society and journey of mind to the opposite direction | Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

পিছন-পানে তাকাই যদি কভু

ভিড় কি আমাদের পিছন দিকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়? যে-কোনও চিন্তাশীল মানুষই তো কোনও একসময় ভিড়ের বিরুদ্ধে এগিয়েছেন। রামমোহন, বিদ্যাসাগর দু’জনের কথাই ধরা যাক না কেন। ভিড় চায় বিধবা সতীকে পুড়িয়ে মারতে, ভিড় চায় নিতান্ত বালবিধবাকে বৈধব্য-যন্ত্রণা দিতে। রামমোহন ভিড়ের বিপরীতে গিয়ে সতীর জীবনের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। বিদ্যাসাগরও একই কাজ করলেন।

Published by: Robbar Digital

Posted:July 9, 2026 7:19 pm | Updated:July 9, 2026 7:19 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

১০.

বাসে উঠলেই আগে শোনা যেত, বিশেষত মিনিবাসে, ‘পেছন দিকে এগিয়ে যান। দরজার কাছে দাঁড়াবেন না।’ কনডাক্টরের চেতাবনি শুনে সবাই যে ‘পেছন দিকে এগিয়ে যেতেন’, তা নয়। তবে মাঝেমধ্যেই ভিড়ের চাপে পিছনদিকে এগিয়ে যাওয়া ছিল স্বাভাবিক।

আজকাল এই বাক্যবন্ধ বাসে খুব একটা শোনা যায় না। যেমন শোনা যায় না– ‘আস্তে লেডিজ’। ‘আস্তে লেডিজ’-এর মতো আরেকটি অমোঘ শব্দ ছিল– ‘বাচ্চা লেডিজ’। বাচ্চা সেখানে লেডিজ-এর বিশেষণ নয়। বাচ্চাকে নিয়ে মা বাস থেকে নামছেন। গাড়ির কনডাক্টর গাড়ির চালককে বলছেন, ‘এই আস্তে বাচ্চা লেডিজ’। ড্রাইভার কনডাক্টরের কথামতো গতি একেবারে তলানিতে নামিয়ে আনছেন। মা বাচ্চাকে নিয়ে ধীর পায়ে নেমে গেলেন। তারপর আবার বাস চলল, চলল, চলল। বাস চলল সামনে আর ভিড় এগিয়ে গেল পিছন দিকে।

মাঝেমাঝে মনে হয়, ভিড় কি আমাদের পিছন দিকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়? যে-কোনও চিন্তাশীল মানুষই তো কোনও একসময় ভিড়ের বিরুদ্ধে এগিয়েছেন। ভিড় যেদিকে চলেছে, সেদিকে যেতে চাননি তাঁরা। রামমোহন, বিদ্যাসাগর দু’জনের কথাই ধরা যাক না কেন!

zoom
রাজা রামমোহন রায়

ভিড় চায় বিধবা সতীকে পুড়িয়ে মারতে, ভিড় চায় নিতান্ত বালবিধবাকে বৈধব্য-যন্ত্রণা দিতে। রামমোহন ভিড়ের বিপরীতে গিয়ে সতীর জীবনের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। বিদ্যাসাগরও একই কাজ করলেন। পতি-বিয়োগ হলে স্ত্রী-শরীর পাষাণবৎ হয়ে যায় না, এই কাণ্ডজ্ঞান তাঁর ছিল। এ-কথাও জানতেন, কাণ্ডজ্ঞানপ্রসূত মানবতার কথা বললেই বিধবাবিবাহ প্রচলন সম্ভব নয়। তাই ‘পরাশর সংহিতা’ থেকে উপযুক্ত শ্লোক তুলে বিধান দিতে হল।

zoom
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। শিল্পী: অতুল বসু

রামমোহন নানা শাস্ত্র প্রসঙ্গ খণ্ডন করলেন। মেয়েদের বুদ্ধি, বিবেচনার কথা উঠল। এমনকী স্ত্রী-শরীর অগ্নিদগ্ধ হচ্ছে, সেই বেদনাদায়ক ভয়ংকর দৃশ্যের অবতারণা করলেন। যদি বৃহত্তর ভিড়ের মনে দয়া জাগে! ভিড়ের বিপরীতে, পিছন দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিপরীতে, তাঁদের উজানযাত্রা।

গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের একটা গুরুত্ব আছে, খুবই গুরুত্ব। রামমোহন বা বিদ্যাসাগরের মত গণতন্ত্রের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত নাও হতে পারে! না-হলে কি তার কোনও গুরুত্ব নেই!

বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। সেই পত্রিকার মাধ্যমে তিনি সাধারণ ও কৃতবিদ্য দু’য়ের মধ্যে সংযোগ সাধন করতে চেয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের সংখ্যা বেশি, কৃতবিদ্যের সংখ্যা কম। কৃতবিদ্য মানে ‘ওয়েল এডুকেটেড ক্লাস’। বঙ্কিম নিজেই সেই দলের লোক। বঙ্কিম জানেন, হতে পারে সাধারণের সঙ্গে কৃতবিদ্যের গণনায় কৃতবিদ্য সংখ্যার বিচারে হেরে যাবে। সেই পরাজয় কিন্তু সংখ্যাগত পরাজয়, গুণগত পরাজয় নয়।

ফরাসি বিপ্লবে আবার অভিজাত-তন্ত্রের সঙ্গে থার্ড এস্টেটের তীব্র লড়াই। অভিজাত ও ধর্মযাজকরা প্রথম দুই এস্টেটের অধিবাসী। এমন এক ব্যবস্থাপনা, যাতে থার্ড এস্টেটের জনসংখ্যা বেশি হলেও দুই এস্টেট তাদের মাথায়। এই ব্যবস্থা বদলের জন্য চাপ এল। প্রবল চাপ! অভিজাত-তন্ত্রের পতন হল। ফরাসি বিপ্লবের তীব্র হিংসা ও হানাহানি। রবীন্দ্রনাথ একটি শব্দবন্ধ তৈরি করেছিলেন– ‘মারকাট’। সেই অনিয়ন্ত্রিত মারকাটকে রবীন্দ্রনাথ সমর্থন করতে পারেননি। বঙ্কিমচন্দ্রেরও ফরাসি বিপ্লবের নির্বিচার জনজোয়ার সম্বন্ধে বিরক্তি ছিল। ‘বঙ্গদর্শন’-এর পৃষ্ঠায় বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্ত ফুট কেটেছিলেন, ‘লিবার্টি, ইকুয়্যালিটি, মটরশুঁটি’! মোক্ষম ফুট সন্দেহ নেই। কী রক্ত কী রক্ত! গিলোটিন আর থামেই না। ন্যাশনাল রেজার কাউকে ছাড়ে না। রোবস্পিয়ারকেও না।

তাহলে ভিড়ের সঙ্গে ব্যক্তি-চিন্তকের সম্পর্ক কী হবে? ব্যক্তি-সচেতন ভিড় কি খানিক পরেই বিবেচনাহীন অনিয়ন্ত্রিত, যা ইচ্ছে তাই!

চৈতন্যদেব কীর্তন প্রচার করলেন। সেই কীর্তনের মাহাত্ম্যে বাঙালির জাতধর্ম ভেঙে পড়ল। চৈতন্যদেব নগর ভ্রমণকালে বিভিন্ন বর্ণের স্পর্শ গ্রহণ করলেন। খাদ্য গ্রহণেও দ্বিধা করলেন না। কীর্তননিষ্ঠ হরিভক্তিপরায়ণ চণ্ডাল, ব্রাহ্মণের চাইতেও শ্রেষ্ঠ! এই কীর্তনের দলের পুরোভাগে চৈতন্যদেব। তিনি ভিড়ের পথ-প্রদর্শক। প্রদর্শনকারী না থাকলে ভিড় কি নিয়ন্ত্রণহীন স্বেচ্ছাচারী জনসংঘ? তারা তখন আরেকভাবে পিছন দিকে এগিয়ে যেতে চাইছে? প্রশ্নগুলি কঠিন শুধু নয়, প্রশ্নগুলির উত্তর স্থান-কাল ভেদে বিভিন্ন।

zoom
চৈতন্য কীর্তন, শিল্পী: ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার

ভিড়ের বিপরীতে চলা, আর ভিড়ের সঙ্গে, ভিড়ের পিছু পিছু চলা– দু’রকম গতি। আরেক গতি হয় ভিড়ের সামনে– পথ দেখিয়ে এগিয়ে যাওয়া। এইসব গতির ছবি ভাবতে ভাবতে মনে হল প্রগতিশীল পরাগতি কিংবা পরাগতিশীল প্রগতিও হতে পারে। সত্যজিতের ছবি ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-তে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন– যত উঠবে, তত নামবে। যাকে মনে হচ্ছে ওঠা, তাই আরেক যুক্তিতে নামা। যাকে মনে হচ্ছে প্রগতি, তাই আরেক যুক্তিতে পরাগতি।

zoom
সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র দৃশ্য

গতি বিচার করার জন্য চাই ব্যক্তিমন, ব্যক্তিমন হওয়া চাই অনুশীলিত ক্ষুদ্র স্বার্থবর্জিত, নির্ভীক। দু’টি মানুষ, ধরা যাক, দুই পথ দিয়ে পাহাড় শীর্ষে উঠছে। শীর্ষে দু’জনে মুখোমুখি। যে ঘাসের দিক দিয়ে উঠেছিল, সে বললে– ‘এ-পাহাড় ঘাসে ঢাকা’। যে ঘাসহীন পাথরের দিক দিয়ে উঠেছিল, সে বললে– ‘এ পাহাড় পাথরের’। তীব্র ঝগড়া! হাতাহাতি! সেই হাতাহাতির ফলে পাথর পথের পথিক পড়ল ঘাসের দিকে, আর ঘাস পথের পথিক পড়ল পাথরের দিকে। পড়ছে আর ভাবছে! কী ভাবছে? চূর্ণ হয়ে যাওয়ার আগে ভাবছে– বিবেচনাহীন কলহ পিছন দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাকে বলে প্রগতিশীল পরাগতি।

zoom
মাইকেল জ্যাকসনের বিখ্যাত ‘মুনওয়াক’ স্টেপ

ভিড় বাস চলেছে। দ্রুত। ভিড় পিছন দিকে এগিয়ে গিয়েছে। পিছন দিকে এগতে এগতে কেউ ভাবছে– পিছনটাই সামনে! এই ভাবনা ততক্ষণই সত্য, যতক্ষণ না গন্তব্য আসছে। গন্তব্য একটা মুহূর্ত, সময়ের বিন্দু। পাহাড় থেকে পড়তে পড়তে আমরা সবাই হয়তো ভাবতে বসতে পারি। তবে ততক্ষণে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছে। ভূতলে পড়ে চূর্ণ হয়ে যেতে বেশি সময় লাগবে না।

……………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন সিরিয়াসলি নেবেন না-র অন্যান্য লেখা

……………………..

Aranyer Dinratri Bangadarshan French Revolution Ishwar Chandra Vidyasagar Rabindranath Tagore Rammohan Roy Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Satyajit Ray Saumitra Chatterjee Sri Chaitanya

Share this article on