Robbar

ঘোলমেলে ব্যাপারস্যাপার

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 31, 2026 9:23 pm
  • Updated:May 31, 2026 9:23 pm  

এই যে আমরা যে কোনও অস্বচ্ছ জিনিসকে ‘ঘোলা’, ‘ঘোলাটে’ বলে দেগে দিই, তার সঙ্গেও ঘোলের সম্পর্ক আছে। যা কিছু ঘেঁটেঘুঁটে ঝাপসা করে দেওয়া হয় তা-ই ‘ঘোলাটে’। পুকুরের স্বচ্ছ জল কেউ পাঁক করে দিলে তা ঘোলা জল। ওই জলে মাছ ধরা আবার খুবই সন্দেহজনক এবং খারাপ কাজ– সেটাও একটা বাগ্‌ধারা! মানুষের দৃষ্টি কমে গেলে– ঘোলাটে, আবহাওয়ায় ধোঁয়া বা ধুলে বেড়ে গেলে– ঘোলাটে, এমনকী কারও স্মৃতি দুর্বল হয়ে গেলে সেটাও ঘোলাটে! শব্দটার সঙ্গে যুক্ত চিত্রকল্প এতই গোলমেলে যে সোদপুরের ‘ঘোলা’ নামের জায়গাটাও আমার বিশেষ সুবিধের মনে হয় না। 

সংহিতা সান্যাল

ঘোল একটি যারপরনাই অপমানিত পানীয়।

সে যদি কথা বলতে পারত, তাহলে তার অভিযোগের অন্ত থাকত না। এই আজকাল যেমন রিলস্‌-এ মাঝেমাঝেই আলু-মুলো-কলা এসে হিন্দিতে তুইতোকারি করে আর রাগ দেখায়– তেমন কিছু করত নিশ্চয়ই। 

এখন রাজ্যে ভয়ানক গরম। বাড়ির অন্দরমহল বাতানুকূল করে রেখে কিছু লাভ হচ্ছে না। বাইরে বেরলে আর্দ্রতা আর রোদের অশুভ আঁতাত যেন শরীর নিংড়ে আত্মা বের করে নিচ্ছে। এই অবস্থায় একপাত্র ঠান্ডা ঘোল, গন্ধরাজ লেবু আর বিটনুন-চিনি সহযোগে, বেরিয়ে আসা আত্মাকে ফের কান ধরে শরীরে চালান করে দিতে পারে। খাঁটি লস্যি বড় বেশি ঘন, খাওয়ার পর অনেক অম্বলচুম্বিত বাঙালি পাকস্থলীই একটু আপত্তি জানায়। আসল ফলের রস রান্নাঘর ব্যতীত মেলা ভার। এই কাক-বেহুঁশ গরমেও ধূমায়িত চা-কফি খাওয়া আমাদের অভ্যেস আছে বটে, কিন্তু সে তো যাকে বলে মৌতাত! স্নিগ্ধতার খোঁজ পেতে গেলে শ্রমসাধ্য বেলের পানা, আমপোড়া, তোকমা বা গুড়ের শরবত, দুর্মূল্য ডাবের জল– এদের থেকে অনেক সহজে ঘোল পর্যন্ত পৌঁছনো যায়। ঘোল যেন আমাদের শরীরের ডার্মিকুল, প্রাণের সিন্থল, হৃদয়ের নবরত্ন তেল! 

এত আদরের ঘোল, আয়ুর্বেদে পর্যন্ত তার জয়জয়কার– তাহলে খামোখা ‘অপমানিত’ বলছি কেন? একবার ভেবে দেখুন তো, তাকে কীভাবে তৈরি করা হয়! জন্মলগ্ন থেকে বেচারা বাঁশডলা খাচ্ছে। দিব্যি দইয়ের সঙ্গে মিলেমিশে ছিল– আমরা সুবিধাবাদী মানুষ প্রথমে দই ঘুঁটে ঘুঁটে ননীটুকু তুলে নিলাম। তারপর বাকি সাদা রঙের হালকা তরলটির দিকে তাকিয়ে মনে হল– একেই বা ছেড়ে দিই কেন? ব্যস! তারপর থেকে– কেবলই ঘোলের জন্ম হয়! ননী আর ঘোল, দুটোই যখন খাওয়ার জন্য ব্যবহার হচ্ছে– কী প্রয়োজন ছিল ওদের আলাদা করার, অ্যাঁ? তারপর যুগ বদলে গেল। এখন যা হয় তা আরও চমৎকার। মন্থন আমরা আর পছন্দ করি না– ওতে বড় খাটনি। তাছাড়া দই আর তেমন জোলো হয় না। দোকান থেকে ঘন মিষ্টি দই নিয়ে এসে, তাতে আলাদা করে জল মিশিয়ে ব্লেন্ডারে ঘুরিয়ে নেওয়া হয়। সুতরাং নিউটনের চতুর্থ সূত্র হচ্ছে– দইয়ে জল অভ্যন্তরীণ হোক কি বাহ্যিক, ঘোল আমাদের বানাতেই হবে। 

অপমান যদি শুধু উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে হত– তবু একটা কথা ছিল। আমরা নিজেদের কথাবার্তায় তাকে এমন একটা জায়গা দিয়েছি যে তার ক্ষমা হয় না। ঘোল গরমে আমাদের আরাম জোগায়, শরীর শীতল করে। এদিকে আমরা ‘ঘোল খাওয়া’ বলতে কী বুঝি? হিমশিম খাওয়া, জব্দ হওয়া, ঠকে যাওয়া। নিজে লাভের ১৬ আনা, অর্থাৎ ননী নিয়ে কেটে পড়ে অন্যের জন্য ঘোল রেখে যাওয়া হয় বলেই হয়তো এই বাগ্‌ধারা! আরও একটু খতিয়ে দেখা যাক। নেপো এসে ‘দই’ মেরে যায়। ‘দুধ’ আর ভাত মিলে সুখের সংসার গড়ে। ছোট্ট কৃষ্ণ বা গোপালের একান্ত লোভের জিনিসটির নাম ‘ননী’। যে চালাকচতুর, সে ‘ক্ষীর’ কিংবা ‘ঘি’ খেয়ে যায়। যা কিছু ভালো, বাধাহীন– পুরো ‘মাখন’। শক্তি চাটুজ্যেও বলেছেন, ভালোবাসা পেলে তবে তিনি পায়সান্ন ত্যাগ করবেন– তার আগে নয়! স্রেফ ঘোল পড়ে আছে, যার কোনও সম্মান নেই। বাংলা ভাষায় ছানারও তেমন গুরুত্ব নেই বটে, কিন্তু ছানার মিষ্টি একাই বাংলার সংস্কৃতি মাতিয়ে রেখেছে। ঘোলের স্বীকৃতি বলতে, ভালো খাবারের উল্লেখ হিসেবে ওই ছড়াটি– ‘কচি পাঁঠা বৃদ্ধ মেষ/ দইয়ের অগ্র ঘোলের শেষ’। অধুনা ব্লেন্ডেড ঘোলের আদি বা অন্ত কিছুই বোঝা যায় না বলে সে ছড়াও অপ্রাসঙ্গিক। ঘোল খাওয়া বা খাওয়ানো তাই ঠকে যাওয়ার ব্যঞ্জনা নিয়েই নিভৃতে কাঁদে।

ঘোল শুধু খায় না, মাথাতেও দেয়। মারাত্মক অপমান হিসেবে ‘ন্যাড়া মাথায় ঘোল ঢালা’ খুবই প্রচলিত। কেউ কুকর্ম করলে তাকে গাধার পিঠে বসানো আর চুল মুড়িয়ে ন্যাড়া করে দেওয়াই যথেষ্ট সাজা হিসেবে বিবেচ্য। সেই মাথায় ঘোল ঢালার বুদ্ধি কোন সাইকোপ্যাথের মাথায় প্রথম এসেছিল কে জানে। চিটচিটে তরল, তায় টক গন্ধ– অপমানের মতোই, মাথায় ঢেলে দেওয়া ঘোল মুছে ফেলা অত সহজ নয়। তার রেশ থেকেই যায়। বহুকাল আগে থেকেই লোককথায় এই শাস্তি জনপ্রিয়। চরম দুঃখ আর চূড়ান্ত লজ্জার মধ্যে একটি লোকের মাথা থেকে টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ছে সাদা তরল– জামায় লেগে যাচ্ছে, মাছি বসছে, শুকিয়ে গেলে চড়চড় করছে, বদ গন্ধ ছাড়ছে– একবার ভাবুন! কালকেই সব ভুলে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার মতো হয়রানি এ নয়– বরং এক দীর্ঘস্থায়ী ট্রমা। স্নান করলে, জামা কেচে ফেললেও ওই টুপিয়ে নামা অবমাননার অনুভূতি ভুলে যাওয়া কঠিন। অপমানকে এমন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হতে বিশেষ দেখা যায় না। 

এরপর আসে এমন এক বাগ্‌ধারা যার মূল বিষয়টি আপনার-আমার সঙ্গে আকছার হয় এবং পিত্তি জ্বালিয়ে দেয়। আমরা কে না শুনেছি এই অমোঘ বাক্য– ‘অমুকের মতো তো হতে পারলি না এ জীবনে’! ঘোলেরও কি পিত্তি জ্বলে না, যতবার আমরা বলি– ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছি’? সে তো দুধ নয়, হতেও চায়নি কোনওদিন! তার জন্ম দই থেকে, অনন্ত কচলানি খেয়ে! তবুও উদার ঘোল দুধের কম-বেশি সমস্ত গুণই নিজের মধ্যে বজায় রাখতে পেরেছে। দুধ যাদের সয় না, তারা দুই বেলা ঘোল খেতে পারে। তারপরেও এ কেমনতর ব্যবহার? দুধকে তো কেউ বলে না ঘোলের মতো টক-মিষ্টি হতে! একফোঁটা লেবুর রস দুধে পড়লে ফ্যাঁস করে ছানা কেটে যায়! ঠাঠাপোড়া গরম থেকে ফেরার পর এক গেলাস দুধ খেয়ে দেখান তো! এ যেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে বলা, ‘জেন্ডেয়ার বাজেট ছিল না বলে তোমাকে কাস্ট করলাম’। ঘোলের তৃষ্ণা যদি দুধে না মেটে, তাহলে স্বাদের কথা তুলে দুধকে এগিয়ে রাখার এই চক্রান্ত কেন?

এ তো গেল ঘোলের ব্যক্তিগত মন্দকপাল। এই যে আমরা যে কোনও অস্বচ্ছ জিনিসকে ‘ঘোলা’, ‘ঘোলাটে’ বলে দেগে দিই, তার সঙ্গেও ঘোলের সম্পর্ক আছে। যা কিছু ঘেঁটেঘুঁটে ঝাপসা করে দেওয়া হয় তা-ই ‘ঘোলাটে’। ‘ঘোল’ শব্দটার ব্যুৎপত্তিতে ঘূর্ণন-এর প্রভাব আছে– যেহেতু ঘোলমউনি (ওই, বাঁশের ভালো নাম) দিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ঘোল তৈরি হয়। তাই বলে সব খারাপ আর ঘাঁটা জিনিস ঘোলাটে হতে হবে? পুকুরের স্বচ্ছ জল কেউ পাঁক করে দিলে তা ঘোলা জল। ওই জলে মাছ ধরা আবার খুবই সন্দেহজনক এবং খারাপ কাজ– সেটাও একটা বাগ্‌ধারা! মানুষের দৃষ্টি কমে গেলে– ঘোলাটে, আবহাওয়ায় ধোঁয়া বা ধুলে বেড়ে গেলে– ঘোলাটে, এমনকী কারও স্মৃতি দুর্বল হয়ে গেলে সেটাও ঘোলাটে! শব্দটার সঙ্গে যুক্ত চিত্রকল্প এতই গোলমেলে যে সোদপুরের ‘ঘোলা’ নামের জায়গাটাও আমার বিশেষ সুবিধের মনে হয় না। 

ঘোল একটি অতিশয় উপকারী পানীয়। তা সত্ত্বেও ঘোলের স্বাদ, গন্ধ, স্পর্শ, চেহারা– সব কিছু নিয়ে বাঙালি ছিনিমিনি খেলেছে। আমরা তো কোনওকিছুই তেমন করে বেচতে পারি না। যেভাবে ছাস বা বাটারমিল্ক প্যাকেটে করে বিক্রি হয়, লস্যি দখল করে নেয় টেট্রাপ্যাক থেকে পাউচ– তেমন আদরে ঘোলকে আমরা সাজিয়ে-গুজিয়ে খেলতে পাঠাতে পারিনি। আজ যদি চকচকে পরিবেশবান্ধব বোতল থেকে স্নিগ্ধ সাদা ঘোলের বিন্দু ঠোঁট দিয়ে তুলে নিতেন পেশিবহুল কোনও অভিনেতা– পলকাটা কাচের গ্লাসের ওপর চম্পকঅঙ্গুলি দিয়ে বিটনুন ছড়িয়ে দিতেন ত্বকে রোদ পিছলে যাওয়া নায়িকা– তখন ক্যাচলাইন হত, ‘ঘোলের স্বাদ স্রেফ ঘোল খেয়েই মেটে’। তখন কথা হত ঘোলের পুষ্টিগুণ নিয়ে, কম ফ্যাট এবং ক্যালোরি নিয়ে। তখন হয়তো একদিন হলিউডের পাথরপ্রতিম অভিনেতা ন্যাড়া মাথায় ঘোল ঢেলেই উপেক্ষা করতেন খলনায়কের ফ্লেমথ্রোয়ার। 

তা আর হল কই! ঘোলকে আমরা ঘোলাটে ব্যক্তিত্ব হিসেবেই অপাংক্তেয় করে রাখলাম।