


ছবিতে তিনি লিনোকাট প্রিন্টের সাহায্যে আলো-ছায়ার সহাবস্থানে গড়ে তোলেন এক কল্পনার জগৎ। বোর্ড, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা ছবির অংশ ও কাগজ কতগুলি স্তরে লাগিয়ে ছবিতে বিভিন্ন তলের সৃষ্টি করেছেন, তাঁর উপর কলমে এঁকেছেন, যেন এ এক ‘অতল দরিয়া’। ছবিগুলোতে লিখেছেন তাঁর দিদার গাওয়া ভাটিয়ালি গানের কথা। যার সুরে নৌ-যাত্রার ইতিহাস নথিবদ্ধ আছে।
৯ জুন কলকাতার এ জে সি বোস রোডের আর্টসি ক্যাফে কফি অ্যান্ড কালচারে শিল্প-ঐতিহাসিক এবং শিল্পী অধ্যাপক দেবদত্ত গুপ্তের একক প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিল্প-ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। নিজে অনেকগুলি প্রদর্শনী কিউরেট করলেও, এই প্রথম তাঁর ছবির একক প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘আই লার্নড দ্য রিভার বিফোর আই স ইট’। বাংলার নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতির আবেগ তাঁর ছবির মধ্যে লক্ষ করা যায়। ছোটবেলায় ওপার বাংলা থেকে দিদার গাওয়া ভাটিয়ালি গান শুনেই তাঁর পরিচয় হয় সেই সংস্কৃতির সাথে। সেখানে কোথাও পাঁচপীরের গল্প পাওয়া যায় তো কোথাও পাওয়া যায় মনসামঙ্গলের গল্প।

শিল্পীর কথায়, আজও ছেলেবেলার সেই গানের নদী তাঁকে তাড়া করে– যেন তখন থেকেই তিনি একজন ভাসমান মানুষ: ‘এক মাঝি, যার কোনো স্থির ঠিকানা নেই’। তাই হয়তো তাঁর ছবিতে নদীর বিস্তার। ছবির পট জুড়ে নৌকো, মাছেদের দলের অবাধ বিচরণ। শুধু তাই নয়, পাখি, প্রকৃতি, বিমূর্ত আকার-আকৃতি ইত্যাদিও রয়েছে। যেগুলি ছবির মধ্যে অতীতের নানান অভিজ্ঞতার সাংকেতিক তাৎপর্য বহন করছে। প্রদর্শনীর কিউরেটর মিলটন ভট্টাচার্য বলেন এই প্রদর্শনী আমাদের অতীত ও বর্তমানের মাঝে, লিনোর দৃশ্যমান প্রিন্ট ও অদৃশ্য স্মৃতির সামনে দাঁড় করায়।

ছবিতে তিনি লিনোকাট প্রিন্টের সাহায্যে আলো-ছায়ার সহাবস্থানে গড়ে তোলেন এক কল্পনার জগৎ। বোর্ড, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা ছবির অংশ ও কাগজ কতগুলি স্তরে লাগিয়ে ছবিতে বিভিন্ন তলের সৃষ্টি করেছেন, তাঁর উপর কলমে এঁকেছেন, যেন এ এক ‘অতল দরিয়া’। ছবিগুলোতে লিখেছেন তাঁর দিদার গাওয়া ভাটিয়ালি গানের কথা। যার সুরে নৌ-যাত্রার ইতিহাস নথিবদ্ধ আছে। তিনি চেষ্টা করেছেন বাংলার নদী-সংস্কৃতির ওই গভীর আবেগ নিজের ছবিতে ধরে রাখতে। ‘খাজা খিজির বাতি’, ‘আল্লা মেঘ দে’, ‘নদীর আলো’, ‘নৌকোর চোখ’, ‘মনসদ-ই-আলা’, ‘স্মরণের পথবাহী’, ‘পাখির গান’, এবং ‘মাছ পাখি আর রোদ্দুর’ ইত্যাদি– ছবির নামকরণও এমনভাবে করেছেন যেন প্রত্যেকটি নামই ভাটিয়ালি গানের কথা, নদী-কেন্দ্রিক জীবনযাত্রার কথা, নাবিকের ইতিহাস, সদাগরদের কথা, শিল্পীর শৈশবের নানান বিষয়ে বিস্ময় ইত্যাদিকেই বারবার স্মরণ করায়। তিনি একজন শিল্প-ঐতিহাসিক বলেই বোধহয় শিল্পে আবেগের সঙ্গে ইতিহাসকেও একাত্মীকরণ করেছেন, পূর্বের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ইতিহাসকে মেলাতে পেরেছেন নিজের ছবিতে।


এখানে ‘মসনদ-ই-আলা’ নামের ছবিটিতে কাগজের টুকরো দিয়ে নিজের মনের মতো করে পূর্ব মেদিনীপুরের হিজলি শরিফ বা মসনদ-ই-আলার দরগা তৈরি করেছেন। যে দরগা শুধুমাত্র একটি পুণ্যস্থান হিসেবেই পরিচিত ছিল না, বরং সুফি সাধনা আর সমুদ্রপথে বাণিজ্যের এক অদ্ভুত সংস্কৃতির মিলনভূমি ছিল। ষোড়শ শতকের হিজলির শাসক আফগান বংশের তাজ খাঁ ‘মসনদ-ই-আলা’ নামে পরিচিত ছিলেন গ্রামের মানুষের কাছে। তিনি কাররানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও সুফি-সাধক হযরত মখদুম শাহ চিশতি পীরের নিবেদিতপ্রাণ শিষ্য ছিলেন। ছিলেন একজন দয়ালু শাসক, ধর্মীয় সহনশীল ও সংস্কৃতির প্রতি ছিল তাঁর ভালোবাসা। মৃত্যুর পর তাঁর সমাধিস্থান ক্রমে পরিণত হয় ধর্মীয় সংস্কৃতির মিলনস্থলে। আজও হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ সেখানে যান তাজ খাঁ ওরফে ‘পয়গম্বর’ মনসদ-ই-আলার আশীর্বাদ নিতে।


১৬২৮ থেকে ওই হিজলি হয়ে ওঠে বন্দর-শহর। ১৬৮৭ সালে ব্রিটিশ নৌ-বাহিনীর আগমন, ক্যাপ্টেন নিকলসন ও পরবর্তীতে জব চার্নকের দখল– এগুলি ছাড়াও হিজলির ইতিহাসে লুকিয়ে আছে আরেকটি সুন্দর জনশ্রুতি, যেখানে বলা হয় এই মসজিদের আলো ছিল নাবিকদের পথপ্রদর্শক। এখানে শিল্পীর ছবিতে সেই দরগা যেন চারিদিক থেকে মৎস্য দ্বারা সুরক্ষিত। মসজিদের স্তম্ভের সঙ্গে মিশে গিয়েছে সুকিয়া স্ট্রিটের রাস্তার এবং হেদোর গলির গ্যাসবাতির স্তম্ভ দেখার অভিজ্ঞতা। লিনোকাট প্রিন্টের মাধ্যমে এমন আলোছায়ার সৃষ্টি করেছেন যেন তাঁর ছবিতেও গভীর অন্ধকারে হিজলি শরিফের আলো নাবিকদের পথ দেখাচ্ছে।

শিল্পীর ‘নৌকোর চোখ’ যেন সেই পথপ্রদর্শক আলোকে এখনও খুঁজে বেড়ায়। খুঁজে বেড়ায় সুন্দরবনের মানুষের গল্প ও গানের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য জগৎকে। যা শুধু তিনি অনুভব করে গিয়েছেন। শিল্পীর কথায় তাঁর শিল্পকর্মগুলো সেই অনুভবেরই অনুবাদ।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved