১ সালে। তাঁর নানা মাধ্যমে করা বেশ কয়েকটি ছবি সেখানে প্রদর্শিত হয়েছিল। সেই ক্যাটলগটিতে লেখা ছিল–

‘The fluidity of both her pen-and-ink figurations and complex brush-strokes should be seen and understood as such– as random scratches on a lacerated mind seeking desperately to bridge the visible and the invisible. The efforts of Galerie 88 to display these very private exercises of the late lamented artist.’

তাঁর ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের বিস্তারিত সংবাদ আমার জানা নেই। যাঁরা তাঁকে চিনতেন, তাঁরা কেউ কেউ বলেন তাঁর মানসিক ভারসাম্যের অভাবের কথা। কেউ কেউ বলেন যে তাঁর স্নায়ুর অসুখের কথা। শুনেছি, তবু শেষ অবধি ছবির মধ্যেই নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিলেন তিনি। শিল্পের ইতিহাসে মানসিক সমস্যা নিয়ে ছবি এঁকেছিলেন দুই বিখ্যাত শিল্পী ভ্যান গখ এবং এডওয়ার্ড মুঙ্খ। পৃথিবীর ইতিহাসে মানসিক ভারসাম্যহীন শিল্পীদের বহু ছবি রয়েছে। তাঁদের ছবির মাধ্যমে তাঁদের মানসিক অবস্থা বোঝার প্রয়াস এবং নানারকম গবেষণা আজও জারি রয়েছে। আর্ট থেরাপির‌ কথা তো আমাদের অনেকেরই জানা। নানা যন্ত্রণাই শিল্পের জন্ম দেয়। কিন্তু শিল্প যখন যন্ত্রণার সাক্ষ্য বহন করেও, নিজের দাবিতে দর্শকের মন কেড়ে নেয়, তখন এ ধরনের মন্তব্য খানিকটা নিষ্প্রয়োজন মনে হয়।

শিল্পী: আমিনা কর

শুরু করেছিলাম জীবনানন্দের কবিতা দিয়ে। আমিনা করের অসংখ্য ছবির বিভিন্ন নারীমুখ ও তাদের অভিব্যক্তি আমাকে বারবার ফিরিয়ে দেয় জীবনানন্দের কাছেই, মনে হয়–

“যে রূপসীদের আমি এশিরিয়ায়, মিশরে, বিদিশায় মরে যেতে দেখেছি
কাল তারা অতিদূরে আকাশের সীমানার কুয়াশায় কুয়াশায় দীর্ঘ বর্শা হাতে ক’রে
কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে যেন–
মৃত্যুকে দলিত করবার জন্য?
জীবনের গভীর জয় প্রকাশ করবার জন্য?
প্রেমের ভয়াবহ গম্ভীর স্তম্ভ তুলবার জন্য?”

…………… পড়ুন চিত্রার্পিত কলামের অন্যেন্য পর্ব ……………

পর্ব ১ : মনের মানুষের সন্ধানেই রানী চন্দের শিল্পনীড় রচনা