Robbar

ছবির কবি: অসিতকুমার হালদার

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 27, 2026 2:56 pm
  • Updated:May 27, 2026 2:56 pm  

রবীন্দ্রনাথের সাদর আহ্বান সত্ত্বেও শান্তিনিকেতনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে অসিতকুমারের বাবার মত ছিল না। তাঁর কাছে শান্তিনিকেতনের শিল্প-আদর্শের চেয়ে কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজের চাকরি ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরে অবশ্য বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ এবং সি এফ অ্যান্ডরুজ অনেক বুঝিয়ে কোনওমতে তাঁকে নিমরাজি করাতে পেরেছিলেন। নইলে অসিতের কলাভবনে যোগ দেওয়া হত কি না সন্দেহ! 

সুশোভন অধিকারী

৫.

অবশেষে নন্দলালের পরিবর্তে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে এসে যোগ দিলেন অসিতকুমার হালদার তাঁর ছবি আঁকার পাঠগ্রহণ অবনীন্দ্রনাথের কাছে ছবির ধরনও গড়ে উঠেছে অবন ঠাকুর প্রবর্তিত বাংলা-কলমের আদলে অসিতকুমারের ছবিতে একপ্রকার কাব্যময়তার প্রকাশ ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন অসিতের ছবি। এমনকী, এলমহারস্ট ও ডরোথির বিয়েতে উপহার হিসেবে অবন-গগন বা নন্দলালের পরিবর্তে তিনি অসিতের আঁকা ছবি উপহার দিয়েছিলেন।

অসিতকুমার হালদার

এখানে অসিতের ছবি প্রসঙ্গে একটা গল্প সেরে নেওয়া যেতে পারে তিনি তখন শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের শিক্ষক, কলাভবন তৈরি হয়নি তখনও বিদ্যালয়ে গরমের ছুটি পড়েছে, রবীন্দ্রনাথ আশ্রমেই রয়েছেন রাঁচিতে গ্রীষ্মের ছুটি কাটিয়ে অসিত শান্তিনিকেতনে ফিরেছেন ঠিক তার পরের ঘটনা, অসিতের মুখেই শুনি, ‘‘সেবার গরমের ছুটিতে রাঁচি গেছি, আমার ছাত্র মুকুলচন্দ্র, তিনি আছেন আশ্রমে আমার অনুপস্থিত কালে নতুন ছবির জন্যে বিষয়বস্তু ভাবতে না পেরে তিনি গেলেন গুরুদেবের (রবিদাদার) কাছে মুকুলের ছিল অবাধ গতি সর্বত্র এবং সকলের সঙ্গে জমিয়ে নেবারও অদ্বিতীয় ক্ষমতা কবি তাঁকে বললেন, ‘আমার উপযুক্ত একটি সরস্বতী আঁক, দিব্যপ্রজ্ঞা– ক্যালেন্ডারের সরস্বতী চাই না।’ মুকুল কোমর বেঁধে লেগে গেলেন, একটার পর একটা সরস্বতী আঁকতে; রবিদার কিন্তু একটিও মনে ধরল না।’’

সুরের আগুন। শিল্পী: অসিতকুমার হালদার

গল্প কিন্তু এখানেই শেষ নয় এরপর অসিত লিখছেন, ‘অবশেষে গ্রীষ্মবকাশের পর আমি ফিরে আসতেই রবিদা তাঁর কথা সব বললেন এবং পুনরায় আমাকে তাঁর ‘দিব্যপ্রজ্ঞা’ সরস্বতীর চিত্রাভাস তৈরি করতে বললেন তিনি যেভাবে বর্ণনাকালে জ্যোতিদৃপ্ত ভাব প্রকাশ করেছিলেন তাতে তাঁর সরস্বতীর আভাস পেয়ে একটি ‘অগ্নিময়ী সরস্বতী’ আঁকলুম রঙিন ছবিটি সম্পূর্ণ করে রবিদার সামনে ধরতেই তাঁরও মনে সুরের রং ধরল তিনি তুড়ি দিতে দিতে তাল দিয়ে গুঞ্জন করে রচনা করলেন: ‘তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে মোর প্রাণে,/ সে আগুন ছড়িয়ে গেল সব খানে…’ অর্থাৎ অসিতের সেই বিখ্যাত ছবি ‘সুরের আগুন’-এর আড়ালে রয়েছে এই গল্প। কেবল তা-ই নয়, এর দিয়ে রবিঠাকুরের গান রচনার এক আশ্চর্য মুহূর্তকে আমরা অনুভব করি কী অনায়াসে তাঁর কণ্ঠে গানের বাণী এবং সুর একত্রে জেগে ওঠে, বেজে ওঠে! আর যে কথাটা বলা দরকার, তা হল, রবীন্দ্রনাথের গান অবলম্বনে একাধিক শিল্পী ছবি এঁকেছেন তার বিপরীত দিকে স্বয়ং রবিঠাকুর কোনও শিল্পীর ছবি দেখে গান রচনা করেছেন, এমন নজির একেবারে হাতে-গোনা এঁদের মধ্যে নন্দলাল আর অসিতকুমারের কথাই সবার আগে মনে পড়ে যাই হোক, এ গল্প এখানে থাক আবার কিছুটা পিছনে তাকাই।

শিক্ষক হিসেবে অসিত হয়তো আরেকটু আগেই কলাভবনে যোগ দিতে পারতেন, রবীন্দ্রনাথই তাঁকে খানিক পরে আসতে বললেন অবশ্য তার কারণ ছিল রীতিমতো টানাটানির মধ্য দিয়ে কবিকে তাঁর প্রতিষ্ঠান চালাতে হয় ছুটির সময় যেহেতু ক্লাস নেই, তাই সেই পর্বের খরচের বোঝা যতটা কমে ততটুকুই সাশ্রয় এই বিবেচনায় অসিতকে শান্তিনিকেতনে তখুনি আসতে বারণ করলেন বললেন, বাগ গুহার কাজটা সেরে নেওয়া ভালো, ‘কেন না তাতে তোর নিজেরও কিছু study হবে অথচ অর্থও পাবি।’ তারপর বাগগুহার কাজ শেষ করে এলে আশ্রমের তিন মাস গরমের ছুটি পড়ছে তাই ছুটি কাটিয়ে কাজে দেওয়াই সমীচীন মনে করলেন রবীন্দ্রনাথ আরও একটা ব্যাপার, ছুটির সময় আশ্রম প্রায় ফাঁকা হয়ে যায় তখন দেখেশুনে যথাযথ থাকার জায়গার ব্যবস্থা করা দরকার রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘ইতিমধ্যে এতকাল নাতবৌকে রাখবো কোথায়? ছুটিতে মীরা তো এখানে থাকবেই না– মাঝে যদি ওর কোথাও ডাক পরে তাহলে কী কর্তব্য? ছয়মাস পরে যখন তুই কাজে যোগ দিবি, তখন এখন থেকে এখানে ঘরকন্নার ব্যবস্থা করা কি ঠিক হবে’ ইত্যাদি ইত্যাদি যদিও এই চিঠির সপ্তাহ খানেক পরে ‘রবিদাদা’র আরেকখানা চিঠি এল অসিতের হাতে রবীন্দ্রনাথ সেখানে কলাভবনের কাজে যোগ দেওয়ার কথা, টাকাপয়সা ইত্যাদি আরেক বার পরিষ্কার করে জানিয়েছেন এমনকী, ঠিক করে দিয়েছেন তাদের থাকবার জায়গাও স্পষ্ট লিখেছেন, ‘নন্দলালকে আমরা মাসে ষাট টাকা দিচ্চিলুম তোকেও তাই দেব।… এখানে মীরার কাছে রাখলে মীরাকে আবদ্ধ থাকতে হয় সে কি সম্ভব হবে?’ এই ভেবে রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যালয়ের শিক্ষক নেপালবাবু যে-ঘরে পরিজন-সহ থাকতেন সেই ঘর বরাদ্দ করে দিলেন অসিতের জন্যে। ঘরের সুযোগ সুবিধে উল্লেখ করে বললেন, ‘সেটা খুব বড় ঘর;– রান্নাঘর, bathroom প্রভৃতি আছে, কুয়ো আছে, দিনু কাছে, কলাভবন কাছে, দক্ষিণ খোলা, পশ্চিমও তথইবচ।’ তবে, নেপালবাবুর এই ঘর বাদে আরেকটা জায়গার কথাও বলেছেন, সে হল বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের বাংলা পরবর্তী কালে যার নাম ‘দ্বিজবিরাম’ কিন্তু তখনও সেখানে অনেক কাজ বাকি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘দাদার বাংলাটাতে আরো আড়াইশো টাকা খরচ করতে হবে, তাছাড়া কূপ খনন করাতে ৫০০ টাকার কম লাগবে না,– তাছাড়া ঐ একলা বাড়িতে তোর বৌয়ের পক্ষে থাকা নিরাপদ বা আরামদায়ক হবে না।’ এরপর ফেব্রুয়ারির গোড়ায় তিনি আবার একটা চিঠি দিলেন লিখলেন, ‘পূর্বেই লিখেছি এখানে তোর ঘর ঠিক হয়ে গেছে ঘরকন্নার জিনিসপত্র এনে ফেললে কোনো অসুবিধা হবে না, অবশ্য প্রধান আসবাবটিকেও আনতে ভুলিসনে–’ এই বলে অসিতের স্ত্রী সরোজনলিনীর প্রসঙ্গে একটু রসিকতা সেরে নিলেন আসল কথাটা পেড়েছেন এরপর, বলছেন, ‘আসচে শনিবারে এখানে গবর্নর আসচেন তার আগে তোর আসা চাই যখন গবর্নর কলাভবন দেখতে আসবে তখন কলানাথকে খাড়া করতে না পারলে সে দেখবে কি? তুই এই বেলা এসে কলা ভবনটাকে ভাল করে সাজিয়ে নে– শীঘ্র আয়– একটুও দেরি করিস নে– এখানে কুইনীনের আয়োজন করে রাখবো।’ পথিক রবীন্দ্রনাথ যে কতটা প্র্যাকটিকাল, তার নমুনা চিঠির পরের অংশে অসিতকে লিখলেন, ‘তোর জিনিসপত্র প্যাক করে রওনা করবার ভার কোনো যোগ্য লোকের উপরে দিস– এসব কাজ আর্টিস্ট মানুষের যোগ্য নয়।’ এরপরেই মোক্ষম এক ঠাট্টা– ‘কলাপ্রিয় হনুমান আর্টিস্ট ছিল সেতু নির্মাণেই তার পরিচয়,– সে গন্ধমাদনও বহন করেছিল কিন্তু হাওড়া স্টেশনে মাল চালান করতে সে কখনই পারত না– এই কথা মনে রেখে শীঘ্র চলে আয়– মালসুদ্ধ পিছনে টেনে আনবার চেষ্টা করলে কিষ্কিন্ধাকাণ্ড বেধে যাবে– সে চুকতে অনেক দেরি।’

‘রবিদাদা’র এই বিশেষ আমন্ত্রণে অসিতও মনে মনে তৈরি এদিকে আরেক সমস্যা রবীন্দ্রনাথের সাদর আহ্বান সত্ত্বেও শান্তিনিকেতনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে অসিতের বাবার মত নেই তাঁর কাছে শান্তিনিকেতনের শিল্প-আদর্শের চেয়ে কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজের চাকরি বেশি গুরুত্বপূর্ণ পরে অবশ্য বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ এবং সি এফ অ্যান্ডরুজ অনেক বুঝিয়ে কোনওমতে তাঁকে নিমরাজি করাতে পেরেছিলেন নইলে এ যাত্রায় অসিতের কলাভবনে যোগ দেওয়া হত কি না সন্দেহ! অবশ্য সেই চিঠির পরেও অন্তত দু’বার অসিতকে টেলিগ্রাম করেছেন রবীন্দ্রনাথ প্রথমটিতে লিখেছেন, ‘Come and join work’, পরেরটায়– ‘Come to arrange art hall Governor comes Saturday’।

সেই সময়ে সদ্যনির্মিত ‘দ্বারিক’ বাড়ির দোতলায় কলাভবন আর নিচের তলায় চলেছে সঙ্গীত ভবন। এখানে আরেকটা কথা, লর্ড কারমাইকেল প্রথম কোনও ইংরেজ রাজপুরুষ হিসেবে ১৯১৫ সালে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। কারমাইকেলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল। আশ্রমে তিনি সানন্দে স্বাগত হয়েছেন। কিন্তু এই পর্বে, ১৯২০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে গবর্নর রোনালডশের আসা একটু স্বতন্ত্র। সদ্য জালিয়ানয়ালাবাগ কাণ্ডে রবীন্দ্রনাথ ‘নাইটহুড’ ত্যাগ করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্পর্ধিত প্রতিবাদ দেখিয়েছেন, তাঁর আশ্রমে ব্রিটিশ রাজপুরুষের নিজের থেকে আসতে চাওয়া একটু আশ্চর্যের। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বর্তমান গভর্নরের ঘনিষ্ঠতার বদলে বিরূপতাই ছিল বেশি। এমনকী, বাংলায় সরকারি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধতার প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে একবার তর্কও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই এবারে গভর্নরের আসায় আশ্রমে কোনও আগ্রহ দেখা যায়নি। সৌজন্যের খাতিরে সব ব্যবস্থা হলেও কবি তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে গেলেন না। বসে রইলেন ‘দ্বারিক’ বাড়ির দোতলায়, টেলিগ্রামে কলাভবনের এই ঘরটিকে সাজানোর কথা অসিতকে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলার গভর্নরকে অভ্যর্থনা জানালেন কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অসিত হালদার। কবি ‘দ্বারিক’ বাড়ির দোতলাতেই তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন।

এই প্রসঙ্গে শান্তিনিকেতন পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ‘আমবাগানের বেদীটির উপরে লাটসাহেবকে বসানো হইয়াছিল। তাঁহার চারিদিকে আলপনাঅঙ্কিত ভূমিখণ্ডের উপর ছেলেরা বাসন্তী রঙের ধুতি চাদর পরিয়া উপস্থিত ছিল। অধ্যাপক মশায়েরা শুভ্র উত্তরীয় ও বসনে নিকটেই ছিলেন, আশ্রমের মহিলাগণও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পণ্ডিতজি ও বিধুবাবুর তত্ত্বাবধানে গানের দলের ছেলেরা কয়েকটি বৈদিক গান ও মন্ত্র পাঠ করিয়াছিল। লাটসাহেব আশ্রম পরিদর্শন করিয়া কলাভবনে গমন করেন।’ এখানে ‘পণ্ডিতজি’ অর্থে ক্ষিতিমোহন সেন এবং ‘বিধুবাবু’– বিধুশেখর শাস্ত্রীর কথা বলা হচ্ছে। আশ্রম পরিদর্শন সারা হলে গভর্নর একান্তভাবে রবীন্দ্রনাথের কাছে সরকারি অর্থ সাহায্য গ্রহণের অনুরোধ রাখলেন। কিন্তু শান্তিনিকেতনে চলা নিদারুণ আর্থিক সংকট সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ তা নিতে অসম্মত হলেন। তিনি জানেন, সরকারি সাহায্য নিলে গভর্নমেন্টের শিক্ষাব্যবস্থার অর্গলে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়বে তাঁর বিশ্বভারতী– রবীন্দ্রনাথ যা মনেপ্রাণে চান না।