Robbar

তিনি চেয়েছিলেন সুবিচার, প্রেম আর ঈশ্বরের ক্রোধ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 6, 2026 8:58 pm
  • Updated:June 6, 2026 9:33 pm  

সাত্রাপির মনের কথা বোঝে তাঁর লেখার টেবিল। একদিন এই টেবিলে বসেই সাত্রাপি ভাবলেন, আজীবন তিনি লড়বেন মৌলবাদের বিরুদ্ধে। টেবিলটাই যেন তাকে নিয়ে গেল এই বোধে, মৌলবাদে নেই বিন্দুমাত্র মৌলিকতা। মানুষ যখন শুধু নিজের কথা বুক চাপড়ে বলতে শিখেছে, অন্যের কথা শুনতে শেখেনি, মৌলবাদ সেই অন্ধকার প্রাচীনকালের। মৌলবাদে ধৈর্য নেই, সহিষ্ণুতা নেই, সংশয় নেই। কিন্তু সভ্যতার অভিজ্ঞান তো সংশয়, ‘টু বি অর নট টু বি’। কোনও কিছুই শেষ কথা নয়। তাই তো সভ্যতা পথ চলেছে অজস্র প্রশ্ন, সন্ধান, আবিষ্কার, ভ্রান্তি ও প্রাপ্তির পথে।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

এখনও দগদগ করছে কথাটা: Nothing worse than saying goodbye. It’s a little dying. বোলো না ‘বিদায়’। এর থেকে খারাপ কিছু নেই। ওটা তো ছোট্ট মৃত্যু!

রাজ্য জুড়ে তোলপাড়। প্রকৃতির ও পরিবহের। ঝড় উপড়ে ফেলছে গাছ। বজ্রাঘাতে পুড়ছে প্রাণ। রাজনীতিতে একদিকে নামছে ধস। অন্যদিকে জাগছে পাড়। এমনই কোনও এক রাত্রে, শুঁড়িখানার বিষণ্ণ কোণে, আমার চোখ আটকে আছে এই ক’টি অক্ষরে: জীবন অসহনীয়। হতে পারলাম না মিডিওকার নিহিলিস্ট, মধ্যমেধার নেতিবাদীর থেকে বেশি কিছু। সামান্য ভালো খবর, আমি মারা যাচ্ছি। দুঃখে।

মার্জান সাত্রাপি

সত্যি মারা গেলেন এই জুনের ৪ তারিখে। ইরানি-ফরাসি বিশ্ববিখ্যাত লেখিকা, মেধা-উজ্জ্বল সুদর্শনা, মার্জান সাত্রাপি, মাত্র ৫৬ বছর বয়সে (জন্ম ইরানের ইম্পিরিয়াল স্টেট রাশত-এ, ২২ নভেম্বর, ১৯৬৯-এ। মৃত্যু প্যারিসে ৪ জুন, ২০২৬)। প্যারিসের সংবাদপত্রে প্রকাশিত এই সংবাদ: মার্জান সাত্রাপির অবসান বিচ্ছেদ-বেদনায়। প্রিয়তম, স্বামী মারিয়াস রিপা প্রয়াত হয়েছেন ঠিক এক বছর আগে। অন্তত তিন বছরের ছোট জীবনসঙ্গীর সঙ্গে বিচ্ছেদের ব্যথা আর বহন করতে পারলেন না সাত্রাপি! তবে স্বামীর মৃত্যুর পরে তিনি তৈরি করে গিয়েছেন তাঁদের স্বপ্নের মার্জান-রিপা-সাত্রাপি সিনেমা ফাউন্ডেশন, যেখানে বিদেশি ছাত্রছাত্রী চলচ্চিত্রচর্চার সুযোগ পাবে।

সাত্রাপি একইসঙ্গে ছিলেন ইরান ও ফ্রান্সের নাগরিক। দেশের প্রতি ছিল প্রাণভরা ভালোবাসা। কিন্তু দেশের দমবন্ধ হয়ে যাওয়া ধর্মীয় পরিবেশে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারেননি। একা লেখার টেবিলে বসে বারবার ভেবেছেন, সত্যি কথাটা লিখবেন, না কি চেপে যাবেন? কিন্তু তাঁর লেখার টেবিল তাঁর বুকের কথা শেষপর্যন্ত নামিয়ে নিয়ে এল ল্যাপটপের আলোকিত স্ক্রিনে। মার্জান লিখতে বাধ্য হলেন এই সহজ কিন্তু আগ্নেয় চারটি প্রশ্ন, তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রাফিক উপন্যাস ‘পারসেপোলিস’-এ: ‘Where is my freedom of thought? Where is my freedom of speech? My life, is it livable? What’s going in the political prison?’ মার্জান আরও সাহসে উচ্চারণ করলেন ইরানের মেয়েদের মনের ভুল প্রশ্নগুলিও: ‘Are my trousers long enough? Is my veil in place? Can my make-up be seen? Are they going to whip me?’

এতই সহজ ভাষায়, ভঙ্গিতে লেখেন মার্জান সাত্রাপি। তবু তাঁর আত্মজৈবনিক উপন্যাসটিকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত করে অস্কার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেন মার্জান। ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠ সম্মান, ‘লিজিয়ন অফ অনার’– তা-ও তাঁকে দেওয়া হল। কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন, ইরানি জনগণের প্রতি ফরাসিদের ভন্ডামির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে।

তবু ফ্রান্সেই তো তিনি সারাজীবন কাটালেন। এই রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে তিনি ফ্রান্সের মনে আঘাত করলেন না তো? তিনি কি ইরানে ফিরে গিয়ে সেখানে বসবাস করতে পারতেন? এই প্রশ্নের সোচ্চার সাহসী উত্তর তাঁকে দিতেই হবে। মার্জান বসলেন তাঁর লেখার টেবিলে, এক শীতের বিকেলে। তুষারে আচ্ছন্ন প্যারিস। প্রাণহীন। ধূসর। মার্জান না লিখে পারলেন না, তাঁর জীবনের করুণ অন্তরসত্য: ‘I was a Westerner in Iran and an Iranian in the West. I had no identity.’ তারপর এই বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি: “I didn’t know any more why I was living.”

ঠিক এইখানে আমি ফিরে যাচ্ছি শুঁড়িখানার ধূসরিমায়, মার্জান সাত্রাপির আত্মজীবনীর ফ্ল্যাশব্যাকে। শুরু করা যাক এইভাবে: ‘I want justice, love, and the wrath of God all in one.’ আমি চাই সুবিচার, প্রেম এবং ঈশ্বরের ক্রোধ। এবং এইসব একসঙ্গে। ভয়ংকর এই যাচনা! গ্রিক চিন্তক ও লেখকরাও ভাবতে পারেননি। ভাবতে পেরেছিলেন, ফারসি, ফরাসি, ইংরেজি, সুইডিশ, জার্মান, ইটালিয়ান জানা এই ইরানি তরুণী। যে তরুণীর ১৪ বছর পর্যন্ত বালিকাবেলা কেটেছিল এক ধর্মবিঘ্নিত নারীবিদ্বেষী সামাজিক পরিবেশে।

লেখার টেবিল মার্জানের একমাত্র বন্ধু। যে লেখার টেবিল তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় মারাত্মক সত্যি কথা কী সহজে: জীবনের প্রথম ১০টা দিন আমার কেটেছে রাশত-এ। তারপর মা-বাবার সঙ্গে তেহরানে। সেখানে এক উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠতে লাগলাম। বাবা-মা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত, আলোকপ্রাপ্ত। রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। শাহ-র রাজতন্ত্রের বিরোধী ছিলেন তাঁরা। ছিলেন বামপন্থী আন্দোলনের সমর্থক। এবং আমাকে ভর্তি করে দিলেন তেহরানের এক ফরাসি স্কুলে। ইসলামি মৌলবাদীদের সমাজে আমি বড় হতে লাগলাম সম্পূর্ণ পশ্চিমী পরিবেশ এবং মূল্যবোধের মধ্যে। এবং চারধারে দেখতে লাগলাম ক্রমবর্ধমান নৃশংসতা।

আমার কাকা– আনুশ, আমাকে খুব ভালোবাসত। আমার বিদ্রোহী কাকা। আমার হিরো! সে রাজনৈতিক বন্দি হল। তারপর নির্বাসিত হল সোভিয়েত ইউনিয়নে। ইরানে এক সময়ে ফিরেও এল। তখনও বন্দি। তারপর তাঁর মৃত্যুদণ্ড হল। তাকে বলা হল, মৃত্যুর আগে পরিবারের শুধু একজনকে দেখতে পাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে তোমাকে। কাকা আমাকে দেখতে চাইল। আমি গিয়েছিলাম। বাবা-মা ঠিক করলেন, আমার আর তেহরানে থাকা ঠিক হবে না। ফরাসি স্কুলে লেখাপড়া শিখে আমার পক্ষে মানিয়ে চলাও সম্ভব হচ্ছিল না। ১৯৮৩ সালে বাবা-মাকে ছেড়ে ১৪ বছর বয়সে আমি অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায়। ছাত্রী হলাম ‘লাইসি ফ্রন্সে দে ভিয়েন’-এ।

পারিবারিক বন্ধুর বাড়িতে থেকে ভিয়েনায় লেখাপড়া শুরু সাত্রাপির। কিন্তু কতদিন বিদেশের পারিবারিক বন্ধু বহন করবে ভার? কতরকম মাথা গোঁজার জায়গা যে খুঁজতে হয়েছে ইরানি তরুণীকে! যেখানেই গিয়েছেন, সঙ্গে রেখেছেন লেখার ছোট্ট টেবিলটিকে। সে-ই তো পরম বন্ধু।

সাত্রাপির মনের কথাও বোঝে লেখার টেবিল। একদিন এই টেবিলে বসেই সাত্রাপি ভাবলেন, আজীবন তিনি লড়বেন মৌলবাদের বিরুদ্ধে। টেবিলটাই যেন তাকে নিয়ে গেল এই বোধে, মৌলবাদে নেই বিন্দুমাত্র মৌলিকতা। মানুষ যখন শুধু নিজের কথা বুক চাপড়ে বলতে শিখেছে, অন্যের কথা শুনতে শেখেনি, মৌলবাদ সেই অন্ধকার প্রাচীনকালের। মৌলবাদে ধৈর্য নেই, সহিষ্ণুতা নেই, সংশয় নেই। কিন্তু সভ্যতার অভিজ্ঞান তো সংশয়, ‘টু বি অর নট টু বি’। কোনও কিছুই শেষ কথা নয়। তাই তো সভ্যতা পথ চলেছে অজস্র প্রশ্ন, সন্ধান, আবিষ্কার, ভ্রান্তি ও প্রাপ্তির পথে। সভ্যতার সমস্ত দানের সঙ্গে ওতপ্রোত প্রশ্ন, পরিপ্রশ্ন, কোনও অ্যাবসোলিউটকে গ্রহণ না-করা। এইসব কথা লেখার টেবিল কানে কানে বলেছে সাত্রাপিকে। এবং এই কথাগুলি, মৌলবাদের প্রতি প্রশ্ন, সন্দেহ, প্রত্যাখ্যান ছুঁড়ে দিয়েছেন মার্জান সাত্রাপি, বিশেষ করে তাঁর আত্মজৈবনিক উপন্যাসে। এবং সেই উপন্যাসকে সহজে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে, তাকে করে তুলতে বিশ্বের অন্যতম বেস্টসেলার, সেই বইয়ে মিশিয়ে দিয়েছেন নিজের আঁকা ছবি, ঠিক যেমন থাকে কমিকস-এ!

মার্জান সাত্রাপির আঁকা কমিকস

জীবন নিয়ে বই, তাকে যা খুশি করা যায়। কিন্তু জীবনের কতটুকু থাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে? প্রতিমুহূর্তে জীবন নতুন বাঁক নেয়, যার যাপন, তাকে আগে থেকে জানার কোনও দায় নেই জীবনের! হঠাৎ ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত হয়ে দেশে ফিরতে হল সাত্রাপিকে। ভয়ংকর মৌলবাদী রাজনীতি ও সমাজের কারাগারে। এবং অর্থহীন অন্তহীন যুদ্ধের মধ্যে।

লেখার টেবিলে বসে সাত্রাপির মনে হল, যা দেখছি, তার প্রয়োজন ছিল, না-হলে কি লিখতে পারতাম: “People don’t know anymore why we have had eight years of war. Why their children have died– this entire war was just a big setup to destroy both the Iranian and Iraqi armies … The West sold weapons to both camps and we were stupid enough to enter into the cynical game– eight years of war for nothing!”

১৯৮৯: হঠাৎ বিয়ে করলেন সাত্রাপি। এক প্রবীণ সৈনিককে। কেন এই বিয়ে? শুধুই কি ওই পুরুষটির শরীরের টান? আর সাত্রাপির মনে হল, ওই চওড়া অভিজ্ঞ কাঁধে মাথা রাখা যায়! বিয়েটা ফোঁপরা। তালাক দিলেন সাত্রাপি চার বছরের নরক পেরিয়ে। এবং ফিরে এলেন মুক্ত শহরে: প্যারিস! মাথায় গিজগিজ করছে স্বাধীন ভাবনা। কিন্তু কে দেবে প্রকাশের প্রেরণা ও সাহস? সাত্রাপি দেখা পেলেন সুইডিশ অভিনেতা এবং সিনেমার প্রযোজক মাটিয়াস রিপার। বয়সে সাত্রাপির থেকে ছোট। তাতে কী! মিল হল মনের কথার। মিল হল দেহের চাহিদা ও তৃপ্তির। এবং হলেন পরস্পরের সৃজনের দোসর। ঠিক করলেন, স্বামী-স্ত্রী নয়, আইনের বন্ধনহীন, সৃজনের পারস্পরিকতায় কাটাবেন বহু বছর। জন্ম নিল সাত্রাপির একের পর এক বেস্টসেলার: ‘চিকেন উইথ প্লামস’, ‘উওম্যান লাইফ ফ্রিডম’ এবং চার খণ্ডের আত্মজীবনী, ইংরেজি অনুবাদে যা এক খণ্ডে পাওয়া যায়।

স্বামী মারিয়াস রিপা-র সঙ্গে মার্জান সাত্রাপি

গত বছর মাত্র ৫৩ বছর বয়সে শেষ হল রিপার জীবন। জীবনসঙ্গী চলে যাওয়ার পরে মাত্র এক বছর বাঁচলেন মার্জান সাত্রাপি। বিচ্ছেদ বেদনায় বেঁচে থাকতে চাইছিলেন না। জানিয়ে গিয়েছেন: ‘Life is too short to be lived badly!’

……………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা

……………………………